kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

‘আর নয় শিশুশ্রম এবং পথশিশু, চলো স্কুলে যাই’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক

শিশুশ্রম বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে

‘আর নয় শিশুশ্রম এবং পথশিশু, চলো স্কুলে যাই’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ২৩ জুন। গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সভাকক্ষে যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে কালের কণ্ঠ, টঙ্গী আরবান প্রোগ্রাম-ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ও আর্টিস্টিক কমিউনিকেশন। এতে বিশেষজ্ঞরা তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। আলোচনায় উঠে আসে নানা প্রতিবন্ধকতা ও পরামর্শ। আলোচনার সারসংক্ষেপ নিয়ে এই ক্রোড়পত্র গ্রন্থনা : মোবারক আজাদ। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

৩০ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



শিশুশ্রম বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে

শিশুশ্রম কেন হচ্ছে চিহ্নিত করে কাজ করতে হবে

জাহিদ আহসান রাসেল

সিটি করপোরেশন এলাকায় শিশুশ্রম ও পথশিশু একটু বেশি। শহরে প্রতি আটটি শিশুর মধ্যে একটি শিশু নিয়োজিত আছে শিশুশ্রমে। এই শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ  নেওয়া হয়েছে। শিক্ষাবৃত্তি, পোশাক দেওয়া, বিনা মূল্যে বই দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অনেক দরিদ্র পরিবারে মা-বাবা দুজনই বাড়ির বাইরে কাজ করেন। তাঁদের শিশুসন্তানদের অনেক সময় স্কুলে দেওয়া হয়, আবার কোনো সময় বাইরের বিভিন্ন কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। শিশুশ্রম বৃদ্ধির এটাও একটা কারণ। অভিভাবকের মধ্যে যদি সন্তানদের স্কুলে পড়ানোর উৎসাহ না থাকে তাহলে শিশুশ্রম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। আবার যাঁরা লেখাপড়া করেননি, তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষের একটা ধারণা এমন—লেখাপড়া না করেও ভালো থাকা যায়। তাঁদের সন্তানরাও পড়াশোনা না করে ভালো থাকতে পারবে। এ ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

দেশের কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের দায়িত্ব, যারা শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করে তাদের চিহ্নিত করা। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় শিশুশ্রম বন্ধ করতে হবে। শুধু সরকার কিংবা অন্য কারো একার পক্ষে এটা বন্ধ করা সম্ভব নয়। শিশুশ্রম কেন হচ্ছে, এটা চিহ্নিত করে কাজ করতে হবে। সেই চিহ্নিত জায়গা ধরে সমাধানের কাজ করতে হবে।

এদিকে আমাদের দেশে পথশিশুদের নিয়ে কাজ কম হয়। অনেক পরিবারে ভাঙনের পর মা-বাবা অন্যত্র বিয়ে করছেন। ফলে শিশুদের থাকার কোনো জায়গা থাকে না। তারা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। এতে কিছু শিশু বাধ্য হয়ে রাস্তায় যাচ্ছে, হয়ে যাচ্ছে পথশিশু। একসময় প্রাথমিকে অনেক শিশু ঝরে পড়ত, এখন নানা সুবিধা দেওয়ার কারণে সেটা নেই বললেই চলে। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ে কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে শিশুশ্রমের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দুপুরের খাবার দেওয়াসহ আরো কিছু বিষয় বিবেচনায় আনতে পারলে এই ঝরে পড়া কমানো যাবে। এ জন্য সমাজের বিত্তবান মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে সরকারের পক্ষে এগুলো সমাধান করা সহজ হবে।

 

 

শিশুশ্রম বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ চাই

মঞ্জু মারীয়া পালমা

বর্তমান সরকার শিশুদের অধিকার রক্ষা ও উন্নয়নে অনেক কাজ করে যাচ্ছে। এত কিছুর পরও বলতে হয়, শিশুশ্রম বাংলাদেশের শিশুদের জন্য একটি বড় অভিশাপ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ বলছে, দেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশুশ্রমিক আছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।

এদিকে কারিতাস বাংলাদেশ-এর ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক সাড়ে ১১ লাখ পথশিশু রয়েছে, যার ৩৩ শতাংশের অবস্থান রাজধানী ও এর আশপাশের শহরে। শিশুশ্রম বন্ধে গৃহীত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২১-২০২৫) নথির তথ্য বলছে, বাংলাদেশে শিশুরা ৩৮ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। এর সঙ্গে সরকার আরো পাঁচটি কাজ যুক্ত করে মোট ৪৩টি খাতকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে আটটিকে এরই মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। বিবিএস বলছে, সিটি করপোরেশনের বস্তি ও শহরাঞ্চলের অনুন্নত এলাকায় প্রতি আটটির মধ্যে একটি শিশু যুক্ত হয়েছে শিশুশ্রমে।

আইএলও ও ইউনিসেফ বলছে, কভিড-১৯-এর কারণে অসংখ্য শিশু নতুনভাবে শিশুশ্রমের ঝুঁকিতে রয়েছে। শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িতরা বঞ্চিত হচ্ছে মৌলিক অধিকার থেকে। তাদের অধিকার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই শিশুশ্রম বন্ধে চাই সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগের সমন্বয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ। একই সঙ্গে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারকে সরকারের বিভিন্ন সেবার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দেশে শিশুশ্রম বন্ধের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব। ওয়ার্ল্ড ভিশন শুরু থেকেই পিছিয়ে পড়া শিশুদের অধিকার ও সার্বিক উন্নয়নে সারা বিশ্বে কাজ করে চলছে। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ দেড় থেকে দুই দশকের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার শিশুশ্রমিককে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে এনেছে।

 

 

শিশুশ্রম ও পথশিশুর সংখ্যা জানতে জরিপ দরকার

আহমেদ বেলাল

গাজীপুরে অনেক শিল্প-কারখানা থাকলেও ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের তুলনায় এখানে শিশুশ্রম কম। এখন যে জরিপ ধরে পথশিশু ও শিশুশ্রমের কথা বলা হচ্ছে, এসব জরিপ ২০১৩ সালের দিকে করা। তাই সরকারের কাছে প্রত্যাশা করব, আবার একটি জরিপ হোক, যেখানে শিশুশ্রম এবং পথশিশুর  সঠিক সংখ্যা উঠে আসবে।

আমরা কিছু পরিকল্পনা ধরে কাজ করি। এর অংশ হিসেবে গাজীপুরে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৬০ জন শিশুশ্রমিককে কাজ থেকে সরিয়ে আনা হয়। পাশাপাশি জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়েও এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। গাজীপুরে জেলা পর্যায়ে দুটি কমিটি আছে। এই কমিটি তিন মাস পর পর বৈঠক করে। এখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসে, সেটা বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে জমা দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি বিভাগীয় শিশু পরিবীক্ষণ কমিটি আছে। আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। আর ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কিশোরদের নিয়োগ দিলে আমাদের পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে কোনো ধরনের অসংগতি পেলে সংশ্লিষ্টদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে নোটিশ দিই, নিষেধ করি।   তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিই। এসবের অংশ হিসেবে আমরা গত অর্থবছরে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা সংক্রান্ত ১২টি মামলা করেছি।

এদিকে পথশিশু যারা আছে, নানা সংকটের কারণে তাদের বিষয়ে অন্যভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলছে, এক লাখ শিশুকে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি প্রশিক্ষণে নিয়ে আসবে। এখানে গাজীপুর ছিল না। এখন আরেকটি প্রকল্প আসছে, আরো এক লাখ শিশুকে দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসবে। এতে গাজীপুরকে যুক্ত করতে চিঠি দিয়েছি।

 

 

শিশুশ্রমমুক্ত সমাজ গঠনে কাজ করছে ওয়ার্ল্ড ভিশন

যোয়ান্না ডি’রোজারিও

শিশুশ্রমের ভয়াবহতা অনুধাবন করে শিশুশ্রমমুক্ত সমাজ গঠনে ওয়ার্ল্ড ভিশন বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশে বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড ভিশন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওয়ার্ল্ভ্র ভিশন চলতি বছরও ১২ জুন বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালন করেছে।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই সংস্থাটি সরকারের উন্নয়ন সহযাত্রী হিসেবে শিশু সুরক্ষা, শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য, জীবিকায়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, লিঙ্গবৈষম্যসহ সব ধরনের বৈষম্য নিরসনে সরকারের সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

শিশুশ্রম নিরসনে ওয়ার্ল্ড ভিশন টঙ্গী আরবান প্রগ্রামের যেসব কাজ হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে দুই হাজার অভিভাবক ও বিভিন্ন কলকারখানার মালিকদের নিয়ে বিষয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক সভা, শোভাযাত্রা, রোড শো, পট সং, জারিগান, পথনাটক এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কাছে শিশুশ্রম ও এর প্রতিকারের দিকগুলো তুলে ধরে সচেতন করা। বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম থেকে বিরত থাকতে ছেলেমেয়েদের ট্রেনিং ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

 

কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে উৎসাহিত করতে হবে

মো. আবু ইউসুফ খান

দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সব ধরনের মানুষকে এক স্রোতোধারায় কাজ করতে হবে। কারণ কিছু মানুষ যদি পিছিয়ে পড়ে, তাহলে তা সম্ভব নয়। তাই দেশে যারা পথশিশু ও শিশুশ্রমে যুক্ত, তাদের মূল স্রোতোধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করতে হবে। আইন দিয়ে জোর করে স্কুলে আনা যায় না। কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, স্কুল থেকে যখন ছেলেমেয়েরা ঝরে পড়ে, তখন স্কুল থেকে যোগাযোগ করা হলে তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আমাদের শিক্ষকদের হোম ভিজিট করার একটি প্রক্রিয়া আছে। যেসব শিশু ৫ থেকে ১০ দিন স্কুলে আসে না, তাদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নিতে হবে—কেন আসছে না। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কাজে তারা যুক্ত হয়ে গেছে। তখন কিন্তু তাদের কাউন্সেলিং করে আবার ফিরিয়ে আনা যায়। কারণ কাউন্সেলিং খুবই কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। এটা করা জরুরি।

এ ছাড়া প্রত্যেকের বাড়ি ও আশপাশের কিছু শিশু শিশুশ্রমে জড়িত আছে। এগুলো বন্ধ করে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

 

 

পথশিশুদের দিয়ে মাদক বহন করানো হয়

মুফতি আলমগীর হোসেন

অনেক পথশিশু চুরির মতো অপরাধমূলক কাজে জড়িত। চুরি করা জিনিস বিক্রি করে সেই টাকায় তারা মাদক গ্রহণ করে। জয়দেবপুরের রথখোলায় প্রায়ই দেখা যায় এসব ছেলেকে নেশা করতে। এতে অন্তত ৫০ জন ছেলে জড়িত, যাদের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে।

জানতে পেরেছি, তাদের দিয়ে ইয়াবা ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বহন করানো হয়। কিছু ধনী লোকের সন্তানরা এই ছোট শিশুদের প্রলোভন দেখিয়ে মাদক বহন করায়। এর মধ্যে কিছু শিশুর খোঁজ নিয়ে দেখেছি, যেসব শিশু বাহকের কাজ করে, তাদের বাবারা রিকশা চালান, দিনমজুরি করেন, কিংবা ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করেন। তাই এসব শিশুকে দিয়ে যারা মাদক বহন করায় তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এদের এখন ফেরানো না গেলে ২০০, ৫০০ বা হাজার টাকার জন্য তারা লোভের বশে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটাতে পারে।

 

 

পথশিশুদের খাসজমিতে পুনর্বাসন করে উন্নয়ন সম্ভব

আসাদুল ইসলাম মাসুদ

গাজীপুর একটি বৃহৎ শিল্প এলাকা। সে তুলনায় অন্য জায়গার চেয়ে এখানে শিশুশ্রম কম। এর পরও দেখা গেছে, কিছু কলকারখানায় অত্যাধুনিক মেশিন আসায় অনেকে বেকার হয়ে পড়েন। এতে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে তাঁদের ১০ থেকে ১২ বছরের শিশুদের তিন-চার হাজার টাকার বিনিময়ে কাজে লাগিয়ে দেন। এভাবে গাজীপুরে শিশুশ্রমিক বাড়ছে।

অন্যদিকে পথশিশুদের কোনো বাড়িঘর নেই। তাদেরসহ অন্য যাদের বাড়িঘর নেই, তাদের যদি সরকারি খাসজমিতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়, তাহলে তাদের স্কুলে ফেরানোসহ অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করা সম্ভব।

 

 

পথশিশুদের জন্য বরাদ্দ দিতে হবে

মো. মোমেন মিয়া

শিশুশ্রম নিরসন ও পথশিশুদের নিয়ে কাজ করার জন্য সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে কিছু বরাদ্দ পাওয়া গেলে ভালোভাবে কাজ করা যেত। কারণ এনজিওর মাধ্যমে যে কাজগুলো করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত প্রশংসার দাবিদার। তবে তাদের পক্ষে একা ভালোভাবে এসব কাজ করা সম্ভব নয়। সে জন্য সিটি করপোরেশনকে যদি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহলে পথশিশু ও শিশুশ্রমে জড়িতদের স্কুলে নিয়ে আসা সহজ হবে। এ জন্য আমাদের সবাইকে মিলেমিশে কাজ করতে হবে।

 

 

অধিকারবঞ্চিত মেয়েশিশুরা গৃহকর্মীর কাজ করছে

মাহমুদুর রহমান নাঈম

শিশুদের অধিকার নিয়ে টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ করার সুবাদে দেখেছি, অনেক শিশুই শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। অথচ এসব শিশুর এই বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা পরিস্থিতির কারণে তারা স্কুলে যাওয়ার বদলে বিভিন্ন কলকারখানা, হোটেল ও রিকশা চালানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত। অনেক মেয়েশিশু মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে গৃহকর্মীর কাজ করছে। এতে অনেক শিশুর হাত-পা ও চোখের মতো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে পরিবারসহ আশপাশের সবার সহযোগিতা আবশ্যক।

 

 

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের উন্নয়নে মন্ত্রণালয় প্রয়োজন

ওয়াদুদুর রহমান

শিশুশ্রম ও পথশিশু দুটোকে যদিও আমরা একলাইনে নিয়ে এসেছি, কিন্তু দুটোর চরিত্র দুই রকম। পথশিশুর সংখ্যা বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী আড়াই থেকে চার লাখ। পথশিশুদের নির্দিষ্ট বাসস্থান নেই। পথশিশুদের মূলধারায় এনে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

যে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত, তারা কেন জড়িত সে কথা ভাবতে হবে। শুধু কাউন্সেলিং করে স্কুলে নিলেই হবে না, তার পরিবারে খাবারের সক্ষমতা আছে কি না সেটা ভাবতে হবে। যদি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থাকতে পারে, তাহলে ঝরে পড়া পথশিশুদের উন্নয়নের জন্য কি মন্ত্রণালয় থাকতে পারে না? প্রধানমন্ত্রীর কাছে পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের উন্নয়নের জন্য একটি মন্ত্রণালয় করার প্রস্তাব করছি।

 

 

শিশুনির্ভর কারখানায় নিয়মিত অভিযান দরকার

হাসান রহমান মামুন

শ্রম আইন ২০০৬-এ আছে ১৮ বছরের নিচে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা যাবে না। কিন্তু অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, শিশুনির্ভর কারখানা। তাই কলকারখানা অধিদপ্তর যদি নিয়মিত পরিদর্শন করে নজরদারি বাড়ায়, তাহলে দ্রুত শিশুশ্রম থেকে বেরিয়ে আসতে পারব।  

এক পরিসংখানে দেখা গেছে, দেশের ৪৭ লাখ শিশু কাজে জড়িত। শিশুশ্রমের কিছু কারণের মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, সচেতনতার অভাব, সস্তা শ্রমের উসকানি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শিশুপাচার ও আইনের যথার্থ বাস্তবায়ন না হওয়া। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সব শিশুর জন্য শিক্ষার অবৈতনিক সুযোগ তৈরি করতে হবে। দারিদ্র্য দূরীকরণে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি শিশুশ্রম নিরসনে প্রচার অভিযান চালাতে হবে।

 

 

অভাব দূর করতে না পারলে শিশুশ্রম বন্ধ হবে না

আশরাফুজ্জামান

শিশুশ্রমের অন্যতম কারণ দারিদ্র্য। দারিদ্র্য যদি বিমোচন করা না যায়, তাহলে কিভাবে শিশুশ্রম নিরসন হবে? যেসব পথশিশুর কথা বলা হচ্ছে, তারা কেন শহরে এলো? দেশে অনেক কিছুরই উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু গ্রাম থেকে মানুষের শহরে আসার যে ঢল, এটা কমছে না। এর কারণ হলো, যারা গ্রামে আছে তারা সব সময় কাজ পাচ্ছে না, ভালোভাবে চলতে পারছে না। তাই জীবন-জীবিকার তাগিদে সন্তানাদি নিয়ে শহরে ছুটছে। কারণ শহরে এলে পরিবারের প্রতিটি সদস্যই কোনো না কোনো কাজে যুক্ত হতে পারছে। এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শ্রম আইন-২০০৬-এর মতো কোনো আইনই মানা হচ্ছে না।

 

 

দরিদ্র অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে

রেবেকা সুলতানা

রাস্তায় বের হলে দেখি, শিশুরা যে বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে তারা বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। শুধু গাজীপুরেই মহানগর এলাকায় ২০০ বিশেষ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ৩০ জন করে দুই পালায় ৬০ জনকে নিয়ে স্কুলিং কার্যক্রম চালাচ্ছে। এখানে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, যেসব শিশু স্কুলে যেতে চায় না বা ঝরে পড়ে, তাদের স্কুলে ফেরানো কঠিন। স্কুলের বাইরে যে জগৎ, সেই জগৎ তাদের আকর্ষণ করে। ফলে তারা স্কুলে যায় না। আরেকটি বিষয় হলো, তাদের পরিবার দরিদ্র, অশিক্ষিত ও অসচেতন। এই তিনটি বিষয়ের একটির সঙ্গে আরেকটির গভীর সম্পর্ক। এসব পরিবারের মা-বাবা মনে করেন, শিশুদের কাজে পাঠিয়ে তাঁরা আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন। আর এই সাময়িক উপকারকে তাঁরা বড় করে দেখেন। কিন্তু শিক্ষা গ্রহণের পরে কাজে যুক্ত হলে যে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি উপকৃত হবেন, সেটি তাঁরা ওইভাবে চিন্তা করেন না। তাই অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। শিক্ষার যে সুফল এবং ভবিষ্যতে তারা যে সফল হবে—এগুলো বোঝাতে হবে। তাহলে মনে হয় ঝরে পড়া রোধ করা অনেকাংশে সম্ভব।

আরেকটি বিষয় দেখেছি, দরিদ্র পরিবারের অনেক সন্তান না খেয়ে স্কুলে যায়। এ জন্য মিডডে মিল চালু করা যায়। এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে বেসরকারি পর্যায়ে এবং সমাজের বিত্তবানদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে এগিয়ে আসার সুপারিশ করব।

 

 

সমন্বিত ও সার্বিক উদ্যোগ দরকার

শাহেদ মুহাম্মদ আলী

শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগকে স্বাগত জানানো, উৎসাহিত করাই আজকের আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য। কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করতে তাদের সঠিক সংখ্যা, অবস্থান জানা জরুরি। শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা নিরূপণে তাই সরকারি উদ্যোগে জরিপ করে হালনাগাদ তথ্য প্রস্তুত করা দরকার। শিশুশ্রম প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন এলাকার বস্তি এবং বাকি অনুন্নত এলাকার অতিদরিদ্র পরিবারের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশেষ আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে সব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা গেলে কাজটা সহজ হবে। শিশুশ্রম নিরসনে আইনের প্রয়োগও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

করোনা মহামারিও শিশুশ্রমকে উসকে দিচ্ছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার জরিপ কভিডের সময় শিশুশ্রম বেড়েছে বলে তথ্য দিচ্ছে। স্কুল ছাড়ার সংখ্যাও বাডছে। সেখানেও আমাদের কাজ করতে হবে। শিশুদের  স্কুলে ফেরাতে হবে। এর জন্য প্রথমে মা-বাবাকে সচেতন করতে হবে। প্রয়োজনে শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার আওতায় আনতে হবে। মোদ্দাকথা, একটা সমন্বিত ও সার্বিক উদ্যোগই কেবল শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের জগৎ থেকে দূরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

 



সাতদিনের সেরা