kalerkantho

বুধবার । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৮ ডিসেম্বর ২০২১। ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২১

সঠিক পদ্ধতিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যা নিরূপণের সুপারিশ

গত ১৯ অক্টোবর সাইটসেভার্স ও কালের কণ্ঠের আয়োজনে ‘ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা (২০২১) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যা নিরূপণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় কালের কণ্ঠের ইডাব্লিউএমজিএল মিলনায়তনে। আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো। গ্রন্থনা করেছেন সজীব আহমেদ, সজীব ঘোষ। সমন্বয় করেছেন তামজিদ হাসান তুরাগ

২৫ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৮ মিনিটে



সঠিক পদ্ধতিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যা নিরূপণের সুপারিশ

আমাদের দায়িত্ব প্রতিবন্ধিতার উপশম করা

এম এ মান্নান

সমাজের বেশ বড় একটি অংশ নানা কারণে ভুগছে। ডিসএবিলিটি বা প্রতিবন্ধিতা, যা-ই বলি না কেন, তারা ভুগছে। তবে আমাদের দায়িত্ব হবে ভোগান্তি কমিয়ে আনা, উপশম করা। এটি আমাদের টার্গেট, হয়তো বা আমরা পুরোপুরিভাবে নির্মূল করতে পারব না। এই প্রকল্পের যিনি উপপরিচালক তিনি আপনাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো শুনেছেন। তিনি ফিরে গিয়ে সে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলবেন আর প্রয়োজন হলে আমার সঙ্গে কথা বলবেন, আমি আছি। আমরা সবাই মিলে এই গণনার কাজটি আরো কিভাবে শাণিত করা যায় সে বিষয়ে কাজ করব। এটি একটি জাতীয় কাজ। আমি কিছুদিন আগে বলেছিলোম এটিই আমাদের শেষ কাজ, পরবর্তী সময়ে আর যেন এভাবে করতে না হয়। এই যুগে আমরা বাড়ি বাড়ি মাথা গুনছি। এখন সময় ডিজিটাল হয়েছে। আগামী দিনে যারা আসবে তারা জানতে পারবে, প্রতি মুহূর্তে তারা তথ্য জানতে পারবে। এই ধরনের প্রযুক্তি আছে আমাদের শুধু প্রয়োগ করতে হবে। আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। আমরা যত দ্রুত পারি কাজটি শেষ করব। আর আপনাদের যে সুপারিশগুলো আসছে তার মধ্যে প্রচারণার বিষয়টি নিয়ে আমি আলোচনা করব শিগগিরই। এরই মধ্যে ডিসেম্বর মাসের একটি তারিখ নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি প্রস্তাব গেছে, তিনি তা হয়তো অনুমোদন করবেন। কারণ তিনি সব কিছু বোঝেন এবং জানেন।

 

 

অন্য দেশে যেসব সুবিধা পাচ্ছে আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তা যেন পায়

ইমদাদুল হক মিলন

আমরা চাই পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পায় পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে, সেই সুযোগ-সুবিধাগুলো যেন আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পায়। যদি তাদের জনশুমারি ও গৃহগণনায় সম্পৃক্ত না করা হয়, তাহলে তো প্রথমেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যাপারে এক ধরনের উদাসীনতা অনুভব করি। সুতরাং আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কী কী সুযোগ-সুবিধা আমরা চাই, সেগুলো আমরা এই বৈঠকে আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকারের গোচরে আনতে চাই। পৃথিবীর অন্যান্য বড় দেশের সঙ্গে আমরা এখন অনেকটা তুলনা করতে পারি। এ কারণে পারি, বাংলাদেশ গত বেশ কয়েক বছরে বড় একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখন বাংলাদেশ নিয়ে আমরা অনেক কথা বলতে পারি। আমাদের গৌরবের অনেক ঘটনা এরই মধ্যে ঘটেছে। যদি একটি ঘটনার কথা আমি বলি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাংলাদেশের চেহারা ঘুরিয়ে দিয়েছে। এখন দেশের চারদিকেই উন্নয়নের জোয়ার চলছে।

 

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যুক্ত করে সুনির্দিষ্ট ডাটাবেইস জরুরি

অমৃতা রেজিনা রোজারিও

দেশের উন্নয়নের জন্য জনসংখ্যার ধরন, প্রকৃতি, বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষাগত যোগ্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এবং দেশের যে সেবা প্রদানের বিষয়টি তার পরিকল্পনার ভিত্তিমূল হলো সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ জনশুমারি। দেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে যে তিনি তাঁর শারীরিক গঠনের কারণে জনগণনা থেকে বাদ পড়বেন না। বরং জনগণনার কাজটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করেই বাস্তবায়িত হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। বাংলাদেশ সরকার জনগণনায় প্রতিবন্ধী তথ্য সংগ্রহ করবে যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কিন্তু আবার পরিতাপের বিষয়, এখন পর্যন্ত আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ ডাটা পাওয়া দুষ্কর। সে কারণে জাতীয় তথ্যভাণ্ডারে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান লক্ষণীয়। তাই জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের অসামঞ্জস্যতা দূর করার জন্য আসন্ন জনগণনা আমাদের একটি সোনালি সুযোগ। তাই আমাদের নিবেদন, এই জনশুমারিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি তাদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেইস যেন করা হয়। যারা তথ্যসংগ্রহ করবে তাদের যেন সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যেন তারা সঠিকভাবে কর্মসম্পাদন করতে পারে। এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কীভাবে গণনা করতে হবে তা যেন তাদের মডিউলে থাকে।

সাইটসেভার্সের প্রস্তুতকৃত প্রামাণ্যচিত্রটি তথ্য সংগ্রাহকদের ট্রেনিং প্রদানে ব্যবহার করা হলে জনশুমারিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। তাই তথ্য সংগ্রহে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

 

জনশুমারির তথ্য থেকে চাইলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আলাদা ডাটাবেইসও করা সম্ভব

মো. আক্তার হোসেন

আলোচনা থেকে আমি যতটুকু বুঝলাম জনশুমারি থেকে কোনোভাবে যেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বাদ না যায় এবং তাদের যে ১২টি ক্যাটাগরি আছে সে অনুযায়ী তাদের লিপিবদ্ধ করা হয়। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি। এবার পুরো জনশুমারিটি ডিজিটালি ট্যাবের মাধ্যমে করা হবে। এতে একদিকে যেমন ডাটা অ্যানালিসিস করা সহজ হবে, অন্যদিকে তথ্য হারানোর সুযোগ নেই। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যে বিষয়টি আছে সেখানে আমরা ১২টি ক্যাটাগরিতেই তথ্য সংগ্রহ করব। আমরা যে প্রশ্নপত্রটি তৈরি করেছি সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যা শুধু নয়, পাশাপাশি তাদের কতজন চাকরি করে, তাদের বয়স কত এবং তাদের কতজন ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তা জানা যাবে। এই সব তথ্য থেকে চাইলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আলাদা ডাটাবেইসও করা সম্ভব।

 

 

সমাজ প্রতিবন্ধিতা কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন ৭০০-৮০০ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ডাটা এন্ট্রি হয়

অদ্বৈত কুমার রায়

আমরা সমাজ প্রতিবন্ধিতা কর্মসূচির আওতায় একটি জরিপ কার্যক্রম শুরু করি ২০১১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি ধারণা পত্রের মধ্য দিয়ে। এই পাইলট প্রকল্প প্রথমে আটটি জেলায় শুরু করা হয়। পরে ২০১৩ সালে আইন এবং ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সর্বশেষ এক মাস আগে এই ডাটা ব্যবহারের নীতিমালা হয়েছে। এই তথ্যগুলো সরকারের ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত রয়েছে। এই জরিপ অনুযায়ী আজকের দিন পর্যন্ত আমরা ১২টি ক্যাটাগরিতে ২৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮২ জন প্রতিবন্ধী আছে। চাইলে যে কেউ এই তথ্য ব্যবহার করতে পারে। তবে তা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী সংগ্রহ করতে হবে। আমাদের সার্ভারে সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে চার লাখের ওপর ডাটা এন্ট্রি হয়েছে। আমাদের ৫৭৬টি কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ ডাটা এন্ট্রি হয়।

 

 

সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে গণনায় আনতে হবে

অয়ন দেবনাথ

জনশুমারি ও গৃহগণনা বিষয়ে আমরা সবাই জানি এটি প্রতিবছর হয় না, প্রতি ১০ বছরে একবার হয়। এটির মাধ্যমে একটি দেশের ডেমোগ্রাফিক অবস্থান, সামাজিক অর্থনীতির তথ্যগুলো তুলে আনার চেষ্টা করা হয়; যার মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে তাদের কিভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। বিভিন্ন দেশে আসলে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত জনশুমারি ও গৃহগণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটুকু সেটিও জনশুমারিতে চলে আসে। দেশের কত শতাংশ মানুষ কাজ করছে, সেটির জন্য আলাদা সার্ভের প্রয়োজন হয় না।

আমরা জানি বাংলাদেশে বিশাল জনগোষ্ঠী, সে কাজ অনেকটাই কঠিন। বিগত জনশুমারিগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ধরন ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে নিরূপণ না করার ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যাগত অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। তাই ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২১-এ বাংলাদেশ এবং বিদেশে বসবাসকারীসহ সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে গণনায় আনতে হবে, যেন কোনো বাংলাদেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই গণনা থেকে বাদ না পড়ে, ২০১৩ সালের প্রণিত আইন এবং প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনার ২০১৯ এর আলোকে পদক্ষেপ নিতে হবে, যেন দেশে ষষ্ঠ জনশুমারিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা এবং তাদের প্রতিবন্ধিতার সব ধরনের তথ্য বের হয়ে আসে।

 

 

বেশির ভাগ মা-বাবা প্রতিবন্ধী শিশুদের পরিচয় দিতে চান না

হাসিবা হাসান জয়া

আমি নিজেও একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী যুবকের মা। আমাদের দেশে এখনো বেশির ভাগ মা-বাবা তাঁদের প্রতিবন্ধী শিশুকে প্রতিবন্ধী বলতে চান না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয়ও দিতে চান না। তাই বেশি করে প্রচারণা বাড়াতে হবে, যাতে প্রত্যেক মা-বাবা তাঁদের প্রতিবন্ধী শিশুকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্তি করেন। অটিজমে আক্রান্ত যেসব শিশু রয়েছে, তারা কিন্তু বিএসএমএমইউ হাসপাতালে সামাজিক নিরাপত্তার যেসব সাহায্য রয়েছে, তা নিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি শহর অঞ্চলে দেখা যায়, তাঁরা প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েকে বাসায় লুকিয়ে রাখেন। বাইরে কোথায় নিতে চান না। অনেক বাবা তাঁদের কর্মক্ষেত্রেও জানাতে চান না তাঁর প্রতিবন্ধী সন্তান আছে। শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ও যুবক যারা আছে, তাদের বেশির ভাগ ডাটা অ্যানালিসিসের ক্ষেত্রে লেখা হয় বহুমুখী প্রতিবন্ধী। এবার যেন এ বিষয়গুলো ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয়। তাই ডাটা কালেকশন ও অ্যানালিসিসের ক্ষেত্রে আমাদের একটু যত্নশীল হলে আমার মনে হয় অনেক ভালো হবে। শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা টেকনিক্যালি অনেক পারদর্শী। তাদের যদি জনশক্তি ব্যুরোর আওতায় প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন ডাটা অ্যানালিসিস সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়, তাহলে আমরা আরো দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হব। তারাও সমাজের বোঝা হবে না।

 

 

প্রতিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দু-একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে

উৎপল মল্লিক

আমার সুপারিশ হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাকরি দেওয়া। আমরা এই মুহূর্তে একটি প্রকল্প করছি, যেটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে চায়। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই আমরা এখানে মিলিত হয়েছি। তিন বছর আগে যখন আমরা এই প্রকল্পটি সাজাই, তখন কিন্তু আমরা জানতাম দেশে জনশুমারি আসছে। আমরা ভেবেছি, প্রকল্প কিভাবে এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে পারে। প্রকল্প আসে-যায়; কিন্তু আমরা এসব সুযোগ কাজে লাগাতে পারি না। আমরা কিন্তু বরাদ্দ রেখেছি কিভাবে এই প্রকল্পের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সহযোগিতা করা যায়। ৮, ১০, ১৫ বছরের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসতে চাই। অবশ্যই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনতেই হবে। আজকে আমি অনেক প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়ে পাই, যারা কত কষ্ট করে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। অথচ তারা ঠিকমতো চাকরিও পায় না।

 

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্ভাবনার জায়গায় তুলে নিতে হবে

আমিনুল আরিফিন

প্রতিবন্ধিতা বিষয়টিকে আমরা কিভাবে দেখব—এটি দায়ও হতে পারে আবার সম্পদও হতে পারে। এই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দায় থেকে বের করে তাদের সম্ভাবনার জায়গায় তুলে নিতে হবে। সেই ভাবনা মাথায় রেখেই তাদের নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওয়েবসাইটে দেশের জনসংখ্যার সব ধরনের তথ্য আছে। কিন্তু আমরা এগুলোর কোনো ব্যবহার করি না। আমরা অন্য জিনিস নিয়ে লিখতে পছন্দ করি। আমরা এত তথ্য নিয়ে কথা বলছি, কেননা সঠিক তথ্য না থাকলে তাদের সম্পদে রূপান্তর করা যাবে না। আমাদের বিভিন্ন প্রগ্রাম করে দায়কে সম্পদে রূপ দিতে হবে। আর প্রগ্রামের সুফল পেতে হলে সঠিক তথ্য থাকতে হবে। প্রতিবন্ধী মানুষ যে যেই অবস্থানেই থাকুক না কেন, সে তার জায়গা থেকে যদি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে।

 

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আইন অনুযায়ী জনশুমারি করতে হবে

মাহবুব-ই-আলম

ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ শুরু থেকে বাংলাদেশের জনশুমারিতে কাজ করে আসছে। বরাবরের মতো এবারও ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের জনশুমারিতে সংযুক্ত আছে। একটু বলে রাখি, ২০০১, ২০১১ ও ২০২১—কোনো জনশুমারিতে এখন পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া হয়নি। এই জনশুমারিতেও তাদের গণনায় ধরা হবে। আজকের আলোচনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যে ১২টি ক্যাটাগরিতে জনশুমারির কথা বলা হয়েছে, সেটিও বিবিএস অনুমোদন দিয়েছে। এখানেও কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আইন অনুযায়ী এই গণনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গণনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে আমার সুপারিশ থাকবে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়টি অধিকারের ভিত্তিতে দেখা, যে তারা নিজেদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে বলতে চায় কি না? পাশাপাশি সঠিক পদ্ধতিতে ও মেথডোলজি অনুযায়ী তাদের গণনা করা।

 

 

জনশুমারিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বাদ পড়লে কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হবে না

জহির-বিন-সিদ্দিক

সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধী সন্তানদের মা-বাবারা নিয়ে আসেন না। তাঁরা তাঁদের সন্তানদের না এনে খুব যে খারাপ কাজ করেন, সেটিও বলার উপায় নেই। হয়তো তাঁরা তাঁদের কোনো বাজে অভিজ্ঞতা থেকে সন্তানদের নিয়ে আসতে চান না। আমিও দেখেছি, একজন তাঁর প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছেন। সেখানে আরেকজন তাঁর সন্তানকে ওই প্রতিবন্ধী বাচ্চার সঙ্গে বসতে দিচ্ছেন না। আমাদের সব আইনই প্রতিবন্ধীতা সহায়ক। এই সব আইনেই প্রতিবন্ধী মানুষের সুযোগ-সুবিধার কথা বলা আছে। কিন্তু জনশুমারি ও গণনায় যদি তারা বাদ পড়ে, তাহলে কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হবে না। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে আমরা বিভিন্ন রকম তথ্য পাচ্ছি। এখন প্রকৃত তথ্য যদি না আসে, তাহলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বা সমাজসেবা অধিদপ্তর যখন যে পরিকল্পনা করবে, তারা তখন তা যথার্থভাবে করতে পারবে না।

 

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোকে আরো সম্পৃক্ত করতে হবে  

রেজাউল করিম সিদ্দিক

আমাদের জরিপগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা কখনো দেড় শতাংশ আসে, তো কখনো ৯ শতাংশ আসে। এখানে ১৭ কোটি মানুষের দেশে ১ শতাংশের ব্যবধান মানে কয়েক লাখ মানুষের ব্যাপার। অর্থাৎ যখন ৮ শতাংশ পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে, সরকারেরই দুটি বিভাগের মধ্যে তখন ব্যবধানের অঙ্কটি কিন্তু কোটির কাছাকাছি চলে যায়। এত বড় একটি সংখ্যক মানুষ সচেতন না, এটি বলার সুযোগ নেই। এই বড় ব্যবধানের মূল কারণ গণনার পদ্ধতির ধরন। সরকারের পক্ষে প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কাছে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। দেশব্যাপী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যেসব সংগঠন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, তাদের কাজে লাগাতে হবে।

এই করোনার মধ্যেও এই সংগঠনগুলো নিজেদের প্রমাণ করেছে। যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কাছে সরকার পৌঁছতে পারেনি, সেখানে এই সংগঠনগুলো পৌঁছে গেছে। রাষ্ট্র, সরকার ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাঝখানের হাত হিসেবে এই সংগঠনগুলো কাজ করছে। তাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সম্পৃক্ত করতে হবে।

 

 

সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচারণা বাড়ানো দরকার

আলবার্ট মোল্লা

তথ্য সংগ্রহ খুব কঠিন ব্যাপার। যাঁরা তথ্য সংগ্রহে মাঠ পর্যায়ে কাজ করবেন, তাঁদের কাছেও পূর্ণ পরিকল্পনা থাকতে হবে। কেননা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যাপারে যদি নির্ভুল তথ্য তুলে আনা না যায়, তাহলে সঠিক সংখ্যা আমরা পাব না। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণা আরো বাড়ানো দরকার। মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য সংগ্রহে চারটি পর্যায়ে কাজ হবে। সবচেয়ে ওপরের স্তরটি হচ্ছে মাস্টার ট্রেইনার। এখানে ১০০ জনের মতো থাকবেন। এর নিচে হচ্ছেন জোনাল অফিসার। তাঁদের সংখ্যা তিন হাজার। জোনাল অফিসারের নিচে সুপারভাইজার থাকবেন ৮০ হাজার জন। আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাঁরা তথ্য সংগ্রহ করবেন, তাঁদের সংখ্যা হবে চার লাখ। এখানে একটি বিষয়ে আমি একটু জোর দিতে চাচ্ছি। শুধু মাস্টার ট্রেইনারকে প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না। তথ্য সংগ্রহ একটি কঠিন কাজ। তাই মাঠ পর্যায়ে যাঁরা কাজ করবেন, তাঁদেরও প্রতিবন্ধীতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তা না হলে আমরা সঠিক পরিসংখ্যান পাব না।

 

 

গণমাধ্যমেরও বড় ভূমিকা দরকার

খন্দকার জহিরুল আলম

মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় বড় বড় বাড়িতে ঢোকাই যায় না। বাড়িতে ঢোকার সময় দারোয়ানরাই আটকে দেয়। ফলে সেসব বাড়িতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোনো সংখ্যা জানা যায় না। এ নিয়ে মানুষের আরো সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমাদের গণমাধ্যমেরও বড় ভূমিকা দরকার। ২০১১ সালে আমার নিজের বাসায়ও এ ঘটনা ঘটেছে। আমার স্ত্রী বাজার করে আসছিল তখন, সে বিষয়টি দেখতে পেয়ে তাঁদের বলে, ‘আমার স্বামী একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, আপনারা তো তাঁর কোনো তথ্যই নিলেন না।’ আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো প্রশ্নপত্র কেমন হবে এটি ঠিক করা। এটি যদি ঠিকভাবে করা না হয়, তাহলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা কঠিন হবে। সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে গণনায় নিতে হবে। আমরা যত কথাই বলি, তাতে খুব একটা লাভ হবে না। আমি দেখতে পাচ্ছি এবারও সঠিক সংখ্যা আসবে না। কতটুকু আনা যায়, সেটি আমাদের দেখা দরকার। সম্প্রতি আমরা দেখার চেষ্টা করেছি, প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা কত। সেখানে আমরা দেখেছি, প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ৬ থেকে ৮ শতাংশ। আমরাও যে সবাইকে চিহ্নিত করতে পেরেছি, তা নয়।

 

সুপারিশ

♦ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২১-এ বাংলাদেশ এবং বিদেশে বসবাসকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গণনায় আনা প্রয়োজন; যেন কোনো বাংলাদেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই গণনা থেকে বাদ না পড়ে।

♦ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা উচিত, যেমন- প্রতিবন্ধিতার ধরন, লিঙ্গ, বয়স ইত্যাদি। তথ্য সংগ্রহকারীদের সঠিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

♦ তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত এবং তাদের এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। জেলা পর্যায়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কমিটিগুলোকে (District Disability Committee) তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা বিশেষভাবে প্রয়োজন।

♦ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ ও ইউএসসিআরপিডি চুক্তি অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহে প্রতিবন্ধিতার ধরন থাকার পাশাপাশি তথ্য সংগ্রাহককে প্রশিক্ষিত ও সংবেদনশীলভাবে কর্মকাণ্ড সম্পাদন করা উচিত। 

♦ বিবিএস কর্তৃক জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২১ চলাকালে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিয়োগ দেওয়া উচিত।

♦ তথ্য বিশ্লেষক ও সুপারভাইজার এবং প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ মডিউলে প্রতিবন্ধিতা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

♦ ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনায় তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রতিবন্ধী ইউনিট গঠন করা উচিত। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

♦ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২১-এর জনসচেতনতা প্রচারাভিযান অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রবেশগম্যতার ভিত্তিতে করা উচিত এবং এই প্রক্রিয়াগুলোর সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যুক্ত করা প্রয়োজন। আইনের আলোকে ইলেকট্রনিক মিডিয়া কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ইশারা ভাষা, সাবটাইটেল এবং বড় অক্ষর ব্যবহার করতে হবে। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২১-এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালাতে হবে।

♦ তথ্য যাচাই-বাছাই ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন ও ডিসএবিলিটি অ্যালায়েন্স ইন এসডিজি বাংলাদেশের সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরামর্শ করতে পারে।

 

যাঁরা অংশ নিয়েছেন

প্রধান অতিথি

এম এ মান্নান, মাননীয় মন্ত্রী

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়

শুভেচ্ছা বক্তব্য

অমৃতা রেজিনা রোজারিও

কান্ট্রি ডিরেক্টর, সাইটসেভার্স বাংলাদেশ

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা

অয়ন দেবনাথ

অ্যাডভোকেসি কোঅর্ডিনেটর, সাইটসেভার্স বাংলাদেশ

আলোচক

অদ্বৈত কুমার রায়

কর্মসূচি পরিচালক, প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কর্মসূচি, সমাজসেবা অধিদপ্তর

মো. আক্তার হোসেন

উপপরিচালক, জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২১ প্রকল্প

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো

মাহবুব-ই-আলম

চিফ, পপুলেশন প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ

ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ

উৎপল মল্লিক

ইনক্লুশন ওয়ার্কস প্রগ্রাম অফিসার

সাইটসেভার্স বাংলাদেশ

হাসিবা হাসান জয়া

ট্রেজারার, সোসাইটি অব দি ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজার্স (এসডিএসএল)

রেজাউল করিম সিদ্দিক

আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

ওপিডি এনগেজমেন্ট অফিসার

ইন্টারন্যাশনাল ডিসএবিলিটি অ্যালায়েন্স

জহির-বিন-সিদ্দিক

কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ

লিওনার্ড চ্যাশায়ার বাংলাদেশ

আলবার্ট মোল্লা

নির্বাহী পরিচালক

অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন

খন্দকার জহিরুল আলম

এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিসএবিলিটি (সিএসআইডি)

আমিনুল আরিফিন

প্রকল্প ব্যবস্থাপক

সামাজিক নিরাপত্তা ও নীতি, জাতিসংঘ

উন্নয়ন কর্মসূচি, বাংলাদেশ



সাতদিনের সেরা