kalerkantho

সোমবার  । ১৬ চৈত্র ১৪২৬। ৩০ মার্চ ২০২০। ৪ শাবান ১৪৪১

নানা সংকটেও ডিমে স্বনির্ভর বাংলাদেশ

প্রতিদিন ডিমের উৎপাদন পৌনে ৫ কোটি

রফিকুল ইসলাম   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নানা সংকটেও ডিমে স্বনির্ভর বাংলাদেশ

গত এক দশকে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণ। একই সঙ্গে ভোক্তার ডিম খাওয়ার পরিমাণও বেড়েছে। সারা দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য খামার। তবে খামারিদের দাবি, অন্যান্য পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে সে তুলনায় ডিমের দাম না বাড়ায় নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে শিল্পটি। এসব নিয়ে বিস্তারিত আয়োজন

দেশে ডিম উৎপাদন বেড়েছে। আমিষের চাহিদা পূরণে একসময় পিছিয়ে থাকলেও এখন অনেকটা স্বনির্ভর। ডিম উৎপাদনে স্বাবলম্বী বাংলাদেশ। চাহিদা পূরণে যতটা প্রয়োজন ঠিক ততটাই ডিম উৎপাদনে সক্ষম দেশের খামারিরা। দেশে প্রতিদিন মুরগি, হাঁস, কবুতর ও কোয়েলের প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। পৃথক হিসাবে কেবল মুরগির ডিম উৎপাদিত হয় সাড়ে তিন থেকে চার কোটি।

প্রাণিসম্পদের অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বছরে একজন মানুষের ডিমের চাহিদা ১০৪টি। ২০১৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ১৬ কোটি ৬৬ লাখ জনসংখ্যার হিসাব ধরে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এখন দেশে বছরে মাথাপিছু ডিম উৎপাদন হচ্ছে ১০৩.৮৯টি।

হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনসংখ্যা চাহিদা অনুযায়ী যে পরিমাণ ডিম প্রয়োজন প্রায় সবটুকুই উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে দেশে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বছরে মাথাপিছু ১০৪টি ধরে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ডিমের চাহিদা ছিল এক হাজার ৭৩২ কোটি পিস। চাহিদার বিপরীতে ডিম উৎপাদিত হয়েছে এক হাজার ৭১১ কোটি পিস।

ডিম উৎপাদকরা বলছেন, আমিষের চাহিদা পূরণে ডিমের চাহিদা অপরিসীম। সম্ভাবনাময় এই খাতটি নানামুখী সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। মুরগি পালনের পর ডিম উৎপাদনে ব্যয় অত্যধিক হলেও পর্যাপ্ত দাম মিলছে না। মুরগির খাবারের মূল্য ক্রমবর্ধমান, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে উচ্চ দাম, রোগ-বালাইয়ে দেদার মুরগি মরলেও ইনস্যুরেন্স বা বীমা না থাকায় খামারিরা পথে বসেন। এতে করে নতুন করে কেউ আর এই ব্যবসায় পা বাড়াচ্ছেন না বরং বড় মূলধনের ব্যবসায়ীরা মুরগি চাষ বাদ দিয়ে অন্যদিকে ঝুঁকছেন।

তাঁদের মতে, বড়রা লোকসানে পড়ে এই ব্যবসা ছাড়লেও নিজস্ব জায়গার উপর ছোট পরিসরে গড়া খামারিরা কোনোমতে টিকে রয়েছেন। দেশের মানুষের আমিষের চাহিদা বড় ভূমিকা পালন করছে। এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ না নিলে তাঁরাও ঝরে পড়বেন। ডিম থেকে আমিষের চাহিদা পূরণে সংকট দেখা দেবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ এই খাতটি আবারও অন্ধকারে ডুববে।

ডিম উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বলছেন, ক্রমবর্ধমান মানুষের চাহিদা পূরণে মুরগির নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন চলছে, যাতে বেশি পরিমাণ ডিম উৎপাদিত হয়। সাধারণত কোনো মুরগি বছরে ৫০ থেকে ৬০টি ডিম দিত। কিন্তু উদ্ভাবিত নতুন জাতের মুরগি বছরে ২৫০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত ডিম দিচ্ছে, যা দেশে ডিম উৎপাদনে সাড়া জাগিয়েছে। আরো কিভাবে ডিম উৎপাদন বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে গবেষণা চলছে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) এক হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে ডিমের বাণিজ্যিক উৎপাদন দৈনিক প্রায় তিন কোটি ৮০ লাখ পিস। সেই হিসাবে ৩৬৫ দিনে এক বছরে দেশে ডিম উৎপাদিত হয় এক হাজার ৩৮৭ কোটি। বছর বছর ডিমের এই উৎপাদন বাড়ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উৎপাদন ও গৃহপালিত মুরগি, হাঁস ও কোয়েল পাখির ডিমের দৈনিক গড় উৎপাদন চার কোটি ৭১ লাখের বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন হয়েছে এক হাজার ৭১১ কোটি পিস।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের গত ১১ বছরের তথ্যানুযায়ী, দেশে ক্রমাগতভাবে ডিম উৎপাদন বাড়ছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন ছিল ৪৬৯ কোটি পিস। তবে ১১ বছরের ব্যবধানে এই উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি।

অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০০৯-১০ সালে ডিম উৎপাদন হয় ৫৭৪ কোটি পিস, ২০১০-২০১১ সালে ৬০৭ কোটি পিস, ২০১১-১২ সালে ৭৩০ কোটি পিস, ২০১২-১৩ সালে ৭৬১ কোটি পিস, ২০১৩-১৪ সালে ১০১৬ কোটি পিস, ২০১৪-১৫ সালে ১০৯৯ কোটি পিস, ২০১৫-১৬ সালে ১১৯১ কোটি পিস, ২০১৬-১৭ সালে ১৪৯৩ কোটি পিস ও ২০১৭-১৮ সালে ১৫৫২ কোটি পিস।

খামারিরা বলছেন, মুরগির ডিমের দাম কমে যাওয়ায় লোকসানে পড়েছেন ডিম উৎপাদনকারীরা। উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ডিমের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি। ডিমের দাম কমছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যানুযায়ী, ডিমের দাম এখন কমতি। গত এক মাসের তুলনায় প্রতি হালি ফার্মের ডিমের দাম কমছে ৮.৮২ শতাংশ। এক মাস আগে প্রতি হালি ডিমের দাম ছিল ৩৩-৩৫ টাকা। কিন্তু এখন সেটা বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২ টাকা। আর বছরের হিসাবে প্রতি হালি ডিমের দাম কমেছে ১১.৪৩ শতাংশ। এক বছর আগে প্রতি হালি ডিমের দাম ছিল ৩৪ থেকে ৩৬ টাকা।

খামারিরা বলছেন, মুরগি লালনে ব্যয় কমাতে না পারলে লোকসানে খামার বন্ধ করে দিতে হবে। ডিম ও মাংসের দাম কমলেও বাড়ছে বাচ্চা ও ওষুধের দাম। ডিমপাড়া মুরগির এক দিনের বাচ্চার দাম বাড়িয়েছেন হ্যাচারি মালিকরা। তাঁরা সিন্ডিকেট সিন্ডিকেট করে বাচ্চার দাম বাড়ানোয় লোকসানে পড়ছে অনেকে। যে বাচ্চার দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকা, সেটি এখন ৮০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি। বাচ্চা উৎপাদনকারী হ্যাচারি মালিকদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। আর তা না পারলে খামারির এই লোকসান ঠেকানো সম্ভব নয়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) মো. আজহারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিম উৎপাদনে আমরা এখন অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। মুরগির ডিমের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন চলছে। আগে মুরগি অনেক কম ডিম দিলেও নতুন উদ্ভাবিত জাতের মুরগি বছরে ২৫০ থেকে ৩০০টি ডিম দিচ্ছে। আবার কোনোটি বিশেষ ক্ষেত্রে বেশিও দিচ্ছে। ক্রমবর্ধমান মানুষের চাহিদা মেটাতে আরো বেশি ডিম উদ্ভাবনের বিষয়ে কাজ চলছে। কিভাবে নতুন জাত উদ্ভাবন করা যায় সেটি নিয়ে কাজ চলছে।’

তিনি বলেন, ‘দেশে বর্তমানে যে ডিম উৎপাদিত হয়, জাতীয় হিসাবে কেবল মুরগির ডিম কত উৎপাদন সেটার আলাদা তথ্য নেই। তবে ধারণাগত তথ্যে বলা যায়, উৎপাদিত ডিমের ৭০ শতাংশ মুরগির ডিম। আর ৩০ শতাংশ হাঁস ও অন্যান্য প্রাণী থেকে পাওয়া যায়।’

বাংলাদেশ এগ প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাহের আহমেদ সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের খামারিরা চাহিদা অনুযায়ী ডিম উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে। মানুষের চাহিদা অনুযায়ী যত ডিম প্রয়োজন সবই উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এই খাতটি নানা সংকটে ভুগছে। বিদ্যুতের বাড়তি দাম, মুরগির খাবারের দামও বেশি। ডিমপাড়া বাচ্চার দাম বাড়িয়েছে হ্যাচারি মালিকরা, যা এই খাতের সংকটকে আরো বাড়িয়েছে।’

তিনি বলেন, এগ প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত খামার ছিল এক হাজার কিন্তু এখন এক শ থেকে দুই শতে এসে ঠেকেছে। ব্যবসায় টিকতে না পেরে অনেক খামার বন্ধ করে দিয়েছে। বড় বড় খামারি বছরের পর বছর লোকসান করা বন্ধ করে অন্যদিকে ঝুঁকছেন। হাতে গোনা কিছু ব্যবসায়ী টিকে রয়েছেন। কিন্তু বিদ্যমান সমস্যা সমাধান না করলে তাঁদের টিকে থাকাও কষ্টসাধ্য হবে।’

তিনি আরো বলেন, একসময় ডিম উৎপাদনে পিছিয়ে থাকলেও খামারিদের হাত ধরে এই খাতটি অনেক দূর এগিয়েছে। দেশের মানুষ ক্রমেই বাড়ছে, বাড়ছে ডিমের চাহিদা। প্রতিদিন যে পরিমাণ ডিম প্রয়োজন, সেটা এখন খামারিরা উৎপাদন করতে পারছেন। প্রতিদিন তিন থেকে চার কোটি ডিম প্রয়োজন। পুরোটুকুই আসছে খামারিদের হাত ধরে। গাজীপুরে ডিম উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হলেও এখন সারা দেশে ডিম উৎপাদন হচ্ছে। আনুষঙ্গিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিম উৎপাদনে খামারিদের টিকে থাকা কষ্টকর। অনেকে টিকতে না পেরে খামার বন্ধ করেছেন। আরো কিছু খামার বন্ধের পথে। খামারিদের বাঁচাতে উদ্যোগ না নিলে আবারও মুখ থুবড়ে পড়বে ডিম উৎপাদন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা