kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ব্র্যান্ড যখন কম্পানির সংস্কৃতি

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ব্র্যান্ড যখন কম্পানির সংস্কৃতি

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি বা করপোরেট কালচার নিয়ে আমরা প্রায়ই আলোচনা করি। কারণ বেশির ভাগ স্থানীয় কম্পানিই সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখার বাইরে। বিদেশি বা আন্তর্জাতিক কম্পানিগুলো ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কম্পানিগুলোর সঠিক করপোরেট বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপের অভাব। এসব কম্পানিকে যদিও অনেকে করপোরেট বলে দাবি করেন। আদতে ওই সব কম্পানির সাংগঠনিক কাঠামোর সত্যিকারের গঠন, আবার গঠনতন্ত্র সংগঠনের ধরন, ভিশন, মিশন, ভ্যালুজ সমসাময়িক এবং আধুনিক মানসম্মত নয়। এর ফলে এসব কম্পানি হারাচ্ছে ভোক্তাদের আস্থা। হারাচ্ছে দক্ষ লোকবল, আকৃষ্ট করতে পারছে না ভালো মানবসম্পদ।

সত্যিকারের সুনাম ধরে রাখতে সুনাম ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। আর সে জন্য দরকার সঠিক করপোরেট ব্রাঞ্চ ম্যানেজমেন্ট। এর মাধ্যমে একটি ব্র্যান্ড কালচার তৈরি হবে। সেটি শুরু হবে কম্পানির ভিশন, মিশন ও ভ্যালুজের মাধ্যমে। যেটি থাকবে, কম্পানির ডিএনএ প্রকাশ পাবে প্রতি পদক্ষেপে, ভ্যালুজের মাধ্যমে, ভোক্তা ও কর্মীর আচার-আচরণে, অভিজ্ঞতায়, অভিব্যক্তিতে, প্রকাশভঙ্গিতে, স্পর্শবিন্দুতে (টাচপয়েন্ট), অনুভবের ছোঁয়ায়। তাই ব্র্যান্ড ডিএনএকে অনেক সময় ব্র্যান্ডের নির্যাসও বলা যায়।

করপোরেট কালচার বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এমনভাবে তৈরি করা দরকার, যাতে ওই কম্পানির কর্মীবাহিনীর মধ্যে ব্র্যান্ডের ভিশন-মিশন মাথায় রেখে ভ্যালুজগুলো প্রকাশিত হয়, সঠিক কৌশল ও মানসম্মত ব্র্যান্ডেড সেবা বা অভিজ্ঞতা দেওয়া যায়।

সফল ও সুষম ব্র্যান্ড কালচার তৈরির ক্ষেত্রে একটি কম্পানি ম্যানেজমেন্ট ও লিডারশিপের ওপর নির্ভরশীল। অন্যভাবে বললে একটি কম্পানির কর্তাব্যক্তিদের ওপরই নির্ভর করে সঠিক ও সুষম ব্র্যান্ড কালচার। এর ফলে কম্পানির সব কর্মকর্তা, কর্মচারী মনস্তাত্ত্বিকভাবে, কৌশলগতভাবে সব কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে, প্রেরণা ও প্রণোদিত হয়, পুরস্কার ও প্রতিদান পায়।

একটি স্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি ধরে রাখতে সহজাত, স্বকীয়তা পালন করে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কর্মকাণ্ডে একটি ভাবমূর্তি প্রকাশ করতে হয়, যা কি না ব্র্যান্ড প্রমিজের সঠিক ব্যবহারের পন্থা বা পদ্ধতি। অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী যদি একটু ব্র্যান্ড ভিশন এবং ব্র্যান্ড প্রমিজ মেনে চলে, উৎসাহ-উদ্দীপনার মাঝে বেড়ে ওঠে, সঠিক মূল্যায়ন ও পুরস্কারের মাধ্যমে প্রণোদিত হয়, তাহলে ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাহ্যিকভাবে তারা ভোক্তা, ভেন্ডার, বিনিয়োগকারী, পৃষ্ঠপোষকসহ অন্য সব অংশীদারকে সঠিক ও মানসম্পন্ন পণ্য ও সেবা প্রদানের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের উৎকর্ষ লাভ করা যায়। যেসব কম্পানি সঠিক ব্যাবসায়িক পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া মেনে চলে; কর্মচারীদের দায়িত্ব-কর্তব্য ও জবাবদিহি সঠিকভাবে ভাগ করে দেয়, সঠিক কর্মী ব্যবস্থাপনা মেনে চলে, সব বিভাগ ও বিভাগীয় কর্মীদের মধ্যে অপারেশন বা ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে সুস্পষ্ট, সহজবোধ্য ও স্বচ্ছভাবে জানিয়ে দেয় তাহলে একটি ব্র্যান্ডেড সংস্কৃতি গড়ে উঠতে সময় লাগে না। এটা টপ ম্যানেজমেন্ট থেকে একজন ট্রেইনি পর্যন্ত একইভাবে বা প্রক্রিয়ায় মেনে চলতে হবে।

এভাবে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের মধ্যে যদি সব প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি ছড়িয়ে দেওয়া যায় আর তারা যদি গভীরভাবে আন্তরিকতা দিয়ে তা মেনে চলে তাহলে যেকোনো ব্যাবসায়িক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সফল করতে বেশি কষ্ট করতে হবে না। আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্র্যান্ডের ইমেজ বাড়বে। বাড়বে তাদের পেশাদারি ও দক্ষতা ব্যক্তিগত পর্যায়ে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে ব্র্যান্ড কালচার তো দূরের কথা; ব্র্যান্ড ডিপার্টমেন্টই অবহেলিত অনেক প্রতিষ্ঠানে। করপোরেট ব্র্যান্ড তো দূরের কথা, সঠিক ব্র্যান্ডিংটাও অনেকে জানেন না। তেমন অভিজ্ঞ লোক নিয়োগেই কার্পণ্য করেন। আর সেখানে ব্র্যান্ডই ব্যবসার মূল। এটাই সফল ও অসফল বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আর ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য। কেউ ব্র্যান্ডকে ব্যবসা হিসেবে চিন্তা করে ব্যাবসায়িক প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি তৈরি করে। অন্যদিকে ব্যক্তিমালিককে খুশি করার জন্য ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা পদ্ধতি তৈরি করে। তাই দিন শেষে ওই সব কম্পানি ঠিকমতো টিকতে পারে না বা পারছে না মানুষের মন কাড়তে, ব্যর্থ হচ্ছে। প্রথমেই ঠকানোর মানসিকতা নিয়ে ব্যবসা শুরু করছে। এই ডিজিটাল যুগে, বিশ্বায়নের যুগে ভোক্তাকে নির্বোধ ভাবলে ভুল হবে। ভোক্তা ও ভালো কর্মচারীরা আজকাল ভালো ইমেজের প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা নিতে আগ্রহী বা কাজ করতে আগ্রহী। কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, বেতন কম দিয়ে বা দেরিতে দিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করে ভালো কাজের পরিবেশ সৃষ্টি না করে কখনোই ভালো ব্যাবসায়িক সাফল্য অর্জন করা যায় না। স্বল্প মেয়াদে ভালো হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসা ভালো হয় না। বাজারে দুর্নাম হয়। তাই ভেতরে-বাইরে যাতে ব্র্যান্ড ভ্যালুজ টিক থাকে সে জন্য গোড়া থেকেই প্রকৃত পেশাদারি ব্র্যান্ড মার্কেটিং জনবল নিয়োগ দেওয়া দরকার। আর ব্র্যান্ডকে করপোরেট স্ট্র্যাটেজির কেন্দ্রে রেখে কর্মকৌশল ও ব্যাবসায়িক রূপকল্প তৈরি করতে হবে। তাহলেই প্রকৃত অর্থে করপোরেট কালচারের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। তার জন্য দরকার কম্পানির ভিশন-মিশন অনুযায়ী সঠিক ব্র্যান্ড কালচার সংজ্ঞায়িত করা, কর্মীদের প্রকৃতভাবে ট্রেনিং দেওয়া, মূল্যায়ন করা, ব্র্যান্ড প্রমিজ মেনে চলা, সঠিক লোক নিয়োগ করা, সব প্রতিষ্ঠানে ব্র্যান্ড কালচারকে উৎসাহ দেওয়া, নেতৃস্থানীয় ব্র্যান্ড ভ্যালুজ মেনে চলা, ব্র্যান্ডের উপাদানগুলোর ব্যবহার সঠিক রাখা, আর কর্মপরিবেশ, সংস্কৃতি, সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার জন্য সব সময় ব্র্যান্ড প্রমিজ ধরে রাখা। কারণ বিন্দু বিন্দু করে যেমন সিন্ধুর জন্ম হয়, তেমনি একটি প্রতিষ্ঠানের ছোট ছোট ভাবভঙ্গির প্রকাশের মাধ্যমেই ওই প্রতিষ্ঠানের সুনাম অর্জিত হয়।

ইন্ডাস্ট্রিতে সুনাম ধরে রাখতে হলে অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানে ব্র্যান্ড সংস্কৃতির উন্নয়নে জোর দিতে হবে, যাতে প্রত্যেক কর্মী একেক ব্র্যান্ডের দূত হতে পারে। কম্পানিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। ভবিষ্যৎ ব্যাবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে। কারণ সঠিক ব্র্যান্ডিং দিতে পারে ব্যাবসায়িক সাফল্য। আর তার জন্য দরকার সঠিক ব্র্যান্ড কালচার। কারণ ব্যান্ডই আপনার কালচার।

লেখক : ব্র্যান্ড মার্কেটিং ক্যাটালিস্ট

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা