kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

ম্যালেরিয়া নির্মূলে চাই আরো কার্যকর উদ্যোগ

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



ম্যালেরিয়া নির্মূলে চাই আরো কার্যকর উদ্যোগ

লুৎফর রহমান

২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এগিয়ে চলছে কাজ। যার ফলে আগের তুলনায় ম্যালেরিয়া এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবু মাঝেমধ্যেই তা অধিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় আরো কী করণীয় আছে তা ঠিক করতে গত ২৮ অক্টোবর জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কালের কণ্ঠ ও ব্র্যাকের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘ম্যালেরিয়া নির্মূলে অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা। সেখানে সবার কথায় উঠে আসে ম্যালেরিয়া নির্মূলে আরো কার্যকর উদ্যোগের কথা, যার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে আজকের এই বিশেষ ক্রোড়পত্রে। গ্রন্থনায় জহিরুল ইসলাম, জনি হোসেন কাব্য ও শাহ পরাণ। ছবি :

ছোট আকারের বড় শত্রু হচ্ছে মশা

জাহিদ মালেক, এমপি

কালের কণ্ঠ বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার আয়োজন করে থাকে। সে জন্য তাদের ধন্যবাদ। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, যা সম্ভব হয়েছে সবার চেষ্টা এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঠিক দিকনির্দেশনায়। এর প্রমাণ জাতিসংঘের দেওয়া ‘ভ্যাকসিন হিরো পুরস্কার’। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় চিকিৎসা তথা স্বাস্থ্য খাতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। পোলিওর মতো রোগ বাংলাদেশ থেকে নির্মূল হয়ে গেছে। টিবির মতো রোগও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। হার্টের অসুখ ও ক্যান্সার হচ্ছে বড় আকারের শত্রু। কিন্তু ছোট আকারের বড় একটি শত্রু হচ্ছে মশা। মশাবাহিত রোগের কারণে প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রচুর মানুষ মারা যায়। কিছুদিন আগেও ডেঙ্গু রোগের ব্যাপকতার মুখোমুখি হয়েছি আমরা; যার প্রভাবে অনেক উন্নত দেশেও অনেক মানুষ মারা গেছে। বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছিল ডেঙ্গু। সবার প্রচেষ্টায় আমরা সেটির মোকাবেলা করতে পেরেছি। ম্যালেরিয়া নির্মূলেও অনেক কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে। ২০০৮ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৫৪ জন মানুষ মারা গিয়েছিল। গত বছর মারা গিয়েছিল সাতজন। একজন মানুষও যেন ম্যালেরিয়ায় মারা না যায় সে লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। ২০২১ সালের মধ্যে ৫৯টি জেলাকে ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণার কথা থাকলেও সেটি আমরা আরো আগেই ঘোষণা করতে পারব বলে আশা করি। আর ২০৩০ সাল নয়, যেভাবে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে তাতে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই দেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করা সম্ভব।

কালক্রমে অনেকগুলো রোগ প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে

ইমদাদুল হক মিলন

আমাদের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য সকলকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আপনারা জানেন যে কালের কণ্ঠ, জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি এবং ব্র্যাক যৌথভাবে এই আয়োজন করেছে। প্রায় সময় আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার আয়োজন করি। আপনারা জানেন, একটা সময় এই বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কলেরা, কালাজ্বর, বসন্ত—এ ধরনের বিভিন্ন রোগে প্রচুর মানুষের জীবনহানি হতো। সেই অবস্থা থেকে কালক্রমে আমরা অনেকটা এগিয়ে এসেছি। অনেকগুলো রোগ প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। যক্ষ্মা এখন একেবারেই আমাদের নিয়ন্ত্রণে, বসন্ত প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে, কলেরাকেও খুব সহজভাবে এখন মোকাবেলা করতে পারি। আগের মতো আর প্রাণহানি হয় না। ম্যালেরিয়া শহর ও গ্রামাঞ্চলে সেভাবে নেই, তবে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে এখনো বেশি। ব্যাপকভাবে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় সেখানকার মানুষ। এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের সমস্যা দেখছে এবং বিশেষজ্ঞরা কিভাবে এটি সমাধান করা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ দেবেন; কিভাবে রোগটি একেবারেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে

মোস্তফা কামাল

কালের কণ্ঠ সব সময় সমাজ এবং দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করে আসছে, যা সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এবারও ম্যালেরিয়ার মতো একটি রোগের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গোলটেবিলের আয়োজন করল। এবার আমাদের সঙ্গী হয়েছে জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি ও ব্র্যাক। ম্যালেরিয়া বাংলাদেশের সব অঞ্চলে নেই বলে আমরা মনে করি এটা তেমন নেই। কিন্তু আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ এই রোগে খুব ভুগছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের মানুষও এই রোগে বিপুল পরিমাণ আক্রান্ত হচ্ছে। আফ্রিকায় অনেক মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। অনেক দেশেই আছে, যদিও ইতিমধ্যে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করেছে। আমাদের ২০৩০ সাল টার্গেট করা হয়েছে। হয়তো এটা আরো আগে হতে পারত। আমার মনে হয়, এটা নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। শুধু পার্বত্য অঞ্চলে আছে বলে কম কাজ করার সুযোগ নেই। একসময় ডেঙ্গু তেমন প্রভাব না দেখালেও এবার ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করেছিল।

ম্যালেরিয়াও ব্যাপক আকারে ছিল, তবে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রচেষ্টায় অনেকটা কমানো সম্ভব হয়েছে। সুতরাং, মহামারি আকার ধারণ করার আগেই ম্যালেরিয়া সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। তবেই সেটি ডেঙ্গুর মতো ব্যাপকতা লাভ করতে পারবে না।

প্রান্তিক মানুষের সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের বিকল্প নেই

ড. মো. আকরামুল ইসলাম

কালের কণ্ঠ, জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির সহায়তায় এই আলোচনাসভার আয়োজন করায় আন্তরিক ধন্যবাদ। উপস্থিত সব ম্যালেরিয়া বিশেষজ্ঞ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। গণমাধ্যমের সহায়তা ছাড়া ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। অর্থাৎ সচেতনতা বাড়াতে, প্রান্তিক মানুষকে জানাতে গণমাধ্যম বিশেষ ভূমিকা রাখে। আমরা আশা করব, গণমাধ্যম ম্যালেরিয়া সম্পর্কিত তথ্য প্রচার করে সবার কাছে পৌঁছে দেবে এবং এই বৈঠকে পলিসি নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের থেকেও নতুন নতুন ধারণা আসবে। ম্যালেরিয়া  নির্মূলে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। বিশেষ করে জনবল ও অন্যান্য উপকরণেরও সংকট আছে। ২০২১ সালের মধ্যে ৫১টি জেলা ও আটটি নিম্ন ম্যালেরিয়াপ্রবণ জেলাকে ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করতে হলে সার্ভেইল্যান্স জোরদার করতে হবে। সেই লক্ষ্যে ল্যাব টেকনিশিয়ানসহ জনবল বাড়াতে হবে, অতিরিক্ত মশারি ও মশা বিতাড়ক ক্রিমের ব্যবস্থা করতে হবে এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি ম্যালেরিয়া খাতে অভ্যন্তরীণ অর্থের জোগান বাড়াতে হবে।

ম্যালেরিয়া শুধু অরণ্যে নয়, যেখানে মানুষ বাস করে সেখানেও থাকে!

ডা. বে-নজির আহমেদ

রোগতাত্ত্বিক নিরীক্ষণ ও বিশ্লেষণে দেখা যায় সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ অনেক কম, যার ফলে আগে আমরা ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে কাজ করতাম আর এখন নির্মূলে  কাজ করছি। এসব এলাকায় ম্যালেরিয়া নির্মূল সম্ভব বিধায় জাতীয় ম্যালেরিয়া নীতিতে নির্মূল কর্মকৌশল যুক্ত হয়েছে। এ ধরনের বিশ্লেষণের আরো গভীরে যেতে হবে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর ম্যালেরিয়া রোগী বেড়েছে এবং এটি কেন বাড়ল তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। আবহাওয়ার পরিবর্তন, পাহাড়ি বন্যা, নাকি আমাদের কর্মসূচিতে কোথাও ব্যাঘাত ছিল। তাই ম্যালেরিয়া ঝুঁকির মৌসুম শুরুর আগেই তথ্যভিত্তিক কর্মকৌশল নিতে হবে ও কাজ করতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের জুমচাষিরা ম্যালেরিয়া ঝুঁকিতে বেশি থাকে।

ক্রসবর্ডার অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু

ড. এ এস এম আলমগীর

প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার; রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ম্যালেরিয়া নির্মূল হয়ে গেলে আবার তা ফিরে আসবে না বিষয়টি এমন নয়। ঢাকা শহরের ম্যালেরিয়া কেসগুলো ইমপোর্টেড এবং কিছু কেস আফ্রিকা থেকে আগত। এই বিষয়গুলো মাথায় নিয়েও কাজ করতে হবে। এ বছর শুধু নির্দিষ্ট কিছু ভেক্টরের ওপর সার্ভে হয়েছে, আগামী বছর সকল প্রজাতির মশাকে মাথায় রেখে ভেক্টর সার্ভেইল্যান্স করতে হবে। আইইডিসিআরে মলিকুলার ল্যাব আছে, পিসিআর বেজড মলিকুলার ডায়াগনসিস ও মশার বায়োলজি জানতে এ ল্যাব ব্যবহার করা যেতে পারে।

সরকারের দেওয়া রক্ষাকবচ বাস্তবায়ন জরুরি

ডা. এম এ ফয়েজ

বাংলাদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূল আসলে টেকসই উন্নয়নের একটা অংশ। একসময় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিবছর ৩৫০ থেকে ৫০০ জন ম্যালেরিয়া রোগী ভর্তি হতো এবং  ১০০ জনের মতো রোগী মারা যেত। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার রোগীর মধ্যে সাতজন মারা গেছে ও মাত্র ২.৩ শতাংশ মারাত্মক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এটি ঈর্ষণীয় এবং প্রশংসার কাজ হয়েছে। এই অর্জন সরকার ও সহযোগী বিভিন্ন সংস্থার প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছে।  ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করতে হলে, ২০২৭ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া শূন্যে নিয়ে আসতে হবে এবং পর পর তিনবার শূন্য বলতে পারলে তবে ম্যালেরিয়ামুক্ত বলা যাবে।

আমাদের কার্যক্রম খুব সুন্দরভাবে পরিচালিত হচ্ছে

ডা. দিলরুবা সুলতানা

জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রম বর্তমানে খুব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। আশা করি আমরা সময়মতোই আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। আপনাদের সবার গুরুত্বপূর্ণ মতামত আমরা বাস্তবায়নে চেষ্টা করব।

মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ছড়ায় এই তথ্য বেশ পুরনো

তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ

আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কাজ করে থাকি। কিন্তু কীটপতঙ্গ ও মশা যে মানুষের নানা ক্ষতি করতে পারে তার ওপর কোনো জোর দেওয়া হয় না। একেক মশার আচরণ একেক রকমের হয়ে থাকে। কিছু মশা ঘরে কামড়ায়, আবার কিছু মশা বাইরে কামড়ায়। তাই ম্যালেরিয়া নির্মূল করতে হলে যে সকল মশা বাইরে কামড়ায় সেগুলো প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে, ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট জোরদার করতে হবে। সে জন্য লোকবল বাড়াতে হবে। তা ছাড়া কীটপতঙ্গের ওপর গবেষণা ও সার্বক্ষণিক তদারকি বাড়াতে হবে।

এনজিও সংস্থাগুলোকে অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে হয়

জেসমিন প্রেমা

এনজিও সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সবার জন্য কাজ করা। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো এলাকায় মশারি বিতরণ করতে গেলে স্থানীয় নেতাদের হস্তক্ষেপের কারণে লক্ষ্য জনগোষ্ঠীর কাছে মশারি পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়। এতে গণমাধ্যমের কাছে আমাদের প্রত্যাশা যাতে তারা আমাদের সফলতাগুলো তুলে ধরে এবং সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করে।

 

বাংলাদেশ ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে সঠিক পথেই চলছে

ডা. মিয়া সেপাল

এই ধরনের গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন দেশের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রেখে থাকে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবার মতামতের দিকে নজর রাখতে হবে। বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কিছু অঞ্চলে বেশি। ওই সব এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও কেস লোড বিবেচনা করে কাজের পরিকল্পনা করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে, যেমন—সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা জোরদারকরণ, ম্যালেরিয়ার সেবাদানে বেসরকারি স্বাস্থ্য সংস্থাকে অন্তর্ভুক্তকরণ, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে ম্যালেরিয়া বিষয়ে সমন্বয় সাধন। বাংলাদেশ ম্যালেরিয়া নির্মূলে সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে। 

২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে ম্যালেরিয়ামুক্ত

ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান

বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ দেশের ১৮.৩৯ মিলিয়ন মানুষ ম্যালেরিয়া ঝুঁকিতে আছে। যেখানে ১৩টি ম্যালেরিয়াপ্রবণ জেলা রয়েছে। ২০১৮ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৫২৩ জন, যা ২০১৫ সালের তুলনায় ২২ শতাংশ কম। ২০১৮ সালে ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যুর সংখ্যা সাতজন, যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৭৪ শতাংশ কম। ধীরে ধীরে ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা কমে আসছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ম্যালেরিয়া নির্মূলে নিম্নপ্রবণ এলাকায় মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের রক্তকাঁচ করতে হবে, সে জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও আর্থিক জোগান নিশ্চিত এবং পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর প্রয়োজন হবে। এ লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ করণীয় হচ্ছে টাস্কফোর্স তৈরি করা, জনবল ও আর্থিক জোগান নিশ্চিত করা এবং পর্যায়ক্রমে বাড়ানো, অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, ম্যালেরিয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা প্রণয়ন, রোগতাত্ত্বিক সার্ভিল্যান্স অধিকতর জোরদার করা, আন্তঃসীমান্ত চলাচল ও অভিবাসী জনসংখ্যা শনাক্তকরণ এবং দ্রুত রোগ নির্ণয়ের আওতায় আনা ও সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনা (IVM)  গাইডলাইন প্রস্তুত করা ইত্যাদি।

সরকারকে রিসোর্সের দিকে নজর দিতে হবে

মনোজ কুমার বিশ্বাস

২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের অগ্রযাত্রায় আমরা সঠিকভাবেই এগোচ্ছি। তবে সার্ভেইল্যান্স বাড়াতে হবে। ৫১টি জেলা থেকে আমরা রিপোর্ট পাচ্ছি। তা থেকে আমরা বলতে পারছি সেখানে কোন কেস নেই, এখানে নিয়মিত সার্ভেইল্যান্স চালিয়ে যেতে হবে। সার্ভেইল্যান্স সত্যিকারে হচ্ছে কি না সেটাও আমাদের সার্ভেইল্যান্স করতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে—ম্যালেরিয়া প্রগ্রামের জন্য ফান্ডিং বা রিসোর্স। এ কর্মসূচিতে ভেক্টর কন্ট্রোলে সরকার সবচেয়ে বেশি ফান্ডিং করছে, যা প্রায় ৭৩ শতাংশ এবং গ্লোবাল ফান্ড করছে মাত্র ২৭ শতাংশ।

সুষ্ঠুভাবে কাজ করি বলে সারা বিশ্ব আমাদের অনুসরণ করে

ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ

যাঁরা ম্যালেরিয়া নিয়ে কাজ করেন, এ সম্পর্কে জানেন, তথ্য-উপাত্ত নিয়ে নিজেদের সুচিন্তিত মতামত আমাদের সামনে তুলে ধরেন—তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ এই গোলটেবিলে নিয়ে আসায় কালের কণ্ঠ পত্রিকাকে ধন্যবাদ। কারণ উপস্থিত বিশেষজ্ঞদের মতের ভিত্তিতে আমাদের কাজ করতে সুবিধা হয়। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যতবারই তাঁর নেতৃত্বে সরকার থাকে, ততবারই দেশের উন্নয়ন হয়, অগ্রগতির সাফল্যধারায় স্বাস্থ্য খাতে একের পর এক অর্জন আসে। এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে সবাই দিন-রাত কাজ করেছেন। নয়তো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু এত সহজে হয়তো নিয়ন্ত্রণে আনা যেত না। উন্নত অনেক দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমরা দক্ষতার সঙ্গে সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি। ম্যালেরিয়া নিয়েও আমাদের অনেক কাজ হয়েছে ও হচ্ছে। এতেও আমরা সফল হব। বাংলাদেশের যে কয়টি জেলায় ম্যালেরিয়া আছে, সেগুলো আমরা ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি। ফলে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার অনেক কমে এসেছে। তাই সারা বিশ্ব আমাদের অনুসরণ করে এবং জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি এর একটি উদাহরণ।

আমরা লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি

ডা. এ মান্নান বাঙ্গালী

ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে এক কোটির ওপরে দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ করা হয়েছে। যার ফলে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব কমে গেছে। এটি খুবই বড় একটি অর্জন। এই অর্জনের ফলে আমরা ম্যালেরিয়া নির্মূলের ঘোষণা দেওয়ার সাহস পাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য—বাংলাদেশের যেসব এলাকা ম্যালেরিয়াপ্রবণ সেখানে কোনো লোকাল ট্রান্সমিশন হবে না, কোনো মৃত্যু হবে না—এই লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি রয়েছি আমরা। আরো কিছু কাজের ব্যাপারে তৎপর হতে হবে। ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় যে ওষুধ ব্যবহার করা হয় তা যদি নিয়মানুযায়ী সেবন না করা হয় তবে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট হতে পারে, সে কারণে নিয়মিত রোগীর ওষুধ সেবন পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

মশা কেবল ঘরে কামড়ায় না বাইরেও কামড়ায়

ডা. শায়লা ইসলাম

ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের প্রধান উপায় কীটনাশকযুক্ত মশারি ব্যবহার। কিভাবে এর ব্যবহার বাড়ানো যায় সেদিকে নজর দিতে হবে, বিশেষ করে যারা জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে রাত কাটায়; তাদের জন্য অন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন—মশা বিতাড়ক ক্রিম ব্যবহার। প্রথম পর্যায়ে ছোট পরিসরে পার্বত্য অঞ্চলে এটি শুরু করা যেতে পারে। মাইগ্রেশন সার্ভিল্যান্স শুরু করতে হবে, যারা জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে অবস্থান করে তাদের ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হয়।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সচেতন করতে হবে

ডা. মোহাম্মাদ শফিউল আলম

ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ম্যালেরিয়া যাতে বাংলাদেশে ছড়িয়ে না পড়ে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এটি যে শুধু পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ছড়াবে তা নয়, জাতিসংঘ মিশনে কর্মরত আফ্রিকাফেরত রোগী থেকেও ছড়াতে পারে। মলিকুলার সার্ভেইল্যান্স বাড়াতে হবে, জেলা পর্যায়ে সম্ভব না হলেও আঞ্চলিক পর্যায়ে মলিকুলার ল্যাব স্থাপন করতে হবে। ম্যালেরিয়া নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে বিশেষ করে বাহক মশা সম্পর্কিত গবেষণা।

ম্যালেরিয়া নির্মূলে যা করণীয়

ফজলুল হক

এটা খুবই আশার বিষয় যে ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে ম্যালেরিয়া রোগী অনেকাংশে কমে গেছে, যদিও আমাদের পলিসি অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূল ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের ধারণা এ টার্গেট ২০২০ সালের মধ্যেই অর্জন করা সম্ভব। তবে যে বিষয়টা সবাইকে ভেবে দেখতে হবের সেটা হচ্ছে—২০২০ বা ২০২১ সালে যদি ম্যালেরিয়া নির্মূল হয়ে যায় তারপর কী হবে? আমরা কি এটা ধরে রাখতে পারব? সম্মিলিতভাবে ক্রসবর্ডার ইস্যুগুলো মোকাবেলা করতে হবে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের (ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে) যে হেলথ কমিটি রয়েছে তা কার্যকর করতে হবে।


যাঁরা অংশ নিয়েছেন


জাহিদ মালেক, এমপি

মন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়


ইমদাদুল হক মিলন

সম্পাদক কালের কণ্ঠ ও পরিচালক ইডাব্লিউএমজিএল


মোস্তফা কামাল

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, কালের কণ্ঠ


অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ

মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর


ড. মো. আকরামুল ইসলাম

পরিচালক, কমিউনিকেবল ডিজিজেস ও ওয়াশ কর্মসূচি, ব্র্যাক


অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ

ম্যালেরিয়া বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর


ডা. মিয়া সেপাল

মেডিক্যাল অফিসার, কমিউনিকেবল ডিজিজেস সার্ভেইল্যান্স, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ


ডা. এ মান্নান বাঙ্গালী

সাবেক এনপিও, ভিবিডি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ


অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ

সাবেক পরিচালক (সিডিসি), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর


ডা. দিলরুবা সুলতানা

উপপরিচালক, এম অ্যান্ড পিডিসি, সিডিসি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর


ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান

ডিপিএম, জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর


ডা. শায়লা ইসলাম

কর্মসূচি প্রধান, কমিউনিকেবল ডিজিজেস (ম্যালেরিয়া), ব্র্যাক


ড. এ এস এম আলমগীর

পিএসও, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট


তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ

সাবেক চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার, এনটোমলজি বিভাগ, আইইডিসিআর


মনোজ কুমার বিশ্বাস

বিসিসিএম কো-অর্ডিনেটর


ডা. মোহাম্মাদ শফিউল আলম

অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট, আইসিডিডিআরবি


জেসমিন প্রেমা

চেয়ারম্যান, সমাজ কল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থা


ফজলুল হক

সিনিয়র ডিরেক্টর, সাজেদা ফাউন্ডেশন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা