kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাসযোগ্য নগর গঠনে চাই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা

১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৮ মিনিটে



বাসযোগ্য নগর গঠনে চাই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা

ছবি তুলেছেন লুৎফর রহমান

অর্থনীতির আকার বাড়ায় দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে দেশে। উন্নয়নের এই ছোঁয়া লেগেছে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে। নগরায়ণের ক্ষেত্রে ঢাকাকে নিয়ে কিছুটা পরিকল্পনা থাকলেও অন্য সব এলাকায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। রাজধানীতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও বাসযোগ্য হিসেবে এখনো গড়ে ওঠেনি ঢাকা। আধুনিক নগরায়ণের জন্য প্রয়োজন আরো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বিদ্যমান আইনের বাস্তবায়ন। গত ১২ অক্টোবর শনিবার ইডাব্লিউএমজিএল সম্মেলন কক্ষে ‘বাসযোগ্য নগর গঠনে করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় কালের কণ্ঠ ও ওরিয়নের আয়োজনে। ওই আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে এই বিশেষ ক্রোড়পত্রে। অনুলিখন ফারজানা লাবনী, আরিফুর রহমান, শাখাওয়াত হোসাইন, জহিরুল ইসলাম জিল্লুর রহমান জনি

গৃহায়ণ ও গণপূর্তের সব কাজে দুর্নীতি দূর করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি

শ. ম. রেজাউল করিম, মন্ত্রী

দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি দূর করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। সাধারণ মানুষের হয়রানি দূর করতে ব্যবস্থা নিয়েছি, নিচ্ছি। এরই মধ্যে ভবন নির্মাণের প্ল্যান পাস করতে ১৬টি স্তরের পরিবর্তে চার স্তরে নিয়ে আসা হয়েছে। অনলাইনে কাগজপত্র জমার ব্যবস্থা করেছি। আবেদনের সাত দিনের মধ্যে আবেদনপত্রের অগ্রগতি সেবাগ্রহীতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) একটি ইউনিফর্মের মধ্যে নিয়ে এসেছি। এসব প্রতিষ্ঠানে আর আগের মতো কোনো দালাল নেই। দালালরা একসময় এমনভাবে অর্থ নিত যে মনে হতো মন্ত্রী থেকে শুরু করে সব স্তরের লোকজন ঘুষ খায়। এখন আর কোনো দালাল নেই এসব প্রতিষ্ঠানে। আমাকে অনেকেই বলেছেন যে কম্বলের লোম বাছলে আর কম্বল থাকে না। তবে আমার ভরসার জায়গা প্রধানমন্ত্রী। তিনি বা তাঁর পরিবারের কেউ ঘুষ নেন না, তদবির করেন না। আমি সাহস পাই তাঁর কাছ থেকে। শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে গেলে রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন ধরনের মানুষ তদবির করে। আমি বলেছি, কম্বল না থাকলে দরকার হলে নতুন কম্বল কিনে আনব; কিন্তু দুর্নীতির শেষ দেখে ছাড়ব।

গণপূর্তের দুর্নাম আর দুর্নীতি পিছু ছাড়ছে না। এফআর টাওয়ারের ঘটনার সঙ্গে ৬২ জন কর্মকর্তার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি। তাঁদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে জানানোর পর মামলা হয়েছে। রূপপুর পরমাণু প্রকল্পে বালিশ কেনার বিষয়টি তদন্ত করে ৩৪ জনের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ৩০ জন আমার মন্ত্রণালয়ের আর চারজন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। বড় বড় পদে রয়েছেন তাঁরা। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও পিছপা হইনি আমরা। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজউকের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়েছি। আমাকে জানানো হলো, অনেক লোককে রাজউক থেকে সরিয়ে দিলে রাজউক অচল হয়ে যাবে। আমি ওই সব লোককে সরিয়ে দিয়েছি, যা রাজউকের ইতিহাসে হয়নি। দূরবর্তী স্থানে শাস্তিমূলক বদলি করেছি অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে। কিন্তু রাজউক ঠিকই ঠিকমতো চলছে। কর্মকর্তা পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। রাজউক ও গৃহায়ণের চেয়ারম্যানকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

আমি আশাবাদী পুরান ঢাকার আবাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। সিঙ্গাপুর, জাপানের অবস্থা আমাদের চেয়েও খারাপ ছিল। তারা সেই অবস্থার পরিবর্তন করতে পেরেছে। আমরাও পারব আধুনিক পুরান ঢাকা বানাতে। বাজেটে সব খাতে বরাদ্দ দেওয়া কঠিন হয়। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবহিত করব। আধুনিক নগরী গড়তে প্রতিনিয়ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে দোকানের ওপরে বাড়ি করা হয়েছে। মেয়রদের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ রেখে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশে বাসযোগ্য নগর গড়তে অনেক ভালো ভালো আইন আছে। আমি দেখেছি, এসব আইন ঠিকমতো মানা হচ্ছে না। আইন মানার চর্চা করতে হবে। আইন মান্য না করার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আাাসতে হবে। নিয়ম মেনে বিল্ডিং বানাতে হবে। এরই মধ্যে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছি, যাঁরা আইন জানেন; কিন্তু নিয়ম না মেনেই বাড়িঘর বানিয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যখনই আইন মানতে বলা হয়, সব প্রভাবশালী এক হয়ে যান। ফোন করে বলেন, আমি অমুক এমপি, আমি অমুক স্ট্যান্ডিং কমিটিতে আছি। আমার মন্ত্রণালয় তাঁদের প্রশ্রয় দেয় না। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় কিছু অসামঞ্জস্যতা ছিল। তা দূর করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড প্রিন্টে দেওয়া হয়েছে। ১০০ বছর পরেও যেন আমরা ভালো থাকি এমন দেশ গড়তে চান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমরাও তাঁর লক্ষ্য পূরণে কাজ করছি।

৩০-৪০ লাখ ধারণক্ষমতার শহরে বাস করছি দুই-আড়াই কোটি মানুষ

ইমদাদুল হক মিলন

সবাইকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে উপস্থিত হওয়ায়। আমি ঢাকায় না জন্মালেও ষাটের দশক থেকে পুরান ঢাকার ইসলামপুর জিন্দাবাহার থার্ড লেন এলাকায় দীর্ঘদিন ছিলাম। তারপর আমার জীবনের ৩৪টি বছর কেটেছে গেণ্ডারিয়া এলাকায়। সে সময় যে ঢাকাকে আমরা দেখেছি, আজকের ঢাকার কেউ সেটা কল্পনাও করতে পারবে না। কী রকম পরিচ্ছন্ন ঢাকা শহর দেখেছি, ঘরবাড়িগুলো আমরা কেমন দেখেছি, এমনকি ঢাকায় বাইসাইকেল চালানোর জন্য একটা লেন পর্যন্ত ছিল রমনা এলাকায়। ওই সময়ের অনেক মানুষেরই সেটা মনে থাকার কথা। সে সময় ঢাকায় প্রচুর মাঠ ছিল, অনেক পুকুর ছিল, খাল ছিল। মোটকথা ঢাকা একটা অসামান্য সুন্দর নগরী ছিল। সকালবেলা পানি দিয়ে সড়কগুলো ধুয়ে দেওয়া হতো। আমরা যারা দেখেছি তারা জানি কী করে চোখের সামনে ঢাকা বদলে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে ভারতে গিয়ে দেখলাম দিল্লি গাছে ভর্তি। পুরনো দিল্লি একটু ভিন্ন। আমাদের ঢাকা শহর যদি আপনি উড়োজাহাজ থেকে দেখেন, তবে বিল্ডিং ছাড়া কিছু দেখবেন না। এটার মূল জায়গাটা হচ্ছে অতিরিক্ত মানুষের চাপ। মানুষ যেভাবে ঢাকামুখী হয়েছে, যেভাবে কাজের সন্ধানে আসছে, বসবাস করতে এসেছে—যে শহরটাতে ৩০-৪০ লাখ মানুষ থাকার কথা সেটাতে দুই-আড়াই কোটি লোক থাকে। তো শহরটির চেহারা এ রকমই হবে। কিছুই আমাদের করার ছিল না।

খালগুলো দখলমুক্ত করা গেলে পরিবেশের পরিবর্তন আসবে

মোস্তফা কামাল

আমরা সাধারণত সমসাময়িক নানা ইস্যু নিয়ে গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে থাকি। আপনারা হয়তো বিষয়টি খেয়াল করেছেন। কালের কণ্ঠ সূচনালগ্ন থেকেই দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করে চলেছে। এবারও আমরা সেটা করেছি। আপনারা জানেন ঢাকা শহর বাসযোগ্য করার প্রয়াস সব সময় থাকে। আন্তর্জাতিক অনেক জরিপে রাজধানী নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন আমরা দেখতে পাই, এখানে বসবাসের মতো অবস্থা নেই। তারপর হচ্ছে যানজটের মতো একটা বড় সমস্যা। এই সমস্যাগুলো দূর করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাই। সরকার অনেকগুলো ফ্লাইওভার করেছে, ইউলুপ করা হয়েছে। এখন আবার মেট্রো রেলের কাজ হচ্ছে, হয়তো দ্রুতই কাজ শেষ হবে। কিন্তু ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করতে হলে শুধু বিল্ডিং করলে হবে না। এখানে রাজউক চেয়ারম্যান আছেন, তিনি বিষয়টি জানবেন যে ঢাকায় এমন সড়ক আছে যেখানে রিকশা নিয়েও প্রবেশ করা যায় না। গাড়ি নিয়েও যাওয়া যায় না। পুরান ঢাকার একটা তো আছেই। নতুন ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে অবশ্যই সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার আয়তন বাড়ছে।

পরিকল্পনা না থাকলে কিছু করা সম্ভব হবে না। রাজধানীতে প্রচুর পরিমাণ গাছ লাগাতে হবে। শুধু রমনা পার্কের গাছ দেখে, গাছ আছে বলে সন্তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই। রাস্তার পাশেও বড় বড় গাছ থাকতে হবে। কেউ কেউ রাস্তার পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেঙে পড়ার কথা বলেন। সেটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে পারে। তার পরও গাছ লাগাতে হবে। আরেকটি বিষয়, বিল্ডিং নির্মাণ করতে হবে অবশ্যই রাজউকের দেওয়া প্ল্যান বা নকশা অনুসারে। ভবনের পাশে খালি স্থান না রেখে ইচ্ছামতো ভবন করা যাবে না।

বাসযোগ্য নগর গঠনে বস্তিবাসীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে

আলমগীর শামসুল আলামিন (কাজল)

মুক্ত বাতাস, ভালো রাস্তাঘাট, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সুপেয় পানি একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু তারা কি এসব মৌলিক সুবিধাগুলো পাচ্ছে? ঢাকায় ৬০ শতাংশ নাগরিকের বসবাস বস্তিতে। তাদের জন্য আমরা টেকসই কিছু করতে পেরেছি? ভবিষ্যতে তাদের জন্য কী করতে চাই; সেটিরও কোনো ব্যাখ্যা নেই। বস্তিতে আগুন লাগলে দেখা যায়, পুরো বস্তিই পুড়ে যায়। বস্তি রক্ষা করা যায় না। এতে বস্তির সবার আশ্রয় হয় খোলা আকাশের নিচে। ফায়ার সার্ভিস কিছুই করতে পারে না। বস্তিতে মাদকের ব্যবসা হয়, অসামাজিক কার্যকলাপ হয়—এসব অভিযোগ তুলে তাদের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা যাবে না। বস্তিবাসীদের জন্য আলাদা চিন্তা করতে হবে। তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হবে। দেশে এরই মধ্যে যেসব বড় বড় শহর হয়ে গেছে, সেসব শহর নিয়ে পরিকল্পনা নেওয়া কঠিন। তবে পূর্বাচলসহ নতুন করে যেসব শহর হতে যাচ্ছে, সেগুলো নিয়ে মহাপরিকল্পনা নিতে হবে।

রাজউকের কাজে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে

ড. সুলতান আহমেদ

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। নগরবাসীকে সেবা প্রদানেও পরিবর্তন এসেছে। রাজউক আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণ করে কাজ করছে। রাজউকের জন্য এভাবে কাজ করা বেশ চ্যালেঞ্জের। সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী সব ধরনের সেবা প্রদান রাজউকের লক্ষ্য। তবে আমি মনে করি সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করাটা জরুরি। ঢাকায় অনেকগুলো ফ্লাইওভার হয়েছে। এগুলো চালু হওয়ার পর যেন যানজট না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যে কাজ অব্যাহত রয়েছে। বর্জ্য ব্যবহার থেকে বিদ্যুৎ তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আর বাসযোগ্য নগর গঠনে এটা খুব জরুরি।

ঢাকার চারপাশে থাকা চারটি নদীকে বাঁচাতে হবে। হাতিরঝিলকে বাঁচাতে হবে। এখন বর্ষাকালে হাতিরঝিলের পাশ দিয়ে গেলে দুর্গন্ধ বের হয়। এটা দূর করতে হবে। বাসযোগ্য নগরী করার জন্য আমাদের আইন ও বিধি-বিধান আছে। এখন দেখতে হবে এগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না। যাঁরা বাড়ি বানান তাঁরা কিন্তু আইন জানেন। অনেকে জেনেও আইন মানেন না। আইন পালন না করলে ভালো হবে না। তখন কিন্তু রাজউক কঠিন হবে। তা কিন্তু ভালো লাগবে না। রাজউক বুলডোজার দিয়ে বেআইনিভাবে বানানো বাড়ি ভেঙে দিলে তখন আবদেন-নিবেদন করলে শোনা হবে না। তাই সময় থাকতে সতর্ক হোন। সব সেবা অনলাইন করার চেষ্টা করছে রাজউক। এতে সাধারণ মানুষের হয়রানি কমে যাবে।

উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিম্ন আয়ের মানুষদের আবাসনে গুরুত্ব দিতে হবে

মো. রাশিদুল ইসলাম

পরিকল্পিত নগরায়ণ জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য। শুধু শহর নয়, গ্রামকে বাসযোগ্য করতে ঢেলে সাজানোও আমাদের লক্ষ্য। এ জন্য আমরা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। প্রতিটি গ্রামকে শহরের আদলে গড়ে তুলতে কাজ করা হচ্ছে। ঢাকা শহরে প্লট প্রকল্পের পরিবর্তে ফ্ল্যাট প্রকল্প উৎসাহিত করা হয়েছে। মিরপুর থেকে শ্যামলী পর্যন্ত আমরা বিশেষ সেবা দিচ্ছি। শহরের বসবাসে যেসব এলাকায় সমস্যা আছে—তা চিহ্নিত করে সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার ওপর নির্ভর করছি না। জমি কমে যাচ্ছে। এ জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত নগরায়ণ। জমি তো বানানো যাবে না। জমি কমে গেলে আমরা কোথায় যাব? আবাসন খাতের উন্নয়ন করতে গেলে, কম আয়ের মানুষদের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা কম আয়ের মানুষদের পরিকল্পিত বসবাসের জন্য ১০ হাজার ফ্ল্যাট তৈরি করছি। এসব ফ্ল্যাট গ্রহণকারী দৈনিক ২৪৫ টাকা হিসেবে পরিশোধ করে ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারবে। বস্তিবাসীর উন্নয়ন না করলে আমাদের নগরগুলো বাসযোগ্য হবে না। রাজধানীতে আরেকটা হাতিরঝিল করা হবে। মোহাম্মদপুর ও শ্যামলীতে অবাঙালিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

পরিকল্পনাবিদদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না!

পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান

বাসযোগ্য নগরের কথা বললে ঢাকার কথা চলে আসে। যদিও বাসযোগ্য নগর বলতে আমরা সারা দেশের সব শহরকে উদ্দেশ্য করে থাকি। জাতীয় ভৌত পরিকল্পনার বিষয়টি সময়োপযোগী। শুধু রাজধানী নয়, বিভাগীয় শহরগুলোকেও মাস্টারপ্ল্যানে আনা জরুরি ছিল। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতে ছোট শহর থেকে বড় শহর সব মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে করতে হবে। যার জন্য দুটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। এক নম্বর হচ্ছে জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব। কত মানুষ থাকার জন্য উপযোগী শহর—তা বিবেচনা না করে পরিকল্পনা করলে সব কিছু ব্যর্থ হবে।

আমাদের দেশে বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে—পরিকল্পনাবিদদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না। বরং স্বার্থান্বেষী ক্ষমতাধরদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। পরিকল্পনার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ দিতে হবে।

আমরা দেখি অনেক এলাকায় পরিকল্পনা হয়েছে কিন্তু তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ঢাকা শহরে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে। অথচ রাজশাহী শহরের দিকে তাকান, মূল পরিকল্পনার মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হলেও উন্নয়ন নজরে আসছে। শহরটি দেখতেও মনোমুগ্ধকর। মনে রাখতে হবে যে পরিকল্পনায় বেশি বাজেট হলে খুশি হওয়ার কিছু নেই। বরং কম বাজেটে উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। শুধু রাজধানী নয় সারা দেশের নগর ও আরবান এরিয়ার দিকে নজর রাখতে হবে। নয়তো ভবিষ্যতে সেখানে ঝুঁকি বাড়বে। এমনকি রাজধানীতে ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। সেটির মাধ্যমে মহল্লাভিত্তিক পরিকল্পনাও করা যেতে পারে। কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহল্লাবাসীর সঙ্গে কথা হলে কোথায় কী সমস্যা সেটা জানা যাবে। তখন জলাবদ্ধতা, খেলার মাঠ, পার্ক ইত্যাদি বিষয়ক মূলচিত্র উঠে আসবে। আমরা এখনো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে উন্নয়নে নজর দিচ্ছি। যা খুব একটা সফলতা দিতে পারে না।

ড্যাপ চূড়ান্তের আগে সব পক্ষের  সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি

মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন

বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশন (বিএলডিএ) আমাদের এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়ে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখনো ৯০ শতাংশই রয়ে গেছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিল্ডিং কোড আছে; কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) আগে ছিল শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক, এখন সেটি দেশব্যাপী হচ্ছে। ড্যাপে অনেক ত্রুটি আছে। অংশীজনরা এরই মধ্যে ড্যাপ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছে। আমি মনে করি, ড্যাপ চূড়ান্তের আগে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি। ঢাকাকে বাসযোগ্য নগর করতে চাইলে নাগরিকের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। অথচ সেটি হচ্ছে না। কারণ এখানে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ নেই। তবে নাগরিকের সচেতনতাও বাড়াতে হবে। আমরা শুধু সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলি; কিন্তু সমাধানের পথে হাঁটি না। এখানে ১০-২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে গেলেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রশ্ন তোলে। এতে দুর্নীতিমুক্ত করতে গিয়ে দুর্নীতি বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। আমরা অসহায়বোধ করছি। বিনিয়োগ করতে গিয়ে যখন নানামুখী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের তখনই বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে। কানাডায় বেগমপাড়া তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে টাকা চলে যাচ্ছে। আমরা গাছের ওপরে পানি ঢেলে শিকড় কাটছি। এতে লাভ হবে না।

কার ও হাঁটার পৃথকরাস্তা করতে হবে

কাজী সাইফুন নেওয়াজ

 

নগরীর রাস্তা যদি নিরাপদ না হয় তাহলে সেটি কখনোই বাসযোগ্য হবে না। রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে পথচারীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার স্বীকার হচ্ছে। নিরাপদ নগরী করতে হলে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই আমরা দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে পারব। নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে বাংলাদেশের মিল রয়েছে। আমাদের মতো তাদেরও রাস্তাসংখ্যা কম। অপরিকল্পিত শহরের কারণে আমরা যেমন রাস্তাসংখ্যা বাড়াতে পারি না তেমনি সি লেভেলের নিচে থাকার কারণে তারাও রাস্তা বাড়াতে পারে না। একটা সময় নেদারল্যান্ডসেরও রাস্তা নিয়ে অনেক দুর্ভোগ ছিল। ঢাকা শহরের মতো জ্যাম ছিল, দুর্ঘটনা ছিল। সেসব সমস্যা বর্তমানে নেই সেখানে। তারা দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে—একটি হচ্ছে কৌশল, অন্যটি পরিকল্পনা। তারা চেয়েছে পথচারীবান্ধব শহর করার। তা করতে গিয়ে অনেক শহরে তারা পরিকল্পনা করেছে হাঁটার রাস্তা একটি হবে ও কার চলার রাস্তা আরেকটি হবে। দেখা গেছে, পথচারীরা সোজা রাস্তায় হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে এবং একই গন্তব্যে পৌঁছাতে কারগুলোকে ঘুরে আসতে হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না তা মনিটর করতে হবে

ইকরাম এইচ খান

‘বাসযোগ্য নগরী’ বলতে শুধু ঢাকা শহর নয়, তা বাংলাদেশের যেকোনো শহরই হতে পারে। শহরকে বাসযোগ্য করতে হলে কিছু করণীয় থাকে। প্রথমটি হচ্ছে, নীতিনির্ধারণ করা এবং তা পালন করা। নীতি বাস্তবায়নের কাজ মূলত কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংস্থাগুলো করবে, গোষ্ঠীবদ্ধভাবে ব্যক্তিরাও করবে ও ব্যক্তিগতভাবে আমরা সবাই করব। শহরে বাড়ি বানানোর আগে অনুমোদন বা পরিকল্পনা নিতে হবে। পরিকল্পনা পাস করিয়ে দেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, সেটিরও মনিটরিং থাকতে হবে। তা যদি আমরা ঠিকঠাকমতো করতে পারি তাহলে নগরী বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।

পরিবহন খাত স্বাধীনতার পর তেমন গুরুত্ব পায়নি

ড. সালেহ উদ্দিন

ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে দুই কোটি নাগরিকের জন্য গণপরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অথচ অর্থনীতির প্রাণ খ্যাত এ পরিবহন খাতটি স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো গুরুত্বই পায়নি। আমরা যখন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করি, সেটি শেষ করতে পারি না। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) করা হলো; কিন্তু সেই দিকনির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে পারিনি। সেটি করতে পারলে ঢাকা শহরের চিত্র পাল্টে যেত। সালেহ উদ্দিন বলেন, আমাদের পরিবহন খাতের তথ্যের অভাব নেই, প্রকল্পেরও অভাব নেই। অথচ ৭৬ শতাংশ নাগরিক গণপরিবহন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছে। ৮৮ শতাংশ দুর্ভোগের শিকার, ৯২ শতাংশ যাত্রীর অভিযোগ অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়া, ৯০ শতাংশ যাত্রী জানে না কোথায় অভিযোগ দিতে হয়। বিভিন্ন কম্পানির যানবাহনের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা ঢাকা শহরকে খেয়ে ফেলছে। সারা বিশ্বেই ফুটপাতকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা করা হয়। আর আমাদের এখানে ফুটপাত সব দখলে।

আধুনিক নগর গঠনে ইটের বিকল্প ব্যবহার জরুরি

মো. আকতার হোসেন সরকার

২০১৬ সাল থেকে আমরা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল নিয়ে কাজ করছি। সেখানে একটি লক্ষ্য হচ্ছে, মানব বসতি ও শহরগুলোকে নিরাপদ এবং স্থিতিশীল রাখা। এ লক্ষ্যটি অর্জন করার জন্য বিশ্বব্যাপী কিছু দিকনির্দেশ দেওয়া আছে। সেগুলো পরিমাপের জন্যও কিছু একক রয়েছে। প্রতিবছর ইনডেক্সের মাধ্যমে পরিমাপ করা যাবে কোন দেশ কতটুকু অগ্রগতি করেছে। বাংলাদেশ অত্যন্ত জনবহুল একটি দেশ। প্রতিবছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়তে হয় আমাদের। সেই প্রেক্ষাপটে নগরে বসবাস করা জনসংখ্যা শতকরা ৩০ ভাগ। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালে নগরে জনসংখ্যা প্রায় ৫০ ভাগে উপনীত হবে। এমন পরিস্থিতিতে নগরের যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সেটি পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব করে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের নজর দিতে হবে। হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট সেই লক্ষ্যে কাজ করছে। আমাদের দেশে নির্মাণকাজে পোড়া মাটির ইটের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। আমরা ভেবে থাকি ইট ছাড়া কোনো কিছু তৈরি করা সম্ভবই নয়। ইট বানাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আমরা পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছি। ইটের বিকল্প ব্যবহার করতে হবে। এসব ব্যাপারে জনগণের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। এইচবিআরআই দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে।

ঢাকার ৪৩ খালের ১৩টি লাইফ সাপোর্টে বাকিগুলো নিশ্চিহ্ন!

মো. শরীফ উদ্দীন

বাসযোগ্য নগরের বিষয়ে কথা বললে দুটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে হয়। একটা হচ্ছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে নগরবাসীর ভোগান্তি। আরেকটা হচ্ছে একটু বৃষ্টিতে ঢাকা শহর ডুবে যাওয়া।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ড্রেনের যে ম্যান্ডেট আছে সরকারের সেটা হচ্ছে মূলত ঢাকা ওয়াসার। আমরা জানি ঢাকা ওয়াসার দুটি ড্রেনেজ সার্কেলও আছে। সেখানে ১১২ জন জনবল আছে। আমরা মূলত সড়ক, নর্দমা, ফুটপাত নির্মাণ রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে থাকি। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখা যায়, জলাবদ্ধতা একটা বিশাল ইস্যু হয়ে যায়। পাঁচ বছর ধরে আমরা নিজেরাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা করি। আমার বাসার সামনেও পানি ওঠে। হয়তো সেখানে ড্রেনেজের পাইপলাইন আছে বা খোলা নর্দমা আছে, কিন্তু পানি যাচ্ছে না। ওই লাইনটার ভেতরে কোনো আবর্জনাও নেই। রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অনেকটা এ রকম। আমার ফুটপাতের নিচে খোলা নর্দমা থেকে ঢাকা ওয়াসার স্ট্রং লাইনে সেখান থেকে পানিটা বক্স কালভার্ট তারপর সেখান থেকে খাল হয়ে নদীতে যাচ্ছে। এই যে পদ্ধতি, এখানের কোথাও যদি একটু ব্যাঘাত ঘটে তাহলে পুরো পদ্ধতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অনেক কাজ করা হয়েছে, হচ্ছে—আমাদের এবং ওয়াসার অভ্যন্তরীণ ড্রেনেজ কাঠামো আছে তার পরও পানি যাচ্ছে না। কোথায় যাবে পানিটা? যাবে খালে। কিন্তু খালই তো নেই। ঢাকা শহরে কাগজে-কলমে ৪৩টি খাল আছে। যার মধ্যে উত্তরায় আছে ২৫টা। এগুলো থেকে এখন লাইফ সাপোর্টে ১২-১৩টা খাল আছে। বাকিগুলো হারিয়ে গেছে।

আমাদের চ্যালেঞ্জ অনেক সামর্থ্য কম

এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন

দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মূলত পুরান ঢাকার মতো অপরিকল্পিত এলাকা নিয়ে কাজ করে। সেখানে কাজ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমরা মূলত তিনটি ধাপে কাজ করে থাকি। যার মধ্যে বর্জ্য কালেকশন বা বাসা-বাড়ি থেকে ময়লা নিয়ে আসা এবং সংগৃহীত বর্জ্য অপসারণ করা। এ দুটি কাজ আমাদের পক্ষে করা সম্ভব হলেও তৃতীয় ধাপে সংগৃহীত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হ্রাস করা সম্ভব হয় না। যদিও গত ১০ বছর ধরে এই ব্যবস্থার কথা বলা হয়ে আসছে। এটা মনে রাখতে হবে আমাদের ৪০ শতাংশ লোকবল সংকট রয়েছে। এর মধ্যে আবার মশক, বর্জ্য, ফুট ওভারব্রিজ, সড়ক পরিষ্কার, বাসা-বাড়ির ময়লা সরানো, জলাবদ্ধতা, দুর্যোগে রাস্তায় পড়ে থাকা গাছ সরানোসহ বিভিন্ন কাজ করতে হয়। জলাবদ্ধতার কিছু কাজে আমরা ওয়াসার কিছুটা সহায়তা পাই। এর মাঝেও জনসচেতনামূলক কাজগুলো করে যেতে হয়। জনসাধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করতে হয়। আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ থাকলেও সে অনুযায়ী সামর্থ্য নেই। প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে এর ৮০ শতাংশের ব্যবস্থাপনা করা গেলেও ২০ শতাংশ থেকে যাচ্ছে। যা পরে ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করছে।

লোকবল বাড়ানোরও কোনো সুযোগ নেই। সিটি করপোরেশনের যে রাজস্ব আয় হয় তা দিয়ে সরঞ্জাম ও কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য কাজ শেষে আর কিছুই থাকে না। রাজস্বও বাড়ানো যায় না। রাজস্ব বাড়াতে গেলে আবার এলাকাবাসী ক্ষেপে যায়। অথচ বিভিন্ন দেশে শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্যই আলাদা বাজেট দেওয়া হয়। এই বিষয়ে যদি সরকার চিন্তা করে তবে সমস্যা কাটিয়ে তোলা সম্ভব। নয়তো খুব ক্ষতিকারক বর্জ্য আরো ক্ষতি নিয়ে আসবে।

এর জন্য জনসাধারণকে সচেতন হতে হবে। আমরা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সচেতনামূলক কাজ করে চলেছি। যাতে তাদের কিছু বর্জ্যের ব্যবস্থা যাতে তারা করতে পারে। রাস্তায় বসে হকার শুধু ফুটপাত দখল করছে না। বরং রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা ফেলে নোংড়া করছে।

আমাদের দেশে বর্ষাকালে রাস্তা খুঁড়ে কাজ করার বিষয়ে সব সময় পত্রপত্রিকা সংবাদ পরিবেশন করে থাকে। কিন্তু ঘুরে-ফিরে সেই বর্ষাতেই খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়। যেমনটা এবারও হচ্ছে। রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি করলে রাস্তা পরিষ্কার করা যায় না। এর কারণে রাস্তায় জমে থাকা বালি বৃষ্টির পানিতে ড্রেনে পানি যাওয়ার মুখ বন্ধ করে দেয়। যার কারণে তৈরি হয় জলাবদ্ধতা।

আরবান রিজিলেন্স প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমবে

আব্দুল লতিফ হেলালী

ভৌগোলিকভাবে ও ভূমিকম্পের দিক থেকে বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ শহরের মধ্যে ঢাকা একটি। ২০১০ সালে হাইতিতে ভূমিকম্পে দুই লাখ ৫০ হাজার লোক মারা গেছে। একই মাত্রার ভূমিকম্পে চিলিতে মারা গেছে ৫০০-এর কম লোক। ১৯৭০ সালে পেরুতে ভূমিকম্পে ৭০ হাজার লোক মারা যায়। ২০০৭ সালের একই মাত্রার ভূমিকম্পে পেরুতে মারা যায় ৫০০-এর চেয়ে কম লোক। তাদের প্রস্তুতি ও জনসচেতনতার কারণে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পেরেছে। বাংলাদেশে অতীতের বড় বড় ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে সরকার ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আরবান রিজিলেন্স প্রজেক্টের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০১৫ সালে এ প্রজেক্টের অনুমোদন দেওয়া হয়। চারটি ভাগে এ প্রজেক্টটি ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে আরবান রিজিলেন্স প্রজেক্ট রাজউক, আরবান রিজিলেন্স প্রজেক্ট ডিএনসিসি, ডিপার্টমেন্ট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট, মনিটরিং অব প্ল্যানিং কমিশন। এ ধরনের প্রজেক্ট বাংলাদেশে প্রথম। যেটি বাস্তবায়িত হলে অন্যান্য দেশের মতো আমরাও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় এগিয়ে যেতে পারব।

পদ্মা সেতু চালুর পর গাড়ির চাপ বাড়বে ফ্লাইওভারে

উইং কমান্ডার এরফানুল আজিম (অব.)

আমরা সবাই ফ্লাইওভার ব্যবহার করি। আমরা দেখি, ফ্লাইওভারের ওপরটা খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও কম সময়ে সেটি পার হতে পারি। পার হওয়ার পরপরই ঢাকা শহরে যানজটের মুখোমুখি হতে হয়। ফ্লাইওভার করার সময় আমাদের পরিকল্পনায় ছিল যে কিভাবে গাড়িগুলো ফ্লাইওভার থেকে নামাবে। দেখা গেছে, বিভিন্ন কারণে ফ্লাইওভারগুলো এমন এক জায়গায় নামাতে হয়েছে, যেখানে ইন্টারসেকশন আছে। বিশেষ করে আমরা যদি পুরান ঢাকার কথা বলি, যেটা নিমতলীতে গিয়ে নেমেছে। নামার পরই এত রিকশা ও ঠেলাগাড়ি, যেগুলোর জন্য ফ্লাইওভার থেকে নেমে গাড়িগুলোকে থেমে যেতে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। যখন কোনো ব্যবহারকারী টোল দিয়ে গাড়ি ব্যবহার করবে সে অবশ্যই চাইবে, সেখান থেকে নেমে সুন্দরভাবে বের হয়ে যেতে। কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে আমরা সেটির নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। পদ্মা সেতু হয়ে যাওয়ার পর যখন দক্ষিণ অঞ্চলের গাড়িগুলো আসা শুরু করবে, তখন ঘটনা আরো ভয়াবহ রূপ নেবে। ফ্লাইওভারের নিচের প্রসঙ্গে যদি বলি তাহলে বলতে হবে, ওপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট। খুবই অপরিষ্কার ও দখলদারি সেখানে লক্ষণীয়। সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিলেই এ সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব।

লোকবল সংকটের কারণে নগরীর পরিচ্ছন্নতাকাজে কারিগরি চিন্তা করতে হবে

কমোডর মঞ্জুর আহমেদ

সিটির জন্য পরিকল্পনা একটি মুখ্য বিষয়। করপোরেশনের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা করা। আর সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হচ্ছে বাসা। আমরা যেটা করি, বাসা ও রাস্তার ময়লাগুলো সেকেন্ডারি স্টেশনে নিয়ে থাকি। সেই ক্ষেত্রে আমাদের লোকবলের অভাব কাজের ক্ষেত্রে বিপাকে ফেলে দেয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মাত্র ১৫০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করছেন। লোকবল কম থাকার কারণে এখন আমরা টেকনিক্যাল কাজের কথা ভাবছি। যেখানে গাড়ি দিয়ে ময়লা নেওয়া হবে এবং পানি দিয়ে ময়লার স্থান পরিষ্কার করে দেবে, সেখানেও সমস্যা রয়েছে। ভালো মেশিন অপারেট করতে হলে ভালো রাস্তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারণ রাস্তা সমান না হলে কাজ করা যায় না। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন তিন হাজার টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এগুলো আমরা সঠিক ব্যবস্থাপনায় সরাতে পারছি না। এ ময়লা দিয়েও খাল ভরাট হচ্ছে। যার ফলে পরবর্তী সময়ে আমরা জলাবদ্ধতার মতো সমস্যায়ও পড়ছি। এখানে হয়তো আমরা ময়লাগুলো ধ্বংস করার ব্যবস্থাপনা দিতে পারিনি, যেটা আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু এই ঘাটতি নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন বলে আসছি। প্রতিটি ওয়ার্ডে যেখানে ময়লা ফেলার দুটি করে সেকেন্ডারি স্টেশন বসানোর কথা, তা আমরা পারছি না।

প্রতিটি বাড়িতে পানি রিজার্ভার থাকা জরুরি

লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান

কয়েক দিন আগেও পুরান ঢাকায় আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। আমরা সবাই চুড়িহাট্টার সেই দুর্ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত। পুরান ঢাকার ভৌগোলিক বিন্যাস অথবা ঘরবাড়ির যে অবস্থান তাতে দুর্ঘটনা ঘটলে তা নির্বাপণ করতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। রাস্তাঘাট চিকন হওয়ায় আমাদের গাড়িগুলো সেখানে মুভ করতে পারে না। ছোটমানের ফায়ার সার্ভিসের যে গাড়িগুলো রয়েছে সেগুলো নেওয়াও সম্ভব হয় না। আরেকটি বড় বিষয় হলো, ওয়াটার রিজার্ভার নেই বললেই চলে। এখানকার যে বাড়িগুলোতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সেগুলো বিভিন্ন কেমিক্যালের গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যার কারণে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলেই এর ব্যাপকতা বহুল অংশে বেড়ে যায়। সুতরাং সেখান থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরিয়ে এনে শুধু বসবাসের বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করলে এর ভয়াবহতা কমে আসবে। সরকার এরই মধ্যে সে উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিটি বাড়িরই উচিত হবে পানির রিজার্ভারগুলো প্রস্তুত করা।  বাড়িতে পর্যাপ্ত পানি মজুদ রাখলে নিজেরাই অগ্নিনির্বাপণ করতে পারবেন।

সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে মানুষের বাঁচার অনেক কিছু হারিয়ে যাবে

মোহাম্মদ আজিম বখ্শ

শুরুতে এখানে বক্তাদের আলোচনা শুনে আমি কিছুটা আশাহত হয়েছিলাম। যে বসতবাড়িকে মাঠ বানিয়ে আমাদের ভালোভাবে থাকার জায়গা করে দেবেন। উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে সেটা সবার প্রত্যাশা। তবে সেটি জনবসতি ধ্বংস করে শহর তৈরি করে নয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে সরু রাস্তার বিষয়টি যে বারবার আসে, সেখানে বলতে হয় ধোলাইখাল বন্ধ করে যে রাস্তাগুলো করা হয়েছে এগুলো কিন্তু আগে ছিল না। নর্থ-সাউথ রোড, ইংলিশ রোড হয়ে গুলিস্তান পর্যন্ত বিরাট রাস্তা হয়েছে। এই রাস্তার ইংলিশ রোডের প্রান্ত ধরে যদি ধরি গুলিস্তানের দিক থেকে গেলে ডান দিকে পড়বে বংশাল এরিয়া, বাম দিকে পড়বে মালিটোলা এরিয়া। এই রাস্তা দিয়ে যখন যাবেন তখন ডান-বামে তাকালে বুঝতে পারবেন বংশাল এলাকার বাড়িঘরগুলো কিন্তু একটু বড়। তার মানে তাদের আর্থিক অবস্থা আগে থেকেই ভালো ছিল। মালিটোলায় কিন্তু বাড়ি ছোট ছোট। এখন বংশালের এই রাস্তা থেকে যদি সরু গলি হয়ে ভেতরের দিকে যাই— তবে দেখব সেখানে পাঁচ-ছয়টা বাড়ি তার পরই কিন্তু বংশাল পুকুর। তাহলে আমরা যদি নর্থ-সাউথ রোডের এই অংশে যদি ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি লাগাই তাহলে আগুন নেভাতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

পরিকল্পনা আছে বাস্তবায়ন নেই

পরিকল্পনাবিদ মো. মাজহারুল ইসলাম

আমরা সবাই একটি পরিকল্পিত ঢাকা শহরের স্বপ্ন দেখি। প্রতিদিন চলার পথে দুর্ভোগ, বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি সমস্যাগুলো কেউই চাই না। এ সমস্যাগুলো নিরসন করার জন্য যে উপায়ে আমাদের কাজ করা উচিত তা সত্যিকার অর্থে করা হচ্ছে না। আমরা যখন কোনো পরিকল্পনা করি সেখানে অনেক ধরনের উপাদান থাকে। প্রতিটি পরিকল্পনারই নির্দিষ্ট ব্যাপ্তি থাকে। যেমন : ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের কথাই ধরা যাক। ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সেটার মেয়াদকাল ছিল। গেজেট হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। সেখানে বলা হয়েছিল, পরিকল্পনাটি প্রতি পাঁচ বছর পর পর পর্যালোচনা হবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, তা হয়নি। ২০১৬ সালে এসে সেটি সম্পন্ন হয়েছে কিন্তু এখনো গেজেট আকারে প্রকাশ হয়নি। পরিকল্পনার যে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া দরকার ছিল সেটি মানা হয়নি। সুতরাং, পরিকল্পনা হচ্ছে কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রত্যেকটি জায়গায় নিয়মনীতি আছে অথচ সবখানে বাস্তবায়ন নিয়ে সমস্যা। আজকের ঢাকা শহরের এই করুণ অবস্থা এক দিনে হয়নি। ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত আমরা যে পরিকল্পনাটি করেছিলাম সেটির বাস্তবায়ন হলে অবস্থাটা এমন হতো না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা