kalerkantho

ছাগল ডট কম

মো. সাখাওয়াত হোসেন

৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ছাগল ডট কম

অঙ্কন: প্রসূন

সকাল থেকে দেখি ছোট ভাই মনমরা হয়ে বসে আছে। গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী তামাশা শুরু করলি আবার? কী হইছে তোর?’

সে মুখ বাঁকা করে বলল, ‘এবারের কোরবানির ঈদের আগে কিছুই হচ্ছে না!’

—কিছুই হচ্ছে না মানে? কী হবে?

: এই যেমন গতবার অনলাইনে ‘হাঁটাও’ অ্যাপস দিয়ে গরু আনাইছিলাম। সে রকম কিছু ধামাকা।

—সব কিছুর মধ্যে ধামাকা খুঁজোস ক্যান? কোরবানি হচ্ছে ত্যাগ আর নিজের পশুত্বকে কোরবানি দেওয়া।

ছোট ভাই কিছু না বলে আবার মনমরা হয়ে গেল।

সেদিনই রাতে আমাদের ছোট মামা হাজির। মামাকে দেখেই আব্বার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। বিড়বিড় করে বলল, ‘এই ছাগল আবার কোথা থেকে?’

ছোট মামা সোফায় বসেই বলল, ‘এবার ব্যবসা করার জন্য আসছি।’

‘কিসের ব্যবসা?’ আমি জানতে চাইলাম।

—ছাগলের!

আব্বা আবার বিড়বিড় করে বলল, ‘ছাগলা!’

এদিকে ছোট মামার চোখ চকচক করছে। চকচক করছে আমার ছোট ভাইয়ের চোখও। সে তার ধামাকা খুঁজে পেয়েছে।

খাবার টেবিলে আব্বা গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘ছাগল ব্যবসা করতেছো! তা কোন হাটে বেচবা?’

মামা এক গাদা খাবার মুখে নিয়ে চাবাতে চাবাতে বলল, ‘কোন হাটে যাব আবার? মাত্র দশটা ছাগল। আপনাদের নিচে গ্যারেজে রাখব।’

আব্বা মুখে খাবার দিতে গিয়ে থেমে গেল, ‘মশকরা করতেছো নাকি? গ্যারেজে কিভাবে রাখবা?’

—বেঁধে রাখব রশি দিয়ে। আপনি চিন্তা করিয়েন

 না।

আব্বা হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল ছাগলের ম্যা ম্যা চিত্কারে। নিচে নেমে দেখি আমার ভাই আর মামা মহা উত্সাহে ছাগল বেঁধে গায়ে কী যেন লাগাচ্ছে। আমি চোখ ডলতে ডলতে কাছে গিয়ে বললাম, ‘কী এসব?’

—কাজ হবে ফিক্সড প্রাইসে। দামদর নিয়ে হাউকাউ লাগানো যাবে না। যেহেতু এটা কাউয়ের বাজার না। ন্যায্য মূল্যে ফিক্সড প্রাইসে ছাগল বেচা হয়ে যাবে।

রুমে যেতেই আব্বা বলল, ‘কোনোভাবে এ সুযোগে তোর মামাকেও বেচে দিতে পারোস নাকি দেখ।’

পেছনে আম্মা এসে বলল, ‘কী বলতেছো?’

আব্বা চুপ হয়ে গেল। খালি বিড়বিড় করল, ‘কী আর বলব।’

দুই দিনেও কোনো কাস্টোমার না পাওয়ায় মামা আর আমার ছোট ভাই চিন্তা করল, মাইকিং করবে। এক বিকেলে তারা মাইকিংয়ে বের হয়ে পড়ল।

‘বিশাল ছাগলের হাট। ছাগল ডটকম। স্থান রায়হান সাহেবের বিল্ডিং।’

‘মান-ইজ্জত আর রাখল না আমার। আমার বিল্ডিংয়ে ছাগলের হাট। আমার নাম বলার কী দরকার?’— আব্বা চেঁচাতে লাগল।

‘আরে আজব! তোমার নাম না বললে লোকেশন চিনবে কিভাবে?’ আম্মা বলল।

আমি রুমের দরজা বন্ধ করে ভিতরে ঢুকে গেলাম। এত ধামাকা আর সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা এক নিমিষে আমার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠল। সেদিন বিকেলে এলাকার ত্রপা আমাকে বলল, ‘ভাইয়া, আপনাদের ওখানে নাকি ছাগল বিক্রি হচ্ছে? আমি একটা কিনতে চাইছি। কিভাবে কিনব?’

ত্রপা আমার সঙ্গে এলাকায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে। এলাকার সবাই থেমে থেমে তাই দেখছে। আমি চোখের কোণ দিয়ে স্পষ্ট দেখতেছি এই যে তারেক, রাহাত, আক্কাস চাচা, কালো দাঁড়কাকটা, বিশাল বটগাছ সবাই তাকিয়ে আছে।

‘ব্যাপার না, তুমি কালকেই আসো। পেয়ে যাবে।’— আমি আশ্বস্ত করলাম।

পরদিন সকালে হলুদ শার্ট, জিন্স প্যান্ট পরে তৈরি হয়ে থাকলাম। ছোট ভাই আমাকে দেখেই বলল, ‘কার বিয়ে?’

প্রশ্ন শুনে আমি পুরোপুরি অবাক। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কার বিয়ে মানে?’

: যা সাজ মারছো। দেখে তো মনে হচ্ছে কারো বিয়ে।

—এই যা ফুট!

একটু পরেই চারদিক আলো করে এলো ত্রপা। ছাগলগুলোও যেন ত্রপাকে দেখে নড়েচড়ে উঠল। এত দিনে মামার দুটি ছাগল বিক্রি হয়েছে। ত্রপাকে দেখে আমার মামাও গম্ভীর স্বরে সব ছাগলের গুণাগুণ বর্ণনা করতে লাগল। অবশেষে ত্রপা একটা ছাগল পছন্দ করল।

‘এটা কত?’ রিমঝিম কণ্ঠে সে বলল।

‘গায়ে লেখা আছে।’ মামা বলল।

‘পাঁচ শ মাত্র?’ দাম দেখে ত্রপা অবাক।

মামা কাছে গিয়ে দেখে আমার ছোট ভাইয়ের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাল। ৫০০০ লিখতে গিয়ে সে একটা শূন্য কম দিয়েছে।

‘সরি একটু ভুল হয়েছে।’ এই বলে আমার মামা শেষে শূন্য না বসিয়ে আগে একটা ৫ বসিয়ে দিল। দাম দাঁড়ালো ৫৫০০। আমি এবার মামার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালাম।

‘ত্রপা তুমি পাঁচ হাজার দাও।’ আমি ত্রপাকে বলতে সে পাঁচ হাজার টাকাই দিল।

সেই ছাগল নিয়ে পরদিন ত্রপা হাজির সকালে। আব্বা দরজা খুলে দিতেই সে আব্বাকে বলল, ‘আংকেল, এই কালারটা চেইঞ্জ করব। হালকা মেরুন কালারের একটা ছিল, সেটা নেব।’

আমি প্রমাদ গুনলাম। তাড়াতাড়ি গিয়ে বললাম, ‘ত্রপা তুমি নিচে যাও, আমি আসতেছি।’

আব্বা খেপে গিয়ে বলল, ‘সাব্বাস! তুইও কী এই লাইনে গেছোস? আপনার ছেলে কী করে, কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলব ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। এখন ছাগল বেচতেছে।’

নিচে গিয়ে দেখি মামার সঙ্গে কথা বলছে ত্রপা। মামা কোনোভাবেই ফেরত দেবে না।

‘বিক্রীত মাল ফেরত নেওয়া হয় না।’ মামার এক জবাব।

‘মামা, দিয়ে দাও। ত্রপা তোমার ছাগলের মডেল হবে। মানে সে যে ছাগল কিনতেছে এটা নিয়ে ফেসবুকে ছবি দেবে। তোমার সব ছাগল বিক্রি হয়ে যাবে।’ আমি মামাকে বোঝালাম।

মামা রাজি হলো। হাসি হাসি মুখে ত্রপা ছাগলের সঙ্গে পোজ দিল। পরদিন সকালেই এলাকার সব ছেলে লাইন দিল।

আব্বা দেখে বিড়বিড় করল, ‘ছাগলের দল!’

মন্তব্য