kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

কালের কণ্ঠ ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আয়োজিত ওয়েবিনার

‘কভিড পরিস্থিতিতে জেন্ডারবান্ধব বাজেট : নারীর অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়ন’

নারীর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন নেই সমাজে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তাঁদের সব কাজের স্বীকৃতি নেই। নারীর অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়নের জন্য সবার আগে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। লিঙ্গবৈষম্য নিরসনের শিক্ষা শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। শিক্ষাব্যবস্থাও নারীবান্ধব হতে হবে। নারী-পুরুষ সমতার বিষয়টির নৈতিক ও আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সুষ্ঠু বণ্টনে নজরদারি জোরদার করতে হবে। ‘কভিড পরিস্থিতিতে জেন্ডারবান্ধব বাজেট : নারীর অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়ন’ শীর্ষক ওয়েবিনারে উঠে এসেছে এসব বিষয়। জাতীয় বাজেট সামনে রেখে কালের কণ্ঠ ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে গত ৯ মে রবিবার বিকেল ৩টায় এই ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়। কালের কণ্ঠ’র অনলাইন ও ফেসবুক পেজে এই আলোচনা অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য নিয়ে আজ প্রকাশিত হলো বিশেষ ক্রোড়পত্র। গ্রন্থনা করেছেন ফাতিমা তুজ জোহরা, শম্পা বিশ্বাস ও এ এস এম সাদ

১২ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ২০ মিনিটে



‘কভিড পরিস্থিতিতে জেন্ডারবান্ধব বাজেট : নারীর অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়ন’

অঙ্কন : প্রসূন

নারীর কাজকে মূল্যায়ন করতে হবে

ইমদাদুল হক মিলন

নারীর মূল্যায়িত ও অমূল্যায়িত কাজ সম্পর্কে অবহিত থাকা জরুরি। এ দেশে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। তবে ধীরে ধীরে এই ধারা পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে সঠিক অধিকার দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবার মূল্যবোধ জাগ্রত হওয়া প্রয়োজন। ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশে পরিবারে একজন পুরুষ বাসার কাজে নারীকে সহায়তা করে। এতে পরিবারের সবাই (নারী-পুরুষ) কাজ ভাগ করে নিচ্ছেন। ফলে সেসব দেশে সমাজে নারীর একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ও এই উপমহাদেশে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বিয়ের পর পুরুষরা ভাবে নারীরা সংসারের কাজ আর বাচ্চা লালন-পালন করবে। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে একজন নারীরও শরীর খারাপ হবে। তাঁর স্বাস্থ্যের সঠিক পরিচর্যা দরকার। সেদিকে বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, নারীর অধিকার ও মূল্যায়ন নিয়ে বহু বছর কাজ করা হলেও মানুষকে সচেতন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সমাজ থেকে এখনো বৈষম্য দূর হয়নি। গার্মেন্টশিল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। এটি অন্যতম শক্তিশালী একটি খাত। এ শিল্পেও নারীরা যথেষ্ট অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে। তবু গার্মেন্ট নারীরা এখনো ন্যায্য মূল্য পান না। নারীরা বিভিন্ন জায়গায় পুরুষের সঙ্গে কাজ করেও কম পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। তাই নারীর অধিকার নিশ্চিত করা ও নারীর কাজকে মূল্যায়ন করার জন্য অবশ্যই তৃণমূল থেকে এসব সমস্যা সমাধান করা জরুরি। আসন্ন বাজেটে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ রাখতে হবে—কয়েক বছরের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই বাজেট তৈরি করতে হবে।

 

নারীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বিশেষ সুবিধা দরকার

ফরিদা ইয়াসমিন

অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোতে নারীর কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে না। জিডিপিতে নারীর অবদান এখন ২০ শতাংশ। অথচ সংসারের ভেতরে-বাইরে নারী যে কাজ করেন সেগুলোর মূল্যায়ন ধরলে এই অবদানের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ পুরুষের কাজের প্রায় সমান। কিন্তু নারীরা যখন ঘরের কাজ করেন তখন সেই হিসাবের সঙ্গে এই অবদানটির পরিমাণ যোগ হচ্ছে না।

অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু আলাদা ব্যবস্থা আছে। নারীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই সংখ্যাটা বেড়ে আজ পঞ্চাশে দাঁড়িয়েছে। আজ কিন্তু এ কারণেই তৃণমূল পর্যায়ে নারীরা ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে আসছেন। নারীরা ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান হচ্ছেন। এভাবে তাঁরা সংসদেও প্রতিনিধিত্ব করছেন। এভাবে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন।

একজন নারী ব্যাংকে গেলে তাঁকে যদি ব্যাংক একটি বিশেষ ঋণ সুবিধা দেয়, তাহলে তিনি কিন্তু কাজটা করতে আরো আগ্রহী হবেন এবং এগিয়ে যাবেন। এভাবে তাঁকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

 

৬৯ শতাংশ নারী কৃষিতে অবদান রাখছেন

ড. ইসমত আরা বেগম

বর্তমানে নারীর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে কৃষি খাতে। আগেও কৃষিতে নারীদের অবদান ছিল। তবে তা দৃশ্যমান ছিল না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করার জন্য কৃষিতে নারীর অবদান বৃদ্ধি শুরু হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি নানা প্রশিক্ষণে তাঁরা অংশ নিচ্ছেন। ফলে এই নারীরা এখন তৃণমূল ও গ্রামীণ পর্যায়ে নিজেদের বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত করতে পারছেন। এতে তাঁদের হাতে অর্থ আসছে। তাঁরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা অবদান রাখছেন। ৬৯ শতাংশ নারী কৃষিতে অবদান রাখছেন।

নব্বইয়ের দশকের তুলনায় বর্তমানে নারীরা কৃষিতে বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছেন। আগে নারীরা ধান ঝাড়াই-মাড়াই কাজ করতেন। বর্তমানে রোপণ-বপন থেকে শুরু করে নানা রকমের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন তাঁরা। কভিড পরিস্থিতিতে নানা জায়গায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছিল। সে সময় নারীরা ঘর থেকে বের হয়ে বিভিন্ন স্থানে কাজ করেছেন। কিন্তু অনেক জায়গায় নারীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

আসন্ন জাতীয় বাজেটে নারীর অবদান ও ব্যবসা প্রসারের ক্ষেত্রে একটি গবেষণা করা জরুরি বলে মনে করি। নারীকে সম্মান দেওয়ার জন্য অবশ্যই ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। কভিডের এই সময়ে তাঁরা নানাভাবে অনলাইনে কাজ করে যাচ্ছেন। ইন্টারনেটের কারণে তাঁরা নিজেদের পরিবর্তন করতে পারছেন। তবে এখনো অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি করতে পারেননি তাঁরা। সে ক্ষেত্রে তাঁদের আরো সহায়তা দেওয়া জরুরি। একজন দক্ষ নারী তৈরি করা শুরু করলে অন্য নারীরাও এগিয়ে আসবেন।

 

সরকার-এনজিও-মিডিয়ার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

ড. শেখ মুসলিমা মুন

জেন্ডার বাজেট নিয়ে ৪৩টি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। জেন্ডার বাজেটে সরকার ৩০ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছে। নারীর যেসব শ্রম মূলায়ন হয় না সেটাকে সরকারের বাজেটে কিভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেটা দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। নারীর গৃহকর্মের মূল্যায়ন পাওয়া যায় না। পুরুষ ও নারীর বিনিময় শ্রমকে ৫০:৫০-এ উন্নীত করার কথা বলেছে সরকার। আমাদের আরো সমন্বিত হতে হবে। এ জন্য সরকার, এনজিও, মিডিয়া সবাইকে একত্র হতে হবে। তাহলে বিনিময়যোগ্য শ্রমকে সমান করা সম্ভব। মিডিয়ায় নাটক-সিনেমায়ও কিন্তু নারীর মূল্যায়ন হতে দেখা যায় না। মানসিকভাবে মূল্যায়ন করার মানসিকতা আমাদের গড়ে তুলতে হবে। শুধু পরিবার নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরকে নারীর কাজের মূল্যায়ন করতে সংবেদনশীলতা বাড়াতে হবে। মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় নারীর ক্ষমতায়ন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, সচেতনতা, সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ বহুমুখী কার্যক্রম চলমান। জেন্ডার বাজেটিং, নারীর অবমূল্যায়নসহ সব দিক নিয়ে কাজ করছে সরকার। তবে সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়।

 

নির্বাচনী অধিকার, নৈতিক শিক্ষা ও আইনি স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

নারীর অমূল্যায়িত শ্রমের ধারণা ও পদ্ধতিগত পর্যালোচনার একটা বিরাট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। কবির ভাষায়—তুমি যদি অন্ধ হও এবং আমার সৌন্দর্য দেখতে না পাও, তার মানে এটা নয় যে সেটা বিরাজমান না। আমরা যদি অন্ধ হই, নারীর শ্রমের প্রকৃত মূল্য দেখতে না পাই তার মানে এই নয় যে তার শ্রমের মূল্য নেই। সরকারের পক্ষ থেকে বিগত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি পরিবর্তন এসেছে। এটা স্বীকার করতে হবে। পাসপোর্টে পিতার নামের সঙ্গে মাতার নাম যুক্ত করা হয়েছে। এটিও বড় পরিবর্তন। সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করেছে, এটাও বড় ধরনের স্বীকৃতি। যাঁরা মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করছেন ছুটি শেষে তাঁরা যেন পুরনো কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারেন তা দেখতে হবে।

আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে নারীবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। ধর্মগুরুরা নারীবিদ্বেষী কথা বলেন। অথচ সেটার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নেতাদের কোনো বক্তব্য নেই। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য নারীর স্বাধীনতা ও কাজের মূল্যায়ন কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা রাজনৈতিক নেতাদের আলোচনায় কখনো দেখিনি। এটা বড় ধরনের ঘাটতি। এর সূত্রপাত হয় শিক্ষাব্যবস্থা থেকে। ছোটবেলা থেকেই পরিবারে শিক্ষা দিতে হবে। সংসদে ও বাইরে নারীর কাজের মূল্যায়ন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে হবে, নারীর জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকতে হবে। পাশাপাশি নারীকে মূলধারার সঙ্গে রাখতে হবে। সংরক্ষিত আসনের একজন নারী এমপি কত ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকেন। উপজেলার সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিরা প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসেন, তাহলে জাতীয় সংসদ সদস্যরা কেন প্রত্যক্ষ নির্বাচনে আসবেন না?

নারী অধিকারের আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। বিষয়টি আইনি স্বীকৃতির মধ্য নিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ নারী ও পুরুষকে আইনের সমান দৃষ্টিতে দেখতে হবে। তাঁকে সম্পত্তির অধিকারের মধ্যে রাখতে হবে, শিশুর ওপর কর্তৃত্বের অধিকার, বিয়েবিচ্ছেদের অধিকার থাকতে হবে। পরিবারে সন্তানকে এ বিষয়ের ওপর নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। আইনি ভিত্তি পরিষ্কার করতে হবে এবং অবমূল্যায়িত কাজকে আইনি স্বীকৃতির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। মূল্যবোধের ক্ষেত্রে নারীর অধিকারের ওপর বিতর্ক আরো জোরদার করতে হবে। ধর্মান্ধতার ভেতর যে বৈষম্য আছে সেটাকে দূর করতে হবে। ইউনিভার্সাল সিভিল কোর্টের মধ্য দিয়ে নারীর সামগ্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

 

পুরুষের চেয়ে বেশি কাজ করেও নারী অমূল্যায়িত

অধ্যাপক তানিয়া হক

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতার কথা বললে দেখা যাবে অধিকসংখ্যক নারীকে আমরা শ্রমবাজারে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি। কিন্তু অধিকসংখ্যক পুরুষকে ঘরের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়নি। গবেষণা থেকে দেখা যায়, পুরুষের থেকে বেশি কাজ করেও নারী অমূল্যায়িত। পুরুষের তুলনায় নারী কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ কাজ করা সত্ত্বেও জিডিপিতে তার স্বীকৃতি নেই। গবেষণার তথ্য মতে, একজন পুরুষ নারী অপেক্ষা ১২ শতাংশ ফ্রি সময় কাটান। একজন নারী দৈনিক ১৫-১৬ ঘণ্টা কাজ করার পরও তাঁকে কটু কথা শুনতে হয়। অর্থনৈতিক আলোচনায় লিঙ্গবৈষম্য অনেকটা উপেক্ষিত হয়। ঘরের কাজ হচ্ছে নারীর কাজ—এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই আনতে হবে পরিবর্তন। সমবণ্টন হিসেবে কথা বললে অবশ্যই নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। সব ক্ষেত্রেই কম্প্র্রিহেনসিভ ফ্যামিলি পলিসি থাকা প্রয়োজন। যেখানে সন্তানের পিতা-মাতা শেখাবে ঘরের কাজের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে বলে আলাদা কিছু থাকবে না। আসলে উন্নয়নের সূচক জিডিপি ও জিএমপির মধ্যেই আমরা এখনো আবদ্ধ রয়েছি।

 

জেন্ডার বাজেট করার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ফ্রেম থাকা দরকার

অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা

আমাদের দেশে বেশ কয়েক বছর ধরে জেন্ডার বাজেট হচ্ছে। সেটা অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। কারণ জেন্ডার বাজেট হচ্ছে বলেই এই পুরো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি জেন্ডার বাজেটের পদ্ধতিগত দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব খুব সুনির্দিষ্ট বা আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জেন্ডার সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নারী বা পুরুষের জন্য বরাদ্দটা করা হয় না। অর্থাৎ প্রক্রিয়াগত দিক দিয়ে এটাতে বড় ধরনের সাবজেকটিভ বায়াস রয়েছে। তাই আমি প্রথমেই বলতে চাই যে জেন্ডার বাজেট করার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত জায়গায় একটি সুস্পষ্ট ফ্রেম থাকা দরকার। পাশাপাশি যাঁরা জেন্ডার বিশেষজ্ঞ রয়েছেন তাঁদের পরামর্শ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সেলের মাধ্যমে এই জেন্ডার বাজেটটা সঠিকভাবে, সঠিক সময় নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকালে এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসংগতি চোখে পড়বে। এর মধ্যে একটি জেন্ডার বাজেটের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন কিভাবে হবে সে বিষয়ে আমাদের চিন্তা করা উচিত। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

 

পারিবারিক দায়দায়িত্বের জায়গায় ভারসাম্য আনতে হবে

শাম্মিন সুলতানা

গৃহস্থালির জন্য যে কাজ সেটা অবমূল্যায়িত থেকে যায়। এই কাজগুলোকে কাজ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা দরকার। এ ক্ষেত্রে আমাদের একটি রূপান্তরমূলক এজেন্ডারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। পারিবারিক দায়দায়িত্বের জায়গায় ভারসাম্য আনতে হবে। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অবমূল্যায়িত কাজ যার বিনিময়ে পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না, সেগুলো ইনফরমাল সেক্টরে বেশি। এই সেক্টরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা মজুরি থেকে বঞ্চিত কিংবা কম মজুরিতে কাজ করছেন। এ ক্ষেত্রে নারীর বারগেনিং পলিসি, দক্ষতা, শিক্ষা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। এদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। আইনি ক্ষেত্রগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। নারীর সেবামূলক কাজগুলো মূল্যায়িত হচ্ছে কি না তা নিয়ে আইএলও কাজ করছে।

 

গৃহকর্মকে পেশা হিসেবে গণ্য করতে হবে

সৈয়দা রুবিনা আক্তার

সবার আগে আমাদের জানতে হবে নারীর অমূল্যায়িত কাজগুলো কী। নারীর অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়ন করতে হলে যাঁরা তাঁদের বাস্তব জীবনে এসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন তাঁদের মুখ থেকেই তা জানতে হবে। প্রথাগতভাবেই এই সমাজ পুরুষের। কিন্তু কাজ নারীরাই বেশি করছেন। বাচ্চা জন্ম দেওয়া থেকে শুরু করে স্বামীর সেবা—সব কাজই একজন নারী করেন। কিন্তু সমাজপতিরা বা পুরুষ শ্রেণি কখনোই এটার মূল্যায়ন করেনি। অনেকে বাসায় কাজের লোক রেখে ঘরের কাজগুলো করান, বিনিময়ে তাকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। একজন নারীকে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ঘরের সব কাজ করতে হয়। তবু তাঁকে পেশার জায়গায় লিখতে হয় গৃহিণী। এটা তাঁর পরিচয়, পেশা নয়। কিন্তু যখন এই পরিচয়কে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি পেশায় নিয়ে আসা হবে, তখনই সেটার স্বীকৃতি মিলবে। অর্থাৎ গৃহকর্মটা একটি পেশা হিসেবে গণ্য হবে তখন। যখন একজন নারী তাঁর আবেদনপত্রে পেশার জায়গায় লিখতে পারবেন গৃহিণী, তখন সেটা হবে তাঁর অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়ন। নারীর জন্য বিধবা ভাতা, পুরুষ দ্বারা নিগৃহীত নারীদের ভাতাদানসহ নারীদের জন্য সরকার অনেক বাজেট রাখে। তবে সেই বাজেটের কাজগুলো গ্রাম পর্যায়ে কতটা হচ্ছে সেটা আমাদের এনজিওগুলোকে দেখতে হবে। আমরা নারীরা পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ও কাজে সমতা চাই। নারী হিসেবে অতিরিক্ত কিছু চাচ্ছি না। আমরা আমাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ চাই। আমাদের যেন নারী হিসেবে অযোগ্য বিবেচনা না করা হয় কিংবা বাদ দেওয়া না হয়। আমরা নারীদের জন্য সেই জায়গাটা চাই।

 

অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়ন বিষয়ে কথা বলা অব্যাহত রাখতে হবে

ড. নাজনীন আহমেদ

অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়ন করতে গেলে বোঝা যায় বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ; তার মধ্যে নারী কতটা করছে আর পুরুষ কতটা করছে। এই মূল্যায়নাটা করতে গেলে দেখা যাবে, নারী এই কাজগুলোতে বেশি অন্তর্ভুক্ত। তাই যখন অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়ন হবে তখন বোঝা যাবে সে নারীটি অর্থনৈতিকভাবে বিশেষ করে ক্ষমতায়িত নন। অমূল্যায়িত কাজ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত নারীরাও করেন। কিন্তু যাঁরা, বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে একটুও ক্ষমতায়িত নন সেই জায়গাটিতে এটা বিশেষ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

অনেক কর্মশালায় বলা হয়ে থাকে যে নারীর কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে। আমি বলব, কোনো কাজই নারীর নয়। কোনো কাজের গায়ে লেখা নেই, এটা নারীকেই করতে হবে। এটা অমূল্যায়িত কাজ এবং সেটার স্বীকৃতি দরকার। অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়ন হওয়া দরকার। আমাদের জানা যেসব পন্থা আছে সেগুলো যদি অবলম্বন করা হয়, তাহলে বিষয়টি ফোকাসে আসবে। যেহেতু এই কাজটা নারীরাই বেশি করছেন, তাই তাঁরা এর সুবিধাটা বেশি পাবেন। কাজেই আমাদের চাইতে হবে অমূল্যায়িত কাজের স্বীকৃতি।

অনেক নারী তাঁর গৃহকর্মের বিষয়টি অর্থনীতি বা টাকার অঙ্কের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে চান না। এটাকে তিনি মহান কাজ মনে করছেন। এই ভাবনাটাও কিন্তু আরোপিত। তিনি এই কাজগুলো করে নিজেকে মহান ভাবতে শিখেছেন। মনে করছেন, এটা করলেই তিনি মহান হবেন। তাঁর মনে হয় গৃহকর্মের কাজে তাঁকে খুব ভালো হতে হবে, ভালো রান্না জানতে হবে। তাহলেই তিনি মহান। এভাবে সমাজ তাঁকে পিছিয়ে রাখে। বর্তমানে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। তবে এটাতে আরো পরিবর্তন আনতে হবে। আমি মনে করি অমূল্যায়িত কাজের মূল্যায়ন বিষয়ে আমাদের কথা বলা অব্যাহত রাখতে হবে।

 

পিতৃতান্ত্রিকতা গ্রাস করছে নারীকে

অধ্যাপক ড. লায়লা আশরাফুন

একটি চুলাকে কেন্দ্র করে একটি পরিবার সৃষ্টি হয়। একজন নারী এই পরিবারটিকে পরিচালনা করেন। এটা কিন্তু শুধু আজকের কথা নয়। যখন থেকে পরিবারের সৃষ্টি হয়েছে, যখন থেকে নারী সেই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তখন থেকেই গৃহস্থালি কাজগুলো নারীকে করতে হচ্ছে। কারণ এটাকে মনে করা হয় নারীর প্রতিরূপ, এটা নারীর কাজ, এটাই তাঁর কর্তব্য। যখন একজন নারীর বিয়ে হয় তখন থেকেই সার্বক্ষণিকভাবে সংসারের কাজের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা হয়। সে বাইরে চাকরি করুক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হোক কিংবা সে রাজনীতি করুক; তাঁকে কিন্তু সংসারের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতেই হয়। সংসারের কাজটাকে মনেই করা হয় যে এটা নারীর নিজের কাজ।

আসলে আমাদের যে রীতি রয়েছে সেখানে পিতৃতান্ত্রিকতাকে শক্তি মনে করা হয়। এটা কিন্তু নারীরাই প্রয়োগ করেন। যখন নারী বিবাহিত হন, তখন স্বামী, শ্বশুর, দেবর, ভাশুর; অর্থাৎ পরিবারের পুরুষরা কিন্তু এমনটা করতে বলে না। এই প্রয়োগটা নারীই নারীর ওপর তুলে দেয় এবং যুগ যুগ ধরে এভাবেই সমাজ পরিচালিত হচ্ছে।

ঘরের কাজের প্রতি নারীর এত কেয়ার দেওয়ার পরও কিন্তু তাঁকে অবমূল্যায়িত করা হয়। ফলে এই বিষয়গুলোর পরিবর্তন কিভাবে করা যায় সেটা ভাবতে হবে। নারী ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু সেই অর্থ সে ব্যবহার করতে পারছে না। সেটা ব্যবহার করছে তার পুরুষ অভিভাবক।

 

সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই বঞ্চনাহীন সমতার সমাজ

আজিজুল পারভেজ

আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা বঞ্চনার শিকার হয়েও বিদ্যমান পরিস্থিতি অবলীলায় মেনে নিচ্ছেন। পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা এবং সমাজে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে এই অবস্থা বিরাজ করছে। নারীর এই বঞ্চনার বিষয়গুলোকে তুলে আনতে হবে। অবস্থার উন্নয়ন ও মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য সচেতনতা তৈরির প্রয়াস চালাতে হবে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এবং সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই বঞ্চনাহীন সমতার সমাজ গড়ে উঠতে পারে।

 

 

নারীর সার্বিক উন্নয়ন বিবেচনায় নিয়েই বাজেট তৈরি করা দরকার

শাহীন আনাম

বিশ্বব্যাপী যেকোনো দুর্যোগেই নারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও অন্যান্য সংস্থার জরিপে উঠে এসেছে, করোনার মধ্যে নারীদের ওপর সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে বেড়েছে। নারীরা বিভিন্ন জায়গায় চাকরির মাধ্যমে নিজেদের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কভিড এসে অর্থনৈতিক অবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক বিবেচনায় নিয়ে বাজেট তৈরি হচ্ছে কি না সে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। সরকার চারটি মন্ত্রণালয় থেকে জেন্ডার রেসপনসিবল বাজেটের কার্যক্রম শুরু করেছিল। বর্তমানে ৪৩টি মন্ত্রণালয়ে সেটির কার্যক্রম রয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু বাজেটে নারীদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে যা বরাদ্দ দেওয়া হয় তা প্রয়োজনের থেকে কম। কভিডের কারণে নারীরা যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তা কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি। খুব সহজে এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।

করোনার কারণে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নারীর অস্বীকৃত কাজ গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছেন। নারীর এই কাজের অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। করোনার মধ্যে বহু নারী চাকরি হারিয়েছেন। তাঁদের জীবনযাত্রার মান অনেক নেমে গেছে। তাই নারীর সার্বিক উন্নয়নের দিক বিবেচনা করেই আগামী অর্থবছরের বাজেট তৈরি করতে হবে। বাজেট প্রণয়নে নারীর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কথা বিবেচনায় নিতে হবে।

নারী অধিকার নিয়ে যতই কথা বলা হোক না কেন, আইনি প্রক্রিয়া ও কাঠামোগত পরিবর্তন করা না হলে সুফল আসবে না। সঙ্গে ধ্যান-ধারণা বদলাতে হবে। কারণ পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত নারীকে নিয়ে একটা খারাপ দৃষ্টিভঙ্গি অনেকেই পোষণ করেন। আইনের মাধ্যমে এগুলো বদলাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ও নারী বৈষম্য নিয়ে যত রকমের আইন আছে তা সংশোধন করতে ইচ্ছুক। কিন্তু দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো সাড়া দেখা যাচ্ছে না। এই আইন পরিবর্তন না করলে নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

 

নারীর পছন্দমতো কাজ বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে

বনশ্রী মিত্র নিয়োগী

২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতিটি মন্ত্রণালয় থেকে একটা জেন্ডার বাজেটের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই থেকে গত বছরের জেন্ডার বাজেট দেখে আমরা তুলনামূলকভাবে হতাশ হয়েছি। কারণ কাঙ্ক্ষিত কোনো ফলই সেখানে প্রতিফলিত হয়নি। সামনে নারীর ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার মতো বাজেট তৈরি হচ্ছে কি না সে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। সমাজে নারীরা নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। আসন্ন বাজেটে নারীদের জন্য নতুন কী ধরনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে সেটি উঠে আসা দরকার। কভিড আক্রমণে শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, আনুষঙ্গিক আরো অনেক কিছু জড়িয়ে রয়েছে। আবার কভিডের কারণে যাঁরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন তাঁদের কথাও উঠে আসাটা জরুরি। ভৌগোলিক, সমাজ, পেশা, ধর্মসহ নানা কারণে নারীরা বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে তাঁদের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা যায়, করোনার কারণে শহরকেন্দ্রিক প্রায় ৫৩ শতাংশ নারী অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আর গ্রামে এই সংখ্যাটা ৯২ শতাংশ। এই যে ক্ষতিগ্রস্ত নারী, তাঁদের নিয়ে পরিকল্পনা কী হবে তা বাজেটে উঠে আসা জরুরি। ৭৭ শতাংশ নারী বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছেন। কভিডে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে প্রথমে তাঁরা তাঁদের আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীর কাছে ধার করেন। দ্বিতীয়ত, গয়না বা সম্পদ বন্ধক রাখেন। শেষ পর্যায়ে অনেক নারীই জমি ও গরু বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে তাঁরা দারিদ্র্যের দিকে আরেক ধাপ নেমে যাচ্ছেন। ফলে আমাদের গবেষণার মাধ্যমে সার্বিক অবস্থা তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। এই ডাটা থেকে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। দেশে বিভিন্ন ধরনের থিংক ট্যাংক রয়েছে। এসব গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের অবশ্যই জেন্ডার বিষয়ক সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। মিডিয়া ও এনজিও থেকে জেন্ডার অ্যানালিসিসের ওপর কাজ করা জরুরি। এই উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। সব নারীকেই শ্রমবাজারে আসতে হবে এমন কোনো কথা নেই। নারীর পছন্দমতো কাজ বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে, তাহলেই কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য কমে আসবে।

 

শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনার যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

নারীর কাজের মূল্যায়ন করতে হলে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে। শ্রমের অবমূল্যায়ন হচ্ছে বলেই আমাদের যা প্রাপ্য সেটা পাচ্ছি না। এই না পাওয়ার পেছনে কারণ হলো আমাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। সরকার জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দ রেখেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সেখানে নারীদের জন্য বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ৭১৫ কোটি টাকা, যা প্রায় ৩৯ শতাংশ। সারা বিশ্বে জেন্ডার সমতায় আমরা ৫৫তম। আর দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমে অবস্থান করছি। গ্রামাঞ্চলে নারীর কাজের মূল্যায়ন সচেতনতার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হবে।

সরকারি শ্রমঘণ্টায় নারীরা পিছিয়ে আছে। সেখানে নারীরা ৩৮ ঘণ্টা শ্রম দেন। কিন্তু সংসারে নারীরা কিন্তু একই পরিমাণে শ্রম দিচ্ছেন। আমরা একজন পুরুষ শ্রমিককে ১০০ টাকা দিলে নারীকে ৯০ টাকা দিচ্ছি। অথচ একই সময় ধরে তাঁরা কাজ করছেন। ২০ লাখ ৫০ হাজার বিধবা নারীকে সরকার থেকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের বেশির ভাগ বাজেট নারীদের দেওয়া হচ্ছে। সারা দেশে প্রশিক্ষণ হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে। কৃষিক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু সেখানেও বৈষম্য। সর্বোপরি নারীর কাজের প্রশিক্ষণের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তাঁর অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, এসএমই ফাউন্ডেশন, সমাজসেবা অধিদপ্তর নারীর উন্নয়নে কাজ করছে। নারী-পুরুষ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে উন্নয়নের দিকে আমরা নিয়ে যাব।