kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

কালের কণ্ঠ-ব্র্যাক গোলটেবিল বৈঠক

ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি

২২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৯ মিনিটে



ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি

কালের কণ্ঠ ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে ‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক গত ১৬ জুন বুধবার কালের কণ্ঠ’র সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। গোলটেবিল বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, সুপারিশ ও পরামর্শ নিয়ে আজ প্রকাশিত হলো বিশেষ ক্রোড়পত্র। সংকলন করেছেন কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক বাহরাম খান, শম্পা বিশ্বাস এ এস এম সাদসমন্বয় করেছেন বিশেষ প্রতিনিধি আজিজুল পারভেজছবি তুলেছেন মঞ্জুরুল করিম

 

ভূমিকম্প মোকাবেলায় ২৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প

ডা. এনামুর রহমান

দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বের সামনে রোল মডেল। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কতটা আন্তরিক তা বলে শেষ করা যাবে না। করোনার এই দুঃসময়েও ভূমিকম্প মোকাবেলায় সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ২৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দিয়েছেন। এই প্রকল্পে সর্বপ্রথম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হবে। কারণ যেকোনো দুর্যোগে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেন। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রোদ, বৃষ্টি, ঝড় ও আগুনে কাজ করেন তাঁরা। তারপর বড় শহরগুলোর জন্য যন্ত্রপাতি কেনা হবে। দুর্যোগ মোকাবেলায় টাকার কোনো সমস্যা হবে না। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতি হওয়ার পথে। কী লাগবে আপনারা নিঃসকোচে বলবেন। সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। বড় ভূমিকম্প দুর্যোগ ঘটে গেলে উপায় থাকবে না। তাই আগে থেকে যত প্রস্তুতি নেওয়া যায় ততই মঙ্গল। যথাযথভাবে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে। ২০১৯ সালে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে ১৯ মে জাপানি সাহায্য সংস্থা জাইকার সঙ্গে ভূমিকম্পসংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলে পরিকল্পনা শুরু করেছিলাম। জাপান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হওয়ার পরও তারা এখন প্রায় ভূমিকম্প সহনীয় দেশ হয়ে উঠেছে। ১০ মাত্রার ভূমিকম্পেও তেমন ক্ষতি হয় না। তাদের এই পর্যায়ে আসতে ৩০ বছর লেগেছে। তারা বলেছে, আমাদের ৫০ বছর লাগতে পারে। ২০৭১ সাল টার্গেট করে কাজ শুরু হচ্ছে। কিন্তু মাঝখানে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হয়ে যাওয়ায় এ বিষয়ে বড় অগ্রগতি হয়নি। তার পরও আমরা চেষ্টা করছি এই কাজটাতে হাত দিতে। জাইকার সঙ্গে চুক্তি হবে। তারা বিনা সুদে আর্থিক সহায়তা দেবে। আমরা হয়তো দেখে যেতে পারব না। পরবর্তী প্রজন্ম এর সুবিধা ভোগ করতে পারবে। ভূমিকম্পের সংকেত দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে দেওয়া যায় সেই চেষ্টাও করা হচ্ছে।

 

সচেতনতাই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারে

ইমদাদুল হক মিলন

কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হচ্ছে। যখনই এসব ছোটখাটো ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটে, তখনই আমাদের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। সবাই নড়েচড়ে ওঠে। গণমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। এরপর অনেক দিন ভূমিকম্প না হলে সেই আতঙ্ক কেটে যায়। এই ভুলে যাওয়াটা আমাদের জন্য কী ধরনের বিপদ তৈরি করছে তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার। সম্প্রতি সিলেটে এক দিন পাঁচবার এবং আরেক দিন দুইবার মৃদু ভূকম্পন হয়েছে। এতে একটি স্কুল ভবন এবং দুটি ছয়তলা ভবন সামান্য হেলে পড়েছে। ডাউকী ফল্ট থেকে ভূকম্পনের উৎপত্তির কথা আমরা জানতে পারি। এটি বাংলাদেশকে যেকোনো সময় বড় সমস্যায় ফেলে দিতে পারে। তাই বাংলাদেশ বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, দেশের কোন কোন শহর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছে। ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় দেশের সব জায়গায় ভূমিকম্প বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে। যেকোনো দুর্যোগের বিষয়ে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কালের কণ্ঠসহ ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো বরাবরই ভূমিকম্প সচেতনতার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে আসছে। ভবিষ্যতেও সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে থাকব আমরা।

 

মহাদুর্যোগ মোকাবেলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া দরকার

মো. মোহসীন

ভূমিকম্পসহ সব ধরনের দুর্যোগের বিষয়ে সরকার কতটা আন্তরিক, আজকের বৈঠকই তার প্রমাণ। আজকের বৈঠকটি বেসরকারি উদ্যোগে হলেও এখানে মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, সচিবসহ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়েছি।

বাংলাদেশের অত্যন্ত সাধারণ মানুষও এখন সুন্দরভাবে মোবাইল ব্যবহার করতে পারে। তাই এ দেশের মানুষ দুর্যোগে সচেতন হবে না, তা বিশ্বাস করি না। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো বিষয়গুলো আমাদের দেশের মানুষ মোকাবেলা করতে শিখেছে। আশা করি ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের বিষয়েও মানুষকে সহজে সচেতন করা সম্ভব। এই কাজটাতে সরকারিভাবেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পৃথিবীর কোনো দেশই ভূমিকম্প মোকাবেলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এই মহাদুর্যোগ মোকাবেলায় সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সেই কাজগুলোই করছি। এই করোনা দুর্যোগের সময়ও দেশের বিভিন্ন জেলায় দুর্যোগসংক্রান্ত মহড়া হচ্ছে।

 

দেশের ১৪টি ভূতাত্ত্বিক ফল্ট (ফাটল রেখা) থেকে যেকোনো সময় মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে

অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল

কোনো ভূখণ্ডে একবার ভূমিকম্প হলে পরবর্তীতে ওই ভূখণ্ডে ভূমিকম্পের আশঙ্কা থেকে যায়। আমাদের দেশে ১৫৫৮ সালে একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। ১৮৯৭ সালে অনুরূপ আরেকটি বড় ভূমিকম্প হয়। এই ভূমিকম্পকে ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকুয়েক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, রিখটার স্কেলে যেটির মাত্রা ছিল ৮.৩। পৃথিবীতে যত ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই ভারতের ভূমিকম্প। এই ভূমিকম্পে সিলেট ও ঢাকায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। পরে ১৯১৮ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে আরেকটি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়, রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৭.৪। তারও আগে ১৮২২ সালে আরেকটি অনুরূপ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়, মাত্রা ছিল ৭.১। এই দুটিরই উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশে। ১৮৯৭ সালের ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পের পর ১২৫ বছর পার হয়েছে, যা পুনঃসংঘটিত হতে ৩৫০ থেকে ৫০০ বছর সময় লাগতে পারে। ১৮২২ ও ১৯১৮ সালের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ১০০ বছর। এই বিবেচনায় একটি ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প হওয়ার ১০০ বছর পর আরো একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে।  একটি ভূমিকম্প হওয়ার পর আরেকটি ভূমিকম্পের শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে। বাংলাদেশে ৬ থেকে ৭.৫ রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প হওয়ার উপযোগী ভূতাত্ত্বিক ফল্ট সংবলিত ১৪টি স্থান রয়েছে, যেগুলো থেকে মাঝারি আকারের ভূমিকম্প হতে পারে। সিলেটেই আছে এ রকম পাঁচটি ফল্ট। এই ১৪টি ফল্ট থেকে যেকোনো সময় মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। ১৭৬২ সালে রাখাইন ফল্টে একটি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এই ভূমিকম্প নিয়েও গবেষণা করা হয়। অনেক গবেষক বলেছেন, এই ভূমিকম্পটি পুনঃসংঘটিত হতে ৩০০ থেকে ৯০০ বছর লাগতে পারে। সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ একটি দেশ। এখানে মাঝারি আকারের ভূমিকম্প হওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়ে আছে। কারণ ভূমিকম্প হওয়ার মতো শক্তি ভূ-অভ্যন্তরে সঞ্চিত হয়েছে। ১৪টি স্থানে যেকোনো সময় ভূমিকম্প হতে পারে। বিল্ডিং, রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো বিল্ডিং কোড মেনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তৈরি না করার কারণে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হলেও আমাদের অবকাঠামোগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। জেলাভিত্তিক যদি হিসাব করা হয় তাহলে সবচেয়ে আপদপ্রবণ ও ঝুঁকি এলাকা সিলেট ও চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামে ভূমিকম্প হলে ভূমিধস হওয়ার ব্যাপক আশঙ্কা আছে। অন্যদিকে ঢাকা শহরে আপদ কম হলেও অবকাঠামোর কারণে ঢাকার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে করণীয় জানতে হবে

সাজেদুল হাসান

সমপ্রতি সিলেটে বারবার ভূমিকম্প হওয়ার পর আমাদের মনে হলো যে নীতিনির্ধারক, গবেষক ও পরিকল্পনাকারীদের নিয়ে একটি বৈঠকের মাধ্যমে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিরসনে কাজ করা যেতে পারে। ১৯৭২ সালে ব্র্যাক সৃষ্টির পর থেকেই বাংলাদেশে যত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে সেগুলোর প্রস্তুতিমূলক ও সাড়াদানের সঙ্গে ব্র্যাক যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সাল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ বছর, যেখানে বাংলাদেশকে কমপক্ষে তিনটি বড় দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করোনা, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা। এই দুর্যোগগুলোর সময়ে সরকারের সহযোগিতায় আমরা সম্মিলিতভাবে ভালো অবদান রাখতে পেরেছি। কিন্তু ভূমিকম্প হচ্ছে এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে আমাদের কিছু অগ্রগতি ও প্রস্তুতি আছে। তবে এ ক্ষেত্রে আরো অগ্রগতির দিকে যেতে হবে। ফলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কিভাবে কমানো যায়, এর পূর্বপ্রস্তুতিগুলো কী এবং ভূমিকম্পের সময় আমাদের করণীয় কী—এই বিষয়গুলোতে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যদিও সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি, তবু আমাদের জেনে রাখা ভালো, এর প্রভাবগুলো কী। বহু ভবন ধসে পড়তে পারে, অনেক নিহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে, ভূমিধস হবে, সাড়া দেওয়া এজেন্সিগুলো পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করতে পারবে না, কারণ তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে আমাদের সবার ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

 

৬২ হাজার আরবান ভলান্টিয়ার প্রস্তুত করার উদ্যোগ

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন

১০০ বছর পর পর ভূমিকম্প বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। সিলেটে ছোট ছোট ঝাঁকুনির জন্য বড় ধরনের ভূমিকম্প হতেও পারে, আবার শক্তি বেরও হয়ে যেতে পারে। ফলে ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা না-ও থাকতে পারে—দুটিই সম্ভব। বাংলাদেশে ১৭ কোটি জনবলের জন্য মাত্র ১১ হাজার ফায়ার সার্ভিস স্টাফ রয়েছে। তবে এদের মধ্যে সবাই কিন্তু উদ্ধারের জন্য নয়। কারণ এর মধ্যে সিভিলিয়ান কর্মী রয়েছে, আবার ফায়ার ফাইটারও আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রায় ৬২ হাজার আরবান ভলান্টিয়ার প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি তৈরি হলে ফায়ার সার্ভিস বড় রকমের ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এখন পর্যন্ত ৪৭ হাজার আরবান ভলান্টিয়ারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন চালু রয়েছে ৪৫৬টি। এই স্টেশনে ভলান্টিয়ারদের ট্রেনিং দেওয়া হবে। আগে পূর্বপ্রস্তুতি ভালো না থাকলেও বর্তমানে ভালো। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সহযোগিতায় ভূমিকম্প থেকে রক্ষার সরঞ্জামেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বড় ভূমিকম্প হওয়ার পর তা মোকাবেলা করার মতো অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। তবে রানা প্লাজা ধসের পর ২১ দিন লেগেছে শুধু উদ্ধার করার জন্য। গবেষকদের মতে, ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হলে ৭০ হাজার স্থাপনা একসঙ্গে ভেঙে পড়বে। তাই ইমার্জেন্সি সেন্টার তৈরি করতে হবে। নিয়ম মেনে স্থাপনা তৈরি করতে হবে। ঢাকা শহরে গ্যাসলাইন ও বিদ্যুৎ যেভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ভূমিকম্পের সময় এগুলোতে আগুন লেগে যেতে পারে। তাই কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

 

ভূমিকম্প সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষণ জরুরি

শামসুদ্দীন আহমেদ

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরে ১০টি ভূমিকম্প স্টেশন রয়েছে, যেগুলো রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এই স্টেশনগুলো থেকে একেবারে সঠিক সময়ে ভূমিকম্পের তরঙ্গ রেকর্ড করা হয়। যখনই ভূমিকম্প সংঘটিত হয়, তখনই এই কেন্দ্রে থাকা বিজ্ঞানী ও টেকনিশিয়ানরা এই তথ্যের বিশ্লেষণ করেন। আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবেও আমরা উপাত্তটা পেয়ে যাই। এর পাশাপাশি আমরা ঐতিহাসিকভাবে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পগুলো এবং বাংলাদেশের ভূমির ধরনের বিশ্লেষণ করি। সেটা থেকে তখন আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছি। কিন্তু যদি এই মুহূর্তে একটি ভূমিকম্প হয় তাহলে তখন তো আমাদের কিছু কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। সেই কার্যক্রমগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো ইনফরমেশন। ভূমিকম্পের সময় সবার আগে কোথায়, কত মাত্রায় এবং কত দূরে ভূমিকম্প সংঘঠিত হচ্ছে সেটা সম্পর্কে ইনফরমেশন দরকার। এই ইনফরমেশনগুলো পাওয়ার একটি পূর্বশর্ত হচ্ছে দেশে একটি ফিজিক্যাল নেটওয়ার্ক থাকা। এর জন্য কিছু যন্ত্রপাতি একটি স্টেশনে স্থাপন করতে হয়। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ১০টি স্টেশনে ব্রডব্যান্ড সিসমোগ্রাম আছে। এর মাধ্যমেই ইনফরমেশনগুলো পাওয়া সম্ভব।

 

স্থান বুঝে বিল্ডিং তৈরি করতে হবে

অধ্যাপক ড. তাহমীদ মালিক আল হুসাইনী

বিল্ডিং কোড প্রণয়নের কাজ হয়েছে। বিল্ডিং তৈরির ক্ষেত্রে কোড বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিল্ডিং তৈরির সময় স্ট্রাকচারাল অবকাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। যে স্থানে বিল্ডিং তৈরি করবে সেখানের মাটির অবস্থাও দেখতে হবে। মাটির ওপরও ভূমিকম্প নির্ভর করে। অনেকেই মাটির বিষয়টি গুরুত্ব দেয় না। যে নতুন কোড তৈরি করা হয়েছে তাতে আমাদের জন্য ভালো হবে। বাংলাদেশকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। সিলেট, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জ—এই চারটি জায়গা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিটি এলাকার জোন কো-ইফিশয়েন্ট রয়েছে। জোন কো-ইফিশয়েন্ট বেশি হলে ভূকম্পন তত বেশি হবে। জোন কো-ইফিশয়েন্ট ম্যাগনিচ্যুডের ওপর সরাসরি নির্ভর করে না। কারণ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে অনেক দূর পর্যন্ত ক্ষতি সাধন করতে পারে। ঢাকার ক্ষেত্রে ম্যাগনিচ্যুড গুরুত্বপূর্ণ নয়, এখানে খেয়াল রাখতে হবে কম্পনের মাত্রা নিয়ে। তাই বাড়ির ডিজাইনও নির্ভর করবে কম্পনের ওপর ভিত্তি করে। কারণ উৎপত্তিস্থল থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, কম্পন তত বেশি কমতে থাকে। তাই জোনিং ম্যাপ তৈরি করার সময় তীব্রতা দেখা হয়। কনস্ট্রাকশন মানের ওপর নির্ভর করবে ভূমিকম্পের সময় বিল্ডিং টিকে থাকবে কি না। বিল্ডিং তৈরির ক্ষেত্রে রডের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ল্যাবে একটি রডের মানকে অনেকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ বিল্ডিং তৈরির ক্ষেত্রে কংক্রিট ও অন্যান্য সামগ্রীর মান বিবেচনা করতে হবে।

 

জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের স্থায়ী টিম তৈরি করতে হবে

মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ু্যুম

বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। এটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইতিহাস অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনেক বড় ধরনের ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ বর্তমানেও ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। আর জাপান সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল এবং সেখানে ভূমিকম্পও হয় বেশি। তবে ভূমিকম্পের তুলনায় মৃত্যু কম হয় সেখানে। কারণ বিল্ডিং কোড সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে। তাই বাংলাদেশেও বিল্ডিং কোডের বাস্তবায়ন জরুরি। সেই সক্ষমতা আমাদের আছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছে, বিল্ডিং কোডের ফ্রেম তৈরি করা। উপজেলা পর্যায়ে প্রকৌশলী রয়েছে। তাঁদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি করতে হবে। কারণ ঢাকার বাইরেও বড় বড় বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে বর্তমানে। ফলে পরিকল্পনা করে সেখানেও বিল্ডিং প্রস্তুত করতে হবে। কারণ এখন ঢাকার বাইরে বিল্ডিং তৈরি করার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে কোড মানা হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশে ভূমিকম্প ছাড়াই বিল্ডিং ধসে পড়ে। ফলে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিল্ডিং তৈরি করলে এই রকম দুর্ঘটনা বাড়তেই থাকবে। তাই বিল্ডিং নির্মাণে কোড মানতে বাধ্য করতে হবে। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকবেলার ধারাবাহিক প্রস্তুতি নিতে হবে। সচেতনতার জন্য একটি দিবস ঘোষণা করা যেতে পারে। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন বড় ভূমিকম্প হয়েছিল, সেই দিনকে আমরা সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করতে পারি। স্কুল, মসজিদসহ যেখানে জনসমাগম হয়, সেখানে ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো ট্রেনিং দেওয়া প্রয়োজন। নানা ধরনের মিটিং করা হয়। কিন্তু এটির প্র্যাকটিক্যাল কাজে প্রতিফলন হয় না। কারণ এ রকম জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গবেষণা না থাকলে কখনোই উন্নতি করা সম্ভব নয়। প্রজেক্ট না থাকলে কখনো এই সমস্যা নিয়ে কথা বলা হয় না। তাই জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিরসনে অবশ্যই একটি স্থায়ী সমস্যার সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এই সমস্যা সমাধান করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের স্থায়ী টিম তৈরি করতে হবে।

 

পূর্বপ্রস্তুতির ক্ষেত্রে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে

দিলরুবা হায়দার

ভূমিকম্প প্রসঙ্গে তিনটি বিষয় উঠে আসে—এক. ভূমিকম্প রোধ, দুই. ভূমিকম্পের প্রস্তুতি এবং তিন. ভূমিকম্প-পরবর্তী কর্মকাণ্ড। ভূমিকম্প রোধ করা তো আর সম্ভব নয়। ভূমিকম্প হচ্ছে এমন একটি দুর্যোগ, যার বেলায় আমাদের পূর্বপ্রস্তুতি এবং পরবর্তী করণীয়তে জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভূমিকম্পবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে নারীকে যুক্ত করতে হবে। নারীকে যুক্ত করার কথা আমরা এ জন্যই বললাম, যখন ভূমিকম্প হয় তখন নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার ক্ষেত্রে যখন সবাই ছুটে বের হয় তখন নারীদের বের হতে দেরি হয়। কারণ তার ওড়নাটা লাগবে। এটাই হলো বাস্তবতা। ফলে নারী ও পুরুষের বেলায় যে সামাজিক ভিন্নতা বা বাধাগুলো আছে, সেগুলো মাথায় নিয়েই আমাদের পূর্বপ্রস্তুতির স্ট্র্যাটেজিগুলো নির্ধারণ করতে হবে। আবার পূর্বপ্রস্তুতির যে কাজগুলো আছে তার অনেকগুলোই কিন্তু বাড়ির কর্ত্রীকে, যেমন—মা কিংবা স্ত্রীকে নিতে হয়। শিশুরা ভূমিকম্পের সময় কোথায় দাঁড়াবে, বিমের নিচে গিয়ে দাঁড়াবে কি না—এসব বিষয়ের সচেতনতাগুলো ঘরের কর্ত্রীকে দায়িত্ব নিয়ে করতে হয়।

 

দুর্যোগের সময় হাসপাতালগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে

অধ্যাপক ডা. রওশন আরা

আমরা ৫৩৬ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। যাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি তাঁরা মিড ও জুনিয়র লেভেল। সিনিয়র লেভেলের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রতিটি হাসপাতালে ইমার্জেন্সি প্ল্যান তৈরি করেছি। এটা বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটিকে পরীক্ষাও করতে হবে। পরীক্ষা করার পর প্রতিটি হাসপাতালে এটির কার্যক্রম শুরু করতে হবে। এটি বাস্তবায়ন করতে পারলেই দুর্যোগের সময় হাসপাতালগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে। হাসপাতালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইমার্জেন্সি বিভাগ। দুর্যোগের সময় জোন অনুযায়ী ইমার্জেন্সি বিভাগকে সাজাতে হবে। মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। দুর্যোগের সময় হাসপাতালগুলো যেন সঠিকভাবে কাজ করতে পারে সে জন্য এদের উন্নত করা প্রয়োজন। স্ট্রাকচারাল ও নন-স্ট্রাকচারাল জায়গায় কাজ করে হাসপাতাল উন্নত করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য সব এজেন্সির একত্রীকরণ জরুরি। আবার হাসপাতাল তৈরির ক্ষেত্রেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে ভূমিকম্পের পর সেটি অক্ষত থাকবে কি না।

 

সচেতনতা বৃদ্ধিতে শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে

সাবিনা ইয়াসমিন

বিশালসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। আমরা শহর ও গ্রাম উভয় জায়গায়ই স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে রেসপন্সের কাজগুলো করিয়ে থাকি। আমরা ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ারনেসের ওপরও কাজ করছি। এখন দেখা যায়, সিলেটে ভূমিকম্প হচ্ছে বলে সিলেটের স্বেচ্ছাসেবকদেরই আমরা সবাই সচেতন করছি। কিন্তু সিলেট যখন ভেঙে পড়বে, তখন তার পাশের জেলাগুলোতে যারা থাকবে বা তার কাছাকাছি যারা থাকবে তাদের জন্য অনেকগুলো স্থাপনা বা খোলা জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে, যেখান থেকে তারা যেতে পারবে। দক্ষিণাঞ্চলটা হচ্ছে ভূমিকম্পের দিক থেকে অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত এলাকা। ফলে ওখান থেকে কিভাবে আধুনিক মানের স্পিডবোট দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে যাওয়া হবে, রেসপন্স মেকানিজম ম্যাটেরিয়ালগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে কিভাবে নিয়ে যাওয়া হবে—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের আমরা এখন সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। তাদের খোলা জায়গায় নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।

 

ভূমিকম্প সহনশীল অর্থনীতি তৈরি করতে হবে

খুরশিদ আলম

ভূমিকম্প হচ্ছে এমন একটি ফেনোমেনন, যার জন্য পৃথিবীর কোনো দেশই পুরোপুরি প্রস্তুত নয়, এমনকি ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপানও নয়। তবে ভূমিকম্পের জন্য আমাদের দেশে টেকনিক্যাল সলিউশন যথেষ্ট পরিমাণে আছে। তবে আমার মনে হয়, স্যাটেলাইট টেকনোলজির ক্ষেত্রে আমাদের নতুন করে বিনিয়োগ করতে হবে। আমাদের শিল্পাঞ্চলগুলো গড়ে উঠেছে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায়। এটি একটি বড় ঝুঁকি। ফলে আমাদের অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য দ্রুত কী পদক্ষেপ নিতে হবে সেটার পরিকল্পনা এখন থেকেই করতে হবে এবং এই পরিকল্পনাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনে গিয়ে দেখেছি, সেখানে যেসব রাস্তায় গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করে সেই গাড়িগুলোকে ওখানে রেখে দেওয়া হয়। এটা হচ্ছে পরবর্তী চালকের জন্য এক ধরনের সতর্কতা, যাতে মানুষ ভুলে না যায়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে আমাদের যে শহরগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে, ওই শহরগুলোর একটি-দুটি বাড়িতে আমরা মন্যুমেন্ট করতে পারি, যাতে মানুষ ভুলে না যায়। আমাদের দেশের রংপুর শহরে একটি জাদুঘর আছে, যেটা সেই রাজবাড়ীতে, যা ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আবার আমাদের স্কুলগুলোতেও এটা করা যায়। তাহলে শিক্ষার্থীরা এটা দেখবে এবং পরে আর তাদের বলতে হবে না বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে। আমার মনে হয়, এই জায়গায় পলিসি ইনোভেশনের সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে টেকনোলজিক্যাল অ্যাডভান্সমেন্টকে প্রাধান্য দিতে হবে।



সাতদিনের সেরা