kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

মান ও পণ্যবৈচিত্র্যে পিছিয়ে

নামেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা

আরিফুর রহমান   

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নামেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা

মাঝামাঝি সময়ে এসে বাণিজ্য মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীর ভিড় বাড়ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘দেইখ্যা লন দেড় শ, বাইছ্যা লন দেড় শ’—এটি কোনো ফুটপাতের হকারের হাঁকডাক নয়; ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার ভেতরে হকারদের ডাক। বাণিজ্য মেলায় ঢুকলেই শোনা যায় ফুটপাতের মতো হকারদের ডাক। মেলাটিকে আন্তর্জাতিক বলা হলেও আন্তর্জাতিকের কোনো লেশ নেই সেখানে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পাশে যে জায়গাটিতে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হয়, সেটিকে ‘আন্তর্জাতিক’ বলতে নারাজ দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

তাঁরা বলেছেন, বাণিজ্য মেলাকে আন্তর্জাতিক বলার অর্থ হলো ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা করা। কারণ, মেলার অর্থ হলো সেখানে শুধু সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল নতুন পণ্যের পসরা বসানো হবে। কিন্তু বাণিজ্য মেলায় গড়পড়তা সব ধরনের পণ্যই বিক্রি হচ্ছে। কোনো নতুন পণ্য নেই। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদেশে যেসব আন্তর্জাতিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়; সেখানে কখনো পণ্য বিক্রি হয় না। মেলায় শুধু পণ্যের অর্ডার নেওয়া হয়। তা ছাড়া বিদেশে এক মাস ধরে কোনো মেলা হয় না। মেলা হয় তিন থেকে পাঁচ দিন। মেলার উদ্দেশ্য হলো—একটি দেশের সৃষ্টিশীল পণ্য আরেক দেশের সামনে তুলে ধরা। একই সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো। কিন্তু আন্তর্জাতিক মেলার কোনো মানদণ্ডই অনুসরণ করা হয় না বাণিজ্য মেলায়। ভবিষ্যতে বাণিজ্য মেলা বন্ধ করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যাওয়ার কথা বলেছেন ব্যবসায়ীরা।

গত কয়েক দিন মেলা ঘুরে দেখা গেছে, বাণিজ্য মেলায় ক্রেতাদের দেওয়া হচ্ছে নানা অফার, ছাড়। একটি পণ্য কিনলে তিনটি ফ্রি। সেলফি তুলে জিতুন পুরস্কার—এমন অফারও মিলছে বাণিজ্য মেলায়। দেশীয় পণ্য বিক্রি হচ্ছে বিদেশি প্যাভিলিয়নে। চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিদিন ঠকানো হচ্ছে ক্রেতাদের। পণ্যের দামও রাখা হচ্ছে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি। বাণিজ্য মেলায় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরে বিস্তর অভিযোগ জমা পড়ে নানা প্রতারণার।

গত কয়েক দিন ঘুরে বাণিজ্য মেলা ঘুরে দেখা গেছে নানা অনিয়ম আর অসংগতি। ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের দাম রাখা হয় অস্বাভাবিক। নিম্নমানের পণ্যও গছিয়ে দেওয়া হয় ক্রেতাদের। এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বিস্তর। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরে প্রতিদিন অসংখ্য অভিযোগ আসে ভোক্তাদের কাছ থেকে। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাকে ঘিরে প্রতি বছরই মিরপুর এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন মিরপুর, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুরসহ ওই এলাকার বাসিন্দারা। গত সপ্তাহে এক সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী মেলা থেকে পণ্য কিনতে গিয়ে এক বিক্রয়কর্মীর খারাপ আচরণের শিকার হন। বেশ কয়েকজন ক্রেতা অভিযোগ করেছেন, মেলার ভেতরে নানা হয়রানি ও খারাপ আচরণের শিকার হয়েছেন তাঁরা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ঢুকে হিজড়ারা ক্রেতা ও স্টলে গিয়ে টাকা দাবি করছে। ক্রেতাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছে। কয়েক দিন আগে এক সংবাদকর্মীর মোবাইল ফোন আছড়ে ভেঙে ফেলেছে ছবি তোলার কারণে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাণিজ্য মেলা চালু হয়েছিল, তার কিছুই এখন মেলায় নেই। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সৃজনশীল নতুন কোনো পণ্য তুলে ধরাই ছিল বাণিজ্য মেলার উদ্দেশ্য। যাতে করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার হয়। নতুন পণ্যের সঙ্গে মানুষ পরিচিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক পণ্যের সঙ্গে দেশীয় পণ্যের সংমিশ্রণ ঘটানোর জন্য বাণিজ্য মেলা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের বাণিজ্য মেলায় নতুন কোনো পণ্য মেলে না। গড়পড়তা সব পণ্যই সেখানে বিক্রি করা হয়। মেলায় দাম বেশি রাখা হচ্ছে। ক্রেতাদের ঠকানো হচ্ছে। নিম্নমানের পণ্যও দেওয়া হচ্ছে।’

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিনের মতে, সারা বছর রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কোনো খবর থাকে না। বাণিজ্য মেলার সময় এলেই তাদের মূল কাজ শুরু হয়। মেলাকে ঘিরে যত অনৈতিক কাজ হয়, সবই হয় বাণিজ্য মেলায়। আর এই সুযোগ করে দেয় ইপিবি। বাণিজ্য মেলার কারণে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

তিনি বলেন, এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যেটি বাণিজ্য মেলায় হয় না। যেকোনো পণ্যের দাম বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। দেশে এক ধরনের ব্যবসায়ী তৈরি হয়েছেন, তাঁরা শুধু মেলা ব্যবসায়ী। তাঁদের কারণে মেলায় আসা ক্রেতারা প্রতারণার শিকার হন। পৃথিবীতে কোথাও মেলা তিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি হয় না। বাংলাদেশে বাণিজ্য মেলা হয় এক মাস ধরে। বাণিজ্য মেলা ভবিষ্যতে যাতে আয়োজন বন্ধ করা হয়, সে জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যাওয়ার কথাও বললেন হেলাল উদ্দিন। কয়েকজন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চীনে যেসব মেলা হয়, সেসব মেলা হয় তিন থেকে পাঁচ দিন। জার্মানিতেও বাণিজ্য মেলা হয়। তবে সেখানে পণ্য কেনার সুযোগ নেই। শুধু অর্ডার দেওয়া হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা