kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

একটুখানি জবাফুল

ইমদাদুল হক মিলন

১০ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



একটুখানি জবাফুল

অঙ্কন : মাসুুম

ঢাকার বাস আসবে চল্লিশ মিনিট পর।

পাঁচ দশ মিনিট আগে পরে দুটো বাস আসবার কথা। একটা যাবে ঢাকায়, আরেকটা ময়মনসিংহের দিকে। জবা তার মাকে নিয়ে শেডের তলায় এসে বসল। সাড়ে এগারোটা বাজে। বৈশাখ মাসের প্রচণ্ড গরম চলছে। রোদে পুড়ছে চারদিক। শেড না থাকলে বাসযাত্রীরা কোথায় বসে অপেক্ষা করত?

এই এলাকার এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান আর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তিনজনই ভালো লোক। জনদরদি। এরকম সাধারণত দেখা যায় না। এমপি ভালো হলে উপজেলা চেয়ারম্যানটি হয় খারাপ। উপজেলা চেয়ারম্যান ভালো হলে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানটি হয়তো ভালো হলো না। ভালো মানে, দুর্নীতিপরায়ণ বা চুরি করার ধান্দায় থাকা লোক না।

এমপি ভদ্রমহিলার তেমন টাকা-পয়সা নেই কিন্তু সততায় তিনি অসাধারণ। সরকারি একটি পয়সাও এদিক-ওদিক হতে দেন না। উপজেলা চেয়ারম্যান বিশাল বড়লোক। গার্মেন্টের ব্যবসা আছে। টেক্সটাইল মিলটিল মিলিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে এলাকায় বহু কাজ করেন। বাসস্ট্যান্ডের শেডটা নিজের টাকায় করে দিয়েছেন। বেঞ্চগুলো আরামদায়ক। শেডের  পেছনে কতগুলো কৃষ্ণচূড়াগাছ লাগিয়ে দিয়েছেন। পাঁচজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রেখেছেন। তাদের বেতন দেন নিজের পকেট থেকে। শেডের বেঞ্চ মেঝে সব ঝকঝকে-তকতকে করে রাখছে কর্মীরা। এরকম সাধারণত দেখা যায় না।

মাকে নিয়ে জবা একবার ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করেছিল। মার চিকিৎসার জন্য তিনি কিছু টাকাও দিয়েছিলেন। ঢাকা নিয়ে যেতে বলেছেন। হাসপাতালে রেখে জবার মায়ের চিকিৎসা করিয়ে দেবেন। কিন্তু মার যা অবস্থা, বোধ হয় তার দিন ঘনিয়ে এসেছে। চিকিৎসায় কতটা কী কাজ হবে কে জানে! তবু মানুষ তো আশায়ই বাঁচে। একমাত্র সন্তান হিসেবে জবাকেই করতে হচ্ছে সব। মাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি-ছোটাছুটি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দৌড়াচ্ছে সপ্তাহে সপ্তাহে। এখানকার চিকিৎসায় কাজ হবে না। ডাক্তাররা বলেছেন ঢাকায় নিয়ে যেতে। ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করে দিলে চিকিৎসা ভালো হবে। আল্লাহ যত দিন আয়ু রেখেছেন, বাঁচবে। আর নয়তো মরণ। মায়ের মরণ মানে জবার জীবনের শেষ মানুষটিরও চলে যাওয়া। আর কেউ রইল না তার।

মাকে বেঞ্চে শুইয়ে দিয়ে তার মাথার কাছে উদাস হয়ে বসে এসবই ভাবছিল জবা। লম্বা শেডের উত্তর মাথায় শেষ বেঞ্চটায় একটা পরিবার বসে আছে। লোকটা বসে সিগ্রেট টানছে। দশ-বারো বছরের একটা ছেলে আর সাত-আট বছরের বাচ্চা মেয়েটি নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে। মহিলাটির কোলে আরেকটি বাচ্চা। সে একবার মায়ের কোলে উঠছে, আরেকবার নেমে যাওয়ার চেষ্টা করছে। দু-আড়াই বছর বয়স হবে। সব কিছু মিলিয়ে বোঝা যায় খুবই সুখী একটা পরিবার। নিম্নবিত্তেরই পরিবার, কিন্তু সুখী।

আহা, এরকম একটা জীবন যদি হতো জবার?

তার পরই মহিলাটিকে চিনে ফেলল সে। মাকে বলল, তুমি শুয়ে থাকো মা। আমি আসছি।

মা দুর্বল গলায় বললেন, যাবি কোথায়?

একজন পরিচিত মানুষ পাইছি। তার সঙ্গে একটু কথা বইলা আসি। ওই সামনের বেঞ্চে বইসা আছে।

মা আর কথা বললেন না। জবার  ভেতর তখন গভীর উত্তেজনা। সে প্রায় ছুটে গেল পরিবারটির কাছে। মহিলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ফেটে পড়া উত্তেজনায় বলল, তুমি খুশি না?

কোলের বাচ্চাটা খুশির কোল থেকে নেমে বাবার হাঁটু ধরে দাঁড়িয়ে আছে। খুশি একপলক সেদিকে তাকিয়ে জবার দিকে তাকাল। কিন্তু আপনেরে তো চিনতে পারলাম না!

জবা উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, কও কী, আমারে তুমি চিনতে পারো নাই? আরে আমি জবা!

নিজের অজান্তে উঠে দাঁড়াল খুশি। অবাক বিস্ময়ের গলায় বলল, তুমি জবা? তোমার এই দশা কেন? তোমারে তো চিনাই যায় না!

জবা কথা না বলে দুহাতে জড়িয়ে ধরল খুশিকে। আহা রে কতদিন পর তোমারে দেখলাম!

খুশিও সেভাবেই জড়িয়ে ধরেছে জবাকে। আমারও তো সেই একই কথা। বারো-তেরো বছরের কম হইব না তোমারে দেখলাম।

খুশির স্বামী সিগ্রেটে শেষটান দিয়ে আঙুলের টোকায় ছুড়ে ফেলল। ছোট বাচ্চাটা কোলে টেনে জড়াজড়ি করা দুজন মানুষের দিকে তাকাল।

জবা আর খুশি ততক্ষণে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে দুজন ধরেছে দুজনার হাত। সেই ফাঁকে খুশি তার স্বামীকে বলল, তোমারে আমার বান্ধবী জবার কথা বলছিলাম না? এই হইল সেই জবা। বিয়ের আগে ঢাকায় আমরা দুইজন জামান সাহেবের বাসায় কাজ করতাম। একসঙ্গে আট বছর কাজ করছি। দুইজনের গলায় গলায় খাতির ছিল।

জবার স্বামী লোকটা একটু গম্ভীর ধরনের। তার আবেগ-উচ্ছ্বাস কম। ব্যাপারটা সে তেমন পাত্তা দিল না। আসলে খুশির মুখে জবার কথা যতটা শুনেছে সেই বর্ণনার সঙ্গে এই মহিলাটিকে মেলানোই যাচ্ছে না। ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ বছর বয়স হবে। এই বয়সেই শরীর একেবারে ভেঙেচুরে গেছে। পরনে অতি সস্তা আর ময়লা নীল রঙের সালোয়ার-কামিজ। মাথার চুলের যত্ন নেই। মুখের যত্ন নেই। ভাঙাচোরা মুখে চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল। এই জবার এত প্রশংসা করেছে খুশি? এ তো দেখতে রাস্তার ভিখিরির মতো।

লোকটা উঠে দাঁড়াল। বউয়ের বান্ধবীকে একটুও পাত্তা না দিয়ে ছোট বাচ্চাটা কোলে নিয়ে অন্য দুটিকে বলল, চল, আমরা একটু হাঁইটা আসি।

খুশি তার স্বামীর মনোভাব বুঝল। বুঝেও ব্যাপারটা চেপে আনন্দমাখা গলায় বলল, হ, যাও। বাস আসতে আরো আধাঘণ্টা দেরি। তুমি বাচ্চাকাচ্চা নিয়া ঘোরো আর আমি আমার বান্ধবীর লগে গল্প করি।

খুশির স্বামী আর কথা বলল না। শেডের পূর্বদিকে কতগুলো দোকানপাট। বেশ জমজমাট একটা জায়গা। সেই দিকে হাঁটতে লাগল। খুনসুটি করতে থাকা বাচ্চা দুটোর একজন বলল, বাবা, মার আবার বান্ধবীও আছে নাকি? কেমন বান্ধবী?

লোকটা কোনো জবাব দিল না। বেশ পা চালিয়ে হাঁটতে লাগল।

জবা বলল, তোমার স্বামী কিছু মনে করল নাকি?

আরে না! কী মনে করব?

না, তুমি পরিচয় করাইয়া দেওয়ার পরও আমার লগে একটাও কথা না কইয়া চইলা গেল! পোলাপান তিনটারেও ভালো কইরা দেখতে দিল না!

খুশি হাসল। ওই রকম কিছুই না। মানুষটা ভালো। তয় একটু নীরস পদের। রসকষ কম।

এবার জবাও হাসল। রসকষ কম হইলে তিনটা বাচ্চা হওয়াইলো কেমনে?

ওই দিক দিয়া ঠিক আছে। আরো বাচ্চা চায়। সে বাচ্চাকাচ্চা খুব পছন্দ করে।

নিজেদের অজান্তেই বেঞ্চে পাশাপাশি বসেছে জবা আর খুশি। খুশির পরনে প্রিন্টের শাড়ি। একটু মোটাসোটা ভারী শরীর। আগের সেই কুচকুচে কালো গায়ের রংটি নেই। রং যেন একটু খুলেছে। চেহারা দেখে বোঝা যায় সুখে আছে সে।

জবা বেঞ্চে পা তুলে বসল। এভাবে বসে বান্ধবীর মুখটা মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। তোমারে দেইখা বোঝা যায় তুমি খুব ভালো আছ, সুখে আছ।

হ, সেইটা আমি আছি। শ্বশুর-শাশুড়ি বাঁইচা নাই। কোনো ননদও নাই। একটা মাত্র দেবর। সে পুলিশের কনস্টেবল। থাকে জামালপুর শহর। আর আমরা থাকি ঈশ্বরগঞ্জে। ওইখানেই বাড়ি। ঈশ্বরগঞ্জ বাজারে মালেকের পাইকারি মালের দোকান আছে। আমগো অবস্থা আল্লাহর রহমতে ভালোই। কিন্তু তোমার এই দশা কেন? জামান সাহেবের বাসা থেইকা তুমি তো আমার এক বছর আগে চইলা গেলা। বিয়া ঠিক অইল আর তোমার মায় তোমারে লইয়া গেল। তার পরের ঘটনা কও তো।

জবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিয়া আমার একটা হয় নাই। দুইটা হইছিল। পয়লা বিয়াটা তিন বছর টিকছে। ওই সময় একটা বাচ্চা পেটেই নষ্ট হইয়া গেল। জামাইটা আছিল ভাদাইমা টাইপের। কোনো কামকাইজ করত না। একদিন খাওন পাই, দুইদিন পাই না। মায় আমারে ছাড়াইয়া আইনা অন্য জায়গায় বিয়া দিল। ওই বিয়াটা টিকল সাত বছর। সাত বছরে আর বাচ্চাকাচ্চা হইল না। জামাইটা খারাপ আছিল না। সে আরেকটা বিয়া করল ঠিকই কিন্তু আমারে ছাড়তে চায় নাই। আমিই সেই বাড়ি থেইকা আইসা পড়লাম। সতিনের ঘর করুম না। তুমি তো জানতাই আমার আর কোনো ভাইবোন নাই। আমি আমার মার একমাত্র সন্তান। ছোটবেলায় বাপ মারা গেছে। আমার জন্য মায় আর বিয়া বসে নাই। কিছুই নাই আমগো। তিন শতাংশ ভিটামাটি আছে। টিনের ভাঙা একটা ঘর আছে। মারে লইয়া থাকি। এইবাড়ি-ওইবাড়ি কাম করি। মার হইয়া গেল ক্যান্সার।

কও কী? ক্যান্সার?

হ। জরায়ুর ক্যান্সার। ওই যে বেঞ্চে শুইয়া আছে। তারে লইয়া ঢাকা যাইতাছি। ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসা করামু। রাখো এই সব কথা। এতদিন পর তোমারে পাইছি। দুঃখ-দুর্দশার কথা বইলা লাভ নাই। একেকজন মানুষের জীবন একেক রকমই হয়। দুনিয়াতে কেউ সুখে থাকে, কেউ থাকে দুঃখে। তোমারে আর আমারেই দেখো! স্বামী-সংসার, পোলাপান লইয়া আল্লায় তোমারে সুখে রাখছে আর আমারে রাখছে দুঃখে। দুইটা বিয়া হওয়ার পরও পোলাপান হইল না। সংসার টিকল না। মারে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করতাছি। রাতের বেলা ভাঙা ঘরটায় মার পাশে শুইয়া দুই স্বামীর একজনের কথাও আমার মনে অয় না। আমার মাঝে মাঝে মনে অয় তোমার কথা। জীবনের সবচাইতে আনন্দের আটটা বছর তোমার সঙ্গে আমি কাটাইছি জামান সাহেবের বাসায়। সারাদিন কাম করতাম দুইজনে আর মজা করতাম। ছাদে দুইজনে একলগে কাপড় রইদে দিতে যাইতাম। পাশের বিল্ডিংয়ে কাজ চলছে। চ্যাংড়া লেবারগুলি তোমারে-আমারে দেখলে শিস দিত, গান গাইত। জোরে জোরে কথা কইয়া আমগো শোনাইত।

খুশি বলল, একটাতো আমার পিছনে উইঠাপইড়া লাগছিল। আমি ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করছিলাম। ছাদে গেলেই ওই শয়তানটা করত কি, ইটের টুকরার মধ্যে কাগজ প্যাঁচাইয়া আমারে ছুইড়া মারত। সেই কাগজে লেখা, ‘আমি তোমারে ভালোবাসি।’ আরেকবার লিখল, ‘তোমাকে বিবাহ করিতে চাই।’ আমারও মজাই লাগত। একদিন খালাম্মায় টের পাইয়া গেল।

হ, তুমি তখন ঘন ঘন ছাদে যাও। ওই ছ্যাড়াও ছাদে আসে। খালাম্মায় গেছে পিছন পিছন। আমিও ছিলাম সঙ্গে। তারপর যেই বকাটা বকল! ছাদে যাওয়াই বন্ধ কইরা দিল আমগো দুইজনের। বিজুর মা বুয়ারে পাঠাইত ছাদে। আহা রে, তার পরও কত আনন্দের দিন! কত ভালো খাওয়াদাওয়া বাড়িতে। টেলিভিশন দেখতাম। গান শুনতাম। একবার তারা আমগো দুইজনরে কক্সবাজারেও বেড়াইতে লইয়া গেছিল। কী বিরাট সমুদ্র! জীবনে সমুদ্র দেখব ভাবতেও পারি নাই।

আমি তারপর আরো দুইবার কক্সবাজার গেছি। একবার শ্রীমঙ্গলে চা বাগান দেখতে গেছিলাম। দুই-তিন বছরে একবার মালেক আমগো লইয়া বেড়াইতে যায়। এইবার গেছিলাম ঝালকাঠি। সেখানে মালেকের ছোট ফুফুর বাড়ি। সেই বাড়িতে বেড়াইয়া আসলাম সাতদিন। যেই বাসে আসছিলাম সেই বাসটা ওই পারে আইসা নষ্ট হইয়া গেছে। ফেরি পার হইয়া এই পারে আসছি। এখন অন্য বাস ধরুম।

আর আমগো বাড়ি তো এইখান থেইকা কাছেই। রিকশায় আধাঘণ্টার মতো লাগে। আইচ্ছা, জামান সাহেবের বাসার আর কোনো খবর রাখো?

না, তুমি রাখো?

আমি শুনছি সেগুনবাগিচার বাড়ি ভাড়া দিয়া তারা আমরিকা চইলা গেছে।

আমরা যখন ওই বাড়িতে তখনই তো তার বড় ছেলে আমরিকায় থাকে। মাঝে মাঝে শুনতাম তারাও কয়েক বছর পর চইলা যাইব। বড় ভালো মানুষ আছিল। আমার বিয়ার জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা দিছিল।

পঞ্চাশ হাজার আমারেও দিছিল। তোমার টাকাটা কাজে লাগছে। আমারটা লাগে নাই।

জবা একটু উদাস হলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর হঠাৎ করেই উচ্ছ্বসিত হলো। এই খুশি, সেই ঘটনাটা তোমার মনে আছে?

কোনটা কও তো?

ওই যে এক রাত্রে খালাম্মায় আইসা আমগো খুব বকাঝকা করল।

খুশিও হাসল। হ, মনে আছে। রাত্র তখন তিনটা বাজে। খালাম্মায় চুপচাপ আইসা হঠাৎ কইরা লাইট জ্বালাইল আমগো রুমে। তারপর ছি ছি করল। চড়চাপড় মারে নাই ঠিকই, তয় গালাগাল করছিল অনেক।

কইছিল, তরা দুইজন বউ-জামাই হইছস? খাচ্চর মাইয়া।

সেকথা মনে করে জবা আর খুশি দুজনেই হাসতে লাগল। খুশির হাত ধরে জবা বলল, তুমি আর আমি একসঙ্গে ঘুমাইতাম সেই ছোট্ট ঘরটায়। শীতের দিনে লেপের তলায় একজন আরেকজনরে এমন করে জড়াইয়া ঘুমাইতাম, যেন আমরা দুইজন বান্ধবী না। বাড়ির কাজের মাইয়া না। যেন আমরা দুইজন বউ-জামাই। যেন মাত্র বিয়া হইছে আমগো। দুইজন দুইজনরে ছাড়া থাকতে পারি না। আহা রে সেই সুখের দিন, সেই আনন্দের দিন আর এই জীবনে ফেরত আসব না।

একটু থেমে রোদজ্বলা আকাশের দিকে তাকিয়ে জবা বলল, আরেকটা রাত্রের কথা খুব মনে অয় আমার। ফাল্গুন মাসের চাঁদনি রাইত। রাস্তায় পাশাপাশি দুইটা কৃষ্ণচূড়াগাছ ফুলে ফুলে ভরা। সবাই গভীর ঘুমে। তুমি আর আমি পলাইয়া পলাইয়া ছাদে চইলা গেছিলাম। নিঝুম রাতের ভরা চাঁদ আকাশে। চাঁদের আলোয় আমরা সব ভুলে দুইজন দুইজনার হাত ধরে শরীরে জ্যোত্স্না মাখতে মাখতে ছাদে হাঁটতে লাগলাম। একবারও ভাবলাম না, খালাম্মায় যদি টের পায়, তাইলে কী অবস্থা হইব আমগো। দরজা বাইরে থেকে টাইনা রাইখা আসছি। চোর ঢুইকা যাইতে পারত ফ্ল্যাটে। কেলেঙ্কারি হইয়া যাইতে পারত। আমগো কিছুই মনে রইল না। পাশের এক বাড়ি থেইকা তখন গানের শব্দ ভাইসা আসল। সেই গানের লাইনটা আমার এখনো মনে আছে। ‘তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা।’ এখনো কোনো কোনো জ্যোত্স্না রাত্রে এই লাইনটা আমার মনে পড়ে। সেই রাত্রটার কথা মনে পড়ে। আর নিজের জীবনের কথা মনে অয়। আমার জীবনের সুখ যেন কোন অচিন বাগানের ফুল, কোন অচিন আকাশের তারা। এই জীবনে আমি তার দেখাই পাইলাম না।

শেষ দিকে গলা ধরে এলো জবার। চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।

এ সময় দূরে একটা বাস দেখা গেল। এদিকেই আসছে। মালেক তার তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে দৌড়ে এলো। খুশিকে বলল, বাস আইসা পড়ছে। রেডি হও।

আমি তো রেডি। শুধু বাসে চড়লেই হইব।

বাসটা এসে জায়গামতো দাঁড়াল। মালেক আবার তাড়া দিল। যাত্রীরা উঠতে শুরু করেছে। মুহূর্তের জন্য জবাকে আরেকবার জড়িয়ে ধরল খুশি। তারপর দৌড়ে গিয়ে বাসে চড়ল। বাস ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত বেঞ্চটার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল জবা। ওই তো জানালার ধারে স্বামী-সন্তান নিয়ে বসেছে খুশি। ফিরে যাচ্ছে তার সুখী জীবনে। আর জবা...!

খুশিদের বাস চলে যাওয়ার পর ধীর পায়ে হেঁটে মায়ের বেঞ্চটার কাছে ফিরে এলো জবা। কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের বাসটাও এসে পড়বে। বুক কাঁপিয়ে ভারী একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল তার। ফুলের নামে নাম রেখেছিলেন মা-বাবা। জামান সাহেবের বাড়ির সেই আটটা বছরে সেই ফুল একটুখানি ফুটেছিল। বাকি জীবন কাটছে শুকনো, ঝরে যাওয়া ফুল হয়ে। কেউ তাকিয়েও দেখে না। বান্ধবীর স্বামী পর্যন্ত মানুষ হিসেবে গণ্য করে না।    হায় রে জবাফুল!