kalerkantho

শিল্প ও সেবায় বাড়ছে রোবটনির্ভরতা

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিল্প ও সেবায় বাড়ছে রোবটনির্ভরতা

মানব শ্রম আর অফুরন্ত কাঁচামালের কল্যাণে আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে বিশ্বজুড়ে যে শিল্প বিপ্লবের সূচনা, একুশ শতকে এসে তা এখন পরিপূর্ণ ডিজিটাল রূপায়ণের দিকে যাচ্ছে। আর এতে মানুষ নয়, নির্ভরতার বড় উৎস হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হচ্ছে রোবট। এতে কম্পানিগুলোর একদিকে যেমন ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে অন্যদিকে কাজের গতিও বাড়ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে অদক্ষ চাকরি থেকে শুরু করে এমনকি জ্ঞানভিত্তিক উচ্চ দক্ষতার চাকরিও এখন রোবটের কাছে হাতছাড়া হচ্ছে।

সম্প্রতি ব্রিটিশ গবষেণা ও কনসালটিং প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকস এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের দুই কোটি চাকরি কেড়ে নেবে রোবট। এর ফলে সামাজিক অসমতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে, যদিও অর্থনৈতিক উৎপাদন বাড়বে। এতে বলা হয়, রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও কম দক্ষতার চাকরিগুলো ব্যাপকভাবে কেড়ে নিচ্ছে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে, যা বড় উদ্বেগের কারণ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রোবট এরই মধ্যে লাখ লাখ ম্যানুফ্যাকচারিং চাকরি কেড়ে নিয়েছে। এখন সেবা খাতেও সম্প্রসারিত হচ্ছে। কম্পিউটার দৃষ্টি, আওয়াজ চেনা এবং মেশিন লার্নিংয়ের অগ্রগতির মাধ্যমে সেবা খাতেও রোবটের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। দোকানকর্মী রোবট, রেস্টুরেন্ট-শপিং মলে মানুষকে স্বাগত জানাচ্ছে, চিকিৎসাক্ষেত্রে রোবটিক সার্জারির অগ্রগতি এবং ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও হার্টের পরিস্থিতি বুঝতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে আর বাস-ট্রাকে চালকের প্রয়োজন হবে না। মানুষ শুধু যাত্রী হয়ে উঠবে। তবে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গবেষকরা বলছেন, রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি শুধু চাকরি নেবে না, উৎপাদনশীলতাও বাড়াবে। তাঁরা ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতিতে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘রোবটিকস ডিভিডেন্ড’ দেখছেন। তাঁদের মতে, যেসব কাজে আবেগ-অনুভূতি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন রয়েছে সেসব কাজে মানুষের প্রয়োজন যুগ যুগ ধরে থাকবে। কিন্তু খুচরা খাত, স্বাস্থ্যসেবা, হসপিটালিটি, পরিবহন, নির্মাণ, কৃষি ইত্যাদি খাতে রোবটের আধিপত্য ক্রমেই বাড়তে থাকবে।

মিশিগানভিত্তিক সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্সিং অটোমেশনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শিল্প-কারখানাগুলোতে রোবট সরবরাহ বেড়ে হয় ২৮ হাজার ৪৭৮টি। যা ২০১৭ সালের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। সব ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানাতেই রোবট সরবরাহ বেড়েছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিযোগিতায় টিকতে কম্পানিগুলো খরচ কমানোর চাপে রয়েছে, তাই মানবকর্মীর চেয়ে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্সিং অটোমেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট বব ডয়লে বলেন, গাড়ি সংযোজন কারখানায় রোবট ব্যবহারের যে ঐতিহ্য ছিল তা ছাড়িয়ে এখন ছোট থেকে বড় সব ধরনের ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানায় রোবটের ব্যবহার বাড়ছে।

ম্যাককিনসে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে প্রযুক্তির যে অগ্রগতি চলছে তাতে বিশ্বের অর্ধেক কাজই একসময় স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি দ্বারা সম্পাদিত হবে। পিডাব্লিউসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৩০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ব্রিটেনে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চাকরি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে শেষ হয়ে যাবে। বিশেষ করে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং পাইকারি ও খুচরা বাজারে চাকরি বেশি লোপ পাবে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও সিলিকন ভ্যালিতে কারনেগি মেলন ইউনিভার্সিটির অনুষদ সদস্য ভিভেক ওয়াদওয়া বলেন, ‘এসব গবেষণায় কর্মসংস্থানে প্রযুক্তির প্রভাবকে এখনো ছোট করে দেখা হচ্ছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।’

জাপানের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক মিজুহু ফিন্যানশিয়াল গ্রুপ তাদের বৈশ্বিক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। কম্পানিটি দেশ ও বৈশ্বিক কার্যক্রম থেকে এক-তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাই করবে আগামী এক দশকে। আর তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। জাপানের স্থানীয় দৈনিক ইয়োমিউরি পত্রিকা জানায়, বর্তমানে থাকা ৬০ হাজার কর্মী থেকে ১৯ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে ব্যাংকটি। এ নিয়ে কম্পানির এক মুখপাত্র বলেন, ‘ক্লারিক্যাল চাকরিগুলো আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তি দিয়ে পূরণ করব।’

আলীবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা বলেন, ‘৩০ বছরের মধ্যেই প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সেরা সিইও বিবেচনায় টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের দখল নিতে যাচ্ছে কোনো রোবট।’ এ সময় যারা প্রযুক্তির আসন্ন উত্থানকালের প্রস্তুতি নিয়ে রাখেনি তাদের সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে বলেও সতর্ক করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আগামী তিন দশকের মধ্যেই পৃথিবীতে আনন্দের চেয়ে নিরানন্দ অনুভূতিই বেড়ে যাবে অনেকখানি।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বকে বদলে দেবে, যেমনিভাবে বিশ্বে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে যুগান্তকারী ইন্টারনেট। এ মন্তব্য করেছেন ইএমইএর ভিপি রিচার্ড জ্যাকসন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি থেকে আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাদের দৈনন্দিন ব্যবসায় এখন এটিকে কাজেও লাগাচ্ছে। সূত্র : এএফপি, রয়টার্স, সিএনএন মানি।

মন্তব্য