kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পুঁজিবাজারে আশার সঞ্চার

রফিকুল ইসলাম   

৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পুঁজিবাজারে আশার সঞ্চার

এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উঁকি দিলেও গেল বছর মন্দায় কেটেছে পুঁজিবাজার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে বছরজুড়েই নির্জীব ছিল পুঁজিবাজার। বছরের শুরুতে নির্বাচনের ইস্যু জাগলে সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে পুঁজিবাজারে মন্দাবস্থা ক্রমেই দীর্ঘায়িত হয়েছে। সব মহলের চেষ্টায় পুঁজিবাজারের একটা শক্ত ভিত গড়ে উঠলেও বিনিয়োগকারীর নিষ্ক্রিয়তায় সফল হয়নি পুঁজিবাজার। নতুন বছরে নতুন আশায় বুক বাঁধছে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিগত বছরে অনেক সম্ভাবনা থাকলেও নির্বাচনী ভীতিতে সেটা সফল হওয়া যায়নি। এবার প্রত্যাশা অনেক বেশি। সব কিছু ঠিক থাকলে পুঁজিবাজারের পালে হাওয়া লাগবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সরকারের ধারাবাহিকতা পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। নতুন-পুরনো বিনিয়োগকারীর সক্রিয়তায় আবারও প্রাণ ফিরবে। বড় কম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করে ভালো শেয়ারের জোগান বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পুঁজিবাজারের শেয়ার লেনদেনকারী ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন-ডিবিএ সূত্র জানায়, বিগত বছরে পুঁজিবাজার বিকশিত হওয়ার সুযোগ থাকলেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভীতি অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এ বছর পুঁজিবাজার বিকশিত হয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পুঁজিবাজার উন্নয়নে করণীয় নির্ধারণে বৈঠকে বসছেন ডিবিএ নেতারা। আগামী ৭ জানুয়ারি বৈঠকের পর সরকার ও চলতি জানুয়ারি মাসের শেষ দিকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একগুচ্ছ প্রস্তাব দেবে সংগঠনটি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ বিগত সরকারের উন্নয়নের পক্ষেই রায় দিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছে। এই সরকারের সময়ে বিগত ১০ বছরে পুঁজিবাজারের আইন-কানুনে বড় পরিবর্তন এসেছে। এই সরকারের ধারবাহিকতা পুঁজিবাজারকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক পরিচালক শাকিল রিজভী।

তিনি মনে করেন, এই সরকারের সময়ে পুঁজিবাজারের অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাজার উন্নয়নও এবার গুরুত্ব পাবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীর সক্রিয়তায় গতিশীল হয়ে উঠবে পুঁজিবাজার।’

জানা যায়, বিগত বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও এগিয়ে নিতে কিছু উদ্যোগ নিলেও কার্যত বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ডিমিউচুয়ালাইজেন আইন অনুযায়ী ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনতেই বছর কেটেছে এ প্রতিষ্ঠানটির। নানা আইনি জটিলতার পর সফলভাবে চীনা দুই স্টক এক্সচেঞ্জের জোটকে কৌশলগত অংশীদার করতে পেরেছে। ছোট কম্পানিগুলোকে নিয়ে স্মলক্যাপ বোর্ড গঠন, বিকল্প লেনদেনে এটিবি বোর্ড, বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ও উচ্চ সম্পদধারীদের নিয়ে ডেরিভেটিবস চালুরও উদ্যোগ ছিল প্রতিষ্ঠানটির। বিগত বছর করতে না পারলেও ২০১৯ সালে করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

নির্বাচনের সময় পুঁজিবাজারে মন্দাবস্থা থাকায় ওই সময় মূলধন বিনিয়োগ করেনি ব্রোকারেজ হাউসগুলো। ইতিমধ্যে দুই মাস শেষ হয়েছে, আগামী চার মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ পুঁজিবাজারে আসছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কৌশলগত অংশীদারের মাধ্যমে এ বছর বিদেশি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়বে। এক হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীর নিট বিনিয়োগ ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ ২০১৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রি করেছেন বেশি। ২০১৮ সালে বিদেশিরা চার হাজার ৪৯৬ কোটি ২৪ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে পাঁচ হাজার ৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি করে। কিন্তু ২০১৭ সালে বৈদেশিক লেনদেন ছিল ১১ হাজার ৪৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। যার মধ্যে ছয় হাজার ৫৭৬ কোটি ২৯ লাখ টাকার শেয়ার ক্রয় করে আর বিক্রি করে চার হাজার ৮৭১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

ব্রোকারেজ হাউস সূত্র জানায়, শেয়ার হস্তান্তরজনিত মূলধনী মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ কর ছাড়ে ছয়টি শর্ত জুড়ে দিয়ে গত ৩ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। চীনের শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করেছে ডিএসইর প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডার ব্রোকারেজ হাউস। ১৮০ কোটি ৩৭ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ শেয়ারের ২৫ শতাংশ বা ৪৫ কোটি ৯ লাখ ৪৪ হাজার ১২৫টি শেয়ার ক্রয় করে চীনা জোট। প্রতিটি শেয়ারের দাম ২১ টাকা দরে দাঁড়ায় প্রায় ৯৪৭ কোটি টাকা। ১৫ কোটি টাকা স্ট্যাম্প ডিউটিসহ গত ৪ সেপ্টেম্বর ৯৬২ কোটি টাকা পরিশোধ করে চীনা জোট। ডিএসইর সাবেক পরিচালক ও স্টক লিমিটেডের এমডি শাকিল রিজভী বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে বিগত বছর ভালো করার সুযোগ থাকলেও হয়নি। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ায় স্থিতিশীলতায় এ বছর পুঁজিবাজারে অনেক ভালো করার সুযোগ রয়েছে। আমরা এবার নতুন ইস্যু আনা, পণ্যের বৈচিত্র্য আনা, আইন-কানুন করা হলেও কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না, পুঁজিবাজার এগিয়ে যেতে অন্তরায় কোথায় প্রভৃতি বিষয়ে একগুচ্ছ প্রস্তাব দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘কৌশলগত বিনিয়োগকারী পাওয়ার পর বিদেশি বিনিয়োগকারী আসার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন চলে আসায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করে। এখন আবারও তারা বাজারে ফিরবে বলে প্রত্যাশা করছি।’

ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন সার্ভিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাক আহমেদ সাদেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুঁজিবাজার একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে; কিন্তু বিগত বছরে নির্বাচন থাকায় সেভাবে গতিশীল হয়নি। তবে নতুন বছরে প্রত্যাশা অনেক। কৌশলগত অংশীদারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ পুঁজিবাজারে চলে আসবে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে গতিশীল হবে পুঁজিবাজার।’

ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, ‘আগামী বছরে পুঁজিবাজার ভালো হবে—এমন প্রত্যাশা করছি। ভালো হওয়ার আলামত ইতিমধ্যে দেখছি। সরকার নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাজার ভালো হয়েছে। নির্বাচনের আগের যে শঙ্কা ছিল, সেটা এখন কেটে গেছে।’ এই সরকারের নেতৃত্বে পুঁজিবাজার ভালো কাটবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা