kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ বৈশাখ ১৪২৮। ২০ এপ্রিল ২০২১। ৭ রমজান ১৪৪২

কালের কণ্ঠ-বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লি. গোলটেবিল : করোনাকালীন ক্যান্সার চিকিৎসা

দেশব্যাপী ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ ও দক্ষ জনবল বাড়ানো দরকার

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



দেশব্যাপী ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ ও দক্ষ জনবল বাড়ানো দরকার

দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আর এই প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা। দ্রুততম সময়ে রোগ চিহ্নিত করা গেলে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এ জন্য সচেতনতার পাশাপাশি রোগ চিহ্নিত করতে সারা দেশেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করে তাঁদের জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। দেশের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উপলক্ষে কালের কণ্ঠ ও বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ‘করোনাকালীন ক্যান্সার চিকিৎসা’ শীর্ষক গোলটেবিলে তাঁরা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল বৈঠক নিয়ে প্রকাশিত হলো বিশেষ ক্রোড়পত্র। গ্রন্থনা করেছেন শম্পা বিশ্বাস, সজিব ঘোষ ও এ এস এম সাদ। সমন্বয় করেছেন আজিজুল পারভেজ

 

যাঁরা অংশ নিয়েছেন

সেশন সভাপতি

মোহাম্মদ এবাদুল করিম

সংসদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড

 

সম্মানিত অতিথি

অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম

মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

 

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হাই

সভাপতি, অনকোলজি ক্লাব বাংলাদেশ

 

অধ্যাপক ডা. মোল্লা ওবায়দুল্লাহ বাকি

সভাপতি, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি

আলোচক

অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার

সভাপতি, মেডিক্যাল অনকোলজি সোসাইটি

 

অধ্যাপক ডা. মো. মোয়াররফ হোসেন

সাবেক পরিচালক, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

 

অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, প্রকল্প পরিচালক ও যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি

 

অধ্যাপক ডা. কামরুজ্জামান চৌধুরী

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল

 

অধ্যাপক ডা. কাজী মুশতাক হোসেন

পরিচালক, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট   ও হাসপাতাল

 

অধ্যাপক ডা. মো. এহেতশামুল হক

অনকোলজি বিভাগের প্রধান, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল

 

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন

বিভাগীয় প্রধান, ক্যান্সার বিভাগ, স্কয়ার হাসপাতাল

 

ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ

সহযোগী অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান, রেডিওথেরাপি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

 

ডা. পারভিন আক্তার বানু

চিফ কনসালট্যান্ট, অনকোলজি বিভাগ

ডেলটা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল

 

ডা. অসীম কুমার ঘোষ

সহযোগী অধ্যাপক ও রেডিয়েশন অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের প্রধান, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

 

সঞ্চালনা

তৌফিক মারুফ

ডেপুটি চিফ রিপোর্টার, কালের কণ্ঠ

 

আমাদের ওষুধ বিদেশেও যাচ্ছে এটা আমাদের জন্য গৌরবের

মোহাম্মদ এবাদুল করিম, এমপি

আমাদের দেশের কত রোগী চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভারতে যায়। এই রোগীরা যদি দেশে চিকিৎসা নিত বা নিতে পারত, তাহলে দেশের কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় হতো। বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানে তো একটি পরিবারকে সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাওয়া। বিমানভাড়া, হোটেলভাড়া, চিকিৎসা খরচ—সব মিলিয়ে অনেক গুণ বেশি খরচ দিয়ে তারা সেখানে চিকিৎসা করায়। বাংলাদেশে যে চিকিৎসা পাঁচ লাখ টাকায় পাওয়া যায়, সেখানে বিদেশে লাগে ৫০ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে আমি বলব, আমাদের দেশের অনেকের বিদেশি পণ্যের প্রতি দুর্বলতা আছে। তাদের কাছে বিদেশি পণ্য মানেই ভালো পণ্য। আসলে বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক পণ্য বা শিল্প বিদেশের চেয়ে ভালো করছে; এর মধ্যে ওষুধশিল্প অন্যতম। ক্যান্সারের ওষুধ সহজলভ্য করার জন্য আমরা প্রথম দেশে ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদন শুরু করি। আমরা সফল হয়েছি। এখন অনেকেই এগিয়ে আসছে। আমাদের ওষুধ বিদেশেও যাচ্ছে। এতে দেশ যেমন লাভবান হচ্ছে, আমাদের মর্যাদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা আমাদের জন্য একটা গৌরবের জায়গা। আমাদের দেশ ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে সরকারের একার পক্ষে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য সামগ্রিকভাবে সবার অংশগ্রহণ দরকার। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেবেন। একসময় মানুষ সরকারি হাসপাতালে নয়, বরং প্রাইভেট ক্লিনিকে সেবা নিতে চাইত। তাদের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল। এখন তা অনেকাংশে কমে গেছে। এখন মানুষ সরকারি হাসপাতালে আসছে এবং সেখান থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। তবে দালালরা অনেক সময় তাদের প্রলুব্ধ করে। তারা রোগীদের জন্য নানা ফাঁদ পাতে। এই দালালদের হাত থেকে রোগীদের রক্ষা করাটাও আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তা ছাড়া গ্রামগঞ্জে এখন অনেক ক্লিনিক হয়েছে, যেখানে কোনো রেজিস্টার্ড ডাক্তারই নেই, নন-কোয়ালিফায়েড চিকিৎসক দিয়ে সেখানে চিকিৎসা চলে। এগুলো আমাদের নজরে আনা উচিত। পাশাপাশি এগুলো নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

 

প্রথম দিকের সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি

অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক

প্রথম দিকে আমরা একটু ইতস্তত করেছিলাম যে কিভাবে আমাদের ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসায় নিয়ে আসব। পরে ক্যান্সার নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। কথা বলেছি যে কিভাবে আমাদের রোগীদের চিকিৎসা দিতে পারি। পরে আমরা আমাদের মতো করে প্রথম দিককার সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি এবং যথাযথভাবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা দিয়ে গেছি।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি হচ্ছে এমন একটি জায়গা—এটা না সরকারি, না বেসরকারি। তবু আমরা আমাদের রোগীদের সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছি। ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৩৩ লাখ টাকার চিকিৎসা আমরা বিনা মূল্যে দিয়েছি। আমরা সরকারের কাছ থেকে সামান্য কিছু সহযোগিতা পাই। সেটি অপারেশনাল কস্ট। এর বাইরে কিছু প্রতিষ্ঠান আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করছে। এভাবেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। করোনার সময় আমরা ক্যান্সার রোগীদের  জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও নিয়েছি।

 

বছরে যোগ হচ্ছে দুই থেকে আড়াই লাখ রোগী

অধ্যাপক ডা. কাজী মুশতাক হোসেন

ক্যান্সার চিকিৎসার সংকটের তীব্রতা বোঝার জন্য আমাদের যে ডাটা থাকার কথা, সেখানে ঘাটতি রয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে থাকার সময় তিন বছরে একটা ডাটা তৈরি করেছিলাম, কোন ধরনের কত রোগী এসেছে। আমাদের মতো বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশেই ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট ডাটাবেইস নেই। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য ও পারিপার্শ্বিক তথ্য মিলে যে ডাটা আছে সেটি দিয়েই আমরা বলি, বাংলাদেশে বছরে দুই থেকে আড়াই লাখ ক্যান্সার রোগী যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার রোগীকে জানুয়ারি মাসে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এখানে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের এখানে ক্যান্সার রেজিস্ট্রি ডাটা সিস্টেম চালু করেছি। সব মেডিক্যাল কলেজে এটা করতে পারলে মোটামুটি একটি চিত্র পেয়ে যাব। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর থেকে রোগীর চাপ কম ছিল। কিন্তু আমরা ডাক্তার ও রোগীদের সুরক্ষা বিধিগুলো মেনে ক্যান্সার বিভাগ খোলা রেখে কাজ চালিয়ে গেছি। আমাদের একজন সহকর্মীকেও আমরা হারিয়েছি। ওই সময়ও আমাদের সার্জারিসহ সব ধরনের কার্যক্রম চালু ছিল।

 

দ্রুত শনাক্ত হলে অনেক ক্ষেত্রেই ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব

অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম

ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। এটা কিন্তু আমরা করতে পারছি না। বাংলাদেশের প্রতিটি হাসপাতালেই ক্যান্সারের কিছু না কিছু চিকিৎসা হয়। ক্যান্সারের চিকিৎসা শুধু কাউন্সেলিং, থেরাপি বা অপারেশন করা নয়; এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ। তার মানে তাকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে অপারেশনের পর বা চিকিৎসার পর সমাজে পুনর্বাসন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই আমাদের সহায়তা লাগবে। সেই জায়গাগুলো এখনো আমাদের তৈরি হয়নি। আমরা যেটা করতে পারব সেটা হচ্ছে, মেডিক্যাল কলেজগুলোতে বিদ্যমান ডিপার্টমেন্টগুলোকে দ্রুত শক্তিশালী করা। এসব জায়গায় আমাদের জনবলও আছে। হয়তো পুরোটা নেই, তবে যতটা আছে সেটাই আমরা কাজে লাগাতে পারি। দেশের আটটি বিভাগে আটটি ক্যান্সার হাসপাতাল হবে। এটার জন্য এরই মধ্যে একটি পরিকল্পনা পাস হয়েছে। আরেকটি বিষয়, বাংলাদেশের সব জেনারেল সার্জনই ক্যান্সার সার্জারি করেন। তবে শুধু ক্যান্সার সার্জারির জন্য স্পেশালি অনকোলজিস্ট বা অনকোলজি সার্জন পাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেকটা পিছিয়ে আছি। সামনের দিকে আমরা এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারব। একটি বিষয় সব সময় মনে রাখতে হবে, ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আর্লি ডিটেকশন। দ্রুততম সময়ে এটা নির্ণয় করতে পারলেই অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সার নিরাময় করা সম্ভব।

 

দেশেই ক্যান্সারের ভালো চিকিৎসা হয়

অধ্যাপক ডা. মো. মোয়াররফ হোসেন

রেডিয়েশন অনকোলজিস্টরা হচ্ছেন আর্কিটেক্টের মতো। তাঁরাই চিকিৎসার সব প্ল্যান-প্রগ্রাম করে থাকেন। সহজে বোঝানোর জন্য কাউকে ছোট না করে বলছি, ফিজিসিস্টরা হচ্ছেন রাজমিস্ত্রির মতো। মূলত দুজন মিলেই কাজটি করে থাকেন। আমাদের ফিজিসিস্ট তৈরি হচ্ছে, কিন্তু পদ নেই। ফিজিসিস্টের আরো পদ তৈরি করা হলে দেশের মানুষকে বিদেশে যেতে হবে না। দেশেই উন্নত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। করোনার সময় আমাদের রোগীদের বিদেশ যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যারা আগে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে এসেছে, তারা একেবারে হৈচৈয়ের মধ্যে পড়ে গেল। দেশে ক্যান্সারের ভালো চিকিৎসা হয়—রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপিসহ সব কিছুই আছে। এখন শুধু দরকার আমাদের প্রতি আস্থা। আপনার পরিবারে যদি কোনো শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে থাকে, তাহলে তাদের বলুন কম্পিউটারে একটু খুঁজে দেখতে। তারা বুঝতে পারবে, আপনার রোগটা কী, কোন স্টেজে আছে, চিকিৎসা কী। তার পরই আপনি বুঝে যাবেন, দেশের চিকিৎসক আপনাকে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন কি না।

 

চিকিৎসা সহায়তায় বীমা কম্পানিগুলোর এগিয়ে আসা দরকার

অধ্যাপক ডা. মো. এহেতশামুল হক

দেশে ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসাসেবা প্রদানে কিছু সমস্যা রয়েছে। চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে না। কিন্তু বেশির ভাগ ক্যান্সার রোগীর রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য প্রচুর ফান্ড দরকার। এই চিকিৎসায় বীমা কম্পানিগুলোর এগিয়ে আসা দরকার। ক্যান্সার চিকিৎসায় যখন রোগীরা ওষুধ কিনতে যায়, তখন তাদের কাছে টাকা থাকে না। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ওষুধ কেনার জন্য লোন দিলে চিকিৎসাব্যবস্থা আরো বেশি সহজ করা সম্ভব। দেশি কম্পানিগুলো যাতে কর ছাড়া ওষুধ আমদানি করতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নার্স ও ম্যানপাওয়ার দরকার। ক্যান্সার চিকিৎসা শুধু কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুচিকিৎসার জন্য আরো অনেক কিছু দরকার। তাই বিশেষজ্ঞদের একসঙ্গে বসে একটি পরিকল্পনা করা দরকার।

 

বেসরকারি খাতে সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা ও মনিটরিং দরকার

ডা. পারভিন আক্তার বানু

ক্যান্সার চিকিৎসায় বেসরকারিভাবে দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল ডেলটা মেডিক্যাল। ৩০০ রোগীকে রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কেমোথেরাপি চলছে। বছরে ছয় হাজার রোগীকে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও চিকিৎসা এক দিনও বন্ধ হয়নি; যদিও রোগী অনেক কমে গিয়েছিল। এখানে গরিব রোগীদের জন্য একটা ফান্ডের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের জন্য যে রকম সাহায্য থাকে, একই রকম সাহায্য বেসরকারি হাসপাতালেও থাকবে প্রত্যাশা করি। মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাটাও থাকা দরকার।

 

ন্যাশনাল ক্যান্সার কন্ট্রোল কাউন্সিলকে সক্রিয় করা দরকার

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হাই

সামগ্রিকভাবে ক্যান্সার ব্যবস্থা এবং ক্যান্সারের চিকিৎসা নিয়ে আমাদের অনেক সমস্যা আছে; যেমন—রোগীর সংখ্যা প্রচুর, সেই তুলনায় আমাদের সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। এ ছাড়া সেন্টার বা চিকিৎসাকেন্দ্র অনেক কম, ম্যানপাওয়ার দরকার অনেক, অনকোলজিস্ট, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট, টেকনোলজিস্ট ও নার্স লাগবে অনেক। পাশাপাশি  ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম লাগবে অনেক। প্রথমেই আমাদের চিন্তা করতে হয় ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের কথা। নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সবার আগে দরকার প্রাইমারি লেভেলের প্রিভেনশন। যেহেতু আমাদের জনবল কম, সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রাইমারি প্রিভেনশনের দিকে নজর দিতে হবে। প্রথম দিকেই যদি আমরা স্ক্রিনিং করে তাদের রোগ শনাক্ত করতে পারি, তাহলে কিউরেটিভ ট্রিটমেন্ট দিয়ে তাদের ভালো করে তুলতে পারব। আজকাল ক্যান্সারের সার্জারি হচ্ছে। দেশজুড়ে আমাদের সার্জনরা আছেন। কিন্তু সেটা যাতে ঠিকভাবে হয় সে জন্য আরেকটু গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজে ম্যানপাওয়ার আছে। অনকোলজিস্ট আছেন। সেখানে যদি আমরা একটি ইউনিট করে দিই তাহলে আমাদের লোড কিছুটা কমবে। রেডিওথেরাপিতে আমরা একটু পিছিয়ে আছি। প্রধানমন্ত্রী ক্যান্সার প্রতিরোধ ও প্রতিকারে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে ক্যান্সার অ্যাফেয়ার দেখার জন্য ন্যাশনাল ক্যান্সার কন্ট্রোল কাউন্সিল যেটা আছে, সেটা সক্রিয় করা দরকার। চিকিৎসাব্যবস্থারও মনিটর করতে পারব। রেফারেন্স ল্যাবরেটরিও হওয়া দরকার। এটা করতে না পারলে আমরা কোনো দিনই কোয়ালিটিটিভ ট্রিটমেন্ট দিতে পারব না।

 

ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য আমাদের উন্নত ল্যাব করা উচিত

অধ্যাপক ডা. কামরুজ্জামান চৌধুরী

ডায়াগনসিসের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময়ই নানা অসুবিধা অনুভব করি, এটা সত্য। আমাদের দেশে আমরা এখনো কিন্তু উন্নত মানের ল্যাব তৈরি করতে পারিনি। ক্যান্সারের জন্য সাধারণ ল্যাব করলে হবে না। উন্নত ল্যাব করা খুবই ব্যয়বহুল, যা আমাদের দেশে এখনো হয়ে ওঠেনি। আমাদের প্রচুর পরিমাণে ল্যাব তৈরি করা উচিত এবং বিদেশের সঙ্গে তুলনা করে দেখা উচিত। আমরা অনেক আলোচনা করছি যে এটা করব ওটা করব; কিন্তু আমাদের কোনো সঠিক পরিকল্পনাই নেই। ভালো কোনো ডাটাবেইস নেই, যার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারব কোন অঞ্চলে কী ধরনের ক্যান্সার বেশি হচ্ছে। আমাদের ল্যাবের স্বল্পতা আছে। ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য আমাদের উন্নত ল্যাব করা উচিত। সঠিক পরিকল্পনা করা উচিত।

 

হাসপাতাল থাকলেও সবাই সঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছে না

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন

স্বাস্থ্য বীমা কার্যকর করতে হবে। এটি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা হচ্ছে। এর পরও কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়নি। দেশে বিভিন্ন রকম বেসরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারী কম্পানি থাকায় ওষুধের দামও কমেছে।

ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য যে মেশিনগুলো আমদানি করা হবে, সেগুলোর ওপর কর আরোপ করা হচ্ছে। মেশিন আমদানির ক্ষেত্রে কর বন্ধ করা দরকার। তাহলে রোগী আরো কম খরচে চিকিৎসা পাবে। দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার হাসপাতাল থাকলেও সবাই সঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছে না। কারণ একেকজন রোগীর একেক রকম চিকিৎসা দরকার। তাই সব জায়গায় এক রকম মেশিন কিনলে হবে না। আবার সরকার ব্যয় নির্ধারণ করে না দিলে ক্যান্সার চিকিৎসা সবার জন্য সহনশীল হবে না। জাতীয়ভাবে একটা ফান্ড খোলা দরকার। প্রধানমন্ত্রী ক্যান্সার সেবার মূল্য কমাতে অনেক আগে থেকেই আহ্বান জানিয়ে আসছেন। এ জন্য বীমার প্রয়োজন আছে।

 

চিকিৎসার জন্য লম্বা লাইন তৈরি হয়

ডা. অসীম কুমার ঘোষ

বছরে প্রায় ছয় হাজার রোগী ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অবকাঠামো তৈরির কাজও অব্যাহত রয়েছে। কেমোথেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসার ব্যবস্থা এখানে রয়েছে। করোনাকালেও জরুরি সেবা দেওয়া হয়েছে। আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরির প্রক্রিয়া চালুর অংশ হিসেবে দু-তিন মাসের মধ্যেই রাজশাহীতে ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরির কাজ শুরু হবে। কিন্তু এখানে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা অনেক। বিভিন্ন পদে প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব রয়েছে। দুই শিফটে ৬০-৭০ জনের বেশি রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে লম্বা লাইন তৈরি হয়।

 

দেশি কম্পানিগুলোর ওষুধ ভালো, বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে

অধ্যাপক ডা. মোল্লা ওবায়দুল্লাহ বাকি

আমরা ক্যান্সার নিয়ে ফাইট করছি। গোপালগঞ্জের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে আমরা প্রফেসর ডাক্তার ওবায়দুল্লাহ ফেরদৌসী ফাউন্ডেশন ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট করেছি। সেখানেও আমরা ফাইট করছি, গ্রাম্য লোকজনকে নিয়ে। বাংলাদেশে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস ক্যান্সারের ওষুধের ক্ষেত্রে অগ্রদূত। দেশি কম্পানিগুলোর ওষুধ ভালো হওয়ায় তারা এখন বিদেশেও রপ্তানি করছে।

আমার জানা মতে, ৬০টির মতো দেশে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস তাদের ওষুধ রপ্তানি করে। অন্য কম্পানিগুলোও তাদের স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেন করছে। মান ভালো বলেই তাদের ওষুধ আমরা এখন অহরহ ব্যবহার করছি। যে ওষুধের দাম একসময় ছিল দেড় লাখ টাকা, সেটা ৪০-৫০ হাজার টাকায় মিললে তো আমরা সেটাই নেব। আমাদের দেশের বেশির ভাগ রোগীই গরিব। তাদের জন্য এটা সাশ্রয়ী। আমি দেড় লাখ টাকা দিয়ে একটি বিদেশি ওষুধ নিলাম কিন্তু পরেরগুলো আর নিতে পারলাম না, সেটা তো আমাদের কাম্য নয়; বরং রোগীরা এতে বিশেষভাবে উপকৃত হচ্ছে না। বিদেশি ওষুধগুলো আগে উচ্চমূল্যে বিক্রি হতো। এখন আর তারা সেটা করতে পারছে না। কেননা বাংলাদেশেই সমমানের ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেকেই লেজ গুটিয়ে পালাচ্ছে।

 

জেলা পর্যায়ে ক্যান্সারে আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে

অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার

আমাদের দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীরা একেবারে শেষ পর্যায়ে চিকিৎসার জন্য আসে। কিন্তু ক্যান্সারের মূল চিকিৎসার আগে রোগীকে প্রস্তুত করার বিষয় থাকে। সারা দেশে মাত্র তিনটি মেডিক্যাল অনকোলজি বিভাগ আছে, যা ঢাকা সদরে অবস্থিত।

ক্যান্সার একটি সমন্বিত চিকিৎসা। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদি এবং কিছুটা জটিল। ঢাকা শহরে রোগীরা এসে যে কষ্টের মধ্যে পড়ে তা অনেকখানি কমানো যায়, যদি জেলা পর্যায়ে ক্যান্সারে আক্রান্তদের উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। সরকার আটটি ক্যান্সার সেন্টার করার ব্যবস্থা নিচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ক্যান্সার চিকিৎসা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। বর্তমানে ক্যান্সার রোগীদের যে চাপ আছে তা কমাতে হলে ক্যান্সার নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন, তাঁদের নিয়ে টিম গঠন করে জেলা পর্যায়ে ক্যান্সার রোগীদের দেখভালের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলা ও উপজেলা সরকারি হাসপাতালগুলোতে খুব অল্প টাকায় প্যাপ টেস্ট ও ফ্রি ভায়া টেস্ট করা হয়। ৫০০ নারীর ওপর একটি জরিপ করে দেখেছি, মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ নারী প্যাপ টেস্ট ও ভায়া টেস্ট সম্পর্কে জানে। নারীদের যদি জানানো হয় প্যাপ টেস্ট ও ভায়া টেস্ট করতে হবে, তাহলে কিন্তু আমরা জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারি। এরপর ব্রেস্ট ক্যান্সার। খুব শিক্ষিত মানুষের ক্ষেত্রেও অ্যাডভান্স স্টেজে গিয়ে পাই। নারীদের ৫০ শতাংশ ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায় যদি নিয়মিত জরায়ুমুখের প্যাপ টেস্ট, ভায়া টেস্ট ও স্তনের পরীক্ষা করা হয়। আর মুখের ক্যান্সার নিয়ে মানুষ এমন সময় আসে, যখন কোনো অপারেশনই করা যায় না; এমনকি রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপিতেও কোনো কাজ হয় না। অথচ মুখের ক্যান্সার সহজেই প্রতিহত করা যায়। যদি আমরা সচেতন হই তাহলেই শুধু ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। সচেতনতার দিকে বিশেষ নজর দিলে একটা সময় পর ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা অনেক কমে যাবে।

 

লোকবলের অভাব, মেশিন দরকার

ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০ জন ক্যান্সার রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ২০২০ সালে ২২ হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আউটডোরে ফ্রি কেমো দেওয়া হয়েছে। করোনার মধ্যেও আমরা এই সেবা বন্ধ রাখিনি। ইদানীং যে সমস্যা হচ্ছে, তা হলো লোকবলের অভাব। নিজেদের তাগিদে কিছু টেকনিশিয়ান রাখা হয়েছে। আরো বেশি চিকিৎসা দেওয়ার জন্য মেশিন দরকার। তা না হলে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হবে। বাংলাদেশ এখন ক্যান্সারের ওষুধ বানাচ্ছে। ক্যান্সারের বেশ কিছু ওষুধ বিদেশ থেকে আসছে, যেগুলো রেজিস্ট্রেশন করা হয় না। ফলে সেই ওষুধের মান কেমন, তা বোঝা যাচ্ছে না। এগুলোর বেশির ভাগই আসে দালালের মাধ্যমে। এই আমদানি করা ওষুধ নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে।

 

ক্যান্সার রোগীদের মানসিক ও শারীরিক দুটি বিষয় রয়েছে

তৌফিক মারুফ

দেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা ঢাকাকেন্দ্রিক। সেখানে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পাশাপাশি ক্যান্সারের ওষুধ নিয়ে কিছু প্রচার-অপপ্রচার আছে। সুতরাং এটি নিয়ে যার যার অবস্থান থেকে কথা বলা দরকার। অনেক সময় শোনা যায়, বিভিন্ন হাসপাতাল কিংবা নানা জায়গা থেকে কিছু অবৈধ ওষুধ উদ্ধার করা হয়েছে। সেটা নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সেই আঙ্গিক থেকে আমাদের এই প্ল্যাটফর্মে বিশেষজ্ঞদের মতামত মানুষের মনের ধোঁয়াশা কাটাতে সাহায্য করবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা