kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

সায়েন্সফিকশন

ভিরু ও পিকুর উপহারদ্বয়

১২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভিরু ও পিকুর উপহারদ্বয়

অবস্থা গুরুতর। অর্থাত্ গুরুরা সবাই তরতরিয়ে উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে। নামে কেন্দ্রীয় হলেও কেউ মানেটানে না। হাজার বছর আগের পৃথিবীর জাতিসংঘের মতো এটাও একটা কিছু। কোথাও যুদ্ধটুদ্ধ লাগুক আর আন্দোলনে সব ছারখার হয়ে যাক, কাউন্সিলের নেতারা শুধু গুটুরগাটুর কথাবার্তা বলেন। দুই দিন পর মহাবিশ্বের তাপ কমে যাচ্ছে বলে একটা হৈচৈ বাধান, আর তাবত্ বিজ্ঞানীদের বিভ্রান্তিতে ফেলে দেন। তাঁরা থারমোডায়নামিকসের জটিল সব তত্ত্ব নিয়ে কাউন্সিলে হাজির হন এবং যথারীতি কেউ কিছু না বুঝে বিজ্ঞের মতো তাকিয়ে থাকেন আর শেষে হাই তুলে কাউন্সিল প্রধান মিস্টার হিলুনিয়া বলেন যে ‘মহাবিশ্ব তার নিজের তালে চলবে। একসময় দুনিয়ার সব শীতলক্ষ্যার মতো শীতল হইয়া যাবে। আমাদের এসব নিয়া না ভাবলেও চলবে।’

বোঝা গেল কাউন্সিল প্রধান একজন বাংলাদেশি। আর তাই বড় কোনো সমস্যাই তাকে বিশেষ একটা ভাবায় না।

আজকের সমস্যা মহাবিশ্ব নিয়ে নয়। সৌরজগতের পাশে মাঝারি সাইজের দুটি প্রতিবেশী গ্রহ—ভিরু ও পিকুকে নিয়ে। গ্রহ দুটি অদ্ভুত। একটি আরেকটিকে ঘিরে চক্কর খায়। সাইজে একটু বড়-ছোট হলেও দুটিরই পূর্ণাঙ্গ গ্রহের মর্যাদা আছে। সমস্যা হলো বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এদের দুজনের কক্ষপথ কাছাকাছি চলে আসে। ওই সময় কক্ষপথের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ঝগড়াঝাটি লেগে যায় দুই গ্রহের। এর মধ্যে আবার ইগো সমস্যাও আছে। একটি গ্রহ আরেকটিকে উপগ্রহ বলে ডাকে। কথায় কথায় ভিরুর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আরে, পিকুর কথা কী শুনব, ও তো আমাদের একটি স্যাটেলাইট। আমাদের ঘিরে চক্কর না খেয়ে উপায় আছে!’

তখন পিকুর রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, ‘ভিরু মানে ভীরু। ওরা কাপুরুষ। সাহস থাকে তো লড়! লড়ে নেব পিকু!’ মূলত এটি তার প্রিয় ডায়ালগ।

এখন কেন্দ্রীয় কাউন্সিল প্রধান হিলুনিয়া পড়েছেন বিপদে। ভিরুর একটি স্পেসশিপ ঢুকে পড়েছিল পিকুতে। ওটার চালকসহ আটক করেছে পিকুর সেনাবাহিনী। সেটি নিয়ে দুই গ্রহে যুদ্ধ শুরু হওয়ার দশা। এদিকে যুদ্ধ শুরু হলে সেটির প্রভাব পড়বে পৃথিবীতেও। টেনশনের শেষ নেই। এ কারণেই ডাক পড়ল বিজ্ঞানী বজলুর।

‘স্যার, ডেকেছেন?’

‘তুমি যে মানের বিজ্ঞানী, তাতে তোমাকেই স্যার বলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কী করা, আমি হইলাম কাউন্সিল প্রধান, বয়সেও বড়। যাউকগা, এই ভিরু আর পিকুর একটা স্থায়ী সমাধান কইরা দিয়া আসো। ওগো কক্ষপথ নিয়া কামড়াকামড়ি ভাল্লাগে না। আর পিকু নাকি একটা ভিরুর স্পেসশিপ ধরসে, পাইলটরেও আটকাইয়া রাখসে। দেখো কী করা যায়।’

বিজ্ঞানী বজলু পান চিবুতে চিবুতে চলে গেলেন। বিজ্ঞানী হয়েও মাঝেমধ্যে এসব কূটনৈতিক জঞ্জাল সরানোর দায়িত্ব এসে পড়ে কাঁধে। বিড় বিড় করে বলতে থাকেন, ‘বড়ই যন্ত্রণা! বড়ই যন্ত্রণা!’

পিকুতে নামতেই বিশেষ সমাদর পেলেন বিজ্ঞানী বজলু। কারণ তিনি কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের ‘বজলু পুরস্কার’ পাওয়া বিজ্ঞানী। নিজের নামের পুরস্কারটা নিজেই সবার আগে পেয়েছেন। এ নিয়ে বিব্রতও বোধ করেন। পিকুর সেনাপ্রধান এসে বিশেষ সম্মানের সঙ্গে তাকে নিয়ে গেল কথাবার্তা বলতে। পৃথিবীর প্রতি পিকুর এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। কারণ বহুকাল আগে পৃথিবীরই কঠিন দাবড়ানি খেয়েছিল পিকু। সেই ক্ষত আজঅব্দি পিকুর সেনারা ভোলে নাই।

‘বিজ্ঞানী সাহেব। ভিরুর পাইলটটাকে কী করব বলেন? মাথা কেটে কক্ষপথে ভাসিয়ে দেব? নাকি কড়ুমাক্কা গ্রহের লাভার সাগরে চোবাবো?’

‘তাতে তো যুদ্ধ লেগে যাবে সেনাপ্রধান।’

‘ওরা এভাবে আমাদের ওপর হামলা চালাবে...।’

‘ওদেরও ভুল হইছে। তবে যুক্তি আছে দুই পক্ষেরই। তোমাদের যুদ্ধ তো আইজকাইলকার কথা না। অনেক দিন ধইরাই কামড়াকামড়ি করতেসো। আমি আসছি সমাধান দিতে।’

‘আমি তো আজকেই দুইটা কোয়ান্টাম সাব অ্যাটমিক বোমা ফেলব ভিরুতে। দেখি ওদের গ্রহ আস্ত থাকে কি না।’

‘শুধু শুধু নিরীহ মানুষ মারা যাবে। তা পাইলটটাকে ডাক দাও। দেখি ও কেমন আছে। মারধর বেশি করো নাই তো?’

ধরে আনা হলো ধরা পড়া ভিরু গ্রহের স্পেসশিপ চালককে। বেচারাকে দেখেই চিনে ফেললেন বিজ্ঞানী বজলু। পাইলটও বজলুকে দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। তবে বজলু কিছু বললেন না। তিনি এসেছেন কূটনৈতিক সমাধান দিতে। বাড়তি ঝামেলা পাকাতে নয়।

‘তোমাদের কক্ষপথটা পৃথিবীর হিসেবে ফেব্রুয়ারি আর মার্চের দিকে ঝামেলা করে। এই সময়টা তোমরা স্যাটেলাইটগুলার বিন্যাস বদলাও। ওই সময় কক্ষপথ গার্ডদের কারো হাতে কোনো গোলাবারুদ যাতে না থাকে। মারামারি করতে মন চাইলে কুস্তি করবা। কেন্দ্রীয় কাউন্সিল যদি দেখে কেউ ওই টাইমে গোলাগুলি করসে, তবে হিলুনিয়া সাহেব সেই গ্রহে মিলিটারি হামলা চালাইবেন। এখন তুমি কি সেটাই চাও?’

‘হুম। আপনার কথা মনে ধরেছে বিজ্ঞানী সাহেব। সেই মোতাবেক কাজ হবে। লড়ে নেব পিকু! মানে গুলি ছাড়া হবে লড়াই। দেখি কুস্তিতে কে জেতে। ক্রিকেটের মতো ভালো একটা গেইমও হবে।’

পিকু ছেড়ে যাওয়ার সময় পিকুর সেনাপ্রধান তাদের গ্রহের একটা বিশেষ খাবার উপহার দিলেন বিজ্ঞানী বজলুকে। বজলু সেই দামি খাবারের প্যাকেট হাতে ভিরুর পাইলটটাকে নিয়ে উড়াল দিলেন।

যাওয়ার সময় পাইলটটা একটা কথাও বলল না। চেহারায় লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে বসে আছে বিজ্ঞানী বজলুর পাশে। ইচ্ছা করেই তার বিষয়টা চেপে গিয়েছিলেন বজলু। কারণ সত্যি কথাটা বলে ফেললে পিকু গ্রহের সেনাপ্রধান আন্ত গ্যালাক্টিক মিডিয়ার সামনে ব্যাপক লজ্জায় পড়ে যেতেন। বজলু তাকে সেই লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন। কারণ যে পাইলটকে তারা ধরেছে সে কোনো মানুষ নয়। বিজ্ঞানী বজলুরই ডিজাইন করা নভো-১৯ সিরিজের পাইলট রোবট। একটা পাইলট রোবটকে ধরে মারধর করাটা বোকামি তো বটেই, হাস্যকরও।

রোবটটাকে ভিরুতে নামিয়ে দিতেই ফের ফুলেল সংবর্ধনা পেলেন বিজ্ঞানী বজলু। আলাপও হলো যথারীতি আগের মতো এবং পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় ভিরু গ্রহের প্রধানমন্ত্রীও তার হাতে একটা বিশেষ খাবার তুলে দিলেন।

বাসায় এসে রোবট গৃহকর্মী নিমাইচন্দ্রকে ডাক দিলেন বজলু, ‘দেখো তো নিমাই, ভিরু আর পিকু দুটি খাবার উপহার দিয়েছে। সবজির মতো মনে হয়। রান্না করা যায় কি না।’

প্যাকেট খুলেই ইরিডিয়াম ধাতুর তৈরি ভ্রু কুঁচকে গেল নিমাইচন্দ্রের, ‘স্যার একটার গায়ে লেখা লাউ, আরেকটার গায়ে কদু। দুইটা একই জিনিস। দুইটাই রান্না করব?’

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা