kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

‘স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভ্যাট-ট্যাক্স হ্রাস : প্রভাব ও প্রতিবন্ধকতা’

নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহজলভ্য হোক স্যানিটারি ন্যাপকিন

২৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহজলভ্য হোক স্যানিটারি ন্যাপকিন

দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৬.৮ শতাংশ নারীর মধ্যে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী তিন কোটি ৯০ লাখ। তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ৯৪.১ শতাংশ নারী এখনো মাসিক ব্যবস্থাপনার বাইরে রয়ে গেছে, যারা এখনো পুরনো কাপড়ই ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতার পাশাপাশি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে খরচ বা দাম। তাই কিভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম বেশির ভাগ নারীর নাগালে রাখা যায়, সেই পথ খুঁজতেই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের কনফারেন্স রুমে গত শনিবার কালের কণ্ঠ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটারএইডের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় গোলটেবিল আলোচনা। গ্রন্থনায় : তানজিদ বসুনিয়াজনি হোসেন কাব্য। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

 

ন্যাপকিন ব্যবহারে জনসচেতনতা জরুরি

ইমদাদুল হক মিলন

ভারতে এখনো বিশাল নারীগোষ্ঠী তাদের পিরিয়ড সম্পর্কে সচেতন নয়। বাংলাদেশের অবস্থাটিও এ রকম ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটার মধ্যে উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। ভারতের দুটি সিনেমা আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছিল। একটির নাম, ‘টয়লেট : এক প্রেম কথা’। গ্রামের নারীরা টয়লেটের ব্যাপারটি নিয়ে কী ধরনের বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন, এ বিষয়টি নিয়ে প্রচারণামূলক সিনেমা এটি। খুবই জনপ্রিয় আঙ্গিকে সিনেমাটি তৈরি করা হয়েছিল। যেন দেশের সাধারণ মানুষ সিনেমাটি দেখে, বিষয়টি নিয়ে ভাবে এবং ঊর্ধ্বতনদের নজরে এ বিষয়টি যায়। অন্য সিনেমাটির নাম ‘প্যাডম্যান’। স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে প্রচারণামূলক সিনেমা এটি। সাধারণ মানুষ যেন এ বিষয়ে সচেতন হতে পারে সে উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল সিনেমাটি। আমাদের আশপাশের দেশগুলোর চেহারা এ ক্ষেত্রগুলোতে প্রায় এক রকম। আমি চার-পাঁচ বছর মেয়েদের স্কুলে গিয়ে কিছু প্রচারণার কাজ করেছিলাম। সে সময় লক্ষ করেছি, আমাদের মেয়েরা ন্যাপকিনের ব্যবহার সম্পর্কে জানে না। স্কুলগুলোতে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। ফলে কেউ কেউ ন্যাপকিন ব্যবহার করলেও সেটি পরিবর্তন করতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। পিরিয়ড চলাকালে অনেক মেয়ে স্কুলেই যেতে পারে না।

 

ন্যাপকিনের ব্যবহার বাড়াতে হলে দাম সহজলভ্য করতে হবে

মোস্তফা কামাল

একটা সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে কথা বলতে মানুষ লজ্জা পেত। এখন আর সেই অবস্থা নেই। কোনো রকম সংকোচ ছাড়াই এ বিষয়টি নিয়ে এখন আলোচনা করা যায়। কিন্তু এটা যে লজ্জার বিষয় নয়, সাধারণ মানুষকে তা বোঝাতে অনেক সময় কেটে গেছে আমাদের। এমনকি মিডিয়াকেও। কেননা, মিডিয়ারও বড় একটা ভূমিকা রয়েছে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার। মিডিয়া এ নিয়ে কথা না বললে সকল পর্যায়ের মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি হবে না। গ্রামের মেয়েরা এখনো ন্যাপকিনের পরিবর্তে পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। এখনো স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পৌঁছাতে পারেনি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এর দাম। নির্ধারিত দাম দিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনা অনেকের পক্ষেই সম্ভব না। ফলে গ্রামের নারীদের কাছে এটি সহজলভ্য হতে পারেনি।

 

কম্পানিগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে

ডা. খাইরুল ইসলাম

একজন নারী প্রথম ঋতুবতী হওয়ার অর্থ হচ্ছে সে মা হওয়ার জন্য উপযুক্ত। পৃথিবীতে প্রজন্মের ধারাবাহিকতা রক্ষা হবে তার মাধ্যমে। এটি অত্যন্ত গর্বের বিষয়। অথচ এই বিষয়টিতে আমাদের রাগ-ঢাক করে চলতে হয়। ২০১৪ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ জাতীয় সমীক্ষা করেছিল। সেখানে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ নারী ন্যাপকিনের পরিবর্তে পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। দুর্ভাগ্যবশত সেই কাপড় যে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করবে; বিভিন্ন সংস্কারের কারণে সেই সুযোগটাও আসে না। লুকোচুরি করে শুকাতে হয় সেটি। কয়েক বছর ধরে ‘আসুন মাসিক নিয়ে কথা বলি’ এ রকম ব্যানারে আমরা খোলামেলা আলোচনা করতে শুরু করেছি। এর ধারাবাহিকতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিছু সার্কুলার জারি করল। অনেক স্কুলেই এখন জরুরিকালীন স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখা হয়। বেশ কয়েকটা নারী সংগঠনকে আধিকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে আন্দোলন শুরু করতে দেখেছি অনেক দেশেই। তাদের দাবি ‘শারীরিক বাস্তবতায় আমাদের শরীর থেকে কিছু রক্তক্ষরণ হচ্ছে, সেটার জন্য ব্যবহৃত ন্যাপকিনে ভ্যাট ও ট্যাক্স নেওয়া অধিকারসম্মত নয়।’ ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে নারীদের এমন অধিকারভিত্তিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সরকার স্যানিটারি ন্যাপকিন থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্স সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বাংলাদেশে এ আলোচনাটা কয়েক বছর ধরেই চলছে। যেহেতু এটি নিয়ে আলোচনা করা অস্বস্তিকর ব্যাপার ছিল সেহেতু একটা সময় এসব আলোচনা আড়ালেই হতো। বিভিন্ন কম্পানির সঙ্গে বসে আমরা বোঝার চেষ্টা করলাম, বাংলাদেশের স্যানিটারি ন্যাপকিনে কী পরিমাণ ভ্যাট, ট্যাক্স, শুল্ক আছে। আমরা দেখলাম, এতে রয়েছে ২৫ শতাংশ আবগারি শুল্ক, ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর, ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ শুল্ক এবং ৪ শতাংশ অগ্রিম ট্রেন্ড ভ্যাট। সব মিলিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর করের বোঝা ছিল সর্বোচ্চ ১২৭.৮৪ শতাংশ। আমরা খুবই আনন্দিত এবং গর্বের সঙ্গেই বলতে চাই, এনবিআরের চেয়ারম্যান এ ব্যাপারে খুবই সংবেদনশীল ছিলেন। সদস্য যাঁরা ছিলেন তাঁরাও টেলিভিশনের টক শোসহ এ রকম বিভিন্ন গোলটেবিলে কথা দিয়েছিলেন এবারের বাজেটে উনারা এ বিষয়টি অবশ্যই দেখবেন।

 

নোংরা কাপড় ব্যবহারে সারা জীবনের জন্য শরীরে ইনফেকশন ঢুকে যায়

অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী

স্কুলে গিয়ে একটি মেয়ের যখন প্রথম মাসিক হয়, তখন তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে যাওয়া যাবে না, খেলধুলা করা যাবে না, ছেলেদের সঙ্গে মেশা যাবে না, কাপড় এভাবে রাখতে হবে—এ রকম অনেক বিধি-নিষেধে একজন মেয়েকে আটকে পড়তে হয়। তখন মেয়েটি মনে করে এটি আসলেই অনেক লজ্জার বিষয় এবং মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তখন সে এলোমেলোভাবে নোংরা কাপড় ব্যবহার শুরু করে, যার ফলে সারা জীবনের জন্য তার শরীরে ইনফেকশন ঢুকে যায়। ইনফেকশনের কারণে অনেকে সারা জীবন তলপেটের ব্যথা নিয়ে থাকে, জন্মদান ক্ষমতা হ্রাস পায়, অনেকের বন্ধ্যাত্বসহ নানা রকম সমস্যা হয়।

 

আমাদের আসলে পুরো প্রক্রিয়াটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে

মুহাম্মদ তারিক হাসান রিকাবদার

আমাদের এই পলিসিটাতে কিছুু গ্যাপ হয়েছে। এই পলিসিটাতে যেটা হয়েছে আমরা এখানে একটা শিল্পকে কিছু বেনিফিট দেওয়ার কথা চিন্তা করেছি। আমাদের কাছে এখন যে আঙ্গিকে আবেদনটা এসেছে স্যানিটারি ন্যাপকিনের সেই আঙ্গিকে আমাদের কাছে আবেদনটা আসেনি। শিল্পায়নকে উদ্বুদ্ধ করতে আমরা যে পলিসিগুলো করে থাকি সেই পলিসির আঙ্গিকে আমরা এই কাজটি করেছি। আমরা সাধারণত শিল্পায়নকে উদ্বুদ্ধ করতে যখন কোনো একটা পলিসি করি, তখন আমরা সাধারণত ইনভেস্টমেন্টকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি, ভেল্যুডেশনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি, কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। যাই হোক উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে আমরা আরো কী করা যায় সে বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেব।

 

স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর কোনো ভ্যাট বসাইনি

মো. তারেক হাসান

স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর ভ্যাট বসানো হয়েছে, এমন বিষয়ে প্রথম আমার সহধর্মিণী এবং পরে আমার এক সহকর্মী, যিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে আছেন তাঁদের মাধ্যমে জানতে পারি। আমরা স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর কোনো ভ্যাট বসাইনি, সেটা তাঁদের বলি। পরে আমরা যেটা বুঝতে পারলাম যে ফেসবুকে প্রথমে কেউ এটি ছড়িয়েছে, তারপর এটি সবার কাছে চলে গেছে। তাই প্রথমেই আমি গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা বলেছি। এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো যাচাই না করে আলোচনা করলে আমরা নিজেরাও বিব্রতকর অবস্থায় পড়ি, সরকারও বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। যাঁরা প্রশ্ন করেছেন তাহলে এনবিআর কেন প্রথমেই প্রচার করল না যে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর ট্যাক্স আরোপ করা হয়নি তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি যে এই বিষয়গুলো এনবিআর কখনো প্রচার করে না।

 

আসলে আমাদের খরচ বেড়ে গেছে

মোহম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান

স্যানিটারি ন্যাপকিনের মানগত দিক অনুসারে বিএসটিআই অনুমোদন নিয়ে যারা এটা করতে পারবে তাদেরই শুধু, মানে তারাই বাজারজাত করতে পারবে এটা অত্যাবশ্যকীয় আছে; কিন্তু এটা এনফোর্স করে না। আমি অনুরোধ করব, এটা যেন এনফোর্স করা হয়। পণ্যটা যেন রিয়েল হাইজিন আমরা বলছি এটা হাইজিন পণ্য; কিন্তু রিয়েল হাইজিন না। আমরা ১ নম্বরে থাকার কারণ হচ্ছে, ৭৫ কোটি টাকা আমার মেশিনটির দাম; সবেচেয়ে উত্তম অবস্থায় মানে ১.১২ মিলিয়ন ইউরো বা ১২ কোটি টাকা। ১২ কোটি টাকার সঙ্গে ভবন-শেড সব কিছু ধরে ৭৫ কোটি। ফলে আমাদের ব্যয় বেশি। আমি শতভাগ একমত, ফেয়ার প্রতিযোগিতা হলে অটোমেটিক কেউ কিন্তু বেশি লাভ করতে চাইলেও পারবে না।

 

স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভ্যাট দিতে ইচ্ছুক না

হাসিন জাহান

লিপস্টিকের জন্য ট্যাক্স-ভ্যাট দিতে চাই, কারণ এটি না হলেও আমার চলে। কিন্তু যেটি আমার প্রতি মাসে প্রয়োজন, সেই স্যানিটারি ন্যাপকিনের জন্য প্রতি মাসে ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে আমি ইচ্ছুক না। এটি শুধু আমার কথা বলছি না, আমি এই কথা একটি প্রত্যন্ত গ্রামের একজন মেয়ের যার হয়তো লিপস্টিক লাগানোর শখ আছে; কিন্তু স্যানিটারি ন্যাপকিনটা তার প্রয়োজন। স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর ভ্যাট এবং ট্যাক্স মওকুফ করার জন্য নারীবান্ধব প্রধানমন্ত্রীর কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি।

 


চার কোটি নারী যেটাকে কিনবে সেটার পেছনে কেন ইনভেস্টমেন্ট করবেন না!

ড. আকরামুল ইসলাম

বিক্রির সময় ভ্যাট প্রদানও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। টিকে থাকতে হলে যেমন ব্যবসা করা দরকার, তেমনি বেঁচে থাকতে হলে সরকারেরও রাজস্বও দরকার। তবে মা-বোনসহ বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যে বিষয়টির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেখানে যদি আমরা বিনিয়োগ না করি, তাহলে কোথায় করব? সরকারকেও ছাড় দিতে হবে, কম্পানিগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। হ্যান্ড ওয়াশ নিয়ে অনেক বড় ক্যাম্পেইন করে কিন্তু কম্পানিগুলো অনেক সুফল পেয়েছিল। চার কোটি নারী যেটাকে কিনবে সেটার পেছনে কেন টাকা ইনভেস্টমেন্ট করবেন না এটা নিয়েও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাবতে হবে।

 

দেশে স্কয়ার প্রথম স্যানিটারি ন্যাপকিন বাজারে আনে

আবদুল্যাহ আল জাবেদ

১৯৯৮ সালে স্যামসন স্যারের হাত ধরে স্কয়ার প্রথম বাংলাদেশি কম্পানি হিসেবে স্যানোরা স্যানিটারি ন্যাপকিন বাজারে আনে। যখন বাংলাদেশে কোনো কম্পানি স্যানিটারি ন্যাপকিনের কাজ শুরু করেনি তখন আমরাই প্রথম এই কাজ শুরু করি। কিন্তু যে কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে তাতে আমি বলতে পারি যে আমরা এক টাকার চেয়ে বেশি আর কমাতে পারব না। আগে আমরা ১৪০ এসআর এ সুবিধাগুলো পেতাম, যেটা এখন ২৪০ এসআরের মাধ্যমে পাই। এর মধ্যে এই কাঠামো নিয়ে অনেকেই এনবিআরের সঙ্গে কথা বলেছে আমরাও বলেছি।

 

মিসগাইডেড হয়েছে ইন্ডাস্ট্রি

কামরুল হাসান

স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভ্যাট কমিয়েছেন এটা একটা আমার মনে হয় মিস লিডিং একটা তথ্য, মিস গাইডেড হয়েছে ইন্ডাস্ট্রি, জনগণও মিস গাইডেড হয়েছে এবং আমার ধারণা, ভ্যাটটা তাঁরা আরো প্রপারলি ক্লারিফাই করতে পারবেন। মূলত ভ্যাট কিন্তু আমরা যখন বিক্রি করি ম্যানুফাচারার যখন সেল করে তখনই ভ্যাট দিই। একটা পণ্য যদি ১০০ টাকা হয় তাহলে এটাতে ভ্যাট ১৫ টাকা। তার মানে এটার দাম হলো ১১৫ টাকা। এই যে ১১৫ টাকায় আমার যদি র ম্যাটারিয়াল লাগে ৫০ টাকা তাহলে ৫০ টাকা ইনপুট ধাপে কিন্তু ৫০ শতাংশ হারে মানে সাড়ে সাত টাকা কর দিয়ে আসছি।

 

আমদানীকৃত অপরিশোধিত উপাদানের ওপর ভ্যাট অপসারণ করা হয়

ব্যারিস্টার অনিতা গাজী রহমান

গত ২৫ জুনে সংসদে প্রকাশিত ২০১৯-২০ সালের বাজেটে স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদনে ব্যবহৃত আমদানীকৃত অপরিশোধিত উপাদানের ওপরে ৪০ শতাংশ ভ্যাট ধরা হয়েছিল। এরপর অনেক ক্যাম্পেইনিং ও প্রতিবাদের ফলে ৩০ জুন এনবিআর একটি এসআরওর মাধ্যমে ওই আমদানীকৃত অপরিশোধিত উপাদানের ওপর ভ্যাট অপসারণ করা হয়, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর। কিন্তু এখানে কিছু শর্ত দেওয়া আছে। এনবিআরের দেওয়া ছয়টি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মোট সাতটি অপরিশোধিত উপাদানের ওপর আরোপিত ভ্যাট থেকে মওকুফ পাবে।

 


পুরো জীবনে ব্যয় করতে হবে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকা

ডা. নাসরীন জাহান

আমি হিসাব করে দেখলাম, একজন নারীর স্যানিটারি ন্যাপকিনের পেছনে তার পুরো জীবনে ব্যয় করতে হবে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকা। কিন্তু এই ১৮ হাজার টাকার বিনিময়ে যে সুবিধাটা পাওয়া যাবে তার টাকার পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি। এটি ব্যবহার করলে মাসিকবিষয়ক সংশ্লিষ্ট রোগগুলো না হওয়ার ফলে অনেক বড় পরিমাণ অঙ্কের টাকা সাশ্রয় হবে। সংশ্লিষ্ট রোগগুলো এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বাঁচানোর চেয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে কিছু টাকা খরচ করা শ্রেয়। যখন আমি কিশোরীদের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের গভীর মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনতে দেখে আমার খুব অবাক লেগেছে।

 

কার্যকর প্রচারণা ন্যাপকিনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে

শাহ্নাজ মুন্নী

যেকোনো বিষয়ে সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে মিডিয়ার ভালো প্রভাব থাকে। প্রচারণার কারণে অনেক বিষয় মানুষ গ্রহণ করে। যেটি নানাভাবে বলেও হয়তো কেউ পারে না কিন্তু কার্যকর প্রচারণা একটি বিষয়কে খুব তাড়াতাড়ি গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এ ক্ষেত্রে ওরস্যালাইন-এনের উদাহরণ দেওয়া যায়। বিজ্ঞাপনটি সবাইকে খুবই উদ্বুদ্ধ করেছিল। স্যানিটারি ন্যাপকিনের ক্ষেত্রেও এ রকম কিছু করার সুযোগ রয়েছে। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এমন ছোট ছোট বিজ্ঞাপন তৈরি করা যেতে পারে। যারা প্রচারণার কাজ করে তারা যদি আমাদের সাহায্য করে তাহলে  জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে তা কাজে দেবে খুব।

 

নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে

ডা. ওয়াহিদা সিরাজ

স্যানিটারি ন্যাপকিন কোনো বিলাসী পণ্য নয়। এটি প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি নারীর জন্য একটি প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। ২০১৪-এর ন্যাশনাল হাইজেন বেজলাইন সার্ভেতে আমরা দেখতে পাই, মাত্র ১৪ শতাংশ মহিলা সানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে। ৮৬ শতাংশ মহিলা যারা ঐতিহ্যগত ন্যাপকিন ব্যবহার করে। সেটা হতে পারে কটন অথবা পুরনো কাপড়। স্কুলে যাওয়া ৪০ শতাংশ ছাত্রী ক্লাসে গড়ে তিন দিন করে অনুপস্থিত থাকে পিরিয়ডের কারণে। বিভিন্ন রিপোর্ট ও ডাটা রিভিও করে দেখেছি, বাংলাদেশে প্রায় ছোট-বড় ১২টি কম্পানি স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করে। যাদের ৮০ শতাংশ পণ্য কনজিউম হয়। সুতরাং এই পণ্যটির প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রয়োজনকে আমরা যদি ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি তাহলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব। যেহেতু ৮৬ শতাংশ নারী ঐতিহ্যগত ন্যাপকিন ব্যবহার করছে সেহেতু তাদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকিটা থেকেই যায়।

 

ন্যাপকিন ডিসপোজ করার যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই

মো. ফজলুল হক

স্যানিটারি ন্যাপকিন বিষয়ের প্রচারণাগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শহরকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে এখনো অনেক কিছু করার বাকি আছে। আমাদের এ জনসচেতনতামূলক কাজগুলো শুধু শহরকেন্দ্রিক না করে প্রত্যন্ত গ্রামেও কিভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তা নিয়ে ভাবা উচিত। বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাদের বেশির ভাগের স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে ব্যবহার করার সামর্থ্য নেই। শুধু ভ্যাট ও ট্যাক্স কমানো নয়, সরকারের পক্ষ থেকে এই লোকগুলোর জন্য ভর্তুকি দেওয়া উচিত।

 

শিক্ষার্থীদের প্রশ্নে সন্তুষ্ট করার মতো উত্তর নেই

মন্দিরা গুহ নিয়োগী

২৪২টি স্কুলের কাজ হচ্ছিল। একটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারি তাদের বেশির ভাগই ন্যাপকিনের পরিবর্তে কাপড় ব্যবহার করে। তারপর তাদেরকে সচেতন করার জন্য আমরা বললাম, ‘কাপড় ভালো করে ধুতে হবে, পরিষ্কার করতে হবে, রোদে শুকাতে হবে।’ অথচ সেই সুযোগটাও তারা সব সময় পাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যায়। শিক্ষার্থী, নয়তো অভিভাবকের কাছ থেকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি প্রায়ই হতে হয়।

 

চাহিদা ও সরবরাহের জায়গা ঠিক করতে হবে

মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান

ব্যবস্থাপনার কয়েকটি ভাগ থাকে। যেমন—চাহিদা ও সরবরাহ। যারা ব্যবহারকারী তাদের চাহিদাটা কী? যারা প্রস্তুতকারী তাদের সরবরাহের জায়গাটাতে কী আছে? আর এর ভেতরে মূল্য তো থাকবেই। দেশীয় নিয়ম-নীতিতে ভ্যাট, ট্যাক্সও থাকবে। এগুলো আমরা এড়িয়ে যেতে পারব না। কিন্তু এর গুরুত্বের দিক খেয়াল রেখে মাত্রাটা ঠিক করতে হবে। আমরা বিভিন্ন সময় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে থাকি। সেটা স্কুলভিত্তিক হোক অথবা গার্মেন্টভিত্তিক হোক। যেখানেই আমাদের বলার সুযোগ আছে আমরা এ বিষয়গুলো নিয়ে বলি।

 

ন্যাপকিনের সঙ্গে স্বাস্থ্যের ব্যাপারটি সরাসরি জড়িত

অ্যাডভোকেট আয়েশা আক্তার

৩০ জুন দেওয়া শুল্কের ঘোষণাটি নারীবান্ধব। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এটিকে তখনই আমি নারীবান্ধব বলতে পারব যখন সব নারী এর সুবিধা নিতে পারবে। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নে একটি রুমই রাখা হয়েছে যেখানে স্যানিটারি ন্যাপকিন, কনডম পাওয়া যায়। যার যখন প্রয়োজন সে এখান থেকে এগুলো সংগ্রহ করতে পারে। এর জন্য কোনো রকম পেমেন্ট দিতে হয় না। ন্যাপকিনের সঙ্গে স্বাস্থ্যের ব্যাপারটি সরাসরি জড়িত। সুতরাং আমার মনে হয় না ন্যাপকিনে কোনো রকম ভ্যাট বা ট্যাক্স আরোপ করার যৌক্তিকতা আছে। ন্যাপকিনের পরিবর্তে পুরান কাপড় ধুয়ে রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করার একটি বিষয় এ আলোচনায় উঠে এসেছে। একটি কাপড় যখন পুরনো হয়ে যায় তখন যতই পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হোক না কেন সেটি অস্বাস্থ্যকরই থাকে।

 

যাঁরা অংশ নিয়েছেন

ইমদাদুল হক মিলন

সম্পাদক, কালের কণ্ঠ

মোস্তফা কামাল

নির্বাহী সম্পাদক, কালের কণ্ঠ

ডা. খাইরুল ইসলাম

কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ

অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী

সভাপতি, অবস অ্যান্ড গাইনোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)

হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার

প্রথম সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

মো. তারেক হাসান

দ্বিতীয় সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান

উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুন্ধরা গ্রুপ

ও আহ্বায়ক, হাইজিন প্রডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ

হাসিন জাহান

কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন

ড. মো. আকরামুল ইসলাম

পরিচালক (ওয়াস কর্মসূচি), ব্র্যাক

আব্দুল্লাহ আল জাবেদ

পরিচালক (ট্যাক্স), স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড

মো. কামরুল হাসান

এসিআইয়ের বিজনেস ডিরেক্টর

ব্যারিস্টার অনিতা গাজী রহমান

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

ডা. নাসরীন জাহান

এলা প্যাডের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার

শাহ্নাজ মুন্নী

প্রধান বার্তা সম্পাদক, নিউজ২৪

ডা. ওয়াহিদা সিরাজ

সিনিয়র ম্যানেজার, সেভ দ্য চিলড্রেন

মো. ফজলুল হক

ঊর্ধ্বতন পরিচালক, সাজেদা ফাউন্ডেশন

মন্দিরা গুহ নিয়োগী

কো-অর্ডিনেটর (পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি)

ওয়ার্ল্ড ভিশন

মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান

পরিচালক (গবেষণা), ডরপ

আয়েশা আক্তার

স্টাফ আইনজীবী, ব্লাস্ট

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা