kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

কিউপিডের তীর

সত্যজিত্ বিশ্বাস

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অনেক রিকোয়েস্টের পর জেরিন রাজি হয়েছে দেখা করতে। স্পট-বিকেল ৫টার সময় চন্দ্রিমা উদ্যান। ‘ভ্যালেন্টাইন ডেতে যে মেয়ে দেখা করতে রাজি হয়, সে মেয়ে কিছু একটা আন্দাজ না করে, না ভেবে রাজি হয় না’—এটা মনে হতেই মন যেন ময়ূরের পেখম বের করে একপাক নেচে উঠল।  

মোবাইলে দেখলাম ৪টা বাজে। সিনসিয়ার ছেলেদের মেয়েরা খুব পছন্দ করে। সে জন্য এক ঘণ্টা আগেই রাকিবকে নিয়ে বসে আছি চন্দ্রিমা উদ্যানে। রাকিব আমাদের গ্রুপের পরীক্ষিত বিপদের বন্ধু। বিপদ এলে মার খায়, তবু পালায় না। দুর্মুখেরা অবশ্য ভিন্ন কথা বলে। বলে—ও মোটু, পালিয়ে বাঁচতে পারবে না বলেই পালায় না। সে যা-ই হোক, অযাচিত বিপদের কথা বলা যায় না, এ ভেবেই ওকে সঙ্গে আনা।  

‘যে পুরুষের দায়িত্বজ্ঞান নেই, সে পুরুষকে মেয়েরা পছন্দ করে না’—কে যেন এই উক্তিটা করেছিলেন? মনে হয় ভলতেয়ার হবে। বেশির ভাগ বাণীই তো এই লোক করেছেন। তাই না রে রাকিব? 

কিছু না বলে মাথা চুলকাতে চুলকাতে মোটু রাকিব বলে, ভলতেয়ার আবার কে? তার সঙ্গে দেখা করার কথা নাকি?

ভালো করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম, মোটু কি আমার সঙ্গে ফাজলামি করার চেষ্টা করছে নাকি আসলেই জানে না। ওকে ঠুয়া মারার জন্য হাত তুলতে গিয়ে হঠাত্ মনে হলো, আরে একটু পরেই তো জেরিন আসবে, রাকিবকে পরেও সাইজ করা যাবে।

কে বলে, শুধু খেলাধুলার বেলায়ই প্রস্তুতি নিতে হয়? প্রথম ডেট করতে আসার আগেও প্রস্তুতি নিতে হয়। 

ওর কাছ থেকে একটু দূরে বসে প্রস্তুতি নিতে থাকলাম—কী বললে, কিভাবে বললে জেরিন আমার দিকে ঢেউটিনের মতো কাত না হয়ে পারবেই না।  

জেরিনের সঙ্গে কথা বলার সময় মোটু যেন ডিস্টার্ব না করে, সে জন্য আড়াই শ গ্রাম বাদাম কিনে দিয়েছি। অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় ছয় মিনিটের মধ্যে সব শেষ করে আমাকে সাহস দিতে এগিয়ে আসে মোটু। আরে দোস্ত, টেনশন করিস কেন? আমি পাশে আছি না?

মনে মনে বলি, ভয়টা তো সেখানেই। খাবার ছাড়া তুই কতক্ষণ পাশে থাকবি, কে জানে। 

ওর দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর জন্য চারপাশ দেখিয়ে বললাম—দেখ, ভ্যালেন্টাইনের মাহাত্ম্য দেখো। ফুলে ফুলে চারপাশের পরিবেশটা কেমন পাল্টে ফেলেছে।

রাকিব চারপাশে তাকিয়ে মাথা দুলিয়ে বলে, আরে তাই তো। হঠাত্ কী মনে হতেই প্রশ্ন করে, আচ্ছা—ভ্যালেন্টাইন কে রে? ভলতেয়ারের ভাই?  

 

লেকের পাশে বসে দুজনই তাকিয়ে আছি পানির দিকে। কল্পনায় সেই পানিতে আমি দেখি জেরিনের মুখ, আর মোটু দেখে প্যাস্ট্রি, বার্গার, ফ্রাই করা চিকেন। অবশ্য দোষটা ওর না। আমি শুধু বলেছিলাম, প্রথম দেখায় কিছু তো খাওয়াতে হবে, না হলে কী ভাববে জেরিন? সেই থেকে মোটু নিজ তাগিদেই বাকিটা ভেবে নিচ্ছে আর একটু পরপর জ্ঞান দিচ্ছে, কোথায় খেতে বসলে কী কী সুবিধা।

খাবারদাবারের ব্যাপারে মোটুদের যে অগাধ জ্ঞান থাকে, সে কথা জানতাম; কিন্তু এই মোটু দেখি শুধু খাবারবিষয়ক জ্ঞানীই না, রীতিমতো বিদ্যাসাগর। রাস্তার পাশের ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার হাজি বিরিয়ানি পর্যন্ত সে ভেবেই যাচ্ছে। মনে মনে বললাম, খালি প্রেমটা হোক, তারপর বুঝবি শালা। বাতাসের বিরিয়ানি, কড়া রোদের রোস্ট, ট্যাপের পানির কোল্ড ড্রিংস দিয়ে তোকে লাঞ্চ করাব।

৫টা বেজে গেছে। পাশে তাকিয়ে দেখি, শয়ে শয়ে পরি নেমেছে আজ চন্দ্রিমা উদ্যানে। আর তাদের ‘পরা’রা মানে প্রেমিকরা খোঁপায় গুঁজে দিচ্ছে গোলাপ। ভাগ্যিস, ভালোবাসার ফুল রজনীগন্ধা না। পরিদের তাহলে খবরই ছিল। রজনীগন্ধার ওজন কম না। উঁচু উঁচু শিং বের হয়ে ঘাড় বাঁকা হয়ে যেত।  

গুনে গুনে আটটা তাজা গোলাপ দিয়ে শাহবাগ থেকে তোড়া বানিয়ে নিয়ে এসেছি। আরো আনার ইচ্ছা ছিল, দাম বেশি দেখে আনিনি। তবে শাহবাগের ফুলের ভাবই আলাদা। অন্য জায়গার ফুল তাজা হলে এখানকার ফুলগুলো হলো তেজী। শার্টের নিচে ফুলগুলো লুকিয়ে রেখেছি বিশেষ কায়দায়। যদিও একটু পর পর কাঁটার খোঁচায় রক্তাক্ত হচ্ছিল বুক। ব্যাপার না, প্রেম করতে গেলে এটুকু সহ্য করতেই হয়। একটু পরেই তো সেভলন ক্রিম হয়ে আসবে জেরিন। জেরিন—আমার ভালোবাসার অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, কই তুমি?  

 

৬টা বেজে গেলেও জেরিন আসছে না দেখে একটু কেমন কেমন যে লাগছিল না, তা না। নিজেকে বোঝাতে লাগলাম—জেরিন তো হেজিপেজি কেউ না। ‘জেরিন, আমার সিনোরিটা, আমার জন্য ঘণ্টা দুই যাবত্ সেজেগুজে রেডি হচ্ছে’ ভাবতেই পেটের ভেতর কেমন জানি একটা ভালো লাগা চক্কর দিয়ে উঠছিল।  

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দুই বন্ধু মিলে ঠাস ঠাস করে মশা মেরে যাচ্ছি। সংসদ ভবনের মতো জায়গায় এত মশা কে জানত! আজ এখানে মশাদেরও ভ্যালেন্টাইন অধিবেশন আছে কি না কে জানে?

রাকিব একটু পর পর আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। আর আমি তাকাচ্ছি আকাশের দিকে। এই দিনে কিউপিড নাকি তাঁর তীর-ধনুক নিয়ে আকাশে উড়ে বেড়ায়। কোনো প্রেমিক-প্রেমিকার হূদয় ভাঙতে দেয় না সে। বরং হাজার মাইল দূরে থাকা যোগ্য সঙ্গীর বুকে এমনভাবে তীর ছোড়ে, যাতে যেখানেই থাকুক, সে ছুটে আসে ভালোবাসার টানে। কিউপিড কী তবে আজ তীর ছুড়বে না?  

ভাবতে না ভাবতেই হঠাত্ মনে হলো, কী যেন বিঁধল বুকে। কিউপিড কী তবে...? গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। রাকিবকে বললাম, তোর কী ধারণা, একটা সামান্য মেয়ের জন্য আজকের এই অসামান্য ভ্যালেন্টাইন দিবসটাকে নষ্ট করব?

রাকিব আমার সমর্থনে দুদিকে মাথা নাড়াতে লাগল। কোনো এক রহস্যময় কারণে মোটা মানুষ দেখতে সুন্দর হয়। সে মুহূর্তে ঘামে চকচক করা রাকিবকে লাগছিল কোনো এক গ্রিকবাসী।

জামার ভেতর থেকে গোলাপের তোড়া বের করে স্কচটেপ ছিঁড়ে একটা গোলাপ রাকিবকে দিয়ে বললাম, হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস্ ডে, দোস্ত। আমার দেখাদেখি রাকিবও ওখান থেকে নিয়ে একটা গোলাপ আমাকে দিল। বাকি গোলাপগুলো ওখানেই কোনো অজানা ভ্যালেন্টাইন জুটির জন্য রেখে উঠে পড়লাম।

রাস্তার সব জুটি হাঁ করে দেখল, দুই বন্ধু কানে গোলাপ গুঁজে গলাগলি করে আসাদগেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের ভালোবাসায় কোনো কৃত্রিমতা নেই।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা