kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সেক্টর-৫

গুলিটিই যেন একাত্তর

এস এম সামছুল ইসলাম, গ্রাম-লামাপাড়া, উপজেলা-বিশ্বম্ভরপুর, জেলা-সুনামগঞ্জ। এক মাস ট্রেনিং করেন ভারতের চেরাপুঞ্জিতে, ইকো ওয়ান ক্যাম্পে। যুদ্ধ করেছেন ছফেরগাঁও, ডালারপাড়, বৈশারপাড়, ইসলামপুর এলাকায়

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গুলিটিই যেন একাত্তর

‘ট্রেনিং তখন শেষ। এবার রণাঙ্গনে যাওয়ার পালা। আমরা নিজ এলাকায় যাওয়ার ইচ্ছার কথা বলি। ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে তিনটি দল করা হয়—বালাট, ভোলাগঞ্জ ও টেকেরহাট। আমি ছিলাম বালাট দলে।

আমাদের কমান্ড করতেন একজন বিহারি মেজর। নাম ডি সুজা। পরবর্তী সময়ে কমান্ডে আসেন মেজর এম এ মোতালেব। প্রথম দিকে বাংলাদেশের ভেতর আক্রমণ করে ফিরে আসতাম। পরে দেশের ভেতর ডিফেন্স রেখেই আক্রমণের প্রস্তুতি নিই।

পাকিস্তানি সেনাদের শক্তিশালী ডিফেন্স ছিল বৈশারপাড় গ্রামে। মঙ্গলকাটা বাজার থেকে আমরা ওদের ওপর আক্রমণ করি। প্রবল আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটে। ডিফেন্স সরিয়ে নেয় ৫০০ গজ পেছনে, ষোলোঘর গ্রামে। আমরা এগিয়ে এসে বৈশারপাড়ায়ই পাকাপোক্ত ডিফেন্স গাড়ি।

১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। বিকেলবেলা। আমরা বৈশারপাড়েই। খবর ছিল আমাদের ওপর অ্যাটাক হওয়ার। ছিলাম ১৬ জন। সবাই প্রস্তুত। বাংকারের ভেতর পজিশন নিয়ে আছি। বাংকারটি একটি বাড়ির ভেতর। পূর্ব দিকে ছিল হাওর অঞ্চল। সবার দৃষ্টি সামনে। কখন আক্রমণ হয় সে অপেক্ষায় আছি! হঠাৎ দেখলাম দূরে ধানক্ষেতের ওপাশে একজন লোক। সে দূর থেকে হাত উঁচিয়ে আমাদের অবস্থান দেখিয়ে দিচ্ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ওপর মর্টার হামলা শুরু হয়। সবাই বাংকার ছেড়ে দ্রুত বাইরে পজিশন নিলাম।

আমি আশ্রয় নিই একটি মেরাগাছের নিচে। ট্রেনিংয়ে নির্দেশ ছিল গাছের সোজাসুজি পজিশন না নেওয়ার। আমার পজিশন তাই গাছের আড়াআড়িতে। পাশেই ছিলেন এলএমজিম্যান। কোথা থেকে গুলি আসছে তা দেখে আমি তাকে নির্দেশ করি। এলএমজিম্যানও ওই অবস্থানে গুলি চালায়। চারদিকে শুধু গোলাগুলির শব্দ। হঠাৎ পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে ব্রাশফায়ার শুরু হয়। সতর্ক হওয়ার আগেই একটি গুলি আমার বাঁ হাতের পেছন দিয়ে শরীরের ভেতর ঢুকে যায়। আমি শব্দ করতে পারছিলাম না। চোখ দুটি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে। মনের ভেতর ভেসে ওঠে মা-বাবার মুখ দুটি। পজিশন অবস্থায়ই আমার মুখটা মাটিতে হেলে পড়ে। অতঃপর মুখ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। তখন ছুটে আসে সহযোদ্ধা আবু লেস ও সিরাজুল ইসলাম।

আমাকে প্রথমে নেওয়া হয় বালাট ইয়ুথ ক্যাম্পে। পরে শিলং মিলিটারি হাসপাতালে। সেখানে পিঠ কেটে বের করে আনা হয় একটি গুলি। গুলিটি আমার স্পাইনালকর্ডে আঘাত করে। ফলে দুই পা প্যারালাইজড হয়ে যায়। এভাবে হুইলচেয়ারই হয়ে যায় চিরসঙ্গী। কী এক ভাবনায় ডাক্তারকে বলে ওই গুলিটি সংগ্রহ করেছিলাম। গুলিটির দিকে তাকালে আজও একাত্তরটা জীবন্ত হয়ে ওঠে।

আমরা তখন লখনউ হাসপাতালে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন দেখতে। ‘বাংলাদেশের খবর শুনতে সেদিন তিনি একটি করে ফিলিপস রেডিও দেন। দেশ স্বাধীনের খবর পেয়ে খুব কেঁদেছিলাম। বাঁচমু কি না তা-ই জানতাম না। পা দুটি অচল। তবু আনন্দে বুকটা ভরে গিয়েছিল।’ একাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা এভাবেই তুলে ধরেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এস এম সামছুল ইসলাম।

এস এম তাহের মিয়া ও জহিরুন নেছার দ্বিতীয় সন্তান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জ বুলচাঁদ হাই স্কুলের ক্লাস টেনের ছাত্র।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় আর্মি নামে। সে খবর পৌঁছে যায় সারা দেশে। সুনামগঞ্জে আনসার-মুজাহিদ, ইপিআর ও স্থানীয় জনতা মিলে আক্রমণ করে এসডিওর বাংলো। নিজেকে বাঁচাতে গ্রামের অনেক যুবকই তখন যোগ দেয় শান্তি কমিটিতে। কিন্তু বাবার উত্সাহে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সামছুল ইসলাম।

মে মাসের মাঝামাঝি সময়। জয়বাংলা বাজার হয়ে তিনি চলে আসেন ভারতের বালাটে। সঙ্গী ছিলেন বন্ধু সিরাজুল ইসলাম ও আবুল কালাম আজাদ। গিয়াস উদ্দিন সুবেদার ট্রেনিংয়ের জন্য রিক্রুট করেন তাঁদের। সামছুল ইসলামের ভাষায়, ‘অনেকেই ছিলেন ১৮ বছরের কম বয়সী। তবু বয়স বাড়িয়ে নাম লেখালো। যুদ্ধে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাদের। ট্রেনিংয়ে ফায়ার করার সময় এদের অনেকেই পেছনে ছিটকে পড়ত। শরীরের জোর নেই; কিন্তু মনে ছিল অদম্য শক্তি।’

সামছুল ইসলামরা ট্রেনিং নেন মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে, ইকো ওয়ান ক্যাম্পে। ৫ নম্বর ব্যাচে তাঁরা ছিলেন ১০৫ জন। ব্যাচ কমান্ডার ছিলেন শ্রীজগেজ্যাতি দাস বীরবিক্রম। ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব ছিল ভারতের গুরখা রেজিমেন্টের।

পাহাড়ে ওঠানামাই ছিল তাঁদের প্যারেড। শেখানো হয় হাতিয়ার রাখার কৌশল, এইম করা, ফায়ার করা, থার্টি সিক্স হ্যান্ড গ্রেনেড, অ্যান্টি ট্যাংক গ্রেনেড, অ্যান্টি পারসোনাল মাইন, ডিনামাইড, এক্সপ্লোসিভ প্রভৃতি বিষয়ে। সমরে এসে সামছুল ইসলাম খুব কাছ থেকে দেখেছেন সহযোদ্ধাদের রক্তাক্ত দেহ আর মৃত্যুযন্ত্রণা। তবু যুদ্ধ করেছেন অকুতোভয়ে।

এ দেশের ছেলেরা যখন নতুন কিছু আবিষ্কার করে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের সুনাম প্রতিষ্ঠিত করে, তখন আনন্দে বুক ভরে যায় সামছুল ইসলামের। নতুন প্রজন্মের প্রতি পাহাড়সম আশা তাঁর। তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা ভালোবেসে দেশটাকে আরো উন্নত করবে। মনে রাখবে, দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। দেশপ্রেম ঈমানের একটি অঙ্গ। নিজের দেশকে যে ভালোবাসে না সে নিমকহারাম।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা