kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার প্রতিরোধ জরুরি

কভিড-১৯ মহামারিতে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ঘটছে, যা সামনে ভয়াবহ বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে মানুষকে। এখনো সতর্ক না হলে বিপদ আরো বাড়তেই থাকবে। অনেকেরই অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত হলে তখন প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়েটিক তার শরীরে কার্যকর হবে না। গত ২৩ নভেম্বর কালের কণ্ঠ-স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা ও ইউএসএইড আয়োজিত এক যৌথ গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা এমন চিত্র তুলে ধরেন। আলোচনায় উঠে আসে আরো নানা সতর্কতা ও পরামর্শ, যা নিয়ে আজকের আয়োজন। গ্রন্থনায় তানজিদ বসুনিয়া, শম্পা বিশ্বাস ও এ এস এম সাদ। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার প্রতিরোধ জরুরি

সঞ্চালক

ইমদাদুল হক মিলন

সম্পাদক, কালের কণ্ঠ

যাঁরা অংশ নিয়েছেন

জাহিদ মালেক, এমপি

মাননীয় মন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়

অধ্যাপক . নীতীশ দেবনাথ

সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়

. নাথু রাম সরকার

মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)

অধ্যাপক ডা. মো: সায়েদুর রহমান

সভাপতি, বাংলাদেশ ফার্মাকোলজিক্যাল সোসাইটি ও চেয়ারম্যান, ফার্মাকোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌসী

পরিচালক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা ও লাইন ডিরেক্টর সিডিসি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঢাকা

মো: মোস্তাফিজুর রহমান

পরিচালক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর

ডা. জেবুননেছা রহমান

কান্ট্রি প্রজেক্ট ডিরেক্টর, এমটেপস

অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর

সভাপতি, বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটি ও বিভাগীয় প্রধান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

. এস এম আলমগীর

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর

ডা. রামজি ইসমাইল

ফোকাল ফর এএমআর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

ডা. অনিন্দ্য রহমান

ডেপুটি প্রগ্রাম ম্যানেজার, সিডিসি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহাখালী, ঢাকা

ডা. আবুল কালাম

গ্লোবাল হেলথ সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট, ইউএসএইড

প্রবন্ধ উপস্থাপক

অধ্যাপক ডা. এম ফয়েজ

সাবেক মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তও মহাখালী, ঢাকা

 

প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে হবে

জাহিদ মালেক

বাংলাদেশের মানুষ অতিমারির মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছে। পুরো বিশ্বের সঙ্গে এ দেশের মানুষও অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে মহামারি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি, জীবনযাত্রা, চিকিৎসা ও সেবা খাতে প্রভাব পড়েছে। দেশের সব পেশার মানুষ আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এর বৈশ্বিক সমস্যা নিরসনে গঠিত One Health Global Leaders Group-এর কো-চেয়ার হিসেবে মনোনীত হওয়ায় আমাদের অভিনন্দন। তিনি নিয়মিত দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখছেন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় করোনা পরিস্থিত ভালোভাবে সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু আমার মনে হয়, সচেতনতার সঙ্গে সামনে এগিয়ে গেলে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। কারণ, এ দেশে বিভিন্ন রকমের ওষুধ কম্পানি গড়ে উঠেছে। তাই এ দেশে ওষুধের কোনো রকমের কমতি নেই। তবে বহু ওষুধ কম্পানি গড়ে উঠলেও কম্পানিগুলোর মান ও কার্যকারিতার দিক থেকে তেমন উন্নতি হয়নি। এ দেশে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ যত্রতত্র বিক্রি হচ্ছে। ফলে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা বন্ধ করা জরুরি। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক চিকিৎসার উন্নতি হয়েছে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে এখন প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা অত্যন্ত ভালো। তবে এর সঙ্গে টারশিয়ারি চিকিৎসাও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে মানুষ এখন দেশেই আধুনিক চিকিৎসা পাচ্ছে।

 

সচেতনতার কাজটা অত্যন্ত জরুরি

ইমদাদুল হক মিলন

পৃথিবীর কোনো দেশেই প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে এ বিষয়টির কোনো তোয়াক্কা করা হয় না। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং এখন আমাদের পিঠ একেবারে দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাই অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ কিংবা কিভাবে এটাকে আরো কাজে লাগানো যায় এবং উপযোগীভাবে ব্যবহার করা যায়—এ বিষয়গুলো নিয়েই আমরা আজ কথা বলব। কভিড পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের গোলটেবিল বৈঠক করাটা একটু কঠিন, তার পরও মানুষের কল্যাণের জন্য এবং তাদের সচেতন করার জন্য আমরা এই আয়োজন করে যাচ্ছি। আজ আপনারা যাঁরা এখানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত আছেন তাঁদের মুখ থেকে বলা কথাগুলো যখন আমাদের মিডিয়াতে প্রচার করা হবে তখন ডাক্তাররা সচেতন হবেন, সাধারণ মানুষ সচেতন হবে। এই সচেতনতার কাজটাই আসলে অত্যন্ত জরুরি এবং সেই উদ্দেশ্যেই আমরা এই আয়োজনটি করেছি। ইউএসএইড এ ধরনের আয়োজন সব সময়ই করে থাকে এবং আমাদের সেই উদ্যোগের সঙ্গি করেন। তাই আমাদের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আসলে আমরা একটি ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি।  অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতাই আমাদের এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে পারে।

 

গতানুগতিক রাস্তায় আমরা আলোর পথে যেতে পারব না

অধ্যাপক ড. নীতীশ দেবনাথ

মানুষ হিসেবে আমাদের অন্ধকারের দিতে গেলে তো হবে না, আমাদের আলোর পথে যেতে হবে। গতানুগতিক রাস্তায় আমরা আলোর পথে যেতে পারব না। আলোর পথে যেতে হলে আমাদের বিকল্প রাস্তার অনুসন্ধান করতে হবে। গত দুই দশকে বৈজ্ঞানিক আলোচনায় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে শুধু অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্সই নয়, মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যের সমন্বয় আমাদের করতে হবে। অতিতে এই তিন বিষয়ের সমন্বয়ের কথা এত বেশি আসেনি। কিন্তু একবিংশ শতকে এসে বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচের কোনো বিকল্প নেই। প্রাথমিকভাবে এই ওয়ান হেলথের কথাটি শুধু কিছু মানুষের মধ্যে থাকলেও ক্রমান্বয়ে এটি ব্যাপকতা রূপ পেয়েছে। আমরা বলে থাকি যে ১০০ বছর পর পর পৃথিবীতে একটি করে  মহামারি আসবে। কিন্তু শুধু গত এক দশকে আমরা পাঁচটিরও বেশি মহামারির মুখোমুখি হয়েছি। সার্স, মার্স, এইচপিআই, ইবোলা, করোনা; এগুলো সবই একেকটি মহামারি। এগুলো হলো নজিরবিহীন ঘটনা। কখনো অতীতে এত কম সময়ের মধ্যে এতগুলো মহামারির ঘটনা ঘটেনি। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্স শুধু মানবস্বাস্থ্যের জন্য ইস্যু হয়ে দেখা দেয়নি। এটি মানবস্বাস্থ্য থেকে শুরু করে মাল্টিসেক্টরের জন্যই বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্স ব্যাকটেরিয়া প্রাণীর কাছে যাবে, পরিবেশে যাবে এবং পরিবেশ থেকে এটি আবার মানুষের শরীরে চলে আসবে।

 

মৎস্যও প্রাণীসম্পদের মাধ্যমেও অ্যান্টিবায়োটিক ঢুকছে মানুষের শরীরে

অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ

বাংলাদেশে পাঁচ বছরের শিশু মৃত্যুর হার কম। কারণ প্রান্তিক অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করা হয়েছে। ফলে সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত হয়ে কাজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন ও বিধিমালা থাকলেও সঠিকভাবে এর ব্যবহার কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাণীদেহে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সঠিক বিধি থাকলেও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। খামারগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহার করছে। ফলে এটি মাছ ও প্রাণীর মধ্যেও ছড়িয়ে যাচ্ছে। এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও মৎস্য অধিদপ্তরের সমন্বিত কাজের প্রয়োজন এখন আবশ্যিক। ২০৩০ সালের মধ্যে সংক্রমণের হার কমানো না গেলে মৃত্যুর হার আরো বাড়বে। নির্ধারিত অর্থ ছাড়া অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তিন ধরনের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ আছে। সব খাতে এই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রয়োগের বিষয়ে একটা পরিকল্পনা করা দরকার আছে। বিভাগীয় পর্যায়ে সঠিক সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন। জ্ঞানের মাধ্যমে সচেতন করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ নেই। অ্যান্টিবায়োটিকের প্যাকেটে লাল রং করে দেওয়ার পক্ষে আইন বাস্তবায়ন করা উচিত বলে আমি মনে করি। তবে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ কেউ যাতে কিনতে না পারে সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কারণ আমাদের দেশে ওষুধের দোকানে লাভের আশায় এই সব অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে সমস্যার সম্মুখীন  হতে হবে।

 

সব ফার্মই অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে না

ড. নাথু রাম সরকার     

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ খাতকে আমরা হটস্পট হিসেবে ধরে থাকি। ফার্মিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু আমরা খাদ্য উৎপাদন করলেও কিছু বিষয় আছে যেগুলোতে আমাদের দৃষ্টিপাত করা উচিত। আমাদের পোল্ট্রি সেক্টর, ফিশারিজ সেক্টর, ডেইরি সেক্টর, ক্যাটল সেক্টরসহ বিভিন্ন সেক্টরের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া এবং অপেক্ষাকৃত উন্নতি সাধন করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা কনসার্ন। এফএওর মাধ্যমে পাওয়া কিছু প্রজেক্টে অর্গানিক ব্রয়লার তৈরির চেষ্টা করেছি, যে কার্যক্রমগুলো এখনো কিছুটা চলমান আছে। এ ক্ষেত্রে কাজগুলো বিক্ষিপ্তভাবে হলেও একটি বড় পর্যায়ে এগুলোর  চর্চা শুরু করা দরকার। সব ফার্মই অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে না। যাঁরা স্বল্প পরিসরে ফার্মের ব্যবসা করছেন তাঁরা এ ক্ষেত্রে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন। ২০০, ৫০০ কিংবা হাজার ব্রয়লার নিয়ে যাঁরা ফার্মিং করেন তাঁরা সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক বেশি ব্যবহার করে থাকেন। ফিড অ্যাক্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা আছে যে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা গ্রোথ প্রমোটার খাদ্যের সঙ্গে ব্যবহার করা যাবে না।

 

ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিকের অভাব মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে

অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান

বাংলাদেশে ওষুধের দোকান থেকে গড়ে তিন- থেকে ১০ জন রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দেওয়া হয়। প্রতিদিন ১০ লাখ মানুষকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। ফলে এর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দেশের সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের প্যাকেটের রং লাল করে দেওয়ার নির্দেশ জারি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই এটি খাওয়া যাবে না। ওষুধের দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করার একটা যথাযথ নিয়ম থাকা জরুরি। এ বিষয়ে সিডিসি ও ইউএসএআইডি মিলে একটা স্কেল নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে। তাই তখন দেখা প্রয়োজন এই স্কেল অতিক্রম করছে কি না। অ্যান্টিবডি অন্যক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক পানিতে মিশিয়ে প্রাণীকে খাওয়ানো হচ্ছে। খামারগুলোতে মুরগিকে সিপ্রোফ্লক্সাসিন খাওয়ানো হচ্ছে। ফলে সিপ্রোফ্লক্সাসিনের কার্যকারিতা আর থাকছে না। গত সাত মাসে কভিডের ভয়ে বহু মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছে। ফলে ব্যাকটেরিয়াও অ্যাডাপ্ট করে নিয়েছে। ফলে চিকিৎসার সকল ধাপ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

 

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সমস্যা সমাধানে চিকিৎসকদের অগ্রণী ভূমিকা দরকার

অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌসী

প্রতিনিয়ত দেশের বিভন্ন সংগঠন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করছে। তবে অত্যন্ত গর্বের বিষয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ওয়ান হেলথ গ্লোবাল লিডারস গ্রুপ অন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্সের’ কো-চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর এই অর্জনে আমরা অনুপ্রাণিত। তবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অ্যান্টিবায়োটিকের যত্রতত্র ব্যবহার একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে ডাক্তারদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ফলে এটি আরো খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রাণী ও মাছের খামারেও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হচ্ছে। ফলে মানুষের রোগপ্রতিরোধ করার সক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। নতুন অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে আসতেও সময়সাপেক্ষ। ফলে এই মুহূর্তে বাজারে অ্যান্টিবায়োটিকের স্বল্পতার কথা মাথায় রেখে যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নতুবা চিকিৎসার খরচ আরো বেড়ে যাবে। ড্রাগ ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন প্রস্তুত করেছে। সিডিসি ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণ করতে এরই মধ্যে ন্যাশনাল ইনফেকশন গাইডলাইন প্রস্তুত করেছে।

 

সীমিত লোকবলের মাধ্যমে আমরা সর্বোচ্চ কাজ করার চেষ্টা করছি

মো. মোস্তাফিজুর রহমান

আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমরা সবাই ডাক্তার, রোগী কেউ না। আমরা সহজেই সবাই প্রেসক্রিপশন করে থাকি, যা আমাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের কিছু বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই ছাতার নিয়ে এসে একসঙ্গে কাজ করতে পারলে আমরা সফলতা অর্জনের পথে অনেক দূর এগিয়ে যাব। অ্যান্টিবায়োটিকেরন ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমিত লোকবলের কারণে কার্যক্রম কিছুটা স্লথ চলছে। তবে আমাদের এই সীমিত লোকবলের মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ কাজটি করছি। ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট, ফার্মেসি, জনগণকে সচেতন করতে ও ঔষধ প্রশাসনের কর্মপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন করার কাজ আমরা করে যাচ্ছি। আমাদের সার্ভেইল্যান্স টিমের তথ্য মতে, ওয়াচ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক অ্যাকসেস গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকের তুলনায় বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা সত্যিকার অর্থে খুবই ভয়ংকর ও মারাত্মক হুমকি বাংলাদেশের জন্য। এটি আমাদের জন্য বিশাল বিপদ ডেকে আনতে পারে। এ ব্যাপারে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

দেশে একটা স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসার গাইডলাইন তৈরি করা জরুরি

ডা. জেবুননেছা রহমান

বর্তমানে ওষুধ নিয়ে আমরা কাজ করছি। এরই মধ্যে পুরো বিশ্বে অ্যান্টিমাইক্রোবায়োলজি রেজিসট্যান্স অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই সমস্যা নিরসনে আমরা সিটিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করছি। বিশেষ করে এ বিষয়ে প্রায় চার হাজার স্বাস্থ্যকর্মীকে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। তবে এ দেশে একটা স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসার গাইডলাইন তৈরি করা জরুরি। এতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে একটা নিয়মের মধ্যে আসবে বলে আমি মনে করি। এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যৎ সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

বাংলাদেশে সবাই নিজেকে চিকিৎসক মনে করে

অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর

কোনো কোনো ডাক্তার রোগীকে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন। আমি সব সময়ই চেষ্টা করি সমস্যাটাকে সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে। বাংলাদেশে সবাই নিজেকে চিকিৎসক মনে করে। কারণ সে নিজেই নিজের প্রেসক্রাইব করে, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের কাছে যায় না। তাই সবার আগে এই নিজে নিজের ডাক্তার হওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে এবং তাদের বোঝাতে হবে আসলে কে প্রেসক্রাইব করার যোগ্য। আমার কাছে এক রোগী এসে বললেন, গত দুই বছর ধরে তিনি প্রতিদিন সিপ্রোফ্লক্সিসিন খান। তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ। এ ক্ষেত্রে একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষই যদি এভাবে যথেচ্ছ মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক খান তাহলে সাধারণ বা অশিক্ষিত মানুষের অবস্থা তো আরো ভয়ংকর। এই দেশের আনাচে-কানাচে এত বেশি ফার্মেসি যে এদের নীতি-নিয়মের মধ্যে আনাও সম্ভব না। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি এওয়ারনেস বা সচেতনতাই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে।

 

সাধারণ মানুষ প্রেসক্রিপশন ড্রাগ সম্পর্কে জানেই না

ড. এ এস এম আলমগীর

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্স শুধু অ্যান্টিবায়োটিক না, এটার সঙ্গে অ্যান্টিভাইরালস, অ্যান্টিফাঙ্গালস, প্যারাসাইটিক সবই জড়িত। ২০১২-১৩ সালে আমি এটার সঙ্গে কাজ করছি। তখন থেকেই আমি বাংলাদেশে জনসচেতনতা তৈরি করতে গিয়ে একটা জিনিস খেয়াল করেছি যে আমাদের সাধারণ মানুষ প্রেসক্রিপশন ড্রাগ সম্পর্কে জানেই না। তারা জানে যে ফার্মেসি অথবা ওষুধের দোকানে গেলেই তাকে ওষুধ দেবে এবং এটা তার অধিকার। ওষুধ কিনতে যে প্রেসক্রিপশন লাগবে এটা বেশির ভাগ মানুষ জানেই না। আমরা যদি আমাদের চিকিৎসকদের কথা বলি তাহলে দেখব যে আমরা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্স বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্স হয়ে যাচ্ছে এটা বলছি তবে আমরা উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স এবং মেডিক্যাল কলেজ ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালে আউট পেশেন্ট ডিপার্টমেন্টে যে অ্যান্টিবায়োটিক ডিসপেন্স করছি সেখানে আমরা ফুল ডোজ অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছি না।

 

বাংলাদেশ গ্লোবাল লিডারশিপে এসেছে এটা নিঃসন্দেহে খুবই চমৎকার

ডা. রামজি ইসমাইল

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধে করণীয়; এটা খুবই সময়োপযোগী একটা আলোচনা। প্রতিবছর নভেম্বর মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সচেতনতা সপ্তাহ উদযাপন করে। এটা হচ্ছে সারা বিশ্বের মধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে কান্ট্রি অ্যাক্টিভিটিসকে ফোকাস করার একটা প্রক্রিয়া। আমি বাংলাদেশে পাঁচটি প্রগ্রামে উপস্থিত ছিলাম এবং আমার মনে হয় আজকের গোলটেবিল বৈঠকটি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে খুবই কার্যকর। এই বছরে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সপ্তাহের স্লোগান হলো, ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালস হ্যান্ডেল উইথ কেয়ার’। এখন মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে এবং তারা জানে যে এটা শুধু অ্যান্টিবায়োটেক্স নয়, বরং অ্যান্টিভাইরাস, অ্যান্টিফাঙ্গাস, অ্যান্টিপ্রপোজালস এবং ড্রাগের অন্যান্য শ্রেণি। তাই এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি, কারণ আমরা দেখেছি কভিড মহামারির কারণে অ্যান্টিভাইরালসের যুক্তিসংগত ব্যবহার বেড়েছে।

 

যাঁরা অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করেন তাঁদের আমরা সচেতন করছি

ডা. অনিন্দ্য রহমান

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিভাবে কাজ করছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. অনিন্দ্য রহমান বলেন, ন্যাশনাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কনটেম্পট প্রগ্রামের ফোকাল পারসন হচ্ছে রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক। অর্থাৎ সিডিসি হচ্ছে এর ফোকাল। ফলে এই যে কাজগুলো হচ্ছে সেগুলোর সমন্বয় করার কাজ আমরা করে থাকি। এ কারণে আমার বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমাদের দুটি জিনিস আছে। একটি হচ্ছে—অ্যান্টিবায়োটিক ড্রাগের ফার্মেসির সঙ্গে যে বিষয়গুলো সেগুলো দেখছে আসলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে—স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে ইস্যুগুলো দেখছে সেগুলো হচ্ছে মূলত সচেতনতা। যেমন সাধারণ জনগণ এবং একই সঙ্গে প্রফেশনাল যাঁরা অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করেন তাঁদের সচেতনতার কাজগুলো আমরা করছি। তা ছাড়া আমাদের সমস্ত দেশে জেলা-উপজেলা সকল পর্যায়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে অ্যাডভোকেসি মিটিংগুলো চলমান রয়েছে। আমার মতে মাইক্রোবাইয়োলজি ল্যাবগুলোর মান উন্নয়ন করা অত্যন্ত জরুরী।

 

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্স

ডা. আবুল কালাম

ডা. আবুল কালাম বলেন, প্রথম থেকেই আমরা দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছি। এক. গ্লোবাল হেলথ সিকিউরিটি এজেন্ডায় অনেকগুলো প্যাকেজ আছে। তার মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্স। সেই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্সের জায়গাটিতে প্রথম থেকেই ইউএসএইড গ্লোবাল লেভেলে, রিজিওনাল লেভেলে এমনকি ন্যাশনাল গভর্নমেন্ট পর্যায়েও কাজ করেছে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্সের যে গ্রুপটা সেটা যে জায়গাটা ইন্ডিকেট করে বা প্রদর্শন করে সেটা আমাদের একটা সেক্টরের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব না। সেটার জন্য আমরা যে কাজগুলো করি সেটা হচ্ছে কো-অর্ডিনেশনের কাজ এবং দুই. ইনফেকশন প্রিভেনশনের কাজ অর্থাৎ আমাদের যত ইনফেকশন কম হবে তত আমাদের কম অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে। ফলে এ দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার যত কম হবে তত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্সের মাত্রাটাও কম হবে। এই ইনফেকশন প্রিভেনশন নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করেছি। আরেকটি বিষয় তিনি উল্লেখ করেন, যিনি প্রেসক্রোইবার তিনি নারী বা পুরুষ সবার স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেই স্টুয়ার্ডশিপ প্রগ্রাম মেনে কাজ করবেন, এই কালচারটা গড়তে তুলতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে ইউএসএআইডি বাংলাদেশের হেলথ সিস্টেম স্ট্যান্ডিংয়ের জন্য কাজ করছে। সেই সঙ্গে এনিম্যাল হেলথ নিয়েও কাজ করছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা