kalerkantho

রবিবার। ১০ নভেম্বর ২০১৯। ২৫ কার্তিক ১৪২৬। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কে বড়

জসীমউদ্দীন

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে




কে বড়

বা-ই-শ মণ পালোয়ান। ইয়া বড় হাত, ইয়া বড় পা। বুকে থাপ্পড় মারে, যেন পাহাড়ের গায়ে পাহাড় আসিয়া পড়ে।

সেই বা-ই-শ মণ পালোয়ানের ভারি নাম-ডাক। একবার দেশে একটা বুনো হাতি আসিয়া উত্পাত আরম্ভ করিল। অমনি খবর গেল বাইশ মণ পালোয়ানের কাছে। বাইশ মণ পালোয়ান তার লেজ ধরিয়া এমনি চরকি-ঘুরুন ঘুরাইয়া ছাড়িয়া দিল যে, ১০ মাইল দূরে সেই সুন্দরবনে যাইয়া হাতিটা ছিটকাইয়া পড়িল।

সেদিন বাইশ মণ পালোয়ান চলিয়াছিল পথ দিয়া। একটি বিদেশি লোক তাহাকে বলিল, ‘কীহে বাইশ মণ পালোয়ান! ভারি তো অহংকারে পথে হাঁটিতে দুনিয়াখানা কাঁপাইয়া চলো। আমাদের দেশের তেইশ মণ পালোয়ানের নাম শুনিয়াছ? তার সঙ্গে লড়াই করিয়া যদি জিতিয়া আসিতে পারো তবেই বুঝিব যে তুমি একটা পালোয়ান বটে।’

শুনিয়া বাইশ মণ পালোয়ান রাগে আর বাঁচে না। তখনই তার কাছে ঠিক-ঠিকানা জানিয়া লইয়া সে চলিল তেইশ মণ পালোয়ানের দেশে। যাইতে যাইতে সকাল গড়াইয়া দুপুর হইল। যাইতে যাইতে দুপুর গড়াইয়া বিকাল হইয়া আসিল। তখন সামনে দেখে এক প্রকাণ্ড দিঘি। এত পথ হাঁটিয়া বাইশ মণ-পালোয়ানের বড়ই পিপাসা লাগিয়াছে। অমনি দিঘির মাঝখানে যাইয়া সে দাঁড়াইল।

দিঘিতে এত যে অথৈ পানি, হায়! হায়!! বাইশ মণ পালোয়ানের সেখানে মাত্র হাঁটু পর্যন্ত ডুবিল। পদ্মা নদীর মতো পানি যদি গভীর হইত, তবে কোমর পর্যন্ত ডুবাইয়া অনায়াসে দুই হাত ভরিয়া সে পানি খাইতে পারিত। বেচারা আর কী করিবে! সেই পুকুরের মধ্যে শুইয়া পড়িয়া সে দুই হাতে দুই ধারের পানি ঠেলিয়া আনিয়া মুখে পুরিতে লাগিল—ঘপ্ ঘপ্-ঘপ্—ঘপ্-ঘপ্—ঘপ্— ঘপ্-ঘপ্—ঘপ্। খাইতে খাইতে দিঘির প্রায় সব পানি শেষ হইয়া আসিল। তখন শুধুমাত্র কাদা-মেশানো পানি বাকি আছে—যা পান করিলে পেটে অসুখ হইবে। কোনো রকমে পানি খাওয়াটা শেষ করিয়া বাইশ মণ পালোয়ান আবার পথ চলিতে আরম্ভ করিল।

যাইতে যাইতে রাত গড়াইয়া সকাল হইল। সকালবেলার বাতাসে বাইশ মণ পালোয়ানের কিছু আনন্দ হইল। দেখে, সামনে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ। বটগাছটি বাম হাতের টানে উপড়াইয়া, তার গোড়া দিয়া সে দাঁতন করিতে করিতে পথ চলিতে লাগিল। এইভাবে যাইতে যাইতে তেইশ মণ পালোয়ানের দরজায় আসিয়া সে হাজির হইল। দরজা ভেতর হইতে বন্ধ। মুখে সেই শিকড়-বাকড়সহ বটগাছের দাঁতন। বাইশ মণ পালোয়ান দরজায় ধাক্কা মারে আর ডাকে—‘ও তেইশ মণ পালোয়ান! ও তেইশ মণ পালোয়ান!’ ধাক্কার চোটে ঘরবাড়ি সব থর থর করিয়া কাঁপিতে লাগিল।

তেইশ মণ পলোয়ান তো বাড়ি নাই, বাড়ি আছে তার ছোট মেয়েটি। দরজা খুলিয়া একটু আগাইয়া আসিয়া সে মিহি গলায় একটু বিরক্তির স্বরে জিজ্ঞাসা করিল,

‘দরজার ওপর অত চেঁচামেচি করে কে?’

এত বড় একজন পালোয়ান দরজায়, সে জন্য মেয়েটির মনে একটুও বিস্ময় নাই! বাইশ মণ পালোয়ানের গা জ্বালা করিতে লাগিল। সে জিজ্ঞাসা করিল, ‘বলি তেইশ মণ পালোয়ান বাড়ি আছে?’

‘তাকে দিয়া তোমার কাজ কী?’

‘আমি বাইশ মণ পালোয়ান। তার সঙ্গে লড়াই করিতে আসিয়াছি। তেইশ মণ পালোয়ানের তুমি কী হও বটে হে?’

‘আমি তার মেয়ে।’ মেয়েটি অতি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিল, ‘বলি তোমার হাতে ওটা কী?’

বাইশ মণ পালোয়ান বুক ফুলাইয়া খুব গর্বের সঙ্গে উত্তর করিল, ‘পথ দিয়া আসিতেছিলাম, দেখলাম একটা বটগাছ। তা বাঁ হাতের টানে ওটাকে উপড়াইয়া দাঁতন করিতে করিতে আসিলাম।’

মেয়েটি একটু বাঁকা হাসিয়া উত্তর করিল, ‘বলি, এই মুরদ লইয়া তুমি আমার বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করিতে আসিয়াছ! ওটা দিয়া আমার বাবা দাঁত খেলাল করেন।’ এই বলিয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া মেয়েটি শব্দ করিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিল। দরজায় তো শব্দ করিল না, এ যেন তার বুকের মধ্যেই হাতুড়ি দিয়া ঘা মারিল। রাগে অপমানে বাইশ মণ পালোয়ান অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল।

এতদূর আসিয়াও তেইশ মণ পালোয়ানের দেখা পাওয়া গেল না। বহুকাল পরে একজন মনের মতো মানুষ পাওয়া গিয়াছিল, যার সঙ্গে সত্যি সত্যিই লড়াই করা যাইত। বনের বাঘ-ভালুকটা, সে তো মশা-মাছির শামিল হইয়া গিয়াছে;—ধর আর মার। বেশ মনের মতো যুদ্ধ করা যায়, এমন একজন প্রতিযোগী তার ভাগ্যে জুটিয়াও জুটিল না।

মনের দুঃখে বাইশ মণ পালোয়ান বাড়ি ফিরিয়া চলিল। চলিতে চলিতে সে এক মাঠের মধ্যে আসিয়া পড়িল। প্রকাণ্ড মাঠ। একধার হইতে আরেকধার দেখা যায় না। হঠাত্ মাঠের মধ্যে ভূমিকম্পের মতো পায়ের তলার মাটি কাঁপিতে লাগিল। বাইশ মণ পালোয়ান মাঠের চাষিদের জিজ্ঞাসা করিল, ‘এত ভূমিকম্প কিসের?’

চাষিরা বলিল, ‘তাও জানো না? তেইশ মণ পালোয়ান আরঙ্গাবাদের যুদ্ধ জয় করিয়া বাড়ি ফিরিতেছে। তার পায়ের দাপটে মাঠের মাটি কাঁপিতেছে। ওই যে সামনে পাহাড়ের মতো দেখা যাইতেছে না? ওই তেইশ মণ পালোয়ান!’

বাইশ মণ পালোয়ান তখন তার পরনের কাপড়খানা মালকোঁচা করিয়া পরিয়া বুকে তাল ঠুকিয়া তেইশ মণ পালোয়ানের সামনে গিয়া দাঁড়াইল। তেইশ মণ পালোয়ান জিজ্ঞাসা করিল, ‘তুমি কে?’ আকাশ হইতে যেন বাজ পড়িল।

বাইশ মণ পালোয়ান তেমনি জোরে উত্তর করিল, ‘আমি তোমার সঙ্গে লড়াই করিতে আসিয়াছি। আমার নাম শোন নাই? আমি বাইশ মণ পালোয়ান।’

তখন বাইশ মণ পালোয়ান আর তেইশ মণ পালোয়ানে লাগিল লড়াই। এদিক হইতে তাল ঠুকিয়া বাইশ মণ পালোয়ান তেইশ মণ পালোয়ানের ঘাড়ে পড়ে। ওদিক হইতে তাল ঠুকিয়া তেইশ মণ পালোয়ান বাইশ মণ পালোয়ানের ঘাড়ে পড়ে। যেন পাহাড়ের ওপর পাহাড় যাইয়া আছাড় খায়, যেন মেঘে মেঘে কড়াত্ কড়াত্ শব্দ করে! কেহ কাহারো চাইতে কম না, এ ওকে ঠেলিয়া খানিক ওদিকে লইয়া যায়; ও আবার একে ঠেলিয়া খানিক এদিকে লইয়া আসে। তাহাদের ঠেলাঠেলির চোটে চারিদিকের মাটি, আকাশ থর থর করিয়া কাঁপিতে লাগিল। হিমগিরির তিন-চারিটি চূড়া ভাঙিয়া পড়িল।

এদিকে হইয়াছে কী—এক বুড়ি কিনা তার সোয়া লক্ষ ছাগল মাঠে চরাইয়া ঘরে ফিরিতেছিল। ছাগলগুলি লাইন ধরিয়া বুড়ির সঙ্গে সঙ্গে চলিতেছিল। কিন্তু বাইশ মণ পালোয়ান আর তেইশ মণ পালোয়ানের লাফালাফিতে বুড়ির ছাগলগুলি ছড়াইয়া গড়াইয়া এলোমেলো হইয়া পড়িল। দুই-চারটি তো তাহাদের পায়ের চাপে একেবারে চিঁড়েচ্যাপ্টা। বুড়ি তাড়াতাড়ি সেই সোয়া লক্ষ ছাগল একটা একটা করিয়া তার ঝুলির মধ্যে পুরিয়া

ফেলিল।

আর বাইশ মণ পালোয়ানকে তার এক কাঁধের ওপর খাড়া করিয়া দিয়া তেইশ মণ পালোয়ানকে অন্য কাঁধের ওপর উঠায়া দিল। তারপর বুড়ি তার লাঠিতে ভর করিয়া আধা বাঁকা হইয়া ঘরের দিকে ফিরিতে লাগিল। বাইশ মণ পালোয়ান আর তেইশ মণ পালোয়ান তার কাঁধের ওপর দাঁড়াইয়া সমানে লড়াই করিতে লাগিল। এ এক লাফ দিয়া ও কাঁধে গিয়া ঝাঁপাইয়া পড়ে; ও এক লাফ দিয়া এ কাঁধে আসিয়া ঝাঁপাইয়া পড়ে। কেহ কাহারও চাইতে কম যায় না।

এদিকে হইয়াছে কী? না—এক চিল বুড়ির ছাগলগুলোর লোভে তাহার মাথার ওপর দিয়া আকাশে ঘুরিতেছিল। সে এক ছোঁ মারিয়া সোয়া লক্ষ ছাগল আর কাঁদের ওপর দুই পালোয়ানসুদ্ধ বুড়িকে আকাশে উড়াইয়া লইয়া গেল।

সে দেশের রাজকন্যা স্নানের পর ভিজা চুল এলাইয়া দিয়া ছাদের ওপর রোদ পোহাইতেছিল। —হঠাত্ চিলের ছোঁ হইতে সটকাইয়া গিয়া সেই ছাগল পালোয়ন সমেত বুড়ি, রাজকন্যার চোখের মধ্যে গিয়া পড়িল। অমনি রাজকন্যা, ‘চোখে কী গেল, চোখে কী গেল’ বলিয়া চিত্কার করিয়া উঠিল। রাজকন্যার সখীরা দৌড়াইয়া আসিল।

কত চক্মকি, ঝক্মকি, ঠক্ঠকি পাথরের রোশনাই জ্বালাইয়া, রাজকন্যার চোখটিকে রগড়াইয়া রগড়াইয়া তাহারা দেখিতে লাগিল। কিন্তু রাজকন্যার চোখের মধ্যে কোথাও তারা কিছু খুঁজিয়া পাইল না। খবর পাইয়া রাজা আসিলেন। মন্ত্রী-কোটাল পাত্র-মিত্র হাওলাদার, পাঙ্খাবরদার, সবাই আসিল। রাজবৈদ্য তার জড়িবড়ি ওষুধের পাটা ঘষিতে ঘষিতে আসিলেন। তার পাহাড়ের আতশি পাথরের রোশনাই জ্বালিয়া, চোখের মধ্যে ১৯৯টি দুরবিন সাজাইয়া, রাজবৈদ্য কত যে খুঁজিলেন, কিন্তু রাজকন্যার চোখের মধ্যে কোথাও কিছু দেখিতে পাইলেন না। রাজকন্যা শুধু কাঁদিতেছে, ‘চোখ জ্বলে গেল, চোখ জ্বলে গেল।’

তখন রাজা, পাত্র-মিত্র, হাওলাদার, সুবেদার, পাঙ্খাবরদার, রাজবৈদ্য—সবাই মিলিয়া পরামর্শ করিয়া স্থির করিলেন, জলধর জেলেকে ডাকিয়া আনিয়া রাজকন্যার চোখের মধ্যে বেড়াজাল ফেলা হউক। যদি কোথাও কিছু ঢুকিয়া থাকে তো সেই বেড়াজালের টানে বাহির হইয়া আসিবে। অমনি রাজ-কোতোয়ালের প্রতি হুকুম হইল জলধর জেলেকে ডাকিয়া আনিতে।

রাজার হুকুম—ধরিয়া আনিতে বলিলে বাঁধিয়া আনে—বাঁধিয়া আনিতে বলিলে মারিয়া আনে, আর মারিয়া আনিতে বলিলে ছাড়িয়া দিয়া আনে।

সিপাই-সান্ত্রী লইয়া রাজ-কোতোয়াল ঢুকিল জেলেপাড়ায়। জেলেদের ঘরের দরজা ভাঙিয়া চালের ছাউনি উড়াইয়া দিয়া, জালের সুতা এলোমেলো করিয়া দিয়া, রাজ সৈন্যরা একেবারে একাকার কাণ্ড করিয়া তুলিল।

তবু জলধর জেলের সাড়াশব্দ নাই। ভয়ে সে মাছের খালুয়ের মধ্যে ঢুকিয়া থর থর করিয়া কাঁপিতেছে।

অনেকক্ষণ পরে যখন দেখিল আর লুকাইয়া থাকিলে জেলেপাড়া তছনছ হইয়া যাইবে; জালের দড়ি ধসনচ হইয়া যাইবে, তখন সে জোড়হাতে রাজ-কোতোয়ালের সামনে আসিয়া দাঁড়াইল।

রাজ-কোতোয়াল সদম্ভে তাহাকে রাজার আদেশ জানাইয়া দিল। রাজার আদেশ শুনিয়া জলধর জেলের ধড়ে প্রাণ ফিরিয়া আসিল। সে তার সোয়া লক্ষ নাতিপুতি লইয়া, জাল-দড়ি-বাঁশ মাথায় করিয়া রাজপুরীতে আসিয়া হাজির হইল।

রাজার আদেশে জেলে তখন রাজকন্যার চোখের মধ্যে বেড়াজাল ফেলিয়া সোয়া লক্ষ নাতিপুতি লইয়া টানিতে লাগিল।

তাহারা জাল টানিয়া এদিক হইতে ওদিকে লইয়া যায়; আবার ওদিক হইতে এদিকে টানিয়া লইয়া আসে; কিন্তু কোথাও কিছু জালে ঠেকে না।

দিন চলিয়া গেল, রাত হইল, রাত কাটিয়া গেল, আবার দিন আসিল। এমনি করিয়া সাত দিন সাত রাত কাটিয়া গেল। টানিতে টানিতে, রাজকন্যার চোখের পুবকোণে কী যেন একটা ঠেকিল।

সোয়ালক্ষ নাতিপুতি মিলিয়া জলধর জেলে আর পারে না;

—‘হেইও জোয়ান হেইও’, ‘হেইও জোয়ান হেইও।’ টানিতে টানিতে অনেক কষ্টে তাহারা জালটাকে টানিয়া আনিয়া কিনারায় জড়ো করিল! তখন আতশি পাথরের রোশনাই জ্বালিয়া সোয়ালক্ষ দুরবিন লাগাইয়া সোয়ালক্ষ নাতিপুতি লইয়া জলধর জেলে অবাক হইয়া দেখে, জালের এক কানিতে আটকা পড়িয়া আছে সেই বুড়ি, তার কাঁধের ওপর বাইশ মণ পালোয়ান আর তেইশ মণ পালোয়ান তেমনি সমানে যুদ্ধ করিয়া চলিয়াছে।

তারা টেরও পায় নাই, এরই মধ্যে যে এত কাণ্ড হইয়া গিয়াছে। বুড়ির ঝুলির মধ্যে সোয়ালক্ষ ছাগল তেমনি আগের মতোই জমা হইয়া আছে।

চোখের ভেতর হইতে কুটোটি বাহির হইয়া গেল। রাজকন্যা হাসিয়া কথা বলিলেন।

বলো তো খোকাখুকুরা, কে সবচেয়ে বড়—দুই পালোয়ান, না বুড়ি, চিল, না কে?

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা