kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

২০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের হাতছানি

জিয়াদুল ইসলাম   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



২০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের হাতছানি

অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক যখন নেতিবাচক তখন আশার আলো দেখাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা পদক্ষেপে দীর্ঘদিন ধরেই এ সূচকে স্বস্তি বিরাজ করছে। প্রতি মাসেই আগের চেয়ে বাড়ছে রেমিট্যান্স।

সর্বশেষ নভেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ১৫৬ কোটি ডলার। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রেমিট্যান্স এসেছে ৭৭১ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্সের এই গতি সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়বে। সব মিলে চলতি অর্থবছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স আহরণের আশা করা হচ্ছে; যা হবে দেশের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক।

চলতি অর্থবছরে ২০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসবে বলে আগেই আশা করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গত অক্টোবরে রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৮’ প্রদান অনুষ্ঠানে এ আশার কথা শুনিয়েছিলেন তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির অন্য সব সূচকের অবস্থা এখন নেতিবাচক। ধারাবাহিক কমছে রপ্তানি আয়। চাপে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। রাজস্ব আদায়েও ভাটা। মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগে খরা। অথচ রেমিট্যান্স বাড়ছে তেজোদীপ্ত গতিতে। বলা যায় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নে ব্যাংকিং চ্যানেলে আগের চেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এই গতি আরো বৃদ্ধিতে সম্প্রতি এক সার্কুলারে ব্যাংকের মাধ্যমে আসা রেমিট্যান্স মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বেশি হারে বিতরণের সুযোগ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিদ্যমান নিয়মে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সাধারণত দিনে পাঁচবারে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত তোলা বা ক্যাশ আউট করা যায়। আর মাসে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করা যায়। এর বেশি টাকা উত্তোলনের সুযোগ নেই। তবে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে তা শিথিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে গত সপ্তাহে জারি হওয়া ওই সার্কুলার অনুযায়ী, এখন থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের অর্থ নগদ প্রণোদনাসহ সর্বোচ্চ এক লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যাংক কর্তৃক সরাসরি সুবিধাভোগীর এমএফএস হিসাবে প্রদান করা যাবে।

এর আগে চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ জন্য বাজেটে তিন হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ১ জুলাই থেকেই এই প্রণোদনা কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এসংক্রান্ত নীতিমালা ঘোষণা করেছে গত ৬ আগস্ট। যদিও অর্থছাড় জটিলতার কারণে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে অক্টোবরের শুরুতে এই জটিলতা কাটায় ৭ অক্টোবর থেকে সুবিধাভোগীদের মাঝে প্রণোদনা বিতরণ শুরু করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

নীতিমালা অনুযায়ী, দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত প্রবাসী আয়ে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে প্রণোদনা দিতে পারবে ব্যাংকগুলো। দেড় লাখ টাকার বেশি আয় এলে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা সাপেক্ষে প্রণোদনা পাবেন গ্রাহকরা। এ ছাড়া অক্টোবর মাসেই তিন দফায় প্রায় ২৫ পয়সার মতো টাকার অবমূল্যায়ন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর নভেম্বরে দুই দফায় করা হয়েছে আরো ১৫ পয়সার মতো। সব মিলে নভেম্বর ও ডিসেম্বর এই দুই মাসে পাঁচ দফায় ৩৫ পয়সার মতো কমানো হবে। বর্তমানে প্রতি ডলারের বিপরীতে ৮৪ টাকা ৯০ পয়সা মিলছে। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে আগের চেয়ে বেশি বিনিময় মূল্য পাওয়ায়ও বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, নগদ প্রণোদনা দেওয়ার খবরে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে বেশি বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়ে আসছেন প্রবাসীরা। চলতি অর্থবছরের প্রতি মাসেই আগের অর্থবছরের একই মাসের চেয়ে অধিক হারে রেমিট্যান্স বেড়েছে। যেমন : চলতি অর্থবছরের জুলাইতে ১৫৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা; যা গত অর্থবছরের জুলাই মাসে ছিল ১৩১ কোটি ৮১ লাখ ডলার। এরপর গত আগস্টে ১৪৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স আসে; যা গত অর্থবছরের আগস্টে ছিল ১৪১ কোটি ১০ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বরে আসে ১৪৭ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ১১৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। অক্টোবরে আসে ১৬৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলার, গত অর্থবছরের অক্টোবরে এসেছিল ১১৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। আর সর্বশেষ গত নভেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৫ কোটি ৫২ লাখ ডলার। এটি গত অর্থবছরের একই মাসের চেয়ে প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের নভেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছিল ১১৮ কোটি ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে এক হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স আসে। এই অঙ্ক আগের বছরের (২০১৭-১৮) চেয়ে ৯.৬ শতাংশ এবং অতীতের যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক বছরে এই পরিমাণ রেমিট্যান্স আসেনি। এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এক হাজার ৪৯৮ কোটি ১৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। ওই অঙ্ক ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে ১৭.৩২ শতাংশ বেশি ছিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা