kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

হাত বদলেই দাম দ্বিগুণ

প্রতিদিন অর্ধশতাধিক ট্রাকে সবজি আসছে ঢাকায়

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হাত বদলেই দাম দ্বিগুণ

বগুড়ার মহাস্থানগড়ের সবজি হাটে শীতকালীন সবজির সমারোহ। ছবি : কালের কণ্ঠ

সবজির পাইকারি বাজার মহাস্থান হাটে এখন প্রতি কেজি ফুলকপি বিক্রি করে কৃষকরা পাচ্ছেন ২৫ টাকা (প্রতি মণ এক হাজার টাকা)। অথচ সেখান থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের প্রতি কেজি ফুলকপি কিনতে হচ্ছে ৫০ টাকা কেজিতে। শহরের বকশীবাজার ও কলোনি বাজারে সেই দাম আরো ১০ টাকা বেশি।

একইভাবে মহাস্থান হাটে কৃষকরা যেখানে এক কেজি বেগুন বিক্রি করে ১২ টাকা ৫০ পয়সা (প্রতি মণ ৫০০ টাকা) দরে, সেখানে তা জেলা শহরের বড় তিনটি কাঁচাবাজারে এক লাফে উঠে যায় ৩০ থেকে ৪০ টাকায়।

সরেজমিনে পাইকারি মোকাম থেকে খুচরা বাজারে শীতকালীন অন্যান্য সবজির দামেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার ভরা সবজি থাকলেও মাসখানেক ধরে দামটা একেবারেই নাগালের বাইরে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছে, এবার অন্য সময়ের চেয়ে বৃষ্টি হয়েছে অনেক বেশি। এ কারণে কৃষকের ক্ষেতে সবজি নষ্ট হওয়ায় সরবরাহ কমেছে, তাই বিক্রি করছে বেশি দামে।

এদিকে বিভিন্ন দামের আর মানের এসব সবজি এখন ট্রাক বোঝাই হয়ে চলে যাচ্ছে ঢাকায়। প্রতিদিন সবজি বোঝাই করে গড়ে অর্ধশত ট্রাক যাচ্ছে। এগুলোর মালামাল ঢাকার কারওয়ান বাজার, গাবতলী, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে।

মহাস্থান হাটের পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল মোত্তালিব জানান, তিনি হাট থেকে সবজি কিনে ঢাকার কারওয়ান বাজারে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন। প্রতিদিন মহাস্থানগড় থেকে তাঁর চারটি ট্রাক ঢাকায় যাচ্ছে। বগুড়ার নামুজা বন্দরের ফুলকপি চাষি নাজিম উদ্দিন জানান, ক্ষেতেই ফুলকপি বড় হয়ে যাচ্ছে। হাটের ব্যাপারীরা বড় আকারের ফুলকপির দাম বেশি দিচ্ছেন। ছোট আকারের ফুলকপির দাম কম। বর্তমান পাইকারি বাজারে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা মণ দরে ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে। তবে এই ফুলকপি আবার ক্ষেত থেকে কিনলে দাম মণে ২০০ টাকা কম। চাষিরা জানান, এক সপ্তাহ আগে একই ফুলকপি দেড় হাজার টাকা মণ বিক্রি হয়েছে। এখন শীতের সবজি বাজারে বেশ ভালোভাবে আসতে শুরু করেছে। সে কারণে সবজির দাম কমছে।

বগুড়া সদরের বাঘোপাড়া এলাকার ট্রাকচালকরা জানান, সবজি ট্রাকে করে প্রতিদিনই ঢাকা যাচ্ছে। এখন ৫০-৬০টি ট্রাক ঢাকা যাচ্ছে। পুরো শীতকাল এলে ট্রাকের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যাবে। সবজিবোঝাই ট্রাকগুলো ঢাকার বিভিন্ন কাঁচাবাজারে নেওয়া হয়। মহাস্থান হাট থেকে দীর্ঘদিন ধরেই সবজি ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে। বড় ট্রাকের ভাড়া ধরা হয় ১৬ হাজার টাকা করে। সবজির পাইকারিরা এই টাকা সবজি বিক্রি করে তুলে নেন। আবার লাভও গুনে থাকেন। মহাস্থান হাটের ইজারাদার জাহিদুর রহমান জানান, ট্রাকের আকার ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা খাজনা আদায় করা হয়।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার চণ্ডিহারা গ্রামের কৃষক খয়বর আলী জানান, মহাস্থান হাটে ২৫০ টাকা মণ দরে মুলা বিক্রি করেছেন। তাঁর এই মুলা কিনে বগুড়ায় নিয়ে ব্যাপারীরা তিন গুণ দামে বিক্রি করছেন।

শেখেরকোলা ইউনিয়নের কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, তিনি মহাস্থান হাটে বড় সাইজের বাঁধাকপি এনেছিলেন ৩০০ পিস। তাঁর কাছ থেকে এই কপি পাইকাররা কিনে নেন ১৮ টাকা পিস হিসাবে। অথচ ১৫ দিন আগেও তিনি একই সাইজের কপি বিক্রি করেছেন প্রতিটি ২৫-২৬ টাকায়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা বাজারে প্রতিটি কপি ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মোকামতলার আবুল মিয়া সোয়া মণ করলা এনে প্রতি মণ এক হাজার টাকা দরে এবং একই গ্রামের নুর আলম বরবটি বিক্রি করেছেন ৯০০ টাকা মণ দরে। নাজিরপুর গ্রামের কৃষক আবু তাহের পাঁচ মণ চিচিঙ্গা এনে প্রতি মণ ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। হাটে এখনই আগাম জাতের নতুন আলু উঠতে শুরু করেছে। কৃষক আব্দুল মান্নান দুই মণ আলু এনেছিলেন। পাইকারদের কাছে বিক্রি করেছেন গড়ে এক হাজার ২৮০ টাকা মণ দরে।

শহরের ফতেহ আলীতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতি কেজি লম্বা বেগুন ৫০, গোল বেগুন ৪০, কাঁচা মরিচ ৬০, কচুর মুখি ৪০, মিষ্টি কুমড়া ৪০, ওলকচু ৪০, ফুলকপি ৬০, বাঁধাকপি ৪০, করলা ৬০, পটোল ৪০, শিম ১২০, ঝিঙে ৪৫, ঢেঁড়স ৫০, বরবটি ৪০, পেঁপে ২০, কাঁকরোল ৪০ এবং দেশি শসা ৫০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। শহরের বকশীবাজার ও কলোনি বাজারে সবজির দাম আরো বেশি।

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবুল কাশেম আযাদ বলেন, বৃষ্টি হলেও তাতে শীতকালীন আগাম সবজির বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি। বাজারেও সবজির কোনো ঘাটতি নেই। গোটা জেলায় এবার তিন হাজার হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে। দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

বছরে ১০ কোটি টাকার সবজি নষ্ট : মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের মতে, যদি তাঁদের উৎপাদিত এসব সবজি মৌসুমে সংরক্ষণ করে রাখা যেত, তাহলে অন্য মৌসুমে ভালো দামে সেগুলো বাজারজাত করা যেত। আর ভোক্তাও ন্যায্য মূল্যে সব রকমের সবজি পেত সারা বছর। কৃষি বিভাগের মতে, উত্তরাঞ্চলে মৌসুমে শুধু সংরক্ষণের অভাবে পচে নষ্ট হয়ে যায় প্রায় ১০ কোটি টাকার সবজি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা