kalerkantho

পরিবেশমান নিশ্চিত হলেই বিকশিত হবে পাদুকাশিল্প

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৬ মিনিটে



পরিবেশমান নিশ্চিত হলেই বিকশিত হবে পাদুকাশিল্প

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাদুকা প্রস্তুতকারী দেশ চীনে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় পাদুকাশিল্প খাত থেকে নিজেদের নজর সরিয়ে নিচ্ছে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তির দেশটি। ফলে পাদুকা বাজারে বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, পোশাক খাতের পরেই পাদুকাশিল্প হতে পারে দ্বিতীয় রপ্তানি খাত। অবশ্য এ জন্য দরকার সরকারের নীতি সহায়তা, বন্দরের জটিলতা কমানো, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আনা এবং কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণের কাজ দ্রুত শেষ করা। ‘ফুটওয়্যার : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ নিয়ে গত ৪ আগস্ট গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে কালের কণ্ঠ। রাজধানীর বারিধারায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের সম্মেলনকক্ষে কালের কণ্ঠ ও ওরিয়ন ফুটওয়্যার যৌথভাবে গোলটেবিল বৈঠকটির আয়োজন করে। সেখানে খাতসংশ্লিষ্ট বক্তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে। দক্ষ জনবল, পরিবেশের মানদণ্ড, সরকারের নীতি সহায়তা পেলে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা কঠিন নয় বলে মত তাঁদের। দুই পৃষ্ঠার ক্রোড়পত্র গ্রন্থনা করেছেন ফারজানা লাবনী, এম সায়েম টিপু, আরিফুর রহমানরফিকুল ইসলাম।  ছবি তুলেছেন লুৎফর রহমান

 

ভিয়েতনাম পারলে আমরা কেন পারব না

ইমদাদুল হক মিলন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যখন যাই, তখন বাংলাদেশে তৈরি জুতা দেখতে পাই। টোকিওতে বাংলাদেশের জুতা ও চামড়াজাত পণ্য দেখেছি। এসব দেখে ভালো লাগে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জুতা আবিষ্কার নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, সেটা আমরা সবাই জানি। কিভাবে এই উপমহাদেশে এই শিল্পটির আবিষ্কার হলো তিনি খুব রম্যভঙ্গিতে লিখেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪৮ বছরে দেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অনেক শিল্পের বিকাশ ঘটেছে; যেসব শিল্প নিয়ে আমরা গর্ব করি। তৈরি পোশাক শিল্প, চামড়া ও ওষুধশিল্প বড় জায়গায় গেছে। তবে চামড়াশিল্পে নানা ধরনের জটিলতা আমরা দেখি। যার কারণে এই শিল্পকে সঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে পারছি না। বিদেশের বাজারগুলোতে সেভাবে ঢুকতে পারছি না। পাদুকাশিল্প নিয়ে অনেক বেশি সম্ভাবনা দেখছি। যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধান করা যাবে না বলে আমার মনে হয়নি। যে ভিয়েতনামের কথা আমরা শুনছি বা বলছি, ভিয়েতনাম আমেরিকার সঙ্গে ১২ বছর যুদ্ধ করেছে। আর আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে ৯ মাসে দেশ স্বাধীন করেছি। ভিয়েতনাম দাঁড়াতে পারলে আমরা কেন পারব না? আমরা তো অনেক দূর এগিয়েছি, আমরা যা স্বপ্নও দেখিনি, সেই স্বপ্নও পূরণ হতে চলেছে।

দেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হবে, সেটা কখনো কল্পনা করিনি। কিন্তু আমরা করছি। একটা খাত যেটা নানা সমস্যায় ডুবে আছে সেটা কেন ভালো করতে পারব না? অনেকে পাদুকাশিল্প নিয়ে সম্ভাবনার কথা বলেছেন। আবার কেউ সমস্যার কথা বলে চোখও খুলে দিয়েছেন। যাঁরা দায়িত্বে আছেন তাঁদেরও চোখ খুলে গেল। আমার বিশ্বাস, পাদুকাশিল্প অনেক দূর যাবে।

 

পোশাক খাতের মতো গুরুত্ব পায়নি পাদুকাশিল্প

মোস্তফা কামাল

পাদুকা দেশের একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। বাংলাদেশের তৈরি জুতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। দেশীয় কম্পানি জুতা রপ্তানি করছে। জুতাশিল্প তৈরি পোশাকশিল্পের মতোই একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। তবে বিগত সময়ে পোশাকশিল্প যেভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, জুতাশিল্প তেমনটি পায়নি। দেশে উৎপাদিত চামড়া আমরা বিদেশে রপ্তানি করি। কিন্তু এই চামড়া দেশের সম্ভাবনাময় জুতাশিল্পেই ব্যবহার হতে পারে। পাদুকাশিল্পের জন্য বাংলাদেশ নিজেই একটা বিশাল বাজার। দেশে একসময় বাটা জুতা ছাড়া অন্য কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে, দেশীয় প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। একসময় এপেক্সের জুতা বিক্রির সেল সেন্টারও দেশে ছিল না। তারা শুধু রপ্তানি করত। এখন তারা দেশের বাজারে অনেক শোরুম খুলেছে।  

উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ বিরাট মার্কেটে পরিণত হয়েছে। চীনের মতো বড় দেশও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। চীনেও পাদুকাশিল্পের বিশাল বাজার রয়েছে। তবু তারা মনে করছে বাংলাদেশ ভালো বিনিয়োগের জায়গা। তারা এখানে বিনিয়োগ করতে চায়, করছেও। বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির দেশের বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। দেশে পাদুকার চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিরও বিশাল সুযোগ রয়েছে। আমরা মনে করি, দেশীয় শিল্পগুলো সেই সুযোগটি কাজে লাগাবে।  বর্তমান সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য বেশ উদার। গত ১০ বছর আওয়ামী লীগ সরকার একটানা দায়িত্ব পালন করছে। ব্যবসায়ীরাও বলছেন, আমিও বলছি, বর্তমান সরকার ব্যবসাবান্ধব। ব্যবসায়ীদের নানা রকম সুবিধা দিয়ে শিল্প খাতকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে সরকার।

 

যোগ্য ব্যক্তিকে চেয়ারে বসাতে হবে

পবন চৌধুরী

পাদুকাশিল্প বাংলাদেশের জন্য কেন সম্ভাবনাময় খাত এর ব্যাখ্যা দিই। জাপানে শ্রমিকের বেতন যেভাবে বেড়েছে, তাতে দেশটির পক্ষে পাদুকাশিল্পে কাজ করা খুবই কঠিন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোরও একই অবস্থা। কারণ সেসব দেশে প্রতি ঘণ্টায় শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশি। চীনেও শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে। মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে তাল রেখে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তির দেশটি জোর করে আর পাঁচ থেকে সাত বছর পাদুকাশিল্পে থাকতে পারবে। এরপর তারাও এই খাত ছেড়ে দেবে। ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া আর সর্বোচ্চ ১০ বছর পাদুকাশিল্পে থাকবে। এরপর বাংলাদেশের দরজাটা সবচেয়ে বেশি উন্মুক্ত হবে বলে আমার বিশ্বাস। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ একটি সাময়িক ঘটনা। দুই পরাশক্তির মধ্যে সাময়িক একটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে কোনো শিল্প বিকশিত হতে পারে না। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। আমাদের টেকসই প্রবৃদ্ধির দিকে যেতে হবে। একই সময়ে আমাদের সমাজ থেকে দুর্নীতিও দূর করতে হবে। পাদুকাশিল্পে বারবার ভিয়েতনামের নামটি উঠে আসছে। তারা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আপনাদের একটা বাস্তব ঘটনা বলি। এই শতাব্দীর শুরুর দিকে আমি ভিয়েতনামে গিয়েছিলাম ১৫ দিনের জন্য। বিমানবন্দরে যতক্ষণ ছিলাম, ওই সময় কয়েকটি কুকুর দেখেছি। একটা উড়োজাহাজ উড়তে দেখিনি। আবার কোনো উড়োজাহাজকে নামতেও দেখেনি। সেই ভিয়েতনাম এখন দুই হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ চামড়াপণ্য রপ্তানি করে। আর আমরা রপ্তানি করি ১০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ চামড়াপণ্য। আমাদের আত্ম-অনুসন্ধান করতে হবে। নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে হবে। নিজেকে আমি অপরাধী মনে করছি, কেন আমরা ভিয়েতনামের মতো পারিনি।

 

পাদুকাশিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নীতিমালা হচ্ছে

আবদুল হালিম

পাদুকা খাতকে আমরা সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে বিবেচনা করছি। এই শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে বলে আমরা মনে করি। আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, পাদুকাশিল্পের প্রধান কাঁচামাল চামড়া দেশেই পাওয়া যায়। আপনাদের একটা সুখবর দিই। পাদুকাশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আমরা একটি নীতিমালা করতে যাচ্ছি। যেটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই নীতিমালা অনুসরণ করেই আগামী দিনে পাদুকাশিল্প পরিচালিত হবে। নীতিমালায় পাদুকাশিল্পের কাঁচামালের সহজলভ্যতা, দক্ষ জনবল তৈরি, পরিবেশসহ প্রয়োজনীয় সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এটাও সত্যি যে, ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তৈরি পোশাক খাতের মতো জুতাশিল্প এখনো বিকশিত হয়নি। তাই পাদুকাশিল্পের বিকাশে কাজ করার সুযোগ আছে। আমাদের কাঁচা চামড়ার গুণগত মান অনেক ভালো। সারা বিশ্বে এর সুনাম আছে। এ চামড়া দিয়ে পাদুকা প্রস্তুত করা হলে মান ভালো হবে বলে আমি মনে করি। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের সহযোগিতায় আগামী পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে পাদুকাশিল্প একটি পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস। অবশ্য এ জন্য পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) আর সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে। আদালতের নির্দেশে প্রতিমাসেই পরামর্শকদের সিইটিপির অগ্রগতি জানাতে হয়। সিইটিপির কাজ সরকার একা করছে না। ব্যবসায়ী সংগঠনের সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে সিইটিপির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি কম্পানি গঠন করা হয়েছে।

 

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে পাদুকাশিল্পের প্রতি উদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে

ওবায়দুল আজম

বাংলাদেশের পাদুকাশিল্পকে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এর পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। কেননা পাদুকাশিল্পে কর্মপরিবেশের অভাবে বিদেশি ক্রেতারা তাদের কাঙ্ক্ষিত কার্যাদেশ আমাদের উদ্যোক্তাদের দিচ্ছে না। প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অনেক কারণ থাকলেও পরিবেশগত সমস্যা ঠিক করতে না পারলে আমরা বিশ্ববাজারে কিছুতেই টিকে থাকতে পারব না। আর পরিবেশগত সমস্যার মধ্যে চামড়াশিল্পের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) একটি বড় কারণ। এ জন্য কাউকে দায়ী না করে কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে। এটা নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি পরিকল্পনা আছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এই বিষয়ে একটি সারমর্ম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করতে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সাশ্রয় ও লবণ ব্যবহার কমাতে হবে। তবে এর আগে একটি নীতিমালা করে এতে পাঁচটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা, সিইটিপি দ্রুত কার্যকর করা, প্রযুক্তি সংযোজন করা, যেখানে ডিজাইন স্টুডিও হবে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতিমালা সহজ করতে কিছু পরিবর্তন আনা। রপ্তানি নীতিমালা করতে গিয়ে আমাদের মাথায় এই পরিকল্পনা আসে। ডিজাইন স্টুডিও দেশের পাদুকাশিল্পের মূল্য সংযোজনের জন্য একটি বড় সহায়ক পরিকল্পনা। এ ছাড়া দেশের কাঁচা চামড়ার মূল্য কমতে কমতে এমন এক জায়গায় এসে ঠেকেছে, যার ফলে গবাদি পশুর মালিকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না।

 

ব্যবসায়ীরা সচেতন হলে পণ্য ছাড়ে সময় কম লাগবে

মো. মেহবুব হক

রাজস্ব হলো উন্নয়নের অক্সিজেন। আমাদের ওপর জাতীয় বাজেটের আয়ের বড় ধরনের চাপ থাকে। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আমাদের আয় করে দিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছর থেকে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন আইন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আমি স্বীকার করছি, রাজস্ব আইনের অনেক জায়গায় কাজ করার সুযোগ আছে। আমি চট্টগ্রাম বন্দরে কাজ করেছি। অনেক বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। বন্দর থেকে পণ্য ছাড়করণে শুধু যে কাস্টমস কর্মকর্তারা দায়ী, বিষয়টি তা নয়। অনেক সময় দেখা যায়, আমদানির পণ্য ছাড় করাতে পর্যাপ্ত কাগজপত্র থাকে না। এখানে অনেক ধরনের কাগজপত্র প্রয়োজন হয়। সব কাস্টমস সম্পর্কিত নয়। সরকারের অন্যান্য সংস্থারও কাগজপত্র লাগে। এসব কাগজ জোগাড় করতে অনেক সময় ব্যবসায়ীদের দেরি হয়। এ ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্মকর্তারা নিরুপায়। তারা প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ছাড়া পণ্য ছাড়করণের অনুমতি দিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সচেতন হলে সময় কম লাগবে। এ ছাড়া কনটেইনার জট একটি বড় বাধা। এখানেও সময় লেগে যায় অনেক বেশি। আমরা সব সময় চেষ্টা করি পাদুকাশিল্পসহ সব খাতের ব্যবসায়ীরা যাতে সময়মতো এবং প্রয়োজনমতো বন্ড সুবিধা পান। তবে মানতে হবে, কিছু সমস্যা নিশ্চয়ই আছে। বন্ড-সংক্রান্ত কার্যক্রম অটোমেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হলে এসব সমস্যা আর থাকবে না। অনেকাংশে জটিলতা কমে যাবে। এ জন্য সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছে।

 

দক্ষ জনবল খুব বেশি প্রয়োজন

মো. রুহুল আমিন মোল্লা

১৯৮০ সালের দিকে পাদুকাশিল্পে আধুনিকায়ন শুরু হলেও বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে এটিকে অগ্রাধিকার শিল্প হিসেবে ঘোষণা দেয়। সারা দেশে তিন হাজারের বেশি জুতা উৎপাদন কারখানা রয়েছে। চার কোটি ২৮ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করা হচ্ছে, যার মধ্যে রপ্তানি থেকে আসছে ১০০ কোটি ডলার। তবে এই খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি আছে। প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত কাঁচামাল এবং পণ্য উদ্ভাবন ও অবকাঠামোর অভাব তো রয়েছেই। শুল্ক বিভাগের আইন-কানুন ও নীতিমালায় জটিলতা আছে। অপর্যাপ্ত বিপণন ব্যবস্থা ও ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকায় এই শিল্প খাত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। তবে সমস্যা থাকলেও সম্ভাবনাও কিন্তু কম নয়। শ্রমঘন শিল্প হিসেবে দেশে প্রচুর শ্রমশক্তির সুবিধা রয়েছে। তবে কম মূল্যে শ্রম পাওয়া গেলেও দক্ষ জনবল নেই। আজ পর্যন্ত দক্ষতাসম্পন্ন জনবল সৃষ্টি হয়নি। পাদুকাশিল্পের কাঁচামালের জোগান দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকেই পূরণ করা সম্ভব। এই খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার নানা ধরনের সুবিধা প্রদান করছে, যা এ শিল্পের জন্য খুবই উপকারী। কর অবকাশ সুবিধা, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ দিচ্ছে সরকার। এ ছাড়া রপ্তানিতে ১৫ শতাংশ সুবিধাও চালু রেখেছে। এ ছাড়া ট্যারিফ ও কোটামুক্ত বড় বাজার বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সুবিধা পাচ্ছে পাদুকাশিল্প।

 

পরিবেশগত মানদণ্ড না মানার সুযোগ নেই

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

চামড়া ও পাদুকা শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে চামড়া শিল্পের পরিবেশগত মানদণ্ড না মানার সুযোগ নেই। কেন না, বাংলাদেশ আগামীতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হলে রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা নাও থাকতে পারে। এ সময় পরিবেশের উন্নয়নে রাষ্ট্রের ওপর নানা ধরনের চাপ আসতে পারে। পাদুকা শিল্পকে আমরা কিভাবে নিব? এটা কি একটি দেশীয় শিল্প; না রপ্তানিমুখী শিল্প? দেশীয় শিল্প হিসেবে পাদুকার একটি বড় বাজার তৈরি হচ্ছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। কেননা মানুষের আয় বাড়ছে। ফলে দেশীয় শিল্পও বিকাশ লাভ করবে। তাই আমরা চাই, দেশীয় শিল্প আগামীতে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত হয়ে গড়ে উঠবে। আমরা চাই আমাদের উদ্যোক্তাদের দেশের ভেতর এবং বাইরে দুই জায়গাতেই অবস্থান শক্তিশালী হোক। সেভাবে যেন বাংলাদেশের শিল্প তৈরি হয়। তবে এই শিল্পের সবচেয়ে বড় বাধা পরিবেশগত মানদণ্ড। আন্তর্জাতিক বাজারে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি থেকে আমরা উত্তরণ ঘটাতে পারছি না। আবার যদি দেশীয় শিল্প হিসেবে এটাকে দেখি, তাহলে এটি খুব একটা বড় চ্যালেঞ্জ নয়।

 

ট্যানারিপল্লীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে সম্পৃক্ত করা দরকার

টিপু সুলতান

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্প নগরী সরিয়ে নিলেও সেটি কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। কারণ, আমাদের দক্ষ জনশক্তির যেমন অভাব রয়েছে; তেমনি পরিকল্পনাতেও গাফিলতি রয়েছে। ফলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে অগ্রাধিকার বর্ষপণ্য ঘোষণা এবং প্রণোদনা দেওয়ার পরও দেশের পাদুকা শিল্প এখনো অবহেলিত। সাভারে ট্যানারি পল্লীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণের দায়িত্ব বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) হাতে না রেখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে সম্পৃক্ত করা জরুরি বলে আমি মনে করি। কেননা সাভারের ট্যানারি পল্লীতে পরিবেশগত যে সুবিধাগুলো দেওয়ার কথা, যার মধ্যে রয়েছে ইটিপি ও ডাম্পিং প্ল্যান্ট এখন পর্যন্ত কাজ করছে না। ডাম্পিং প্ল্যান্টের কাজ একেবারেই সন্তোষজনক নয়। আমরা মনে করি, দক্ষ লোকের অভাবে কাজ এগোচ্ছে না। ট্যানারি পল্লীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এটাকে এগিয়ে নিতে হলে বিসিক দিয়ে হবে না। এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেও সম্পৃক্ত করতে হবে। এই প্রকল্পকে কার্যকর করা না গেলে চামড়া ও পাদুকা শিল্প অস্তিত্বহীন হয়ে পড়তে পারে। কেননা পাদুকা তৈরিতে কর্মপরিবেশ মানতে হবে। এটা মানা না গেলে পাদুকা শিল্প নিয়ে আমাদের যে আকাঙ্ক্ষা, সেই প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। জুতার ব্যবসা প্রকৃত অর্থে একটি জটিল বাণিজ্য। এই শিল্পে শুরুতেই প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়। ব্যবসা ধরার জন্য প্রতি বছর গরম এবং শীতে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়। প্রচুর বিনিয়োগও করতে হয়।

 

ভিয়েতনামে ব্যবসা করা অনেক সহজ

নাসির খান

তিন দশক ধরে পাদুকাশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাই সাহস করে বলতে পারি, জুতা ব্যবসায় আমি যথেষ্ট দক্ষ ও অভিজ্ঞ। অনেকের চেয়ে ভালো বুঝি এই শিল্প। ৩০ বছর পার করে এসে এখন মাঝে মাঝে পেছন ফিরে তাকিয়ে ভাবি, আমি কি এ দেশে জুতার ব্যবসা করতে এসে ভুল করেছি? আমি জুতা বিক্রি করতে দুনিয়া ঘুরি। আমি মনে করি আমাদের প্রধান সম্পদ আমাদের শ্রমিক। তারা সোনার মানুষ। যা বোঝাবেন তা-ই তারা করতে পারবে। একবার কিছু বললেই শ্রমিকরা তা করতে পারে। বোঝে। যেটা চীন ও ভিয়েতনামের শ্রমিকদের নেই। দেখুন, ভিয়েতনাম আমাদের ছাড়িয়ে কোথায় চলে গেছে। মাত্র কিছুদিন আগেও ভিয়েতনামের কিছুই ছিল না। আজকে সারা বিশ্বে ভিয়েতনাম একটি দৃষ্টান্ত। সেখানে আইনি কোনো জটিলতা নেই। সেখানকার সরকার সহজভাবে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের দেশে ব্যবসা করতে হলে বহু প্রতিষ্ঠান থেকে কাগজপত্র নিতে হয়। বহু রকমের লাইসেন্স লাগে। অন্যদিকে ভিয়েতনামে ব্যবসা করতে হলে একটি পিন নম্বরই যথেষ্ট। এই নম্বরই তার পরিচয়। যত দিন ব্যবসা করবে, তত দিন এই একটি নম্বর দিয়ে তার সব সুবিধা পাবে। ব্যবসায়ে খরচ নাই বললেই চলে। ভিয়েতনামে বন্ড সুবিধার প্রয়োজন হয় না। সবাই একই সুবিধা পায়। বন্দরে কাঁচামাল এসে পৌঁছানোর পর কাস্টমস কর্মকর্তারা অনলাইনে যাচাই করে দেখে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়ম-কানুন মেনে পণ্য এনেছে কি না। উৎপাদনে যেন সমস্যা না হয় এ জন্য দ্রুততার সঙ্গে কাঁচামাল ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর পণ্য রপ্তানির সময়ে কাস্টমস দেখে যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করা হয়েছে তা দিয়ে সঠিক পরিমাণে পণ্য বানানো হয়েছে কি না। কোনো হয়রানি নেই। আইনি জটিলতা নেই। এইচএস কোডের কোনো বিভ্রান্তি নেই। অত্যন্ত সহজে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

 

প্রণোদনা না দিলে সম্ভাবনার জানালা বন্ধ হয়ে যাবে

রিয়াদ মাহমুদ

পোশাক শিল্পের পরেই দেশের পাদুকা শিল্পের সম্ভাবনা ব্যাপক। চীনে শ্রমিকের খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশটি রপ্তানির বাজার হারাতে বসেছে। এ ছাড়া চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধে চীনে প্রচুর জুতা শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও  বাংলাদেশে শ্রমিকের মজুরি কম হওয়াতে পাদুকা শিল্প এসব দেশে স্থানান্তরের অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সিনথেটিক ও স্পোর্টস সুর চাহিদা বিশ্বব্যাপী বেড়েই চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, এ খাতে সময়মতো প্রণোদনা না দেয়, তবে দেড় হতে দুই বছরের মাথায় এই উদীয়মান শিল্পটি ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় চলে যাবে। এ খাতে আমাদের সম্ভাবনার জানালা বন্ধ হয়ে যাবে। পাদুকা যেহেতু ফ্যাশাননির্ভর খাত, এ বিষয়েও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। বন্দরে মাল খালাস এবং জাহাজীকরণে দীর্ঘসূত্রতা আছে। এতে ক্রেতারা সময়মতো তাদের জুতা বাংলাদেশ থেকে না পাওয়ার আশঙ্কা করে। এসব বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। দক্ষ জনবল এবং প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি বন্দরের সমস্যা দূর করা না হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার দিবে। ফলে বাংলাদেশ হারাবে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির বাজার। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, একটি অত্যাধুনিক ডিজাইন সেন্টার করা। বর্তমানে এই সেক্টরে অগ্রিম কর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে এই সেক্টরের সম্ভাবনা কমে যাবে। আমরা এখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি; সেখানে অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া এই খাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে। সরকারের কাছে অনুরোধ—এ খাতকে বাঁচিয়ে রাখা এবং এগিয়ে নেওয়ার জন্য যথাযথ প্রণোদনা দিতে হবে। বন্দরের নিয়ম-কানুন সহজ করতে হবে। পাদুকা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে সহজ শর্তে দেওয়ার জন্য একটি পৃথক তহবিল গঠন এখন সময়ের দাবি।

 

প্রযুক্তিগত দুর্বলতা পাদুকা খাতের উন্নয়নে বড় বাধা

এস এম শাহীন আনোয়ার

ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পনির্ভর অর্থনীতির অন্যতম উদাহরণ বাংলাদেশ। পাদুকা শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম খাত। দেশে এখন ৪০টি রপ্তানিমুখী পাদুকা কারখানা রয়েছে। যেখান থেকে বছরে আট হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়। এ খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৮.৫%। বিশ্ববাজারে পাদুকা রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ রপ্তানি পণ্য। দেশের অভ্যন্তরীণ পাদুকা পণ্যের বাজার ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার। দেশের অভ্যন্তরীণ পাদুকা বাজারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিম্ন আয়ের ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে মধ্যম ও উচ্চ মূল্য সম্পন্ন পাদুকা পণ্যে ক্রেতার চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়বে। আর তা পূরণে দেশীয় ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্পকে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। সঠিক কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলেই কেবল পাদুকা শিল্পের বাজার সমপ্রসারণ সম্ভব হবে। পাদুকাসহ অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে সরকার সরাসরি ১৫% ক্যাশ ইনসেনটিভ দিচ্ছে। দেশের পাদুকা শিল্পের ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো দক্ষ জনবলের অভাব। কারখানাগুলোতে প্রথাগত উপায়ে পাদুকা উৎপাদিত হয় বলে ডিজাইন, শেইপ, কমফোর্ট, কাঁচামাল বাছাই ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিশ্বমানের আধুনিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পাদুকা মধ্য-উচ্চবিত্ত ও বিশ্ববাজারের ক্রেতা শ্রেণিকে আকৃষ্ট করার মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হচ্ছে না। অধিকাংশ শ্রমিকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও উৎপাদন কৌশলের ওপর প্রশিক্ষণ না থাকা এর বড় কারণ। আমার মতে, পাদুকা খাতের উন্নয়নে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তিগত দুর্বলতা। ভালোমানের ও বহুমুখী কাঁচামাল বাছাই করার কৌশল না জানা। কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় বাজারে প্রাপ্য কাঁচামালে বৈচিত্র্য না থাকা। নকশার অভাব, উচ্চ কর্মক্ষমতার উৎপাদন কৌশল না জানার কারণেও এই খাত এগোতে পারছে না কাঙ্ক্ষিত হারে। বিপণনে পারদর্শিতার অভাব, ক্রমবর্ধমান হারে বিদেশি পাদুকা আমদানি এবং ব্যবসার সার্বিক ব্যয় বৃদ্ধি এ খাতের উন্নয়নে প্রতিকূলতা বলে আমি মনে করি। আধুুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, উৎপাদন কৌশলের কর্মদক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ আয়োজন, ভালোমানের বৈচিত্র্যময় কাঁচামাল সোর্সিং ও মান যাচাই বিষয়ে প্রশিক্ষণ, দেশীয় ডিজাইন তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশ্বমানের ডিজাইনিং সেন্টার স্থাপন, বিদেশি পাদুকা আমদানি ও বিপণনে সরকারের যথাযথ কৌশল প্রয়োগ এই শিল্পের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

অক্টোবরে সিইটিপির কাজ শেষ হবে

মোহাম্মদ মোতাহার হোসেন

চীনের একটি কম্পানি সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে সিইটিপি করতে আমাদের সঙ্গে চুক্তি করে। বিসিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে অতি দ্রুত সিইটিপি চালু করতে। কাজ খুব দ্রুত চলছে। সিইটিপির কিছু মাল চট্টগ্রাম বন্দরে আটক আছে। এ বিষয়ে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সিইটিপি এখন চালু রয়েছে। সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে। বিসিক আশা করছে, আগামী অক্টোবরের মধ্যে সকল কাজ শেষ হবে। সিইটিপি পরিচালনায় এরই মধ্যে একটি কম্পানি গঠন করা হয়েছে। যেখানে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা আছেন। এই কম্পানির কাছে সিইটিপি হস্তান্তর করা হবে। বিসিক থেকে বিভিন্ন শিল্পসংশ্লিষ্ট শিল্পনগরী করছে। মুন্সীগঞ্জে প্লাস্টিক শিল্প নগরী গড়ে তোলার কাজ চলছে। চামড়া খাতের জন্য আরো শিল্পনগরী গড়ে তুলতে কাজ করা হচ্ছে। 

 

ঢাকা থেকে ট্যানারি সরলেও অপবাদ ঘোচেনি

শাখাওয়াত উল্লাহ

এখন থেকে দুই বছর আগে ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্পকে সাভারের শিল্প নগরীতে সরানো হলেও অপবাদ ঘোচেনি চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত মালিকদের। কারণ, ট্যানারি ভালোভাবে স্থানান্তরিত করা হয়নি। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে এখনো কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার চালু হয়নি। ডাম্পিংয়ের কাজও এখনো অসম্পূর্ণ। এতে করে পরিবেশবান্ধব চামড়া উৎপাদন না করতে পারার যে গ্লানি ট্যানারি মালিকদের ছিল সেটা থেকেই গেল।  এ সমস্যা এখনো বিরাজমান। গত দুই থেকে আড়াই বছর ট্যানারি মালিকরা সেখানে দাঁড়াতে পারেননি। একটার পর একটা সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। আশার কথা—সরকারের উদ্যোগে সাভারের ট্যানারির সিইটিপির চারটি মডিউল কাজ করছে। এই মডিউলগুলো ভালোভাবে কাজ করলে আশা করছি আমাদের চামড়া আন্তর্জাতিকমানের হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ডাম্পিং। এর কাজ এখনো এক শতাংশও হয়নি। বর্তমানে অস্থায়ীভাবে চারটি ডাম্পিং তৈরি করা হচ্ছে। এরপর মূল ডাম্পিংয়ের কাজ ধরা হবে। এদিকে এলডাব্লিউজি স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে করার জন্য ইতালি থেকে এক্সপার্ট এসেছেন। তাঁরা সার্ভে করে গেছেন। এসব কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে শিগগির সাভারের ট্যানারিতে কার্যকরভাবে কাজ শুরু হবে। এ ছাড়া আমাদের আশা, কাঁচামাল আমদানিতে বন্দর ও কাস্টমস জটিলতা এবং অবকাঠামো দুর্বলতার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখবে, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার শিগগিরই কার্যকর হবে। ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আলোর মুখ দেখবে।

 

পাদুকাশিল্পে সমন্বয় জরুরি

কামরুল হাসান

পাদুকা আমাদের নিজেদের শিল্প। দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য এই খাত কর্মসংস্থানের ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমরা পাদুকা বিদেশে রপ্তানি করতে পারি। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পাদুকাপণ্যের সুযোগ প্রশস্ত হয়েছে। এখনই বাংলাদেশের সময়। এখন আর দেরি করার কোনো সুযোগ নেই। এই সময়কে কাজে লাগাতে হবে। আর এটি করতে হলে সমন্বিতভাবে কাজ করবে হবে। পোশাক খাত সমন্বিতভাবে কাজ করে এগিয়ে গেছে। একটি রপ্তানি পণ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ টিকে আছে। ১৬ কোটি মানুষের দেশ একটি পণ্যে টিকে থাকবে, এটা হতে পারে না। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ জরুরি। এক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে জুতাশিল্পের ওপর জোর দিতে হবে। এখন আমাদের দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। জুতা উৎপাদন করতে গিয়ে আমাদের অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

 

সরকারি সংস্থাগুলোকে গতিশীল করতে হবে

জোহেব আহমেদ

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জুতার বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও দুর্বল অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং কাস্টমসের হয়রানি বন্ধ না হলে এই শিল্প নিয়ে খুব বেশি দূর এগোনো যাবে না বলে আমি মনে করি। আমাদের জন্য সরকারের নীতি সহায়তাও খুবই জরুরি। কেননা এখনো ভারত থেকে লোক এনে আমাদের ভিডিও মার্চেন্টডিজাইনিংয়ের কাজ করতে হয়। এটা এতই ব্যয়সাধ্য যে এ ধরনের একজন অভিজ্ঞ লোককে আমাদের প্রতি মাসে বেতন দিতে হয় তিন থেকে আট লাখ টাকা। এটা আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। অথচ এ ধরনের দক্ষ কর্মী আমরা আমাদের দেশেই তৈরি করতে পারি যথাযথ নীতি সহায়তা পেলে। দেশের ব্যবসার অবস্থা খুব একটা ভালো না হলেও ব্যয় বেড়েছে অনেক। জুতা শিল্পের এক ধরনের কাঁচামাল দরকার হয়। এই কাঁচামাল আমদানির পর কাস্টমস থেকে ছাড়িয়ে নিতে সময় লেগে যায় দুই থেকে আড়াই মাস। সিস্টেম লসের কারণে বড় একটি সময় কাঁচামাল বন্দরেই পড়ে থাকে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অসহযোগিতামূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এসব ছোট ছোট কারণে দেশের জুতা শিল্পের উদ্যোক্তাদের আরো বেশি পিছিয়ে পড়তে হবে।

 

সিইটিপি ভালো না হলে পাদুকা খাত এগোবে না

মোহাম্মদ ইজাবুল হক

আমাদের ফুটওয়্যারে সম্ভাবনা অবারিত, কিন্তু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আমরা সেটা কতটুকু নিচ্ছি বা গুরুত্ব দিচ্ছি সেটা ভাবার বিষয়। লেদারের জুতা নিয়ে অন্য মার্কেটে যেতে পারছি না। কারণ পরিবেশগত। পরিবেশের কারণে গুণগত মান রক্ষা হচ্ছে না। এই পরিবেশ ঠিক করবে কে? যারা সিইটিপি নিয়ন্ত্রণ করবে তারাই। লেদার খাতকে এগিয়ে নিতে যে সিইটিপি করা হয়েছে, সেটা আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ভেঙে পড়বে। কারণ এটা অসম্পূর্ণভাবে চালু করা হয়েছে। চারটির মধ্যে দুটি মডিউল চালু করা হয়েছে। সিইটিপি বানাতে অন্যান্য দেশের চেয়ে তিন গুণ ব্যয় বেশি হলেও গুণগত মান ঠিক হচ্ছে না। অনভিজ্ঞতার কারণে সেটা ঠিকভাবে হয়নি। যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারাও অনভিজ্ঞ। জুতা তৈরির মূল উপাদান চামড়া। কিন্তু সেই চামড়া সঠিক প্রক্রিয়াকরণ করতে পারিনি। সিইটিপিতে যে উপাদান থাকার কথা, সেটি দেওয়া হয়নি। মান ২০ শতাংশ এসেছে, কিন্তু ৮০ শতাংশই হয়নি। চামড়া হলো ব্র্যান্ডেড ব্যবসা। প্রযুক্তি থাকলেও পরিবেশগত ইস্যুতে সেটা করতে পারছি না। অনেক বিদেশি গ্রাহক পরিবেশগত কারণে অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে সাভারের প্রকল্পও ব্যর্থ হবে। তখন হয়তো চামড়াও আমদানি করতে হবে। সিইটিপি করা হয়েছে আমাদের পরিবেশ রক্ষা করতে, কিন্তু সেটাকে অগোছালোভাবে করা হয়েছে।

 

নন-লেদার পাদুকা প্রস্তুতকারীদের প্র্রণোদনা দেওয়ার সময় এসেছে

আশরাফ উদ্দিন

দেশের পাদুকা শিল্পের সুরক্ষায় সরকার নানা ধরনের প্রণোদনা দিলেও ক্ষুদ্র ও সাধারণ পাদুকা ব্যবসায়ীরা সরকারের কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। অথচ এঁরাই সাধারণ মানুষের পাদুকার স্থানীয় চাহিদা পূরণ করছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই সমাজের নিম্নআয়ের মানুষ। সাশ্রয়ী মূল্যে জুতা পরার সুযোগ করে দিয়ে তাদের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ সুরক্ষায়ও অবদান রাখছেন। তাই চামড়ার জুতা রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও প্রণোদনা পাওয়ার দাবি রাখে। আমি দেখেছি চামড়ার চেয়ে নন-লেদার পণ্যের কার্যাদেশ আসে বেশি। এটা প্রায় ৮০ শতাংশ।  তাই এখন আমাদের শুধু চামড়ানির্ভর জুতা নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। নন-লেদার জুতা নিয়েও ভাববার সময় এসেছে। আমি মনে করি, পাদুকা শিল্পের অন্য সব শাখা নিয়েও আমাদের কথা বলার সময় এসেছে। গ্রামের অনেক মানুষ আছে যারা এখনো প্লাস্টিকের সেন্ডেল পরে। বিশেষ করে রিকশাচালক ও ঠেলাচালকরা তো আছেই। তাদের অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

মন্তব্য