kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

নিত্যপণ্যের দামের বোঝা ভোক্তার ঘাড়ে

বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তেমন কোনো সংকট নেই। শীতের সবজিরও সরবরাহ পর্যাপ্ত, তবু দাম সহনীয় হচ্ছে না। বাড়ছে মূল্যস্ফীতির হার। এসব নিয়ে বিস্তারিত আয়োজন

রফিকুল ইসলাম   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিত্যপণ্যের দামের বোঝা ভোক্তার ঘাড়ে

ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রচুর পরিমাণে শীতের সবজি এসেছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

মৌসুমি শাক-সবজিতে পাইকারি ও খুচরা বাজার ভরপুর হলেও স্বস্তিতে নেই ভোক্তা। সংকটের কারণে হঠাৎ পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক উত্থানের পর তড়িঘড়ি করে বাজার সামাল দিলেও অন্যান্য ভোগ্য পণ্যেরও দাম বেড়ে গেছে। সবজির জোগানে খুচরা বাজার সয়লাব হলেও দাম কমার তেমন কোনো লক্ষণ নেই।

ভোক্তাদের দাবি, এক সপ্তাহ আগে সবজির যে দাম ছিল তা এখন কিছুটা কমলেও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুম শুরু হলেও এবার শীতে সবজি এসেছে দেরিতে। বাজারে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমে আসছে। ক্রমেই জোগান বাড়লে দাম আরো কমে আসবে।

শুধু কাঁচা শাক-সবজিই নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্য পণ্যের বাজারে ভোক্তার স্বস্তি নেই। এক মাস আগের তুলনায় চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, মসলা ও মাছ-গোশতের দাম বাড়তি। আকাশচুম্বী পেঁয়াজের দাম কমে অর্ধেকে নামলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি। নতুন দেশি পেঁয়াজের জোগান বাড়ায় ক্রমেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাঁদের মতে, পেঁয়াজের নৈরাজ্য ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। সরকারের ব্যাপক তোড়জোড়ে পেঁয়াজ নৈরাজ্যের পরিস্থিতি সামলে উঠলেও অন্যান্য ভোগ্য পণ্যে তেমনটা স্বস্তি নেই। পেঁয়াজের নৈরাজ্য অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। ব্যবসায়ীরা কৌশলে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে এবার শীত মৌসুমের সবজি দেরি করে বাজারে এসেছে। আর দেরিতে আসায় প্রত্যাশিত দামে সবজি মিলছে না। তবে শীতকালীন সবজির দাম কমছে। দেরিতে সবজি এসেছে, আবার সবজি রপ্তানিও বেড়েছে। আর এই রপ্তানি বাড়ায় দেশের বাজারে চাহিদা জোগানে সমস্যা দেখা দিয়েছে, যাতে প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম সহনীয় হচ্ছে না।’ বাজার পরিস্থিতি ভোক্তার অনুকূলে ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সংকটের কারণে পেঁয়াজের দাম অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় অন্যান্য পণ্যের ব্যবসায়ীরা কৌশলে দাম বাড়িয়েছেন। বাড়তি মুনাফার লোভে ব্যবসায়ীগোষ্ঠী এ কাজ করেছে। লোভী ব্যবসায়ীরা ক্রমে দাম বাড়িয়ে চলেছেন। বাজারব্যবস্থা সঠিক রাখতে হলে সরকারের মনিটরিং বাড়াতে হবে। আবার সার্বিক বাজারব্যবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।’

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যানুযায়ী, গতকাল শনিবার রাজধানীর বাজারে আমদানি করা পেঁয়াজ ও ফার্মের মুরগির ডিমের দাম হ্রাস পেয়েছে। সয়াবিন তেল (খোলা ও বোতল), ডাল ও চিনির দাম বেড়েছে। গত এক মাসে ঢাকা মহানগরীর বেশির ভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। চাল, আটা, ময়দা, ভোজ্য তেল ও ডালের দাম বেড়েছে। মসলার মধ্যে আকাশচুম্বী পেঁয়াজের দাম কমলেও রসুন, শুকনা মরিচ, হলুদ, দারচিনি, জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, ধনিয়া ও তেজপাতার দাম বেড়েছে। মাছ ও মাংসের মধ্যে রুই মাছ ও ব্রয়লার মুরগির দাম কমেছে। ইলিশ মাছ, খাসির মাংস ও দেশি মুরগির মাংসের দাম বেড়েছে। গরুর মাংসের দাম ৫৩০-৫০০ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

এক মাস আগে সরু চালের দাম ছিল ৪৮-৫৬ টাকা। গতকাল এ চাল বিক্রি হয়েছে ৫০-৬০ টাকায়। সেই হিসাবে মাস ব্যবধানে চালের দাম ৫.৭৭ শতাংশ বাড়তি। নাজিরশাইল, মিনিকেট (সাধারণ ও উত্তম), পাইজাম, লতা (সাধারণ ও উত্তম) ও মোটা চালের দাম বেড়েছে। উত্তম মানের নাজিরশাইল চালের দাম কেজিতে দুই টাকা করে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫৫ টাকা, যা এক মাস আগে ছিল ৪৮-৫২ টাকা। মাঝারি চাল, পাইজাম, লতা ও মোটা চালে প্রতি কেজিতে দুই টাকা করে বেড়েছে।

এক মাস আগের হিসাবে আটার দাম বাড়েনি বা কমেওনি। সমান অবস্থায় রয়েছে। তবে ময়দার দাম প্রতি কেজিতে দুই টাকা করে বেড়েছে। হঠাৎ করেই বাড়তির দিকে ভোজ্য তেল। খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেল ও পাম অয়েলের দাম বেড়েছে।

মাসের হিসাবে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি কেজিতে বেড়েছে চার টাকা, বোতলজাত পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা, এক লিটার তেলের বোতলে বেড়েছে পাঁচ টাকা। পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের দাম এখন ৪৪৫-৫০০ টাকা, যা এক মাস আগে ছিল ৪৩০-৫০০ টাকা। এক লিটারের বোতলজাত তেলের দাম ছিল ৯৫-১১০ টাকা, যা এখন বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকা। পাম অয়েলের দাম কেজিতে তিন টাকা করে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬৮-৭০ টাকা। এক মাস আগে ছিল ৬২-৬৫ টাকা। সেই হিসাবে পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ৮.৬৬ শতাংশ।

এদিকে অ্যাংকর ও ছোলার দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকলেও মসুর ডালের দাম বাড়তি। তবে তুরস্ক ও কানাডা থেকে আনা ডালের দাম কমছে। দেশি মসুর ডাল, নেপালি ডাল ও মুগডালের দাম বেড়েছে। মসুর ডালের দাম ২.৯৪ শতাংশ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৫-১২০ টাকা কেজি, যা আগের মাসে ছিল ৫৫-১১৫ টাকা। দেশি ডাল বিক্রি হচ্ছে ১০৫-১১০ টাকা, যা এক মাস আগে ছিল ১০০-১০৫ টাকা। নেপালি ডালের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা করে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১১৫-১২০ টাকা।

আলুর দাম কেজিতে দু-তিন টাকা করে বেড়েছে। গতকাল আড়তে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে ২৫-২৮ টাকা। টিসিবি বলছে, আলু বিক্রি হয়েছে ২৫-৩০ টাকায়। সেই হিসাবে এক মাসের তুলনায় আলুর দাম বাড়তি, শতকরা হিসাবে আলু দাম বেড়েছে ১২.২৪ শতাংশ।

দেশি রসুনের দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি দেশি রসুনের দাম ১৬০-১৮০ টাকা। এক মাস আগে রসুনের দাম ছিল ১৫০-১৮০ টাকা। শুকনা মরিচের দাম ১৬.২৮ শতাংশ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৮০-৩২০ টাকায়। এক মাস আগে শুকনা মরিচের দাম ছিল ১৮০-২৫০ টাকা কেজি। হলুদের দাম ৫.১৩ শতাংশ বেড়ে ১৬০-২৫০ টাকা, জিরার দাম বেড়েছে ৬.৬৭ শতাংশ। এলাচের দাম কেজিতে বেড়েছে ৬০০ টাকা। এক মাস আগে এলাচের দাম ছিল প্রতি কেজি দুই হাজার ৪০০ থেকে তিন হাজার টাকা, যা গতকাল বিক্রি হয়েছে তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৬০০ টাকায়। ধনিয়া ও তেজপাতার দাম বেড়েছে ১২ শতাংশ। এক মাস আগে ধনিয়ার দাম ছিল ১০০-১৫০ টাকা, যা গতকাল বিক্রি হয়েছে ১২০-১৬০ টাকায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা