kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

চাঁপারানির চা দোকান

হরিশংকর জলদাস

১০ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



চাঁপারানির চা দোকান

অঙ্কন : মাসুম

এক ফালি ওই স্থানটির নাম চাঁপাতলা।

কেন ওই এক টুকরো জায়গাটির নাম চাঁপাতলা হলো, তেমন করে কেউ বলতে পারে না। নবীনরা তো নয়ই, প্রবীণদের মধ্যেও জনাকয়েক ছাড়া অন্যরা জানে না। তবে এটা সবাই জানে, স্থানটির আগে কোনো নামই ছিল না। অনেক বছর আগে কে বা কারা জায়গাটির নাম চাঁপাতলা দিয়ে বসেছিল। নামদাতা কোন সে জন? অন্যরা না জানলেও একজনে জানে, সে প্রণবেশ মাইতি।

চাঁপাতলা পদ্মপুরেরই একটেরে ছোট্ট এক খণ্ড জায়গা। পদ্মপুর শহরতলি। এই সেদিনও পদ্মপুর অজগাঁ। শহরের গা ঘেঁষে নিস্তেজ অজগরের মতো পড়ে ছিল। দু-দশটা ইটের বাড়ি, ইট বিছানো চার-পাঁচটা আঁকাবাঁকা রাস্তা নিয়ে পদ্মপুর আপন খেয়ালে সময় পার করছিল। বিশাল বিশাল ফসলি ক্ষেত, মাঠজুড়ে চাষিদের হাঁকডাক, গাছে গাছে সকালের পাখির কলরব, উঠানে উঠানে বোঝা বোঝা নানা শস্য—এই-ই ছিল পদ্মপুরের পরিচয়।

তারপর হঠাৎ করে শহরটা বাড়তে শুরু করল। তার পেটে তখন প্রবল খিদে। ওই খিদে নিয়ে শহরটা তখন চারপাশের গাঁগেরাম গিলতে শুরু করল। শহর ঢুকে যেতে লাগল গ্রামের মধ্যে। বড় বড় রাস্তা হতে লাগল, পাকা। বিরান জমিগুলো খণ্ড খণ্ড হতে শুরু হলো। সেখানে ঘর উঠতে লাগল, নানা রকমের। কোনো কোনো দালান তো চোখ ধাঁধিয়ে দিল! শহরের বা শহরের বাইরের নিরিবিলিপ্রিয় মানুষ পদ্মপুরের এখানে-ওখানে ঠাঁই করে নিতে শুরু করল। বছর দশেকের মধ্যেই পদ্মপুরের চেহারা ম্যাজিকের মতো পাল্টে গেল। এত বড় যে গ্রাম, খোলামেলা যার মাঠঘাট, তা অচিরেই অলিগলিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। পাড়ায় পাড়ায় বিভক্ত হয়ে গেল পদ্মপুর—ফুলছড়িপাড়া, মসজিদপাড়া, কামারতলা, সাহাপাড়া। পদ্মপুরের বাইরের চেহারাটা যতই বদলে যাক, ভেতরের রূপ তেমন করে পাল্টাল না। পদ্মপুরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে জোরে শ্বাস টানলে এখনো প্রবীণরা পুরনো পদ্মপুরের মেটে গন্ধ টের পায়, সোঁদালির হলুদ রং তাদের চোখ জুড়ে ভেসে ওঠে।

সুহাস দাশ বছর পনেরো আগে পদ্মপুরে জায়গা কিনে রেখেছিলেন। সরকারি চাকরি। বড় পোস্ট। উপরি পাওনার ছড়াছড়ি। কাঁচা টাকা হাতে এলে জায়গা কেনার বুদ্ধিটা তাঁর মাথায় এসেছিল। রিটায়ারমেন্টের পর বিশাল এক বিল্ডিং তুলে বসেছেন সুহাস, পদ্মপুরের ওই কেনা জায়গায়। শহরের এক বিয়েবাড়িতে এই সুহাস দাশের সঙ্গে প্রণবেশ মাইতির দেখা হয়েছিল। প্রণবেশের রিটায়ারমেন্টের তখনো পাঁচ বছরের মতো বাকি। একথা-ওকথার পর দুজনের মধ্যে বেশ আলাপ জমে গিয়েছিল। চাকরি শেষে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই দরকার, জানিয়েছিল প্রণবেশ মাইতি। ঘণ্টাখানেকের আলাপে সুহাসবাবুর ভালো লেগে গিয়েছিল প্রণবেশ মাইতিকে। তাঁর হাতে এক খণ্ড জায়গার খোঁজ ছিল তখন। মসজিদপাড়ার সলোমান এসেছিল তার ওই জায়গাটি বেচবে বলে। সামনে যে তার মেয়ের বিয়ে! প্রণবেশ মাইতির কথায় সুহাসবাবুর সলোমানের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল।

পরের সপ্তাহে সলোমানের ওই জায়গাটি প্রণবেশ মাইতির নামে রেজিস্ট্রি হয়েছিল। তা-ও বছর আট-নয়েকের আগের ঘটনা। প্রণবেশ মাইতি মসজিদপাড়ার কেনা জায়গাটিতে ঘরে তুলেছিল। দ্বিতল বাড়ি। ওই বাড়ির একতলায় থাকে প্রণবেশ, দ্বিতীয় তলায় স্ত্রী তিলোত্তমা। স্বামী-স্ত্রী হয়ে দুজন দুই তলায় কেন? তারও একটা কারণ আছে। ক্রমশ জানা যাবে।

তার আগে সুহাস দাশের কথা। সুহাস দাশের দুই ছেলে, মেয়ে নেই। দুই ছেলের একজন অধ্যাপক, ছোটজন সরকারি চাকুরে। কর্মব্যপদেশে দুজনেরই বাইরে বসবাস। বাইরে মানে নিজ শহরের বাইরে, অন্য জেলার শহরে। বিশাল বাড়িতে তাই দুজনেরই জীবনযাপন। সুহাসবাবুর আর আরতি সমাদ্দারের। আরতি সুহাসবাবুর স্ত্রীর নাম। জরা সুহাসবাবুর দেহে ছায়া ফেললেও আরতির দেহবারান্দায়ও ঢুকতে পারেনি। আরতির দু-একটা চুলে পাক ধরলেও শরীরটা আজও টানটান। অভিনিবেশীর চোখে গলার চামড়া কিছুটা অমসৃণ ঠেকলেও মুগ্ধ চোখের সামনে আরতি সমাদ্দার এখনো দুর্দান্ত। আরতি নিজের শরীর সম্পর্কে জানে, তাই যত্ন নেয় খুব। ওই যত্ন নেওয়া শরীরে যখন-তখন আঁচ-আঁচড় লাগতে দেয় না আরতি। তাই সুহাস দাশের শরীর জাগলেও শরীরসচেতন আরতির সামনে তা কুঁচকে যায়। প্রবীণেরও তো দেহসান্নিধ্য দরকার! সুহাসের জীবনে দেহসুখের বড় অভাব। স্ত্রীর ওপর যে জোর খাটাবেন তারও উপায় নেই সুহাসবাবুর। বিয়ের প্রথম দিকেই স্ত্রীর কাছে হেরে বসে আছেন সুহাস দাশ।

সুহাস দাশের গড়ন ছোটখাটো। কালোর দিকে দেহবরণ। অনেক চেষ্টা করেও উদরস্ফীতিকে বশে রাখতে পারেননি। এই পেটের জন্য স্ত্রীর উপহাসের মুখোমুখি হতে হয়েছে বারবার।

আরতি সমাদ্দার সাধারণ বাঙালি মেয়ের চেয়ে বেশি সুন্দরী। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির দেহ তার। ফরসা। টিকালো নাক। চোখ দুটো দেখার মতো। তার বক্ষ দুটো বন্দনা করার মতো। এহেন রূপবতীর সামনে জীবনানন্দীয় চেহারার সুহাস দাশকে তো হাঁটু গেড়ে বসতেই হয়। বসেছেনও সুহাসবাবু। প্রথম দিন থেকেই স্ত্রীর ইচ্ছার পুতুল হয়ে গিয়েছিলেন সুহাস দাশ। তাই স্ত্রীকে ইচ্ছামতো পাওয়ার অধিকার বারবার ক্ষুণ্ন হয়েছে সুহাসের। ফলে তাঁর মধ্যে স্ত্রীসান্নিধ্যের প্রবল এক বাসনা মাথা কুড়ে মরেছে। রিটায়ারমেন্টের পরে সেই বাসনার বারবার অপমান হয়েছে। এক প্রবল অবদমিত ইচ্ছার চাপে সুহাসবাবু দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কখনো কখনো।

তাঁর এই জীবনের কথা একবার প্রণবেশ মাইতিকে বলতে গিয়েছিলেন সুহাস দাশ!

‘বুঝলে প্রণবেশ।’ তত দিনে দুজনের মধ্যে সম্পর্ক আরো গাঢ় হয়েছে। সুহাসবাবু প্রণবেশ মাইতিকে কখন তুমি করে বলতে শুরু করেছেন, দুজনের কেউ খেয়াল করেননি।

‘বুঝলে প্রণবেশ’ বলে থেমে গিয়েছিলেন সুহাসবাবু।

প্রণবেশ বলেছিল : ‘কিছু বলতে চাইছিলেন দাদা। হঠাৎ মাঝপথে থেমে গেলেন!’

‘ব্যাপারটা তোমায় বলব কি না ভাবছি।’

প্রণবেশ আর কী বলবে! বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ, নিজ থেকে না বললে তো আর জোর করে বলানো যায় না! তাই চুপ করে সুহাসবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকল প্রণবেশ।

‘না, বলছিলাম কী, সংসারজীবনে তুমি কেমন সুখী?’ খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সুহাস দাশ।

সেদিন তাঁরা চাঁপাতলায় একটা বেঞ্চে মুখোমুখি বসেছিলেন।

পদ্মপুর ঘিরে উপশহর তৈরি হওয়ার পর নিরিবিলিতে একটু শ্বাস ফেলার স্থান রইল না। চারদিকে ইটকাঠ—হৈচৈ, গাড়ি-রিকশার ফ্যাঁ-ফোঁ-টুং-টাং। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানা রকম ক্যাঁচরম্যাচর চারদিকে। এ রকম দুর্বিষহ সময়ে একদিন সুহাসবাবু এই চাঁপাতলাটা আবিষ্কার করলেন। জায়গাটির নাম তখন চাঁপাতলা ছিল না। আসলে স্থানটির কোনো নামই ছিল না ওই সময়।

এই জায়গায় চাঁপারানি নামের এক রমণী একটা টংয়ে চা বেচতেন। তখন একটা কেটলি, চার-পাঁচটা কাপ, একটা দুধের ডেকচি, গুঁড়া দুধের পট, চিনির কৌটা এবং সামনে তিন-চারটা বয়ামে নানা ধরনের বিস্কুট। খুব যে মানুষ চা খেত, তা নয়। এই গোটা দিনজুড়ে দশ-বারো কাপ।

হাঁটতে হাঁটতে একদিন এদিকে আসতে আসতে বেশ তেষ্টা পেয়ে গিয়েছিল সুহাসবাবুর। এদিক-ওদিক তাকাতে টংটি চোখে পড়েছিল। এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। পানি চাইতে গিয়ে চা চেয়ে বসেছিলেন চাঁপারানির কাছে সুহাসবাবু। তাঁর চোখ তখন চাঁপারানির দেহেতে-বাহুতে আটকে গেছে। কিছুই না। সাধারণ চেহারা। বয়স চল্লিশের এপার-ওপার। জংলিছাপা একটা শাড়ি পরনে। হলদেটে ব্লাউজ। আর কপালের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটা টিপ। এই যা। এতেই সুহাসবাবুর মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠেছিল। একহারা আর দোহারার মাঝামাঝি গড়ন। দেহটা কালো বললে অপমান করা হবে। ঈষৎ নত স্তন দুটোতে আয় আয় ভাব।

চাঁপারানি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবু, রং চা, না দুধ চা।’

সুহাসবাবুর তখন বিহ্বল অবস্থা। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল ‘দুধ’।

‘তা টানা দুধ, না টেপা দুধ বাবু?’ সহজ কণ্ঠে বলেছিল চাঁপারানি।

 ‘এ্যাঁ’! সংবিতে ফিরেছিলেন সহাসবাবু।

‘বলছিলাম, গরুর দুধ, না কৌটার দুধ?’

‘কী যেন বললে! টানা আর টেপা!’

‘গরুর দুধ হলো টানা দুধ। টেনে টেনে বাঁট থেকে বের করতে হয়। আর কৌটার দুধ তো টেপাই, উপুড় করে টিপলে ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে আসে।’ বলেছিল চাঁপারানি।

ধপ করে বেঞ্চির ওপর বসে পড়েছিলেন সুহাস দাশ। জবাব দেবেন কী, হাঁ করে চাঁপার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া সুহাসবাবুর অন্য কোনো উপায় থাকল না তখন। সেদিন চাঁপারানির চা খেয়েছিলেন তিনি, ওই টেপা দুধ দিয়েই খেয়েছিলেন।

সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে ফিরে এসেছিলেন সুহাসবাবু, নিজ বাড়িতে। তাঁর তখন মনে হচ্ছিল, তিনি কী যেন ফেলে এসেছেন, কী যেন নিয়ে এসেছেন চাঁপারানির কাছ থেকে। ঘরে ঢুকতেই আরতি সামনে পড়েছিল। অন্য দিন হলে বুভুক্ষুর চোখে তাকাতেন আরতির দিকে। আজ তেমন করে তাকাতে ইচ্ছা করল না সুহাসবাবুর। এর পর থেকে চাঁপারানির টংয়ে নিত্য যাতায়াত সুহাসবাবুর। সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই সময়ে যান, সন্ধ্যা গড়িয়ে ফেরেন। এর মধ্যে চাঁপারানির বেচাকেনা বেড়েছে। একা আর সামাল দিতে পারছিল না বলে বাদল নামের এক ছোকরাকে রেখেছে। শত কর্মব্যস্ততার মধ্যেও সুহাসবাবুর জন্য এক ঝলক মিষ্টি হাসি অপেক্ষা করে থাকে চাঁপারানির ঠোঁটে। ওই হাসিটার জন্যই বুঝি কুড়ি মিনিটের রাস্তা ঠেঙিয়ে সুহাসবাবু চাঁপারানির টংয়ে আসেন।

দিন কেটেছে। একদিন প্রণবেশ এসে জুটেছে। প্রণবেশ যে খুব চাতে অভ্যস্ত, তা নয়। কিন্তু চায়ের চেয়ে যে চাঁপারানিকে ভালো লাগে তার! দুজনেই নিয়ম করে সূর্য গড়ানো বিকেলে চাঁপারানির চা দোকানে হাজির হন। টংয়ের বাইরে বিছানো বেঞ্চিতে দুজনে বসেন। তারপর নানা কথা। কখনো চাঁপারানির সঙ্গে, কখনো নিজেদের মধ্যে।

সুহাসবাবুরা এর মধ্যে জেনে গেছেন, চাঁপারানির ছেলে ছিল, এখন নেই। স্বামী আছে, পঙ্গু। এমপি সাহেবের বিল্ডিংয়ে কাজ করতে গিয়ে নিচে পড়ে গিয়েছিল। হাজার বিশেক টাকা হাতে গছিয়ে লাল চোখ করে চুপ থাকতে বলেছেন এমপি। নিরুপায় হয়ে টংয়ে এই চা দোকান।

এক সন্ধ্যায় সুহাসবাবু বলেছেন, ‘বুঝলে প্রণবেশ, এই জায়গাটার একটা নাম থাকা দরকার।’

‘তাহলে তো ভালো হয় দাদা।’

‘কী নাম দেওয়া যায় বলো তো!’

‘নাম, নাম! কী নাম দিলে ভালো হয়! নাহ, কিছুই তো মাথায় আসছে না দাদা! আপনিই একটা নাম দেন না।’ আমতা আমতা করে বলল প্রণবেশ মাইতি।

‘আমি দিতাম!’ চাপা হাসি ফুটে উঠল সুহাস দাশের মুখে।

‘হ্যাঁ দাদা, দিন না! আপনার দেওয়া নামটাই প্রচার করব আমরা।’

‘তাহলে দিলাম, আজ থেকে এই স্থানটির নাম চাঁপাতলা হবে।’

প্রণবেশ চমকে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।

খেয়াল করলেন সুহাসবাবু। জিজ্ঞেস করলেন, কী দেখছ?’

প্রণবেশ বলল, ‘দেখছি—আশপাশে কোনো চাঁপাগাছ আছে কি না।’

‘না, নেই। আশপাশে কোনো চাঁপাগাছ নেই।’ কৌতুক মেশানো গলায় সুহাসবাবু বললেন।

‘তাহলে যে জায়গাটির নাম দিলেন চাঁপাতলা!’

এবার গলা উঁচিয়ে হেসে উঠলেন সুহাসবাবু। বললেন, ‘তুমি শুধু গাছই দেখলে, অন্য কিছু দেখলে না প্রণবেশ?’

বিস্মিত কণ্ঠে প্রণবেশ বলল, ‘অন্য কিছু!’

‘হ্যাঁ তো। অন্য কিছু!’ কণ্ঠে গাম্ভীর্য ঢেলে বললেন সুহাসবাবু।

‘মানে!’ চোখে-মুখে জিজ্ঞাসা প্রণবেশ মাইতির।

সুহাসবাবু কিছু না বলে ডান হাতের তর্জনীটা টংয়ে বসা চাঁপারানির দিকে তুললেন। মুখে কিছু বললেন না।

প্রণবেশ তাকিয়ে দেখল, লণ্ঠনের আলোতে টংয়ে বসা চাঁপারানিকে অসাধারণ মোহময়ী বলে মনে হচ্ছে। তার গ্রীবায়, তার বাহুতে, তার আবৃত পুরুষ্টু স্তনে লণ্ঠনের আলো তখন পিছলে পিছলে যাচ্ছে।

ওই থেকে এই জায়গাটির নাম হয়ে গিয়েছিল চাঁপাতলা। কেন চাঁপাতলা, এই নাম কে দিয়েছে—তা জানতে চায়নি কেউ কোনো দিন। শুধু দুজনে এই নামটির রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। এই দুজনের নাম অন্যরা তো দূরের কথা, খোদ চাঁপারানিও জানে না।

এরপর বহুদিন কেটে গেছে। প্রতি সন্ধ্যায় গেছেন দুজনে। পরে পরে আরো অনেকে এসে জুটেছে সেই চাঁপারানির চা দোকানে। কেউ গেছে, কেউ থেকে গেছে বেশ কিছুদিন। কিন্তু সুহাসবাবু আর প্রণবেশ মাইতির কামাই হয়নি এক দিনও।

তা সেই সন্ধ্যার কথায় ফিরে যাওয়া যাক। ‘সংসারজীবনে তুমি কেমন সুখী?’

সুহাস দাশের এই প্রশ্নের উত্তরে প্রণবেশের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল। তারপর বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকেছিল প্রণবেশ।

সুহাসবাবু আবার বলেছিলেন, ‘কী, কিছু বলছ না যে প্রণবেশ!’

প্রণবেশ মাথা তুলেছিল। তারপর বলেছিল, ‘শুনবেন আমার কথা?’

সুহাসবাবু ডান দিকে মাথাটা কাত করেছিলেন।

প্রণবেশ মাইতি বলতে শুরু করেছিল, ‘তিলোত্তমার সঙ্গে আমার ভালোবাসাবাসির বিয়ে। একই কলেজে পড়তাম। জানাশোনা থেকে ধীরে ধীরে প্রেম। ছাত্ররাজনীতি করতাম। আমার বক্তৃতা খুব ভালো লাগত নাকি তিলোত্তমার। দুর্দান্ত রূপসী সে। তার চারদিকে প্রণয়াকাঙ্ক্ষীদের ভিড়। সবাইকে বাদ দিয়ে আমাকেই ভালোবাসল তিলোত্তমা। আমাদের বিয়ে হলো। সুখের জীবন আমাদের। কয়েক বছর পর মেয়ে হলো। সন্তান নিয়ে বেশ কয়েক বছর ব্যস্ত থাকল সে। আমি আমার কাজ নিয়ে। পদোন্নতি হলো আমার। অন্য শহরে বদলি হলাম। দম নেওয়ার জন্য একটু থামল প্রণবেশ।

সুহাসবাবু কী যেন আঁচ করতে পেরেছেন। তাঁর চোখে-মুখে বিষণ্নতা। চাপা কণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘সন্দেহ!’

‘ঠিক ধরেছেন দাদা। ওই সময় থেকে তিলোত্তমা আমাকে সন্দেহ করা শুরু করল। আমি বুঝি তাকে আর ভালোবাসি না। আমি বুঝি অন্য নারীতে আসক্ত। প্রথম প্রথম অনেক চেষ্টা করেছি, তার সন্দেহ দূর করতে। হিতে বিপরীত হয়েছে। খেপে গেছে বারবার। তিলোত্তমার সন্দেহ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়েছে।’

‘তারপর?’ সুহাসবাবু জিজ্ঞেস করেছেন।

প্রণবেশ বলল, ‘তিলোত্তমা আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। মেয়ের মাথায় হাত রেখে তাকে বলেছি, তোমার সন্দেহ অমূলক তিলোত্তমা। আমি দুশ্চরিত্র নই।’

‘তোমার বউ কী বলল?’ সুহাসবাবু বললেন।

প্রণবেশ ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বলল, ‘একদলা থুতু আমার মুখে ছুড়ে বলল, আমি তোমাকে ঘৃণা করি প্রণবেশ।’ বলে একেবারে চুপ মেরে গেল প্রণবেশ মাইতি।

নিষ্পল চোখে প্রণবেশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ থাকল না সুহাসবাবুর।

‘এরপর মেয়ে বড় হলো। মেয়েকে নিয়ে আলাদা বিছানায় থাকা শুরু করল তিলোত্তমা। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল। নাতনি হলো। শ্বশুরবাড়িতে সুখে আছে ইন্দ্রানী। এরপর এই মসজিদপাড়ায় বাড়ি হলো। তিলোত্তমা দোতলায় নিজের মতো করে থাকতে শুরু করল। আমি নিচতলায়। দীপালিমাসি রাঁধে। ওপরতলায় খাবার যায়। আমি একা একা ডাইনিং টেবিলে খাই।’ থামল প্রণবেশ।

‘তুমি তো আমার চেয়েও অসুখীরে প্রণবেশ। আমি তো মাঝেমধ্যে হলেও বউয়ের সান্নিধ্য পাই! তুমি তো বউ থাকতেও বিপত্নীক রে প্রণবেশ!’ বলতে বলতে কণ্ঠটা বুজে এলো সুহাসবাবুর।



সাতদিনের সেরা