kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কালের কণ্ঠ ও ব্র্যাক আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠক

ম্যালেরিয়া মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বাধা বিনিয়োগ ও কভিড

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



ম্যালেরিয়া মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বাধা বিনিয়োগ ও কভিড

২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকার রয়েছে বাংলাদেশের। এ লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কাজও চলছে। তবে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের জোগান ও চলমান করোনাভাইরাস মহামারি। কিভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যায় তেমন অনেক দিকনির্দেশনা ও অভিমত উঠে আসে গত ১১ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠ ও ব্র্যাকের যৌথ গোলটেবিল বৈঠকে। ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ার কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এ বৈঠকের আলোচনার অনুলিখন করেছেন ফাতিমা তুজ জোহরা, শম্পা বিশ্বাস ও এ এস এম সাদ। ছবি :  

 

২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা ম্যালেরিয়ামুক্ত দেখতে চাই

ইমদাদুল হক মিলন

২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা ম্যালেরিয়ামুক্ত দেখতে চাই। তবে কভিডের কারণে এই কার্যক্রমে অনেক বিঘ্ন ঘটেছে। এটা শুধু ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও ঘটেছে। মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে, সাধারণ মানুষ হাহাকারের মধ্যে পড়ে গেছে। নানা সামাজিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ কারণেই অনেক কিছু থেকে আমরা পিছিয়ে গেছি। বর্তমানে পৃথিবীর সর্বত্র কভিড চলছে। বাংলাদেশেরও সর্বত্র চলছে। আর এই পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চল থেকে প্রায়ই আমরা খবর পাচ্ছি, মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। যারা জুমচাষি তারা আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের পাশাপাশি ওই অঞ্চলে বসবাসকারী প্রান্তিক মানুষও এর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে। ফলে এই পরিস্থিতি আমরা কিভাবে মোকাবেলা করব, সেটা নতুন করে ভাবতে হবে। এ ক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা সবচেয়ে বড় অস্ত্র এবং সবচেয়ে জরুরি বিষয়। মানুষ যত বেশি সচেতন হবে, তত আমরা রোগমুক্ত হব এবং রোগকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারব। সচেতনতা বাড়াতে আমরা আমাদের সংবাদপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা এবং তথ্য তুলে ধরি, যাতে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এবং যারা দেশ নিয়ন্ত্রণ করেন সেই কর্তৃপক্ষের কাছে এসব বক্তব্য পৌঁছে দিতে পারি।

 

ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কঠিন নয়, তবে হয়তো নির্মূল হবে না

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন নয়, তবে এটা নির্মূল হয়তো হবে না। এটা প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। তবে করোনার মধ্যে একটু ধাক্কা খেয়েছে। এটা শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা পৃথিবীতেই এমনটা হচ্ছে। কভিড এসে এমন পরিস্থিতি হয়েছে যে অনেক অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীও ভোগান্তিতে পড়েছে। তারা ঠিকমতো চিকিৎসাও পায়নি, এটা সত্য কথা। বহু হার্টের রোগী, কিডনির রোগী, লিভার-ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী অপারেশনে গিয়েও ঝামেলায় পড়েছে। করোনা টেস্ট না করে এলে চিকিৎসকরা তাদের দেখবেন না—এসব বিষয়ে নানা অভিযোগও রয়েছে। ফলে কভিডের কারণে শুধু ম্যালেরিয়া রোগীই নয়, অন্য রোগীরাও কমবেশি দুর্ভোগে পড়েছে। আমরা যারা চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকি তারা জ্বর, সর্দি, কাশি দেখলেই ১ নম্বরে কভিড ধরে নিচ্ছি। ফলে করোনার কারণে ম্যালেরিয়ার কথা আমরা ভুলতেই বসেছি। আসলে এটা ছিল মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। আমরা সবাই কিন্তু এখনো করোনা নিয়েই ব্যস্ত। অনেক হাসপাতালে করোনার জন্য অন্যান্য সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। এত কিছুর মধ্যেও ম্যালেরিয়া নির্মূলে আমাদের দেশে অন্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক কাজ হচ্ছে।

 

বাংলাদেশে এক ধরনের ম্যালেরিয়া নয়, তিন ধরনের

অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ

ম্যালেরিয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের জন্য জটিল। কারণ বাংলাদেশে এক ধরনের ম্যালেরিয়া নয়, তিন ধরনের। জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য মতে, আমাদের ১১টি জেলায় ম্যালেরিয়া নেই। আটটি জেলায় এলিমিনেশন হয়ে যাচ্ছে। দুটি জেলার পরিস্থিতি প্রায় একই রকম। তবে পার্বত্য তিনটি জেলায় পরিস্থিতি খুবই ভয়ংকর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর হার বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশেই কমেছে। কিন্তু কভিডের এই অতিমারিতে সেই অর্জন ম্লান হয়ে যেতে বসেছে। বর্তমানে এটাই হচ্ছে আশঙ্কা। কভিড নিয়েই আমাদের চিন্তা করতে হচ্ছে, চলতে হচ্ছে। এখন এমন মনে হচ্ছে যে বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ায় আর কোনো রোগ নেই, একমাত্র কভিডই আছে। হ্যাঁ, কভিডের সঙ্গে সবাই অবশ্যই যুক্ত। তবে এর পাশাপাশি অন্যান্য রোগও তো আছে। এমনই একটি রোগ ম্যালেরিয়া, যেটা আমরা নির্মূল করতে চাই। গত বছর পর্যন্ত ম্যালেরিয়া রোগী কমেছে ৪.৩ শতাংশ এবং ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর হার কমেছে .৫ শতাংশ। কিন্তু সেই রেটটা হঠাৎ করেই কভিডের কারণে বেড়ে গেছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে সংক্রামক ব্যাধি আইন জারি করা হয়েছে, যেটা এখনো চলমান।

 

নতুন প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা দেখা দিয়েছে

অধ্যাপক মো. মাহবুবার রহমান

আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলগুলো ছাড়া বাকি অঞ্চলগুলো থেকে ম্যালেরিয়া রোগের জন্য দায়ী স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে গিয়েছিল। ফলে শুধু এই পার্বত্য অঞ্চলগুলোতেই ম্যালেরিয়া রোগী পাওয়া যাচ্ছিল। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকেও তখন ধরে নেওয়া হয়েছিল যে বাংলাদেশ ম্যালেরিয়ামুক্ত। কিন্তু সেই পর্যায় থেকে আজ দেখলাম যে শুধু পার্বত্য অঞ্চলেই নয়, অন্যান্য বাছাই করা অঞ্চলেও ম্যালেরিয়া দেখা দিচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, ম্যালেরিয়ার যে ভেক্টর অর্থাৎ স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা সেটা অন্যান্য জায়গায়ও সক্রিয় হচ্ছে। এর অনেক কারণও আছে। যেমন—অনেক নতুন প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা দেখা দিয়েছে। আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের কীটপতঙ্গের যে স্বাভাবিক ও সুপ্রতিষ্ঠিত ধরন ছিল, সেটার অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে আমরা ৩২ ডিগ্রি তাপমাত্রা পেতাম জুন মাসে, সেখানে এখন সেটা আমরা পাচ্ছি এপ্রিল বা মে মাসে। ফলে মশার ফেভারেবল টেম্পারেচার যদি ৩২ ডিগ্রি হয়ে থাকে তাহলে সেটা অন্য সময় আমরা পাচ্ছি না।

 

ম্যালেরিয়া নির্মূলে গবেষণা হওয়া জরুরি

অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা

ম্যালেরিয়া নির্মূলে গ্লোবাল অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রী পর্যায় পর্যন্ত অনেকেই মন্তব্য করেন, এই কাজটি করা দরকার। সবাই মত দিলে সেই কাজটি কারা করবেন? বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার লোকের অনেক অভাব। তাই একসঙ্গে সবার কাজ করতে হবে। মানুষের সচেতনতা এমনি এমনি তৈরি হবে না। জনগণকে সচেতন করতে হলে অবশ্যই সরকারের একটি ভূমিকা থাকে। চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এক নয়। এমনকি শ্রীলঙ্কা ম্যালেরিয়ামুক্ত হওয়ার পর বাইরে থেকে একটি ম্যালেরিয়া এসেছে। চীনের উহানে একজন কভিড শনাক্ত হওয়ার পর পুরো জনগোষ্ঠীর পিসিআর পরীক্ষা করা হয়। ম্যালেরিয়াপ্রবণ অঞ্চলের চিকিৎসকরা পর্যন্ত সচেতন নন। ফলে এটি এই প্রগ্রামের ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে। তাঁদের ট্রেনিং দেওয়া জরুরি। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ কম। কিন্তু কেন কমেছে, সেটি নিয়ে কোনো ধরনের গবেষণা নেই। কমে যাওয়া নিয়েও গবেষণা করা জরুরি। অনেক শ্রমিক ভারতের কয়লাখনিতে যায়। সেখানে গিয়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। তবে ম্যালেরিয়া নির্মূলে অর্থনৈতিক ও সরকারের পদক্ষেপ জরুরি।  

 

পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট অত্যন্ত জরুরি

অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা

ম্যালেরিয়া নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজ করছে। আগের থেকে ম্যালেরিয়ার সমস্যা অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ডিজিজ একেবারে নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত দেশে পরিণত করতে হবে। ফলে সেই রোডম্যাপের মাধ্যমেই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে  ফান্ড। কারণ এই ফান্ড সংকটে পড়লে তখন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। কভিড পরিস্থিতিতে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। কভিডের পরিস্থিতিতে নানা রকমের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মাধ্যমেই ম্যালেরিয়া নির্মূলের কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে। কভিড কমেছে, এটা নিয়ে একটা গবেষণা করা এবং থাকা জরুরি।

 

ফান্ড এবং জনসম্পৃক্ততা জরুরি

অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির

সমন্বিত প্রগ্রামের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া সমস্যার সমাধান করা জরুরি। মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের বর্ডার আছে। ফলে এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি আলাদা কমিটি গঠন করা জরুরি ছিল। কারণ বর্ডারে মানুষ যাতায়াত করছে। ফলে বলিষ্ঠ একটা পদক্ষেপ না নিলে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। কভিড পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে কি না এবং সঠিক সময়ে রিপোর্ট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে কি না সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি। মনিটরিং সিস্টেম শক্তিশালী করতে হবে।

 

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন

ড. মো. আকরামুল ইসলাম

ব্র্যাক দীর্ঘদিন ধরে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। ম্যালেরিয়া এখন আর জাতীয় সমস্যা নয়। ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ থাকলেও এটি একেবারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা দিচ্ছে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল এবং একেবারে সীমান্ত এলাকা, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিবছরই ম্যালেরিয়া সংক্রমণ সংকুচিত হচ্ছে। এখানে আমাদের কিছু বাধা আছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করছে। এটি চলমান থাকলে মানুষ সহজেই ম্যালেরিয়া সেবা পাবে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় প্রকোপ বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় দরকার। সুতরাং স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক এলাকায় সরকারের ইনভেস্টমেন্ট বাড়ানো দরকার। আশা করি, এই জনগোষ্ঠীর ম্যালেরিয়া নির্মূলে সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবে, যা স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। সরকার যদি একটি সুনির্ভর পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যায়, তাহলে কভিড-১৯-সহ ম্যালেরিয়ার মতো ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব।

 

কভিডের জন্য ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে

অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম

১৯৪৭ সাল থেকে ভারত থেকে এই অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার বিস্তৃতি বাড়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আশির দশকে ম্যালেরিয়া রোগী ছিল ৩০ হাজারের মতো। ১৯৯১ সালে এসে রোগীর সংখ্যা ৬৩ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ১৯৯৪ সালে এক লাখ ৫৪ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে সরকার ম্যালেরিয়া নির্মূলে পদক্ষেপ গ্রহণ করায় রোগীর সংখ্যা কমতে থাকে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে ম্যালেরিয়া নির্মূলের কাজ করা যাবে না। কভিডের জন্য ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে সম্পদ থাকে সীমিত, আবার এই সম্পদের ব্যবহার সঠিকভাবে করা হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ম্যালেরিয়া নির্মূলের চেষ্টা করা হচ্ছে। করোনা অতিমারির মধ্যেও প্রান্তিক অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে মশারি বিতরণের কাজ আমরা করেছি। এটা সম্ভব হয়েছে সরকারের সহযোগিতার কারণে। গ্লোবাল ফান্ড মনে করছে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো আমরা ম্যালেরিয়া নির্মূলেও ভালো করছি। তাই ফান্ড পাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে নানা পর্যায়ে আলোচনা চলছে। এক্ষেত্রে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ওষুধের মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। বৈশ্বিক আবহাওয়ার একটা পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে অন্য কোনো মহামারি আসবে কি না সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি। দক্ষ জনবল তৈরি করার জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে। যারা সরাসরি মাঠে কাজ করেন তাঁদের গবেষণালব্ধ জ্ঞানের প্রয়োজন আছে।

 

জঙ্গলে গেলে মশারি নিয়ে যেতে হবে

অধ্যাপক কবিরুল বাশার

ম্যালেরিয়া নির্মূলে ব্র্যাক প্রান্তিক পর্যায়ে ভালো কাজ করছে। এতে ব্র্যাক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট টিমের অবদান রয়েছে। তবে ৭২টি উপজেলায় ম্যালেরিয়া নেই। ওই উপজেলাগুলোর কিছু ইউনিয়নে ম্যালেরিয়ার হটস্পট আছে। পাহাড়ি অঞ্চলে ম্যালেরিয়া বেশি আছে। আমাদের সার্ভেতে এই তথ্য উঠে এসেছে। পেশা ও জীবিকার তাগিদে মানুষ কাঠ কাটতে জঙ্গলে যাচ্ছে। সেখানে তারা অনেক দিন অবস্থান করছে। মশারি ছাড়া সেখানে অবস্থান করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তারাই বেশি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। কী কারণে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে সেই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

 

২০০৮-এর তুলনায় ৯৩ শতাংশ সংক্রমণ কমেছে

ডা. আফসানা আলমগীর খান

২০০৮ সালের তুলনায় বাংলাদেশে ২০২০ সালে ম্যালেরিয়া রোগী ও ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু কমেছে যথাক্রমে ৯৩% ও ৯৪%। কভিড-১৯ মহামারীর সময়েও শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মাঠ পর্যায়ে ম্যালেরিয়া সেবা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রন কর্মসূচী ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়ামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের মধ্যে তিন পার্বত্য জেলায় বার্ষিক সংক্রমণের হার প্রতি ১০০০ জনে ১-এর নীচে নামিয়ে আনা, বাকি ১০ ম্যালেরিয়াপ্রবণ জেলায় পর্যায়ক্রমিকভাবে ম্যালেরিয়া নির্মূল করা, অবশিষ্ট ৫১ জেলায় ম্যালেরিয়ামুক্ত অবস্থা নিশ্চিত করা ও ম্যালেরিয়ামুক্ত এলাকাসমূহে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়ার পুন:আর্বিভাব প্রতিরোধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেজন্য সার্বজনীন ম্যালেরিয়া চিকিৎসাসেবা ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত, ম্যালেরিয়া রোগ নিরীক্ষণ ও প্রাদুর্ভাব রোধে কার্যক্রম জোরদার এবং জনগণকে সমপৃক্ত করে সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম (ACSM) অব্যাহত রাখতে হবে। একই সাথে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ রোধে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্য ম্যালেরিয়া সংক্রান্ত এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এসকল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে ম্যালেরিয়ায় অধিকতর বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

 

ম্যালেরিয়ার ভেক্টর চেঞ্জ হয়েছে, ট্রান্সমিশনও হচ্ছে

ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম

বিভিন্ন জায়গার রোগীদের ওপর সার্ভে করে দেখেছি, নতুন ম্যালেরিয়া স্ট্রেন আসেনি। এটা আশার কথা হলেও আত্মতুষ্টিতে থাকা যাবে না। পাশাপাশি ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে এই স্ট্রেনগুলো পাওয়া যাচ্ছে। এ জন্য আমরা যদি নিশ্চিন্ত থাকি যে আমাদের এখানে নতুন ম্যালেরিয়া স্ট্রেন আসেনি, সেটা অনুচিত হবে। কারণ জিরো থেকেও এমন স্থানে চলে আসতে পারে যে ওষুধেও কাজ হবে না। এ অবস্থায় সীমান্তের ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকাগুলোয় সার্ভে করে দেখতে হবে। একটি বেসরকারি সংস্থা হিসাবে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এ জন্য হেলথ ডিপার্টমেন্টসহ সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

 

পার্বত্য জেলাগুলো হচ্ছে ম্যালেরিয়ার হটস্পট

সৈয়দ তারিকুল ইসলাম

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। এর জন্য বিভাগীয় একটি ইনিশিয়েটিভ দরকার। যেমন এটার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, বন মন্ত্রণালয়েরও দরকার আছে। এগুলোর মধ্যে এক ধরনের সহযোগিতাপূর্ণ জায়গা দরকার, যদি আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে চাই। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখছি পার্বত্য জেলাগুলোতে ভ্রমণকারীর সংখ্যা বেশি। সেখানে তাদের যোগাযোগ বাড়ছে। এটাতেও কিন্তু একটা ঝুঁকি আছে। কারণ এই পার্বত্য জেলাগুলো হচ্ছে ম্যালেরিয়ার হটস্পট।

 

ম্যালেরিয়া নির্মূলে রিসোর্স ও ফান্ড জরুরি

ডা. শায়লা ইসলাম

ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী সরাসরি প্রাইভেট হাসপাতালে চলে যায়। সেখানে ম্যালেরিয়াকে প্রাধান্য না দিয়ে কভিডসহ অন্যান্য টেস্ট করা হচ্ছে। এতে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। এবছর এরকম তিন জন রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এ জন্য উপজেলা অনুযায়ী প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে ম্যালেরিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করা জরুরি। সেখানে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। কক্সবাজারসহ অন্য এরিয়াগুলোতে ম্যালেরিয়া রোগী অনেক বেড়ে গেছে। অনেকে সীমান্ত এলাকা থেকে কক্সবাজারে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। একেবারে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গেছে। এ জন্য ম্যাপিং করা জরুরি, রোগীরা কোন জায়গা থেকে আক্রান্ত হয়ে ফিরছে। এতে সেসব এলাকায় ম্যালেরিয়া চিকিৎসা ও সেবা নিয়ে কাজ ও সচেতনতা বাড়াতে কাজ করা যাবে। পাশাপাশি রোগীদের মধ্যে এখন একটি অন্য বিষয় কাজ করছে। জ্বর হলে তারা ধরে নিচ্ছে তাদের কভিড হয়েছে। তারা অন্য স্থানে কভিড টেস্ট করতে যাচ্ছে। নিকটবর্তী ম্যালেরিয়া সেন্টারে টেস্ট করছে না। তখন অন্য হাসপাতালে গেলেও কভিড হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ক্রস বর্ডার বড় চ্যালেঞ্জ। বর্ডার এলাকাগুলোও ম্যালেরিয়াপ্রবণ। আরেকটি বড় সমস্যা রিসোর্স নিয়ে। ডোনার মনে করছে ম্যালেরিয়া কমে আসছে, ফান্ডও কমিয়ে দিচ্ছে। এটি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।



সাতদিনের সেরা