kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু ও বাংলা ভাষা

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৮ মিনিটে



জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু ও বাংলা ভাষা

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বাংলায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। মূলত এই ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। গতকাল শনিবার ছিল জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রদানের ৪৭তম বার্ষিকী। বিশেষ এই দিনটিকে স্মরণ করতে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত হয় ‘জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু ও বাংলা ভাষা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক। কালের কণ্ঠ’র আয়োজনে এই বৈঠকে বঙ্গবন্ধু ও বাংলা ভাষার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন বিশিষ্টজনরা। গ্রন্থনা : শরীফুল আলম সুমন, সজিব ঘোষএ এস এম সাদ। ছবি তুলেছেন মঞ্জুরুল করিম

 

বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দিয়েছিলেন

ইমদাদুল হক মিলন

যাঁকে নিয়ে আজকের এই অনুষ্ঠান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রথমেই আমি তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় ‘জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু ও বাংলা ভাষা’। এর আগে এই বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা বা গোলটেবিল বৈঠক আমরা শুনিনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে গৌরব বোধ করছি যে এই বিষয়টার অবতারণা আমরা করতে পেরেছি।

১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের শান্তি ও সংগ্রামের কথা বললেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেন। তিনি আগামী দিনের চ্যালেঞ্জের কথা বললেন, আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা বললেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন আমাদের সবচেয়ে প্রিয়, আমাদের অন্তরের স্লোগান ‘জয় বাংলা’র মাধ্যমে।

চারদিকে আমরা এখন বাংলা ভাষার অসহায় অবস্থা দেখতে পাই। তবে হতাশা নিয়ে আমরা জীবনটা কাটাতে পারব না। সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে শত শত বই লেখা হচ্ছে। কিন্তু এই মহান নেতাকে প্রকৃত অর্থে চেনানোর কাজটি কোথায় হচ্ছে? তাঁর শক্তির কথাটা কোথায় আমরা বলছি, তিনি যে মাটিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেই মাটির কথা আমরা কোথায় বলছি? সুতরাং এখন আমাদের ভাবার সময়, কিভাবে আমরা প্রকৃত বঙ্গবন্ধুকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরব?

 

বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনের দ্রষ্টা

সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

বাংলা শুধু মিষ্টি ভাষাই নয়, বৈশাখের মাটির মতো শক্ত ভাষাও। বঙ্গবন্ধু নিজে বলেছেন, বাংলা নরম মাটির দেশ। কিন্তু বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ মাসে এ মাটি এত শক্ত হয়। বাংলা ভাষার মিষ্টতার পাশাপাশি এর শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনের দ্রষ্টা। ১৯৪৭ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতার সাপ্তাহিক মিল্লাত পত্রিকার সম্পাদকের কক্ষে বসে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হতে হবে বাংলা। কারণ বেশির ভাগ মানুষের ভাষাই বাংলা। এর আগে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর লেখায় এ বিষয়ে বললেও রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে যা বলার তার সব কিছুই বললেন বঙ্গবন্ধু।

ভাষা তিন রকমের। মৌখিক, লিখিত ও দেহ ভাষা বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। মৌখিক ভাষার সঙ্গে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ না মিললে ভাব কিন্তু সঠিকভাবে প্রকাশ হয় না। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সবাই মুখের ভাষার সঙ্গে দেহ ভাষা মেলাতে পারেন না। যাঁরা পারঙ্গম বক্তা, তাঁরা পারেন। বঙ্গবন্ধু তেমন ছিলেন।

৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কোথায়ও তাঁর দেহের ভাষার কথা লেখা নেই। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রাজনীতি হয়, সুবিধা লোটা হয়, ব্যবসা হয়। বঙ্গবন্ধুকে চেনা, জানা ও বোঝার কাজ এখনো হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো বিকৃত করে ছাপা হয়। সরকারি অফিসে যাঁরা চাকরি করেন তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে চেনেন না, জানেন না। বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগ আমলে মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধু চর্চা করতে হচ্ছে। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের বঙ্গবন্ধুর ভাষণটা আমরা ভিডিওতে দেখি। তাঁর মৌখিক ভাষণ বা লিখিত ভাষণ যা-ই পাই না কেন, ভিডিওতে দেখি তাঁর দৈহিক ভাষণ। যখন তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কথা বলেন, তখন তিনি শক্তপোক্তভাবে বলেন। বঙ্গবন্ধু সাধারণত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে লিখিত বক্তব্য দিতেন। দেশের ভেতর কখনো লিখিত বক্তব্য দিতেন না। ৭ই মার্চের ভাষণ অলিখিত, ১০ জানুয়ারির ভাষণ অলিখিত। তবে ১০ জানুয়ারির ভাষণও সরকার বিকৃত করেছে। এটার কারণ হচ্ছে, সেলফ সেন্সরশিপ। কিন্তু ইতিহাস বড় কঠিন। ইতিহাস কে রুষ্ঠ হলো, কে পুষ্ঠ হতো তা বিচার করে না। 

 

জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু অনড় ছিলেন

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পা থেকে মাথা পর্যন্ত একজন বাঙালি। সে কারণে যখন তাঁর পরিচয়ের প্রশ্ন আসত, তখন তিনি প্রথমেই বলতেন, আমি একজন মানুষ। তাঁর দ্বিতীয় পরিচয়ের কথা বলতেন, তিনি একজন বাঙালি। তাঁর ধর্মের পরিচয়কে কখনো তিনি মুখ্য পরিচয় বলে কারো কাছে তুলে ধরতেন না। সে কারণেই তিনি ভাষাভিত্তিক দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পেরেছিলেন। তিনি যখন ১৯৪৬, ১৯৪৭ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎ বোস এবং হাশেম সাহেব মিলে যুক্ত বাংলার একটি প্রস্তাবনা তুলেছিলেন, তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব কিন্তু তারই পক্ষে ছিলেন। ১৯৪৮ সালের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, দ্বিজাতিতত্ত্ব ছিল একটা ভুয়া তত্ত্ব, যেটি দিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের লোকজন। ১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধু এই ভাবনা শুরু করেছিলেন, বাঙালিদের জন্য একটা আলাদা রাষ্ট্র করতে হবে এবং এটি হবে। তাঁর এই দর্শন আরো বেশি ঘনীভূত হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯৪৮ সাল থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থেকেই তিনি বাংলা ভাষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসে সেই কথাটির উল্লেখ তেমন একটা নেই। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে তিনি বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের নামটা পরিবর্তন করে পূর্ব বাংলা রাখা হোক। ওই সময়ে সেটা খুবই সাহসী পদক্ষেপ ছিল। ১৯৬৪ সালে যখন ঢাকায় আওয়ামী লীগের সভা হলো, তখন কিন্তু সেই সভায় পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়নি, বাজানো হয়েছিলো ‘আমরা সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোভাসি’। এই যে একজন বাঙালি পরিচয়, সেই পরিচয় ধরেই ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার জন্য জোরাজুরি করেছিলেন। অনেক বাধা ছিল। তা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু অনড় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছিল তাঁকে বাংলায় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য।

 

বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতা ঐক্য ও দৃঢ়তা ফুটে উঠেছিল

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে জাতিসংঘে প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তব্য। তাঁর বক্তব্যের কয়েক দিন আগে জাতিসংঘের সদস্য পদ পায় বাংলাদেশ। চীন মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এ ছাড়া সদস্য পদ দেওয়ার সময় তারা বাংলাদেশের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গেই বাঙালির ঐতিহ্য মিশে ছিল। এই ধারা এখনো চলমান। বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতা, ঐক্য ও দৃঢ়তা ফুটে উঠেছিল। তাঁর রক্তের সঙ্গেই বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি মিশে ছিল। যেটা এখন তাঁর কন্যা ধারণ করছেন, আমরা ধারণ করছি। বাংলাদেশ শুরু থেকেই বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়াবে—এটাই বঙ্গবন্ধু স্বাভাবিক বলেছিলেন। আমরাও মনে করি, সেটাই স্বাভাবিক। তিনি নিজেদের উদ্যোগের কথা বলেছিলেন। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা বর্তমানে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। বাংলাদেশ একটি উদীয়মান দেশ হিসেবে কিভাবে সামনে এগোবে, সেই দিকনির্দেশনা তিনি দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দর্শন মতে, বাংলাদেশ সব সময় নিপীড়িত দেশের পাশে দাঁড়াবে এবং এটাই হওয়া উচিত। জাতিসংঘে শেখ হাসিনা সশরীরে ১৭ বার বক্তব্য দিয়ে যে ইতিহাস গড়েছেন, তা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি।

 

আমরা একবারও চেষ্টা করিনি বঙ্গবন্ধুর জীবনকর্ম নিয়ে গবেষণা করতে

জাফর ওয়াজেদ

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে।’ সত্যি সত্যি শত্রুবাহিনী ঢুকে পড়েছে তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে। সুনিপুণভাবে অনেক কিছুকে বিকৃত করা হয়েছে। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের জন্য আইয়ুব খানের পতন হয়েছে—এ কথাটি একটি জায়গায়ও লেখা নেই। জেলখানায় যে তিন নেতা নিহত হলেন, তাঁদের তিনজনের বর্ণনা তিন রকম। কোথাও লেখা নেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে জিল্লুর রহমানের ভূমিকা। শেখ ফজলুল হক মনির কথা কোথাও লেখা নেই। তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট অন্ত্বঃসত্তা স্ত্রীসহ নিহত হন। শুধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ই নয় ‘কারাগারের রোজনামচায়’ও একই অবস্থা। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন সাধু ভাষায় আর সরকারের একটি দপ্তর তা প্রকাশ করল চলিত ভাষায়। তরুণ প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুকে জানানো খুব সহজ কাজ নয়, অনেক চড়াই-উতরাই পার হতে হবে। বঙ্গবন্ধু হয়ে গেছে এখন সড়ক, সেতু, কালভার্টের নাম। আমরা একবারও চেষ্টা করিনি বঙ্গবন্ধুর জীবনকর্ম নিয়ে গবেষণা করতে। বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট বৃত্তি দেয়, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণার জন্য একটি টাকাও খরচ করে না। ছয় দফা নিয়ে আমাদের একটি লেখাও নেই। বঙ্গবন্ধুর সময়কার জাতিসংঘের ঘটনাবলি নিয়ে একটি বইও আমাদের নেই। আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর জীবনকর্ম নিয়ে গবেষণা না করি, তাহলে সবই বৃথা। আমরা নিজেরাই তো ইতিহাস জানি না, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কী রেখে যাব? আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী, সাহিত্যিকদের অবদান খুবই কম। যুদ্ধ করেছে চাষাভুষারা। উচ্চবিত্তরা খুবই কম গেছে। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রই শহীদ হওয়ার কথা, কিন্তু হয়নি। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু যে বাংলাকে তুলে ধরেছিলেন, সেই বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার। আমরা যে বাংলা বানান শিখে এসেছি, এর অনেক কিছুই এখন টিকছে না।

 

জাতিসংঘে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে শান্তি ও ন্যায়ের সংগ্রাম বলেন বঙ্গবন্ধু

এ কে এম আতিকুর রহমান

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে আমরা পাঁচটা অংশে ভাগ করতে পারি। প্রথমত, উনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের কথা বলেছেন। সেই সংগ্রামে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। বিশ্বসমাজের সমর্থন এবং স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন কর্মকাণ্ড এবং অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের সাহায্য ও সহযোগিতার কথা বলেছেন। সর্বোপরি ওই সব রাষ্ট্র এবং জনগণকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তিনি যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বসমাজে বাংলাদেশ স্থান লাভ করল, তাঁদের অভিনন্দন জানানো ছাড়াও জাতিসংঘে বাংলাদেশকে স্বাগত জানানোর জন্য সব রাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানান। এ ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে শান্তি ও ন্যায়ের সংগ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিরাজমান জাতীয়তা, বৈষম্য, বর্ণবাদ, আগ্রাসন, উপনিবেশবাদ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার থেকে বঞ্চিত করার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান তিনি তুলে ধরেন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ছাড়া কোনো বিভাগেই বাংলায় প্রশ্নপত্র করা হয় না

বিশ্বজিৎ ঘোষ

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছেন। এটি তাঁর জন্য নতুন কিছু নয়, মোটেও নতুন নয়। কেননা বঙ্গবন্ধু সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই বাংলা ভাষার জন্য যুদ্ধ করেছেন, রাষ্ট্র ভাষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরে চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনে তিনি বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের গণপরিষদে, বাংলা ভাষা গণপরিষদের ভাষা হিসেবে চালু করার জন্য স্পিকারের সঙ্গে, মুসলিম লীগ গণপরিষদের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর যে যুদ্ধ, সেটি অভাবনীয়। এবং সেই মানুষ যে (জাতিসংঘের) সাধারণ পরিষদের সভাপতির অনুরোধকে না মেনে বাংলায় বক্তৃতা দেবেন, এটি খুব স্বাভাবিক। এটি শুধু দুঃসাহস নয়, আমার কাছে খুব স্বাভাবিক বলে মনে হয়। কেননা তিনি বাংলা ভাষাকে ভালোবাসেন, তিনি বাঙালি সংস্কৃতিকে ভালোবাসেন, তিনি বাংলার মাটিকে ভালোবাসেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় তিনি ভাষণ দিয়েছেন চুয়াত্তরের ২৫ সেপ্টেম্বর। এর সাত-আট মাস পরে ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ যখন তিনি রাষ্ট্রপতি তখন একটি আদেশ জারি করেছিলেন। সেখানে সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করতে বলা হয়। বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে কাগজপত্র আগে বাংলায় হবে, প্রয়োজনে প্রতিলিপিটি ইংরেজি বা সংশ্লিষ্ট ভাষায় দেওয়া হবে। অথচ আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ ছাড়া কোনো বিভাগেই বাংলায় প্রশ্নপত্র করা হয় না।

 

পাঠ্য বইয়ে ইতিহাসের গুরুত্ব দিতে হবে

এ কে এম শাওনাওয়াজ

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু বাংলায় ভাষণ দিয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি বিশ্বদরবারে তোলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। তরুণ প্রজন্ম এই সব দিবসের মাধ্যমে যদি ফিরে যেতে পারে। বঙ্গবন্ধু কয়েক বছর বেঁচে থাকলে দেশ আরো বেশি উন্নত হতো। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে খণ্ডিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাঙালি খ্রিস্টপূর্ব যুগে এক হাজার বছর পর্যন্ত আর্যদের আগমন ঠেকিয়ে রেখেছিল। ফলে সঠিক ইতিহাস জানার ব্যাপারে বর্তমান প্রজন্মকে উৎসাহ দিতে হবে। অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীরা তাদের ইতিহাস সম্পর্কে যথাযথভাবে জ্ঞান অর্জন করে। কিন্তু আমাদের দেশে পাঠ্য বইগুলো পড়ে সঠিক ইতিহাস জানার কোনো সুযোগ নেই এবং অনেক ক্ষেত্রে বাদও দেওয়া হয়েছে। বইগুলোতে ইতিহাস সম্পর্কে ভাসা ভাসা তথ্য দেওয়া আছে। এই অসংগতিগুলো ঠিক করা উচিত বলে আমি মনে করি। অনেক সেমিনারে নানা অভিজ্ঞ মানুষ বলেন যে ইতিহাস পড়ে কী হবে, এই রকম মনোভাব দূর করা প্রয়োজন। নতুবা তরুণ প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু অজানাই থেকে যাবে। বঙ্গবন্ধুর দর্শন ধারণ করতে হবে এবং এর তাৎপর্য তুলে ধরতে হবে।

 

বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা

ড. ছাদেকুল আরেফিন মাতিন

আজকে বাংলাদেশের যে অবস্থা, যেখানে অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের যুদ্ধ করতে হচ্ছে, সে জায়গায় কি বঙ্গবন্ধুর এই জাতিসংঘের ভাষণটির প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে? সারা বিশ্বে এখন নেতৃত্বে পরিবর্তন চলছে। বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তি হয়েছে। আমাদের কাছে এ রকম নেতা কি তৈরি হয়েছে, যে নেতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হচ্ছে? সম্প্রতি আমরা এই স্বীকৃতিটা পাচ্ছি জাতির পিতার কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। জাতিসংঘের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।’ বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল যে বাঙালি আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে একটি জাতিসত্তা রূপান্তর করে একটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আমরা যদি ১৯৪৭ সালের আগের থেকে দেখি, বাঙালি জাতিকে আত্মমর্যাদাশীল জাতিতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাংলা ভাষাকে নিয়ে তিনি যুদ্ধ করলেন। বঙ্গবন্ধু বুঝে ফেলেছিলেন, একটি জাতির যে মূল উপাদান—ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ সেগুলো ধ্বংস করার প্রথম লক্ষ্যটি ছিল ভাষাকে অবদমিত করা।

 

বঙ্গবন্ধু শুধু আবেগে বাংলায় বক্তৃতা দেন নাই

মো. জাকির হোসেন

বঙ্গবন্ধু দেশে এবং দেশের বাইরে, কমপক্ষে তিনটি ক্ষেত্রে দেশের বাইরে তিনি বাংলায় বক্তৃতা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ একটি ভাষণ। তারপর লক্ষণীয় হলো, বাংলা ভাষাকে যখন পাকিস্তানের অন্যতম ভাষা হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি দেওয়া হলো, তখন সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখন বলেছেন, বাংলা ভাষা যত দিন পর্যন্ত আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না হবে তত দিন পর্যন্ত ওই কেতাবি স্বীকৃতিতে কিছু যায়-আসে না। যখন বলা হলো উর্দু হরফে বাংলা লেখা হবে, তিনি কিন্তু সেই সময় যুক্তি উপস্থাপন করে বলেছিলেন উর্দু হরফে বাংলা লেখা চলবে না। সেই পরিস্থিতি থেকে এখনকার অবস্থার কি খুব পরিবর্তন হয়েছে? আজকাল ইংরেজি হরফে বাংলা লেখা হচ্ছে। বাংলা ভাষার মূল্য আজকে হারিয়ে গেছে, শক্তি ক্রমাগত ফুরাচ্ছে।

কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে বক্তৃতা হয় ইংরেজিতে, দোয়া হয় আরবিতে আর গান হয় হিন্দি অথবা ইংরেজিতে। যেখানে বাংলার কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই। এমন পরিস্থিতিতে আমরা এখন বিরাজ করছি। বঙ্গবন্ধু কিন্তু তখন শুধু আবেগের কারণে বাংলায় বক্তৃতা দেন নাই। তিনি জানেন যে ভাষার কারণে বৈষম্য সৃষ্টি হবে। আজকে বাংলার ভেতরে উচ্চবিত্ত যাঁরা তাঁরা তাঁদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করান, এখানে কিন্তু বাংলা অবহেলিত। আবার একেবারে নিম্নবিত্ত যারা তারা আরবিতে পড়াশোনা করছে, সেখানেও বাংলা অবহেলিত।

 

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমাদের নতুন দিনের স্বপ্ন দেখায়

ড. আসাদুজ্জামান চৌধুরী

বাংলা ভাষাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৪ সালে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছিল জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলা ভাষার বক্তৃতার মাধ্যমে। এই পথটি খুব একটা সহজ ছিল না। কারণ জাতিসংঘের সদস্য পদ পেতে আমাদের নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল। জাতিসংঘের সদস্য পদ পেতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটা বাধা পেয়েছিল বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে অপশক্তি দেশকে ক্ষমতার বলয়ে রাখতে চেয়েছিল। তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস সম্পর্কে সঠিকভাবে জানেও না। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। ভাষাকে তিনি অন্তরে লালন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমাদের নতুন দিনের স্বপ্ন দেখায়। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মাধ্যমে জাতীয় সত্তাকে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি আজীবন মানুষের অধিকারের জন্য কাজ করেছেন এবং নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যেসব দেশ আমাদের সমর্থন দিয়েছিল, তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করেছেন। একজন কৃতজ্ঞ মানুষ সব সময় উদার হয়। আর উদার ব্যক্তির মধ্যে সৃষ্টিশীলতা কাজ করে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ মহাকাব্যের মতো। সাহিত্যের অনন্য উপাদানের মতো। তাঁর ভাষণ ইউনেসকো এবং বৈশ্বিক পর্যায় থেকে স্বীকৃত পেয়েছে। 

 

উচ্চশিক্ষা হতে হবে মাতৃভাষায়

ড. মো. নাছিম আখতার

ভালোবাসা থাকলে সব সময় সব কিছু করা সম্ভব। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় বক্তব্য রেখে তিনি দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সবার সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি এই ভাষণের মাধ্যমে একটা বিষয় স্পস্ট করেছিলেন যে একটা দেশ যতই ছোট হোক না কেন, নিজের দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কখনোই ভুলতে পারে না। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কিন্তু কোনো কারখানাকেন্দ্রিক নয়, এটি হচ্ছে জ্ঞানভিত্তিক শিল্প বিপ্লব। প্রযুক্তির শীর্ষস্থানীয় দেশগুলো যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় পড়ালেখা করেছে। ফলে পড়ালেখা হতে হবে নিজের ভাষায়। শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষার ওপর উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

 

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ ধরেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ

আলী হাবিব

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেটা ছিল জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ছিল সাধু ভাষায়। জাতিসংঘ সনদে মানবাধিকারসহ যেসব মহান আদর্শের কথা বলা হয়েছে, সেসবের উল্লেখ করে তিনি সেদিন বলেছিলেন, এ সবই বাংলাদেশের জনগণের আদর্শ। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণের মধ্য দিয়ে মূলত বাঙালির শক্তি, সাহস ও চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতার কথাই তুলে ধরেছেন। সেই শক্তির পরিচয়ও দিতে পেরেছে বাংলাদেশের মানুষ। আজ নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে পদ্মা সেতু। উন্নয়নে বাংলাদেশ আজ রোল মডেল। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ ধরেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে আজ কাণ্ডারি তাঁরই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।



সাতদিনের সেরা