kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দামাদামি

আফরীন সুমু

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



দামাদামি

প্রফেসর সাহেব বাজার করতে এসেছেন। প্রফেসর শুনে যতটা রাশভারি, পয়সাওয়ালা উঁচুদরের মানুষ মনে হয়, তিনি মোটেও তা নন। সব কিছুতেই তিনি আগ বাড়িয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। মুলামুলি—অর্থাত্ দামাদামিতে তিনি ওস্তাদ। তার ধারণা, রিকশাওয়ালা, টেম্পোওয়ালা, বাসওয়ালা—কেউ কখনো তার কাছ থেকে এক পয়সা বেশি নিতে পারেনি। লোকে নাকি বলে, তরকারির বাজার আর মাছ বাজারে তার চেয়ে ভালো মুলামুলি করা লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

এই প্রফেসর সাহেব বাজারে ঢুকলেই বিরক্তিতে বিক্রেতাদের ভ্রু কুঁচকে যায়। মনে মনে বলে, ‘ব্যাটা জন্মের কঞ্জুস।’ এলাকার দোকান বলে এর কাছে বিক্রি করতে হয়। নইলে দোকানিদের ভাষায়, ‘এ রকম কাইষ্টা মানুষের কাছে বেচা-বিক্রি করে মাইনষে?’

আজ প্রফেসর সাহেবের মেজাজ খারাপ। কারণ গতকাল তিনি বেতন পেয়েছেন। বেতন পেলেই গিন্নি একগাদা বাজার ধরিয়ে দেন। প্রফেসর সাহেব ফরাজির দোকানের দিকে গেলেন, পটোল কিনতে হবে।

—কী রে ফরাজি, আছিস কেমন?

—জি ছার, বালা।

—তোরে না বলছি স্যার বলবি না।

—থুক্কু বুল অইছে। জি পফেসর সাব, বালা।

—বালা নয়, বল ভালো।

—জি ছার, বালা।

প্রফেসর সাহেব রাম ধমক দিলেন, ‘আবার স্যার?’

এমন ধমক খেয়েও ফরাজির মধ্যে ভয়ের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। সে ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল, ‘পফেসর সাবে নিবেন কি?’

প্রফেসর সাহেবের মতে, যেটা নিতে হবে সেটা কখনো আগে ধরতে হয় না। রচনার মতো অন্য আইটেম দিয়ে ভূমিকা করতে হয়। প্রফেসর সাহেব একটা পেঁপে হাতে নিয়ে বললেন, ‘কত করে পেঁপে?’

ফরাজি এসবের সঙ্গে অভ্যস্ত। সে দামটাকে তিন-চার গুণ বাড়িয়ে বলল।

—বলিস কী! এত কেন?

—মালের দাম বাড়তি।

—তাই বলে কী মগের মুলুকে চলে এসেছি নাকি?

প্রফেসর সাহেবের দামাদামির পাশাপাশি অন্তত তিন-চারজন কাস্টমার কেনাকাটা করে গেছে। পেঁপে ছেড়ে প্রফেসর সাহেব এবার বেগুন ধরলেন। নাড়াচাড়া করে বেগুনের হাজারটা খুঁত বের করলেন। তারপর কাঁচা মরিচ নিয়ে কিছুক্ষণ কচকচিয়ে পটোলে হাত বাড়ালেন। ভাবখানা এমন যেন তিনি পটোল নিতে চাননি, কিন্তু হঠাত্ করেই মনে হলো নিয়ে নেই এক কেজি।

—পটোল কত করে রে ফরাজি?

—আশি টেকা।

—দূর ব্যাটা, এই পটোল আশি টাকা হয় নাকি? খোসাগুলোয় দেখেছিস দাগ পড়ে গেছে।

—এহনকার পটোল ছার এমনি।

—এ তো দেখছি আজকের পটোল না। কেমন শুঁটকো হয়ে আছে।

—আপনেরে ছার বাইছ্যা বালাডাই দিমু। একদাম ৭০ ট্যাকা রাখুম, নিবেন?

প্রফেসর সাহেবের স্বভাব হলো, তিনি আগে বাজারের সব দোকান ঘুরে দাম জেনে আসেন। ফরাজি এটাও জানে। তাই ফরাজি বুদ্ধি করে সবাইকে বলে রেখেছে, প্রফেসর সাহেব গেলে যেন সব তরকারি কেজিপ্রতি ১০-২০ টাকা বেশি বলে। কথা হলো, অন্যরা এতে রাজি হবে কেন? কাস্টমার পেলে তো তাদের লাভ। কিন্তু তারা রাজি হয়, কারণ প্রফেসর সাহেবের মতো কাস্টমারের যন্ত্রণা পোহানোর চেয়ে একজন কাস্টমার কম পাওয়া ভালো।

—৫০ টাকা দেব, দেখ্ দিবি কি না?

—লস হয়া যায় ছার।

আরো ১০ মিনিট দামাদামি করে দুইবার চলে যেতে গিয়েও ফিরে এসে প্রফেসর সাহেব ৪০ টাকার পটোল ৫৫ টাকায় কিনলেন। সন্তুষ্টচিত্তে মাছওয়ালার দিকে এগোলেন। প্রফেসর সাহেব সুখী, ফরাজির মুখে হাসি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা