kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

কালের কণ্ঠ ও ইউএসএআইডি

দুর্যোগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে রোল মডেল বাংলাদেশ

২৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ২১ মিনিটে



দুর্যোগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে রোল মডেল বাংলাদেশ

পৃথিবীতে সংঘটিত ৮০ শতাংশ দুর্যোগ আবহাওয়াজনিত। বিশ্বব্যাপী ৯২ শতাংশ মানুষের প্রাণহানি এসব দুর্যোগের কারণে হয়ে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব দুর্যোগের সংখ্যা, তীব্রতা ও মাত্রার ব্যাপকতাও ক্রমবর্ধমান। তবে এশিয়া মহাদেশে পৃথিবীতে সংঘটিত দুর্যোগগুলোর ৪৫ শতাংশ ঘটে আসছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে ‘দুর্যোগের সুপারমার্কেট’ বলা হয়। এ অবস্থায় গত রবিবার ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড (ইডাব্লিউএমজিএল) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক। কালের কণ্ঠ ও ইউএসএআইডির আয়োজনে এই বৈঠকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অবস্থার পাশাপাশি নানা করণীয় তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। গ্রন্থনা করেছেন শরীফুল আলম সুমন, জহিরুল ইসলামএ এস এম সাদ। ছবি : লুৎফর রহমান

 

উন্নয়নের অগ্রযাত্রার সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জড়িত

মো. মোহসীন

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব দেশকে দুর্যোগ পোহাতে হবে, তারা তাদের নেতা মনে করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। কারণ আমরা যখন কোনো আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যাই, তখন বিভিন্ন দেশের নেতারা শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলার জন্য উদগ্রীব থাকেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে কথা বলেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় কী করতে হবে, তা তিনি বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন। দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসে যে কাজটি জাতিসংঘ করছে, সেটি ১৯৭৩ সাল থেকেই বলে আসছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আরবান ডিজাস্টারে আমাদের আরো গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং সেই সুযোগও আমাদের আছে। আরবান ডিজাস্টারের বড় প্রমাণ চীনের সিচুয়ান প্রদেশ। ২০১১ সালে তাদের একটি পুরো শহরই শেষ হয়ে যায়, যার পুরোটাই এখন রিকনস্ট্রাকশন করতে হচ্ছে।

কয়েক দিন আগে আমাদের উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় সমতলের চেয়ে ছয়-সাত ফুট ওপরে পানি উঠে যায়। এখানে আমাদের আরো সমন্বয় থাকা দরকার। বিশেষ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আমাদের সমন্বয়, অন্যদের সঙ্গেও সমন্বয় থাকতে হবে। আমাদের সবার সমন্বয় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সরকারও এ ব্যাপারে খুবই আন্তরিক।

আমাদের এসডিজির যে অর্জন, বহু দেশ এর ধারেকাছে নেই। জিডিপিরও ধারেকাছে নেই। উন্নয়নের অগ্রযাত্রার সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জড়িত। পৃথিবীর বহু দেশ হঠাৎ করে কিন্তু থেমে গেছে। তুরস্কের মতো দেশ একটি ভূমিকম্পের ক্ষতিই কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তবে আমাদের দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল আছে। এর সভাপতি প্রধানমন্ত্রী। এটা শিগগিরই আরো কার্যকর হবে। এতে আমরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অনেক দূর এগিয়ে যাব। তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারব। প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বড় শক্তি যদি বলি, তা হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবক। বাংলাদেশের সেই শক্তিও আছে।

 

উন্নত বিশ্বও মাঝে মাঝে আমাদের কাছে শেখার জন্য আসে

ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত

শুরুতেই বলতে চাই, আমরা অনেকটা সফল। উন্নত বিশ্ব দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পেরেছে বলা হলেও মূলত পারেনি। তারাও মাঝে মাঝে আমাদের কাছে শেখার জন্য আসে। আমরা অনেক কিছু পেরেছি। আজকে পশ্চিম দিকে ক্যালিফোর্নিয়া, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় আগুন জ্বলছে। আবার পূর্ব দিকে লুচিয়ানা থেকে শুরু করে ওই দিকটা পানিতে ভাসছে। তিস্তা নদীতে হঠাৎ পানি বেড়েছে, এ কথা ঠিক নয়। বৃষ্টিটা শুরু হয়েছে নেপাল থেকে। সে বন্যা পুবের দিকে সরে এসে গ্যাংটকে বৃষ্টিটা হয়। ভারতের দার্জিলিংয়ে বৃষ্টি হয়েছে. বাংলাদেশে বৃষ্টি হয়েছে; যার কারণে তিস্তার পানি অকল্পনীয়ভাবে বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিস্তা ব্যারাজ ভেঙে যেতে পারত। আসলে পানি ঢোকার পর যে এলাকা দিয়ে পানি বের করে দেওয়া হবে, সেটি চিহ্নিত থাকার পরও আমরা সে এলাকার লোকদের প্রস্তুত করতে পারিনি। এখানেই হচ্ছে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতা।

হঠাৎ করে একটি দুর্যোগ এলে আমাদের পরিকল্পনা কী? তিস্তার পানি বাড়ার মতো ঘটনা দুই বছর, তিন বছর পর পর হতে পারে। এই যে পানির লেভেলটা বেড়েছে, এটা চেক করা দরকার। এটা নিশ্চিত, তা বাংলাদেশের স্বাভাবিক আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কারণ ভারত ও বাংলাদেশের আবহাওয়া দপ্তর সম্প্রতি বলেছে, মৌসুমি বায়ু প্রস্থান করছে। আসলে ভারত তিস্তা ব্যারাজ খুলে দেওয়ায় পানি বেড়েছে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ বর্ষাকালে খোলা গেট আবার কী করে খোলে? দুই দেশের গেটই খোলা।

স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য গঠিত কমিটিগুলো কাজে আসবে। ভবিষ্যতে এদের ট্রেনিং দেওয়া হলে এরাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় লিড দেবে। ঢাকা থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা করা যায় না। ব্যবস্থাটা করতে হবে স্থানীয় পর্যায়ে। স্থানীয় লোকদের যুক্ত করা হচ্ছে সংসদে পাস করা আইনের মাধ্যমে; যার জন্য মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ। একটি বিষয় হচ্ছে, পৃথিবীতে যত ধরনের দুর্যোগ আছে, একমাত্র আগ্নেয়গিরি ছাড়া আমরা সব মোকাবেলা করতে প্রস্তুত। বাংলাদেশ হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে বিধাতার গবেষণাক্ষেত্র।

এ বছর খরার বছর, বন্যা হয়নি। গত বছর যে চার-পাঁচটি বন্যা হয়েছে সেটি মানুষের সৃষ্টি। বাঁধ ভেঙে গেছে। ভাঙবে কেন? আমাদের ব্যবস্থাপনায় সমস্যা রয়েছে। বাঁধ থাকলেও সেটির সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। নয়তো পানি নেমে যাওয়ার পর কেন বাঁধ ভেঙে যায়। বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের অনেক দায়িত্ব। তাঁদের অনেক কিছু করতে হবে, যাতে কোনো ঘটনা ঘটলে রিপোর্ট করা যায়।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে সতর্কতা ও পূর্বাভাস। এ দুটি কাছাকাছি মনে হলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। পূর্বাভাস ঠিক থাকলেও সতর্কতার মতো বাজে আর কিছু হতে পারে না। সতর্কতা হলো জাহাজের ক্যাপ্টেনের জন্য। এটি এলাকাকেন্দ্রিক বিট্রিশ আমলে তৈরি করা এক আইনের ভিত্তিতে দেওয়া। আমরা তো বিপত্সীমার অর্থই বুঝি না। সতর্কতা সাধারণ মানুষকে খবর দেওয়ার জন্য নয়। সতর্কতার নম্বর দিয়ে বিপদ বিবেচনা করলে হবে না। কারণ এলাকাকেন্দ্রিক সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্নের বিষয় রয়েছে। বর্তমান সময়ে ব্রিটিশ আমলের আইন দিয়ে এসব সতর্কতা কাজে আসবে না।

মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাবনা এবং এর শক্তি বাড়বে। বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যে মাত্রার সাইক্লোন হতে পারে, সেই সাইক্লোনের অভিজ্ঞতা আগে ছিল না; যেটি ফোর অথবা ফাইভ ক্যাটাগরির হতে পারে। গতিবেগ হতে পারে ২৪০ কিলোমিটার। আমাদের অভিজ্ঞতা ১২০ থেকে ১৩০ গতির। বড় মাত্রার সাইক্লোনের জন্য আরো শেল্টার লাগবে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, শারীরিক অক্ষমদের নিয়ে দুর্যোগের সময়ের জন্য কাজ করতে হবে। ভাবতে হবে তাদের কিভাবে উদ্ধার করা যায়। প্রতিটি দুর্যোগের সময় তাদের জন্য আলাদা করে ভাবতে হবে।

 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে

ইমদাদুল হক মিলন

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্যোগের কবলে পড়েছে। এই পরিবর্তনের কারণে অনেক জায়গায় পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেছে। বাইরের অন্যান্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ নানান সময় দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ দশগুলো দ্রুত আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিরোধ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা  কতোটুকু হয়েছে তা দেখার বিষয়। বাংলাদেশ ভৌগলিক দিক থেকে একটি দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় অবস্থিত। এই অঞ্চলে ভূমিকমপ দুর্যোগ হিসেবে আসে। এছাড়া প্রতি বছর ঝড়-বন্যা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের হয়েছে কিন্তু বড় রকমের দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতাও অর্জন করা জরুরী। কয়েক বছরে নানা রকমের দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে বাংলাদেশ। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার নানা জায়গায় সহায়তা করেছে। এতে প্রান্তিক জনপদের জন্য লাভ হয়েছে।

 

বাংলাদেশে গত ২০ বছরে ১৮৫টি আবহাওয়াজনিত তীব্র দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে

ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল

বিশ্বব্যাপী দুর্যোগঝুঁকি ক্রমেই বেড়ে চলছে। এর মূল কারণ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভূমি ব্যবহার, আপদ ও বিপদাপন্নতা মূল্যায়নবিহীন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জনসচেতনতার অভাব এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরে দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসসংক্রান্ত পরিকল্পনাহীনতা। দুর্যোগের সংখ্যা, মাত্রা ও তীব্রতা বিগত ২০ বছরে পৃথিবীতে বহুলাংশে বেড়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীতে সংঘটিত ৮০ শতাংশ দুর্যোগ আবহাওয়াজনিত। বিশ্বব্যাপী ৯২ শতাংশ মানুষের প্রাণহানি এসব দুর্যোগের কারণে হয়ে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব দুর্যোগের সংখ্যা, তীব্রতা ও মাত্রার ব্যাপকতাও ক্রমবর্ধমান। তবে এশিয়া মহাদেশে পৃথিবীতে সংঘটিত দুর্যোগসমূহের ৪৫ শতাংশ হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির ৪২ শতাংশ, হতাহতের ৮৩ শতাংশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনসংখ্যার ৮৬ শতাংশের অবস্থান এই মহাদেশে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে ‘দুর্যোগের সুপারমার্কেট’ বলা যায়। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত ২০ বছরে ১৮৫টি আবহাওয়াজনিত তীব্র দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে। যার ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৩.৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। কপ-২৫-এ প্রকাশিত জার্মান প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্টাল গ্রিন ওয়াচের হিসাব মতে, দুর্যোগ বিপদাপন্নতায় পৃথিবীতে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। অন্যদিকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ বিপদাপন্নতায় পৃথিবীতে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে রয়েছে।

২০১৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্যোগঝুঁকি সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসতে পৃথিবীব্যাপী ‘সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক’ অনুসৃত হয়ে আসছে। এই ফ্রেমওয়ার্কে সাতটি বিষয় অনুসরণের জন্য বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রগুলোকে সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে মৃতের সংখ্যা, ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা, জিডিপি লস এবং ক্রিটিক্যাল অবকাঠামোর ড্যামেজ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর যেমন সুপারিশ আছে, অন্যদিকে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে ২০২০ সালের মধ্যে দুর্যোগঝুঁকি কমানোর কৌশলপত্র প্রণয়ন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতা এবং দুর্যোগের পূর্বসতর্কতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর বিষয়েও দেশগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাপী অনুসৃত ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে অন্তত ১০টিতে দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসের জন্য ২৫টি টার্গেট নির্দিষ্ট করা হয়েছে। উল্লেখ্য, মোট টার্গেটের সংখ্যা ১৬৯। জলবায়ুজনিত দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসের জন্য বিশ্বব্যাপী ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড’ চালু করা হয়েছে। এযাবৎ সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক ও এসডিজিতে উল্লিখিত দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকে সক্ষমতা প্রদর্শন করে আসছে। স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ত্রাণনির্ভরতা থেকে দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসে এই মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধি বহুলাংশে বেড়েছে। ২০১২ সালে ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ প্রণীত হয়। ২০১৫ সালে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত নীতিমালা’ প্রণীত হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২ এবং এসওডি-২০১৯ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে মূলধারায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। ২০১০ সাল-পরবর্তী প্রতিটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মন্ত্রণালয়গুলোর দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসসংক্রান্ত বেশির ভাগ প্রকল্প বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনকেন্দ্রিক। ভূমিকম্প, বজ্রপাত, ভূমিধস, লবণাক্ততা ইত্যাদি দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসসংক্রান্ত প্রকল্পের সংখ্যা বেশ কম। যদিও অতি সম্প্রতি সরকার ইমার্জিং দুর্যোগের বিপদাপন্নতা হ্রাসে নানা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবিক সংকটের কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্র হিসেবে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে কক্সবাজারে পাহাড়ি এলাকায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়ণের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক ও সামাজিক দুর্যোগ ক্রমেই বেড়ে চলছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ভূমিধস, বন উজাড়, ভূমিক্ষয়, পাহাড়ি ঢল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পাহাড়ের ঢালুতার সেফটি ফ্যাক্টর ১.৩১ (২০১৬) থেকে কমে ০.৮৬৮ (২০২০)-এ এসে দাঁড়িয়েছে, যা ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়ে মাটির ক্ষয়প্রবণতা প্রতিবছর প্রতি হেক্টরে ২৯১ (২০১৬) থেকে ৩৯০ টনে (২০২০) এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ-বিক্ষোভ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস ক্রমেই সামাজিক ব্যাধিতে রূপান্তরিত হতে চলেছে। এ অবস্থায় প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট আপদের ঝুঁকি কমানোর জন্য ভূতাত্ত্বিকভাবে স্থিতিশীল ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সাময়িকভাবে স্থানান্তর সরকারের একটি সময়োপযোগী পরিকল্পনা। ভাসানচরে সাইক্লোনজনিত জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি কমানোর জন্য চার স্তরবিশিষ্ট রক্ষা বাঁধ ও বনায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

যদিও বাংলাদেশ আবহাওয়াজনিত দুর্যোগঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে রোল মডেল, কিন্তু নগর দুর্যোগ যথা—আগুন, ভূমিকম্প, জলাবদ্ধতা ইত্যাদি ব্যবস্থাপনায় এখনো পিছিয়ে আছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউট এরই মধ্যে অনার্স ও মাস্টার ডিগ্রি প্রদান করছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় গবেষণা প্রকল্পের জন্য অনুদান প্রদান করছে। দক্ষ জনগোষ্ঠী সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ডিপার্টমেন্ট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটও গড়ে তুলেছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সব ধরনের দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস করতে বাংলাদেশ সক্ষম হবে।

 

কাজের ছলে কাজ নয়, গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে

মো. আতিকুল হক

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর যেকোনো সময়ের তুলনায় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং সরাসরি তত্ত্বাবধানে মন্ত্রী ও সচিব মহাদয়ের নির্দেশনায় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। কাজের ছলে কাজ নয়, এটি থেকে বের হয়ে আসা হয়েছে। আগে কোনো প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ছিল না, এখন অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে। যেখানে চারটি অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব আছে। যার কারণে ম্যানপাওয়ার বৃদ্ধি করা যাচ্ছে।

এসওডি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বাইরের হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এটি নিয়ে কাজ করা জরুরি ছিল। আমরা হিসাব করে দেখেছি, বাংলাদেশে প্রতিটা ওয়ার্ড কমিটিসহ যতগুলো কমিটি আছে সেখানে প্রায় আট লাখ ২০ হাজার সদস্য রয়েছে। যাদেরকে আমাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সরকারের একার পক্ষে হয়তো এটা সম্ভব না। অনেকগুলো কমিটি করে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে কমিটিগুলোকে সক্রিয় করা গেছে। এর ফলে সফলতা পাওয়া গেছে গত বছর আম্ফানের সময়। যখন কভিড এবং আম্ফানের চাপ ছিল।

আগে দেখা যেত, ক্ষয়ক্ষতির তথ্যের বেলায় উপজেলা, মৎস্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ নিজেরা একটা কম্পাইল তথ্য করে দিতাম। কিন্তু হেডকোয়ার্টারে এসে কারো সঙ্গে কারোটা মিলছে না। এবার (২০২০) আমরা যখন ডি-ফরমের মাধ্যমে করি, দেখা যায় অনেক ব্যবধান নেই। হিসাব অনেক কাছাকাছি। চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে কমিটিগুলোকে সক্রিয় করা যায়। এনজিওর সঙ্গেও আমরা কাজ করছি। প্রায় সভা করা হচ্ছে। এনজিও এবং সরকারের যৌথভাবে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থার চেষ্টা করা হচ্ছে। যাতে তারা তাদের কর্তব্যটা জানবে।

আমরা ম্যাপিং করতে চাচ্ছি, দুর্যোগপূর্ণ এলাকার কোন কোন জায়গায় আমাদের মুজিব কেল্লা, সাইক্লোন সেন্টার আছে। এ ছাড়া কোন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমরা সাব-সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করতে পারব। এ রকম একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমাদের কনসালট্যান্ট কাজ করছে। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় এটি মোকাবেলা করা সম্ভব। একার পক্ষে সম্ভব হবে না।

 

সফলতার বড় কারণ টিম স্পিরিট

অধ্যাপক খন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন

বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে সফলতার পেছনে একটা বড় কারণ হচ্ছে টিম স্পিরিট। ২০২০ সালে আম্ফানের সময় উপকূলীয় এলাকা থেকে আমরা ২৬ লাখ মানুষকে সরিয়ে নিতে পেরেছিলাম। যাতে আমাদের সক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছে। একদিকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে লাখ লাখ মানুষকে বাঁচানোর বিষয় ছিল। সিডরের সময়ও ১৪ লাখ মানুষকে আমরা উপকূলীয় এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়েছি। এখানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে দ্রুত সতর্কতা পদ্ধতি। এ ছাড়া সম্প্রদায়ভিত্তিক দ্রুত সতর্কতার কারণে দ্রুত সফলতা পাওয়া গেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অনেক টাকার বিষয় থাকে। যেখানে আগে অনেক এলোমেলো ভাব ছিল। এখন সেটি নেই। আর্থিক শৃঙ্খলা একটি বড় বিষয়। সহায়তা নিয়ে অনিয়মের বিষয়টিও নিশ্চিত করা হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় কার্যকরভাবে সেটি করতে পেরেছে।

দুর্যোগের সময় ৫০ থেকে ৬০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক স্বেচ্ছায় শ্রম দিচ্ছেন। আগের তুলনায় এখন নারীরাও এই কাজে এগিয়ে আসছে। তারা আগের মতো পিছিয়ে নেই। শারীরিক অক্ষমদের নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তাদেরও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। আমাদের গবেষণার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। ম্যানপাওয়ার তৈরির বিষয়টিও ভাবনায় রাখতে হবে। স্বেচ্ছাসেবকদের যে গতি সেটিও কাজে লাগাতে হবে।

 

২০ বছরে ইউএসএআইডি সাত শর বেশি সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করেছে

মাহাবুব জামান

২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গত ২০ বছরে ইউএসএআইডি বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ৭০০টিরও বেশি সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করে দিয়েছে। সম্প্রতি বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধি করতে ইউএসএআইডির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ৯৬টি বিদ্যমান ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রকে পুনর্নির্মাণ করছে, যাতে এগুলো একই সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয় ও স্কুল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সেই সঙ্গে ২৫টি নতুন বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

২০১৬ সাল থেকে ইউএসএআইডির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ৫২ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশিকে দুর্যোগ মোকাবেলার প্রশিক্ষণ দিয়েছে, বিশেষ করে সাইক্লোন, ভূমিধস, বন্যার সময়ে কিভাবে জানমালের রক্ষা করতে হয় সেই বিষয়ক প্রশিক্ষণ। শহুরে দুর্যোগ মোকাবেলায় ইউএসএআইডির কার্যক্রম শহরের স্বেচ্ছাসেবী তথাপি ডাক্তার, নার্স, হসপিটাল স্টাফসহ অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

ইউএসএআইডির সৌহার্দ্য প্রকল্প বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণে ও ‘প্লিন্থ রেইসিং’ এর মাধ্যমে হাওর অঞ্চলে বসবাসরত পরিবারের বাড়ির আশপাশের মাটি উঁচু করতে সাহায্য করেছে যেন বন্যার পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেও জনগণের জানমালের কোনো ক্ষতি না হয়।

 

দুর্যোগ মোকাবেলায় সমন্বিত কাজ করতে হবে

আব্দুল লতিফ খান

গত বছর করোনা অতিমারি স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করেছে। ঠিক সে সময়ে দেশে সাইক্লোন আঘাত এনেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দেশ অনেক উন্নতি করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শেখার জন্য কোনো রকমের প্রতিষ্ঠান ছিল না। এ বিষয়ে নানা জনের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছি। বর্তমানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পড়ানো হচ্ছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য অবকাঠামো এবং অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়—এ বিষয়গুলোতে মনোযোগী হওয়া দরকার। অবকাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক উন্নত করেছে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় আশ্রয়স্থল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলো বন্যায় আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ফায়ার সার্ভিসকে উন্নত করতে হবে। এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনেও কাজ করা জরুরি আছে। এই অগ্রগতি দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেক্টরটি অত্যন্ত জরুরি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওয়তায় একটি গবেষণা হয়েছিল। সেই গবেষণার জন্য দেশের অনেক স্থানে যেতে হয়েছে। তখন নানা জায়গার দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট সমস্যা দেখতে সক্ষম হয়েছি। এ ছাড়া সরকার নানা জায়গায় উন্নতি করেছে। তবে এখনো সমন্বিত কাজ করা জরুরি বলে আমি মনে করি।

 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনা দরকার

ফিরোজ সালাউদ্দিন

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি একটি মানবিক সাহায্য সংস্থা। যেকোনো দুর্যোগে সাহায্যের প্রয়োজন হয় যারা সুস্থ থাকে। রেড ক্রিসেন্ট সে সময় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়। এটি অত্যন্ত বড় একটি দায়িত্ব। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে সাত লাখ ভলান্টিয়ার আছে। যত রকম দুর্যোগ আসুক না কেন, রেড ক্রিসেন্ট সব সময় মানুষের পাশে দাঁড়াবে। কাজের জন্য উপযোগী করে স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করতে হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রান্তিক জনপদকে নানা রকমের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য তাগিদ দিয়েছিলেন। কারণ তারা যেকোনো দুর্যোগে সবচেয়ে বিপদের মধ্যে থাকে। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সাহায্যে এটি আরো বেশি উন্নতি করা হয়েছে। ভূমিকম্পে কাজ করার জন্য ভলান্টিয়ারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেই ধরনের প্রশিক্ষণ আমরা তাঁদের দিয়েছি। সময়ের সঙ্গে দুর্যোগের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য পরিকল্পনা ভিন্নভাবে সাজাতে হবে। ভূমিকম্প শহরের অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক। ফলে এটি নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। নতুবা বড় রকমের একটা বিপদ আসতে পারে। গত কয়েক বছর বেশ কয়েকটি বন্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে।

 

সুপারিশ


►    ঢাকা থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা করা যায় না। ব্যবস্থাটা করতে হবে স্থানীয় পর্যায়ে। স্থানীয় লোকদের এই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরো বেশি যুক্ত করতে হবে।

 

►    দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউট এরই মধ্যে অনার্স ও মাস্টার ডিগ্রি প্রদান করছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় গবেষণা প্রকল্পের জন্য অনুদান প্রদান করছে। দক্ষ জনগোষ্ঠী সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ডিপার্টমেন্ট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটও গড়ে তুলেছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সব ধরনের দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস করতে বাংলাদেশ সক্ষম হবে।

 

►    জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়বে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ চার থেকে পাঁচ ক্যাটাগরির সাইক্লোনে আক্রান্ত হতে পারে। অতীতে এ ধরনের শক্তিসম্পন্ন সাইক্লোনে বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়নি। চার কিংবা এর অধিক ক্যাটাগরির সাইক্লোনের গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার। এই গতির সাইক্লোনের অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। বড় মাত্রার সাইক্লোনের জন্য আরো শেল্টার লাগবে।

 

►    প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বৃদ্ধদের নিয়ে দুর্যোগকালের জন্য কাজ করতে হবে। ভাবতে হবে তাদের কিভাবে উদ্ধার করা যায়।

 

►    আমাদের গবেষণার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণা করা না হলে সমস্যা চিহ্নিত করা যাবে না। ম্যানপাওয়ার তৈরির বিষয়টিও ভাবনায় রাখতে হবে। এখন দুর্যোগবিষয়ক টেকসই শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এটিকে আরো গতিশীল করতে হবে।

 

► সময়ের সঙ্গে দুর্যোগের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। ১০ লাখ রোহিঙ্গার সাহায্য-সহযোগিতার জন্য পরিকল্পনা ভিন্নভাবে সাজাতে হবে। রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা যেমন দিতে হবে, অন্যদিকে তাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

►   ভূমিকম্প শহরাঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক। ফলে এটি নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

 

►    প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোকে যেন বন্যায় আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ফায়ার সার্ভিসকে উন্নত করতে হবে।

 

 

যাঁরা অংশ নিয়েছেন



 

প্রধান অতিথি


মো. মোহসীন

সচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়

 

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা


ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল

অধ্যাপক, দুর্যোগ, বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ

উপ-উপাচার্য (শিক্ষা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

আলোচক


ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত

পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ

 

মো. আতিকুল হক

মহাপরিচালক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর

 

অধ্যাপক খন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন

প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলি স্টাডিজ ও

সাবেক উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

মাহাবুব জামান

মিশন ইঞ্জিনিয়ার, ইউএসএআইডি বাংলাদেশ

অফিস অব ফুড, ডিজাস্টার অ্যান্ড হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্টস

 

ফিরোজ সালাউদ্দিন

সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি

 

আব্দুল লতিফ খান

ফ্রিল্যান্স কনসালট্যান্ট

ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন

 

সঞ্চালনা


ইমদাদুল হক মিলন

পরিচালক, ইডাব্লিউএমজিএল

 

শুভেচ্ছা বক্তব্য


শাহেদ মুহাম্মদ আলী

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, কালের কণ্ঠ

 



সাতদিনের সেরা