kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

মান-অভিমান-বিমান

সত্যজিৎ বিশ্বাস

৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মান-অভিমান-বিমান

হরমুজের মন খারাপ। খুবই খারাপ। কেউ তাঁকে পাত্তা দিচ্ছে না। বন্ধু, বান্ধবী, ফেসবুক ফ্রেন্ড, জাস্ট ফ্রেন্ড, বেস্ট ফ্রেন্ড—কেউই না। অথচ সে তো ফালতু কেউ না। শিক্ষাগত যোগ্যতা না হয় একটু কমই। এসএসসি পাস। তাতে কী? প্রতিভাবান, বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা পড়াশোনায় একটু ল্যাবেন্টিসই হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলামের মতো বড় বড় ফেমাস ব্যক্তিও কি তা-ই না? কার কবে স্কুল-কলেজের প্রতি আগ্রহ ছিল শুনি? সে জন্য কি কারো বিখ্যাত হওয়া ঠেকিয়ে রাখা গেছে? অথচ তাঁর মতো প্রতিভাবানকে কেউ দাম দিচ্ছে না কেন, সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না হরমুজ।

নাহ্, এভাবে হবে না। এমন কিছু একটা করে দেখাতে হবে, যাতে সারা দুনিয়া কেঁপে ওঠে। তারপর এক বাক্যে স্বীকার করে, একেই বলে অভিনয়, একেই বলে প্রতিভা। কী করা যায়, কী করা যায় ভাবতে ভাবতেই হরমুজের মাথায় আসে এক দুর্ধর্ষ প্ল্যান। যেই ভাবা সেই কাজ। প্ল্যান অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে কাজে নেমে পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই।

চুইংগাম চিবোতে চিবোতে দৃপ্ত পদক্ষেপে জেমস বন্ড স্টাইলে ঢুকে পড়ে এক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়ে গেটের মুখে টাঙানো নোটিশটার সামনে দাঁড়ায়। ওখানে লেখা, ‘আপনার সঙ্গে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্যাদি প্রদর্শন করুন।’ নোটিশটি পড়ে মুচকি হেসে দাঁতগুলো দেখিয়ে ভেতরে ঢোকে হরমুজ। তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠে পড়ে মস্ত উড়োজাহাজে।  

প্রায় দেড় শজন যাত্রী নিয়ে উড়োজাহাজটি আকাশে ডানা মেলে। কেউ কেউ রিল্যাক্স হয়ে পাশের সিটের প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে গল্প জমানোর চেষ্টায় ব্যস্ত, কেউ বা একটু ঝিমুতে শুরু করেছে। হরমুজ জানালার পাশে সিট পেয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিল। এমন সময় হরমুজের ঠিক পেছনের সিটে শুরু হলো শোরগোল। পেছনে জানালার পাশের সিটে বসা এক মাঝবয়সী মহিলা প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে জানালার কাচ ওঠানোর। পাশের যাত্রীরা যতই চেষ্টা করে যাচ্ছে বোঝানোর, ‘এটা ট্রেনের জানালা না, উড়োজাহাজের জানালা। এটা খোলা যায় না’—কাজ হচ্ছে না। মহিলা কাচ ওঠাবেই। কথা কাটাকাটি থেকে যখন হাতাহাতি হওয়ার জোগাড়, আর সহ্য করতে না পেরে সিটবেল্ট খুলে উঠে দাঁড়ায় হরমুজ। ঘুরে মহিলার দিকে তাকিয়ে ঝাড়ি মারে, সমস্যা কী আপনার? এমন করছেন কেন? জানালা খুলে কী করবেন?

মহিলাও পাল্টা ঝাড়ি মেরে বলে, ‘আমার জালানা খুইলা আমি বমি করাম, তোর লাগে ক্যারে?’   

আশপাশের সবাই আসন্ন বিপদ থেকে নিজেদের জামাকাপড় বাঁচানোর জন্য সিট ছাড়ার আগেই দেখে আরেক বিপদ। হরমুজ হাতের খেলনা পিস্তল দেখিয়ে সবাইকে বলে, ‘একেবারে চুপ। যে যার সিটে আছেন, একেবারে নড়বেন না। একটু নড়লেই গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেব। এই উড়োজাহাজ ছিনতাই করা হলো।’

কথা শুনে এক কেবিন ক্রু পাশ দিয়ে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করতেই তাঁর কলার চেপে ধরল হরমুজ,  ‘এই, কই দৌড় দিস? প্লেনের ড্রাইভারকে বল প্লেন নিচে নামাতে। কুইক।’

হরমুজের কথায় শুধু উড়োজাহাজ না, কেঁপে উঠল যেন সারা বিশ্ব। উড়োজাহাজ তড়িঘড়ি করে নেমে পড়ল এয়ারপোর্টে। খবর হওয়া শুরু করল সব মিডিয়ায়। এই চাঞ্চল্যকর খবর জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক হওয়া শুরু করল মুহূর্তের মধ্যেই। সবার একই প্রশ্ন, একই কৌতূহল, কেন এমন করল হরমুজ? 

এত সহজেই প্ল্যান বাস্তবায়ন হয়ে যাওয়ায় গর্বের হাসি হেসে নিজেকেই থ্যাংকস দিল হরমুজ। তারপর সিনেমার ভিলেনের মতো গর্জে উঠে বলল, ‘আমার কথা শোনার মতো সময় তো কারো নাই, এখন কেন শোনার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছ? ঠেলার নাম বাবাজি, তাই না? হুহাহাহা...’   

‘যদি কারণ জানতে চাও, তাহলে আমাকে ফলো করো’ বলে সবাইকে সাসপেন্সের মধ্যে রেখে এক হাতে পিস্তল উঁচিয়ে ধরে অন্য হাত পকেটে ঢোকাল হরমুজ। আতঙ্কে ভরা মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ধীরে ধীরে পকেট থেকে হাত বের করতে লাগল সে। ‘কী বের হবে, ককটেল নাকি বোমা?’ এই ভয়ে চোখ বুজে ফেলল অনেকেই। শতাধিক পলক না পড়া চোখ দেখল, হরমুজের পকেট থেকে বের হলো কলম আর কাগজ।

‘আমি এখন একটা জরুরি প্রজ্ঞাপন লিখব, কেউ একটু টুঁ-টা শব্দ করবে না, করলেই কিন্তু ঠুস’—এ কথা বলেই লিখতে বসে গেল হরমুজ। রুদ্ধশ্বাস করা মিনিট পাঁচেক পরে নিজের লেখায় নিজেই মুগ্ধ হরমুজ বানান ভুল আছে কি না চেক করার জন্য শব্দ করে পড়তে শুরু করল, ‘অস্কার পুরস্কার ঘোষণা করা হবে আগামীকাল! অভিনয় দুনিয়ার সর্বোচ্চ সম্মাননা পুরস্কার অনুষ্ঠান ঘোষণা হয়ে যাবে আর সেখানে আমার বা আমার বউয়ের নাম থাকবে না, এটা কি ঠিক? তোমরা দেখো, অভিনয় প্রতিভা কাকে বলে। মুহূর্তের মধ্যেই সারা দুনিয়া কী করে তাক লাগিয়ে দিলাম। এর পরও যদি অস্কার না দাও, সে ব্যর্থতা তোমাদের।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা