kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

বকশিশে শুরু, কোলাকুলিতে শেষ

মোস্তফা মামুন

১০ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বকশিশে শুরু, কোলাকুলিতে শেষ

অঙ্কন : প্রসূন হালদার

আমাদের এক বন্ধুর বাবা ঈদের দিন খুব খেপে থাকতেন। সকাল থেকেই একে-ওকে ধমকাধমকি। ‘চড় মেরে দাঁত ফেলে দেব’, ‘আমাকে চিনিস’—এই জাতীয় হুমকিতে সবাই অস্থির। হম্বিতম্বি শেষে বলতেন, ‘যদি আজ ঈদের দিন না হতো তাহলে দেখতি কী করি...ঈদের দিন বলে মাফ পেয়ে গেলি।’

এভাবে মাফ পেয়ে পেয়ে আমাদের মনে এই প্রশ্নটাও আসত, ঈদের দিন তিনি এমন রেগে থাকেন কেন? যখন ঈদ আসলে খুশির দিন, আনন্দ করারই কথা। ঠিক করেছিলাম, একটু বড় হলে জিজ্ঞেস করব। সুযোগ হয়নি। আমরা প্রশ্ন করার মতো বয়সে আসার আগেই তিনি মারা যান।

কিন্তু একটু বড় হওয়ার পর প্রশ্নটার উত্তর নিজে নিজেই বুঝে গেছি। পরিবারের কর্তাজাতীয় ব্যক্তিদের পক্ষে ঈদের দিন মাথা ঠিক রাখা মুশকিলেরই কাজ। একটা গল্প শুনে নিই আগে। বুঝতে সুবিধা হবে। আমার পুরনো অফিসের এক সহকারী একদিন পাশে ঘুরঘুর করছিল। অফিসের এ রকম সহকর্মীরা কী উদ্দেশ্যে ঘুরঘুর করে আমরা মোটামুটি জানি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি, তোমার কি কোনো সাহায্যটাহায্য লাগবে?’

‘না স্যার, একটা খবর জানাতে এলাম।’

‘কী খবর?’

‘একটা নতুন বাসা ভাড়া নিয়েছি।’

‘খুব ভালো। ভাড়া কত?’

সে একটা অঙ্ক বলল। আমি অবাক। অঙ্কটা তাঁর বেতনের চেয়ে বেশিই হওয়ার কথা। তবু নিশ্চিত হতে বললাম, ‘ভাড়া তিন হাজার টাকা। তোমার বেতন কত?’

‘তিন হাজার টাকা।’

‘তুমি পুরো টাকায় বাসা নিয়ে নিলে?’

‘কী করব স্যার। প্রেস্টিজ, লোকে বলে এত বড় অফিসে চাকরি করো, তোমার তো একটা রুম ভাড়া করে থাকা উচিত। বস্তিতে থাকলে মান থাকে?’

‘বুঝলাম, কিন্তু তুমি সারা মাস চলবে কী করে?’

‘আল্লাহ চালাবেন।’

ঈদের সময় আমাদের মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত কর্তাদের অবস্থা আমার অফিস সহকারীর মতোই হয়। ঘনিষ্ঠদের দাবি মেটাতে আর লৌকিকতা-সামাজিকতায় মাসের প্রায় পুরো আয়টা বেরিয়ে যায়। যাঁর আয় ৩০ হাজার টাকা, দেখা যায় তাঁর খরচ হয়ে গেছে ৪০ হাজার টাকা। যাঁর ৪০, তাঁর খরচ ৫০। বাকি মাসটা খোদা ছাড়া আর কে চালাতে পারেন! খোদা তো চালাবেন, কিন্তু ঠেলার কাজটা তো নিজেকেই করতে হবে। মেজাজটা সপ্তমে চড়ে থাকা তাই স্বাভাবিক। সেই হিসাবে এঁরা যে ঈদের দিন খুনখারাবি করেন না, এই বেশি।

শুরু হয় বকশিশের যন্ত্রণা দিয়ে। রোজার মাসের মাঝামাঝি থেকে সালাম-আদাব-তোয়াজ এসব অনেক বেড়ে যায়। যখনই এসব বাড়ে তখন সম্মানিত বোধ করার বদলে ভীতিবোধ শুরু হয়। কোনো এক ঈদের আগে বকশিশের ঠেলায় এমন বিধ্বস্ত যে রাস্তাঘাটে যাকে দেখি ভয় লাগে। এই বুঝি এসে সালাম দিয়ে টাকা চায়! এর মধ্যে একদিন অফিসের করিডরে বেখেয়ালে হাঁটছি, সামনে পড়লেন আমার বস। টুক করে সরে গেলাম। তিনিও যদি বকশিশ চেয়ে বসেন! বোধে ফেরার পর মনে হলো, আচ্ছা, এখানে তো আমিই উনার কাছে বকশিশ চাইতে পারি। পরে বাদ দিলাম। মনে হলো, তাঁরও তো দিতে দিতে আমার চেয়ে বেশি বিধ্বস্ত অবস্থা।

ঈদপূর্ব এমন হাজারো যন্ত্রণা পেরিয়ে ঈদ আসে। আনন্দ চলে। সবচেয়ে বেশি চলে খাওয়াদাওয়া। প্রায় সব বাসায়ই বিপুল খাওয়াদাওয়ার বাহারি আয়োজন। রোজার এক মাস সংযমের পর এটাই স্বাভাবিক। একটাই সমস্যা, সব বাসায় প্রায় একই রকম রান্না। সত্যি বললে, যারা রিচ ফুড ঠিক খেতে পারে না তাদের জন্য ঈদের দিন রোজার চেয়েও কঠিন দিন। হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ। ভাত রান্না প্রায় নিষিদ্ধ। তাতে তাদের সিদ্ধ হওয়ার জোগাড়।

আবার যারা খুব খেতে চায় তাদের জন্যও সমস্যা কম নয়। এক মুরব্বি শ্রেণির মানুষ ঈদের দিন কেউ এলেই টেনে নিয়ে টেবিলে বসিয়ে বলতেন, ‘খাও বাবা, খাও। এই খাবারটা খুব ভালো হয়েছে।’

কেউ তো বসেই সঙ্গে সঙ্গে খেতে শুরু করতে পারে না। একটু ইতস্তত করত। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বলতেন, ‘তুমি ভাবছ খাওয়াটা কেমন? এই যে দেখো, আমি খাচ্ছি।’ বলেই শুরু করে দিতেন।

তারপর আরেকটা আইটেম দেখিয়ে, এটা আরো মজা—বলে সেটায়ও তাঁর হাত।

পরে জানা গেল, কোলেস্টেরল বেশি বলে বাসার লোকজন তাকে এসব খেতে দিতে চায় না। তিনি তাই অতিথিসেবার নামে নিজেই শুরু করে দিতেন। মেহমানের সামনে কিছু বলা যায় না বলে ওদের ব্যবহার করেই পেটপূজাটা হয়ে যেত। পরে অবশ্য পেটে কিছু সমস্যাও দেখা দিত। সে যা-ই হোক...।

আবার অন্য রকম ঘটনাও আছে। আমাদের এক বন্ধু ঈদে কোনো বাসায় বেড়াতে গিয়ে খাবার দেখেই একটা পর্যবেক্ষণ সেরে নিত। এরপর বলত, ‘এই ভাজিটা খা। দেখে মনে হচ্ছে দারুণ। ওই ডালের আইটেমটাও খেতে পারিস। ইন্ডিয়ান স্টাইলে রান্না মনে হচ্ছে...’

ওর কথামতো ওগুলোতে অন্যরা হাত বাড়াত। মাংসের আইটেম সাধারণত পড়ে থাকত। সেটা খেতে হতো তাকে। বন্ধুদের প্রতি ওর এই ত্যাগের মানসিকতায় আমরা মুগ্ধ ছিলাম। পরে জানা গেল ঘটনা পুরো উল্টো। যেটা ওর খেতে ইচ্ছা হয়, সেটা বাদ দিয়ে সে বাকি খাবারগুলোর প্রশংসা করে, যাতে অন্যরা সেগুলো নিয়ে মেতে থাকে। আসল খাবারটা ওর জন্য অক্ষত থাকে।

খাওয়া নিয়ে অনেক হলো। এবার কোলাকুলি। সেটা ঈদের বিরাট এক অনুষঙ্গ। গত বছরের ঈদটাকে যেমন আমার ঈদই মনে হয়নি, কারণ করোনার জন্য কারো সঙ্গে কোলাকুলি করিনি। কাউকে কোলাকুলি করতেও দেখিনি। কিন্তু এই কোলাকুলির কাজটা অনেকে খুব যন্ত্রের মতো করে। শক্তি যোগ করে এমন চেপে ধরে যে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হয়। কখনো কখনো আবার এই কোলাকুলিকে বেশ ব্যবহার করা যায়।

আমাদের এক বিজ্ঞ ধরনের বড় ভাই ছিলেন, খুব যন্ত্রণা দিতেন। ভুল ধরতেন সব কিছুতে। কঠিন কঠিন প্রশ্ন করে লজ্জায় ফেলতেন। একবার ঠিক হলো, ঈদের কোলাকুলির মাধ্যমে তাঁকে উচিত শিক্ষা দেওয়া হবে।

ঈদের সকালে আমরা ১৫-২০ জনের দল পরিকল্পনামতো এগিয়ে গেলাম তাঁর দিকে। শুরু হলো কোলাকুলি। প্রথমে তাঁর হাসিমুখ ছিল। চার-পাঁচজন যাওয়ার পর মুখ একটু গম্ভীর হলো। ১০ জনের পর মুখে কালো মেঘ। বললেন, ‘থাক, থাক। কোলাকুলি তো শরীরের বিষয়। আসল ভালোবাসা তো মনে। হৃদয়ে।’ বলে নিজের হৃদয়টা হাত দিয়ে দেখালেনও।

কিন্তু আমাদের তখন এমন নেশায় পেয়েছে যে বয়েই গেছে হৃদয়বৃত্তান্ত শুনতে। বাকিরা মন খারাপ করে বলল, ‘ভাই, ওরা করল। আমরা বাদ পড়ব কেন?’

তাঁর চেহারা দেখলে তখন পাষাণেরও মায়া হবে। কিন্তু আমরা সেদিন পাষাণেরও পাষাণ। কোনো ছাড় দিতে রাজি নই।

শেষে আমাদের ফার্স্ট বয় একটা আপস প্রস্তাব দিল। ‘ভাই, বাকি সবাই একসঙ্গে...তাতে আপনার ওপর খুব চাপ পড়বে না।’

বড় ভাই কিছু বলার আগেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ভাইয়ের গলা শোনা গেল, ‘এই আস্তে’ ‘এই ঠিক আছে।’ এরপর শোনা যেতে থাকল, ‘ইতর’ ‘বদমাশের দল’ ‘তোদেরকে আমি কোনো দিন মাফ করব না।’

সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন লাফিয়ে পড়ল পায়ে। ‘ভাই, মাফ করে দেন ভাই’—কোরাসে ছাপিয়ে গেল তাঁর সব আর্তনাদ।

কয়েকজন এর মধ্যে পা ধরে তাঁকে কাঁধে তুলে নিল। আশপাশের লোকজন ভাবল, ভাইয়ের প্রতি ভক্তদের ভক্তি। কেউ কেউ শুরু করল হাততালি। ভাইকে তাই অপমানটা বুকে চেপে মুখে হাসি হাসি ভাব রাখতে হলো। কাঁধে চেপে আমাদের কথামতো চলতে শুরু করলেন, যাতে আর মানহানিকর কিছু  না হয়।

এর মানে নিরাপদ ঈদ পালনের রেসিপি হলো চোখ-কান খোলা রাখা। খাবেন, কিন্তু সতর্ক থাকবেন। কোলাকুলি করবেন, তবে চারদিকে খেয়াল রাখবেন। আর খেয়াল রাখবেন, যেন আপনার ঘরের নারীরাও ঈদ করতে পারেন। ঈদের খাবার নিয়ে আমরা মেতে থাকি, যা বানাতে গিয়ে আমাদের মা-বোন-খালা-চাচিদের জীবন যায়। এমনিতেই রান্নাঘরে আমাদের নারীশক্তির অর্ধেকটা অপব্যয় হয়, ঈদের মহা আয়োজনে সেটা আরো মর্মান্তিক রূপ নেয়। তাঁদেরও ঈদ আছে। তাঁদের খুশির দিকটা নিয়ে ভাবলে ঈদ সার্থক হবে।

আর সার্থকতা পূর্ণতা পাবে, যদি ওদের কথাও ভাবি, যারা বছরে এই এক দিনই নতুন কাপড় পরতে পারে, এই এক দিনই কোর্মা-পোলাও খেতে পারে। আমাদের সন্তানদের কাপড় তিনটার জায়গায় দুইটায় নামিয়ে, খাওয়ায় অপচয় একটু কমানোর বিনিময়ে যে কী স্বর্গীয় আনন্দ দিতে পারি কিছু মানুষকে!

আপনি যদি সত্যিকারের ঈদ আনন্দ চান তাহলে ওদের একজনের কাপড়ের বন্দোবস্ত করুন। একজনের মুখে তুলে দিন সেই খাবার, যা সে বছরে এই এক দিনই খাওয়ার সুযোগ পায়।

সবাইকে ঈদের আগাম শুভেচ্ছা।



সাতদিনের সেরা