kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

প্রবাসীদের টাকার ৬৬% অনুৎপাদনশীল খাতে

তৈরি হচ্ছে বিলাসবহুল বাড়ি, মার্কেট

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রবাসীদের টাকার ৬৬% অনুৎপাদনশীল খাতে

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার লন্ডনীপাড়া হিসেবে খ্যাত। ইনাতগঞ্জ ও কুর্শি ইউনিয়নের ৯টি গ্রামের অধিবাসীরা রয়েছেন লন্ডন, আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। গ্রামগুলোতে গেলে চোখে পড়ে অনেক বিলাসবহুল বাড়ি। কিন্তু সেগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। বাড়ির মালিক থাকেন লন্ডনে। দেশে দেখাশোনা করছেন কেয়ারটেকার। এখানে ১০০ কোটি টাকায় নির্মিত বাড়ি রয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানায়।

বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদের (বিইউপি) এক জরিপে দেখা যায়, প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থের দুই-তৃতীয়াংশ ব্যয় হয় অনুৎপাদনশীল খাতে এবং এর অধিকাংশ ব্যয় হয় ভোগবিলাসে। জরিপে আরো দেখা যায়, প্রবাসীদের পাঠানো টাকার ৬৬.১ শতাংশ অনুৎপাদনশীল খাতে। এর মধ্যে ৫২.৪ শতাংশ আপ্যায়ন, অনুষ্ঠানাধি এবং ৯.২ শতাংশ ঘরবাড়ি ঠিক করার কাজে ব্যয় হয়। বিনিয়োগ খাতের মধ্যে দোকান ও গাড়ি ক্রয় ইত্যাদিতে। ১২.২ শতাংশ ব্যয় হয় অকৃষি খাতে। কৃষিজমি ক্রয় খাতে ব্যয় হয় ১৫ শতাংশ। ০.৮ শতাংশ ভ্রমণ, ৩.৪ শতাংশ ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যয় হয়।

পিরোজপুর গ্রামের আব্দুল হান্নান জানান, লন্ডনে থাকা অবস্থায় তাঁর গুলশান হোটেলে সিঙ্গাপুরের দুুই শিক্ষার্থী কাজ করত। তাদের আমন্ত্রণে সিঙ্গাপুর গেলে তিনি একটি বিলাসবহুল রাজবাড়ি দেখতে পান। এক যুগ ধরে তেমন একটি রাজবাড়ি নির্মাণের চেষ্টা করছেন। এ জন্য বাজেট প্রায় ৩০ কোটি টাকা। দেশে বিনিয়োগ না করে বাড়ি নির্মাণের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ করলে বিভিন্ন হয়রানির ভয় থাকে। তাই বিনিয়োগ করিনি। আর বাড়ি বানিয়েছি যাতে লোকজন আমার নাম বলে।’

একই গ্রামে আরেকটি বাগানবাড়ি রয়েছে। শিল্পপতি মেহবুব নুরুল ইসলাম ২০০০ সালে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে এ বাড়ি নির্মাণ করেন। সেখানে থাকার কেউ নেই।

তবে হবিগঞ্জ, নবীগঞ্জসহ পৌর এলাকায় অধিকাংশ মার্কেট নির্মাণ করেছেন প্রবাসীরা। হবিগঞ্জ শহরের আমীর চান কমপ্লেক্স, আশরাফ জাহান কমপ্লেক্স, আব্দুল আলী কমপ্লেক্স, মহসিন মার্কেটসহ বেশ কিছু মার্কেট গড়ে তুলেছেন লন্ডনপ্রবাসীরা। চলছে আরো কয়েকটি মার্কেট নির্মাণকাজ।

হবিগঞ্জ শহরের আমীর চান কমপ্লেক্সের স্বত্বাধিকারী আবুল কাশেম জানান, বিচ্ছিন্নভাবে জমি কিনে রাখার চেয়ে মার্কেট নির্মাণে ঝুঁকি কম। আর বিনিয়োগ করতে গেলে শত শত বাধা। তাই প্রবাসীরা সহজ বিনিয়োগ হিসেবে মার্কেট গড়ে তুলছেন।

লন্ডনপ্রবাসী মোতাচ্ছিরুল ইসলাম হবিগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান এবং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট। তিনি মনে করেন, সরকার উদ্যোগ নিলে এখনো প্রবাসীদের বিনিয়োগে আগ্রহী করা সম্ভব। সুষ্ঠু পরিবেশ ও বিনিয়োগ ফেরতের নিশ্চয়তা পেলে তাঁরা বিনিয়োগ করবেন।

তবে ব্যতিক্রমী উদাহরণও আছে। সাতজন প্রবাসী মিলে হবিগঞ্জ শহরের পাশে ধুলিয়াখাল এলাকায় গড়ে তুলেছেন ওমেগা ফিড প্রাইভেট লিমিটেড। কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান লন্ডনপ্রবাসী জাকাউল বারী জানান, দেশে কর্মসংস্থান ও পোল্ট্রি খাতের প্রণোদনার জন্য তাঁরা বন্ধুরা মিলে এই শিল্প করেছেন। নিজেরা দেশে না থাকলেও দেশে থাকা বন্ধুরা এটি দেখভাল করছেন। তিনি প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জহিরুল হক শাকিল বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটি আর্থিক দিক থেকে বেশ সমৃদ্ধ। আমি অনেককে দেখেছি, দেশে এসে বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করেন। অনেকে দুবাই, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশে ফ্ল্যাট কেনেন। কিন্তু তাঁরা দেশে কী খাতে বিনিয়োগ করা যায় সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত নন। এ ছাড়া একটি অপশক্তি বিদেশের মাটিতে দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারে কেবল প্রবাসীরাই না, অনেক বিদেশিও আমাদের দেশ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন।’

তিনি আরো বলেন, সিলেট অঞ্চলে প্রায় ২০ লাখ প্রবাসী রয়েছেন। এর মাঝে লন্ডনেই আছেন পাঁচ লাখ, যা ওই দেশের মোট বাংলাদেশির ৯০ শতাংশ। তাঁরা বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স পাঠান। এই অঞ্চলের ব্যাংকগুলোতে প্রবাসীদের অলস অর্থ পড়ে আছে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। এখানে বিনিয়োগ করার মতো অনেক সুযোগ রয়েছে। রয়েছে কাঁচামাল। সরকারিভাবে হচ্ছে ইকোনমিক জোন। পর্যটন খাতে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে প্রবাসীদের এই খাতে আকর্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা