kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নজর বাড়াতে হবে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে

১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



নজর বাড়াতে হবে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে

ছবি : তারিক আজিজ নিশক

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে হৃদেরাগে মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে গত শনিবার বাংলাদেশ সোসাইটি অব কার্ডিও ভাসকুলার প্রিভেনশনের উদ্যোগে কালের কণ্ঠ ও চ্যানেল আইয়ের আয়োজনে এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয় এক গোলটেবিল আলোচনা। চ্যানেল আইয়ের স্টুডিওতে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন তানজিদ বসুনিয়াশাহ পরান

আরবান হেলথ ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা দরকার

ডা. আ ফ ম রুহুল হক

স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিকাঠামোতে আমরা বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে আছি। কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল এ রকম অনেক পরিকাঠামো এত সুন্দরভাবে সাজানো খুব কম স্থানে আছে। তবে আমাদের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সব রোগ নিরাময়কারী, প্রতিষেধক খুব বেশি জায়গায় নেই। শুধু টিকাদান কর্মসূচি আছে যেখানে আমাদের প্রায় এক লাখ স্বেচ্ছাসেবী আছে। আমাদের প্রচলিত রীতির বাইরে থেকে কিছু ভাবতে হবে এবং ওই এক লাখ স্বেচ্ছাসেবীকে এ ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। শহরে বসে সভা-সেমিনার করলে সেটি গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। আমাদের ওই দিকে নজর দিতে হবে। গ্রামে, স্কুলে স্কুলে গিয়ে যদি প্রচারণার কাজ করা যেত তাহলে এর উপকারিতা আরো বেশি পাওয়া যেত। সে কায়দায় আমরা কমিউনিটি ক্লিনিককে কাজে লাগাতে পারি কি না সেটি ভেবে দেখতে হবে। উদ্যোগগুলোকে গ্রামের পর্যায়েও নিয়ে যেতে হবে তাহলে সফলতা আরো বেশি আসবে। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্যান্য ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিষয়ের শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানগুলো শহুরে স্বাস্থ্যের (আরবান হেলথ) ক্ষেত্রে এসে একেবারে নিচে নেমে যায় সেটি মাতৃমৃত্যু হোক, শিশুমৃত্যু হোক, ক্যান্সারের ক্ষেত্রে হোক আর পরিবার পরিকল্পনাই হোক। তার প্রধান কারণ শহরে থাকা গরিব মানুষ। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নিয়ে বসেছিলাম। আরবান হেলথ ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা দরকার। ই-সিগারেট আমদানি একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া উচিত। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি সিগারেট কম্পানিগুলো কিভাবে স্কুলছাত্রদের ব্যাগে ই-সিগারেট ব্যবহারের পথ করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিষয়ে আরো বেশি বেশি গবেষণার প্রয়োজন এবং তথ্যসমৃদ্ধ পরিসংখ্যান পরিচালনা করা প্রয়োজন।

শিগগিরই শুরু হচ্ছে ‘হেলদি সিটি’ প্রগ্রাম

ড. গোলাম মো. ফারুক

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যে পরিকল্পনাগুলো আছে তার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নন-কমিউনিক্যাবল ডিজিজ কন্ট্রোল অপারেশন প্ল্যান। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই প্ল্যান চলবে এবং এসডিজি গোল ঘোষণা হওয়ার পরই আমাদের এই পরিকল্পনাগুলো তৈরি হয়েছে। লক্ষ্য অর্জনে আমাদের সেভাবেই দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে এবং কাজ চলছে। সাম্প্রতিক ডাটা থাকলে আমাদের কাজ করতে অনেক সুবিধা হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে নন-কমিউনিক্যাবল ডিজিজ (এনসিডি) নিয়ে একটি মাল্টিসেক্টরাল অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি হয়ে আছে। এরই মধ্যে আমরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে ফোকাল পারসনদের নাম নিয়েছি। আশা করছি, আগামী এক মাসের মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নিয়ে একটি প্রবেশিকা করতে পারব। এর কারণ এনসিডি বিষয়ে সফলতা অর্জন করতে গেলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরাসহ সচিবদের সমর্থন ও সক্রিয়তার প্রয়োজন রয়েছে। এনসিডি কো-অর্ডিনেশনের সভাপতি হিসেবে আমাদের মন্ত্রী এবং সদস্যসচিব হিসেবে আমাদের সচিব রয়েছেন। এরই মধ্যে আমরা অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর মধ্যে ‘হেলদি সিটি’ নামের একটি নতুন প্রগ্রাম শিগগিরই শুরু হচ্ছে। বর্তমানে ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিকস, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি স্কুল শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়েও কাজ চলছে। সিগারেট, গুল, জর্দা ব্যবহারে মানুষকে নিরুৎসাহ করতে কাজ শুরু হয়েছে এবং গত সপ্তাহেই ই-সিগারেট নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

হৃদেরাগের ওষুধ কম দামে দেওয়ার জন্য কাজ করছি

আশরাফ উদ্দিন আহমেদ

হৃদেরাগে হঠাৎ অনেকের মৃত্যু ঘটলেও মূলত এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগের অন্তর্ভুক্ত। এটি চাইলেই সহজে দমন করা যায় না। তাই কিভাবে এই রোগের ওষুধ সহজে পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা আমরা করছি। আমরা এই রোগ প্রতিরোধে টিমও গঠন করেছি। কিভাবে কম মূল্যে ওষুধ বিক্রি করা যায় তার জন্যও আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

অতিরিক্ত ওজন শিশুদের জন্য বড় বিপদ বয়ে আনছে

ডা. মো. আব্দুল আজিজ

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রত্যেকটি সাইট তৈরি হয়েছে শুধু কিউরেটিভ বিষয়ে, প্রিভেনটিভ বিষয়গুলোর দিকে আমাদের তাকানোই হয়নি। মানুষের কোলেস্টেরল কেন বেড়ে যাচ্ছে সে বিষয়ে আমাদের খোঁজ নিতে হবে। শিশুদের নিয়ে কাজ করার সুবাদে দেখেছি মায়েদের একটাই সমস্যা তাঁদের শিশুরা খায় না। এখন ৫০ ভাগেরও বেশি শিশু ওভার ওয়েট বা অতিরিক্ত ওজন, যা শিশুদের জন্য বড় বিপদ বয়ে আনছে। এমনও দেখা গেছে যে আট বছরের একটি বাচ্চার ওজন ৮৫ কেজি, ৯ বছরের বাচ্চার ৬৫ কেজি ওজন। এগুলো কেন হচ্ছে? ফাস্ট ফুডের জন্য আমাদের বাচ্চাদের ওজনটাও বেড়ে যাচ্ছে, কোলেস্টেরলটাও বেড়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় যেসব বাচ্চার ওজন বেশি হয় ৪০ বছর বয়সের পর তাদের হাইপার টেনশন, ডায়াবেটিস বেশি হয় এটা এরই মধ্যে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তাকালেই দেখবেন, আমাদের স্কুলের সামনে ফাস্ট ফুডের দোকান, যেখানেই যাবেন সেখানেই ফাস্ট ফুডের দোকান। আমরা এখন থেকেই যদি এই বিষয়গুলো খেয়াল না করি, বাচ্চাদের খাবারের বিষয়ে যদি আগে থেকেই সচেতন না থাকি তাহলে যতই ক্লিনিক্যাল সাইটে উন্নতি করি না কেন লাভ হবে না। দিন দিন যেভাবে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে তাতে এখনই আমাদের এই বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। বাচ্চার শরীর নরমাল হলেও সেটা আমাদের কাছে নরমাল না। একটি বাচ্চাকে যদি আপনি চিপসের প্যাকেট কিংবা জুস ধরিয়ে দেন তাহলে কি ওই বাচ্চা আগামী আট ঘণ্টার মধ্যে অন্য কোনো খাবার খাবে? বাচ্চার খাবার আগেই নষ্ট করে দিলে সে খাবে কিভাবে? এসব বাচ্চার কোলেস্টেরলসহ অন্যান্য বিষয়গুলো কখনোই নরমাল থাকার কথা নয়। এটার পরিবর্তন চাইলে আমাদের বাচ্চাদের জন্য ১০০০ দিনের খাওয়ার যে কর্মসূচি সে জায়গা থেকে শুরু করতে হবে। তা ছাড়া এই নন-কমিউনিকেবল ডিজিসমুক্ত সুস্থ জাতি পাব না।

ব্যক্তিগত সচেতনতায় যেকোনো রোগ-প্রতিরোধ সম্ভব

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন

সত্যি বলতে আমরা যত দ্রুত শহরায়নের পথে যাচ্ছি আমাদের কমিউনিক্যাবল ডিজিস ও নন-কমিউনিকেবল (এনসিডি) ডিজিস তত দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। আমরা কমিউনিকেবল ডিজিসের ক্ষেত্রে যতটা গুরুত্ব দিয়ে থাকি নন-কমিউনিকেবল ডিজিসের ক্ষেত্রে ততটা গুরুত্ব দিই না। কিন্তু এটি এখন মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চলে এসেছে। বিশেষ করে হৃদেরাগের কথা বলা যেতে পারে। হৃদেরাগের যে ফ্যাক্টরগুলো কাজ করছে সেটি অবশ্যই শহরায়ন, লাইফস্টাইল, কাজের পরিবেশ, বয়োবৃদ্ধির প্রক্রিয়া, খাদ্যাভ্যাস, টোব্যাকোসহ সব কিছুর বৃদ্ধিতে আমরা ঝুঁকির মধ্যে চলে যাচ্ছি। ব্যক্তিগত সচেতনতা থাকলে আমরা যেকোনো ধরনের রোগ-প্রতিরোধ করতে পারি। রোগ সম্পর্কে শুধু জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে সেটার বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগ ঘটাতে হবে। এনসিডির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিক থেকে গুরুত্ব দিতে হবে। সে জন্য যদি শিক্ষার কারিকুলামে এসংক্রান্ত কোনো বিষয় সংযুক্ত করতে হয় সেটা করতে হবে, একসঙ্গে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া গণমাধ্যমকে ব্যবহার করতে হবে। সর্বশেষ ডেঙ্গু ইস্যুতে গণমাধ্যমের কার্যকরী ভূমিকা সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত আছি। স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থাটা যদি আমাদের প্রাইমারি হেলথ কেয়ার লেভেলে নিতে পারি তাহলে সেটি খুবই কার্যকরী প্রভাব ফেলতে পারে। ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটিজের ওপরে আমাদের জোর দিতে হবে। আমরা অনেক দেশেই দেখি যে সেখানে গাড়ি চলার জন্য বরাদ্দ রাস্তার চেয়ে ফুটপাতে চলাচলের জন্য রাস্তার প্রশস্ত বেশি। আর আমাদের দেশে চলাচলের জন্য যতটুকু রাস্তা আছে ততটুকুই ব্যবহারের সুযোগ বা পরিবেশ কোনোটাই থাকে না। পথচারীদের চলাচলের জন্য ফুটপাত দখল উচ্ছেদে এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং আমরা একটি সাইকেল লেনও এরই মধ্যে উদ্বোধন করেছি। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের দেশে এন্টি টোব্যাকো ক্যাম্পেইনটা আরো বেশি করতে হবে। আমাদের আইনগুলোর সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।

খাদ্যে লবণের পরিমাণ কমাতে হবে

ডা. হাফিজা সুলতানা

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, এই রোগ অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতার কারণে বেশি হয়ে থাকে। তাই আমাদের সবার উচিত সচেতন হওয়া। খাদ্যে লবণের পরিমাণ কমানো, বেশি করে শাকসবজি খাওয়া, ধূমপান থেকে বিরত থাকা, পরিবারের সবার রক্তচাপের প্রতি নজর রাখা। তাহলে এই রোগকে আমার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব।

আমাদের তৃণমূল পর্যায়েও কাজ করতে হবে

সৈয়দা সারওয়ার জাহান

খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে এরই মধ্যে সভা করেছি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে প্রত্যেকেই কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন সে বিষয়ে যোগাযোগ ও আলোচনা করেছি। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমরা ডিভিশনাল ওয়ার্কশপ করব। চলতি মাসেই চট্টগ্রামে একটি সভা আছে। পাশাপাশি প্রচারণার কাজও করব। ফুড চেইনের উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত যারা স্টেকহোল্ডার আছে, তাদের খুব সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। তেল যেহেতু মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মধ্যে পড়ে, তাই মানুষ তেল ব্যবহার করবেই। কাজেই মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি আমাদের তৃণমূল পর্যায়েও কাজ করতে হবে। শুধু অ্যাকশন দিয়ে কোনো কাজ হয় না। শুধু সাজা বা শাস্তি দিলে হয়তো এই প্রক্রিয়া তাত্ক্ষণিকভাবে কিছুটা বন্ধ হতে পারে; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ীভাবে চিন্তা করলে আমাদের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করতে হবে। কৃষিকাজে যে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, আমরা সেগুলো নিয়ে আলাপ করেছি। আমরা সার ও কিছু পেস্টিসাইড পরীক্ষা করে সেগুলোতে ত্রুটি পেয়েছি। আমরা আরো একটি পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় আছি, না হলে আমরা এরই মধ্যে অ্যাকশনে যেতাম। ওই ফলাফল হাতে পেলে আমরা মাঠে নামতে পারব বলে আশাবাদী।

সমন্বিত পরিকল্পনায় হৃদেরাগ প্রতিরোধ সম্ভব

ডা. বায়েজিদ খুরশীদ রিয়াজ

একটা সময় সবাই ভাবত হৃদেরাগ শুধু বয়স্কদের হয়ে থাকে। কিন্তু না, ছোট-বড় সবাই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। শুধু ধূমপান করলে এই রোগ হয় না। অনেক কারণেই হৃদেরাগ হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে—দাঁতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমরা কিছুই মনে করে না; কিন্তু এটা থেকে যে হৃদেরাগ হতে পারে, অনেকেই তা জানে না। তা ছাড়া হাসপাতালগুলোতে শুধু রোগের প্রতিকার করা হয়; কিন্তু কিভাবে রোগের প্রতিরোধ করা যায় তার কোনো ব্যবস্থা করতে আমরা দেখি না। তাই এই রোগের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। সবচেয়ে বেশি করণীয়—ছয় মাসের মধ্যে শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন হতে হবে।

প্রতি তিনজনে একজন মারা যায় হৃদেরাগে

ডা. শিশির কুমার বসাক

যদি আমরা কার্ডিও ভাসকুলারকে ম্যানেজ করতে চাই, তাহলে এর ঝুঁকিপূর্ণ ফ্যাক্টরগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। যদি আমরা বাংলাদেশের মৃত্যুর হার দেখতে যাই, তাহলে দেখা যাবে ২০১৬ সালে মোট ৬৭ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে নন-কমিউনিক্যাবল ডিজিজ (এনসিডি) থেকে, যার মধ্যে কার্ডিও ভাসকুলারের কারণে ৩০ শতাংশ লোকের মৃত্যু হয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে তিনজনের মধ্যে গড়ে একজনের মৃত্যু হচ্ছে এই কার্ডিও ভাসকুলার ডিজিজের কারণে।

মানুষের বয়স যত বাড়তে থাকে তত রিস্ক বাড়তে থাকে। মজার বিষয় হচ্ছে, প্রথম ১০ থেকে ২০ বছর হার্টের ব্লকগুলো সাইলেন্ট থাকে। পড়ে যখন একটা সময় আসে তখন এর লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। সাইলেন্ট সময়ের মধ্যে ব্লকগুলো হার্টের মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকলেও ভেতরে ভেতরে প্রথম দিকে বোঝা যায় না। কিন্তু আশার কথা হলো, এই সাইলেন্ট সময়টাই কার্ডিও ভাসকুলার ডিজিজ প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো সময়। রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো সম্পর্কে সচেতন থেকে সেগুলো এড়িয়ে গেলে এবং সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় খেয়াল করলে এর প্রতিরোধ সম্ভব। এই রোগ লক্ষণ দেখা দেওয়া পর্যায়ে চলে গেলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায় এবং বেশি অর্থ ব্যয় হয়।

একটি জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের মোট মৃত্যুর ২২ শতাংশ হয় ডায়েটের কারণে এবং এই মৃত্যুর পেছনে প্রধান কারণ কার্ডিও ভাসকুলার ডিজিজ। বারবার হার্ট অ্যাটাক হলেও জোড়াতালি দিয়ে আমরা হার্টকে ভালো রাখার চেষ্টা করছি; কিন্তু রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো রয়েই যাচ্ছে।

সচেতনতা বৃদ্ধি খুবই কার্যকর একটি উপায়

আদিত্য শাহীন

উন্নত বিশ্বে দেখা যায়, কী খেতে হবে না হবে তার একটি নিয়ম থাকে। তাই আমাদেরও উচিত সঠিক সময়ে সঠিক খাদ্য খাওয়া আর আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা। এসব তথ্য কিভাবে সবার মাঝে ছড়িয়ে যাবে তার ব্যবস্থা আমরা করে থাকি। বিশেষ করে, হৃদেরাগ প্রতিরোধে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি খুবই কার্যকর একটি উপায়। এদিকে সবাইকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে।

১০-১২ বছর বয়স থেকেই হৃদেরাগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে

ডা. নজরুল ইসলাম

এই রোগের ঝুঁকি ছোট অবস্থায় কম থাকলেও ১০-১২ বছর বয়স থেকে হৃদেরাগের ঝুঁকির পরিমাণ বেড়ে যায়। এই রোগের অন্যতম কারণ—উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, ডায়াবেটিস, রক্তনালি—এসব উৎস থেকে হয়ে থাকে। জাংক ফুড জাতীয় খাবার; যেমন—বার্গার, চিকেন, পিত্জা ইত্যাদি থেকেও প্রভাবিত হয়ে থাকে। ফলে ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে। তাই আমাদের সবার উচিত সচেতন হওয়া। মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারণা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি একাধিক ওষুধের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে আলাদা চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা করা জরুরি।

অসংক্রামক রোগের মধ্যে একমাত্র হৃদেরাগের কারণেই হঠাৎ মৃত্যু ঘটে

ডা. এস এম হাবিবউল্লাহ সেলিম

নন-কমিউনিক্যাবল ডিজিজগুলোর (এনসিডি) মধ্যে প্রথমেই আসে কার্ডিও ভাসকুলার ডিজিজ। এরপর আসে ক্যান্সার, সিওপিডি ও ডায়াবেটিস। নন-কমিউনিক্যাবল ডিজিজের মধ্যে একমাত্র কার্ডিও ভাসকুলার ডিজিজের কারণেই মানুষের হঠাৎ মৃত্যু হচ্ছে। অন্য রোগগুলোতে দীর্ঘ সময় পড়ে মৃত্যু হচ্ছে। আমরা এরই মধ্যে জানি যে একনেকে ক্যান্সারসংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়েছে। ফলে সারা দেশে ক্যান্সারের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ক্যান্সার নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হবে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এর পাশাপাশি দেশের প্রতিটি হাসপাতালে স্বয়ং সম্পূর্ণ কার্ডিয়াক সেন্টারের ব্যবস্থা করতে হবে। হার্টের সমস্যায় রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে এসে সিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। সারা দেশেই এই অবস্থা। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। আর একটি বিষয় হলো, আমরা গণমাধ্যমে প্রায়ই দেখি যে বলা হচ্ছে, ‘ধূমপানের কারণে ক্যান্সার হচ্ছে।’ এখানে কোথাও কিন্তু লেখা নেই যে ধূমপানের কারণে হৃদেরাগ হচ্ছে। এখানে শুধু ক্যান্সারের কথা না বলে একই সঙ্গে বলা যায় যে ‘ধূমপান হৃদেরাগ ও ক্যান্সারের কারণ’, তাহলে মানুষ আরো বেশি সচেতন হবে। এই বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যাঁরা আছেন, তাঁদের দৃষ্টিপাত আকর্ষণ করছি।

শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি আরো নজর দিতে হবে

ডা. জাহিদ হাসান

ছোট-বড় সবারই হৃদেরাগের ঝুঁকি আছে। তবে যেহেতু রোগের উৎপত্তি ছোট থেকেই শুরু হয়, তাই জন্মের দুই বছরের মধ্যে শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি আরো নজর দিতে হবে। আমাদের দেশে টিকাদানের মাধ্যমে যেহেতু রোগ প্রতিরোধ করার মতো অবদান রয়েছে, তাই টিকাদানের মাধ্যমেও রোগ প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তা ছাড়া আমাদের খাদ্যাভ্যাসেরও পরিবর্তন করতে হবে। পরিমাণমতো হাঁটাচলা করতে হবে। প্রচুর পরিমাণ শাকসবজি খেতে হবে। খাদ্যাভ্যাসের ইতিবাচক পরিবর্তন হৃদেরাগ প্রতিরোধে অনেকটা ভূমিকা রাখে।

স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নিয়েই যত সংশয়

তৌফিক মারুফ

কালের কণ্ঠ সব সময়ই নিয়মিত খবরের পাশাপাশি জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে গোলটেবিল আলোচনাসহ অন্যান্য সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। হৃদেরাগের বিষয়ে এর আগেও চ্যানেল আই, ইনসেপটাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কালের কণ্ঠ এমন আয়োজনে অংশ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমরা সব সময়ই বলার চেষ্টা করি, এখন দেশে খাদ্যের অভাব নেই; কিন্তু সেই খাদ্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নিয়েই যত সংশয়ে পড়তে হচ্ছে মানুষকে। মানুষ যদি নিরাপদ খাদ্য খেতে না পারে, তবে শরীরও নিরাপদ থাকতে পারে না। হৃদেরাগের মতো নানা অসংক্রামক রোগের কারণ হিসেবে অনিরাপদ খাদ্যকে দায়ী করা হয়। সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন খুবই জরুরি। কায়িক পরিশ্রমের দিকে নজর দিতে হবে। এ জন্য উপযুক্ত সচেতনতা, পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যম হিসেবে আমরা সব সময়ই এমন কাজের সঙ্গে আছি ও থাকব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা