kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

প্রচারেই প্রসার

সত্যজিত্ বিশ্বাস

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




প্রচারেই প্রসার

‘আপু, আপনার হাতের বইটা নিতে পারেন। আমি পড়ে দেখেছি।’

কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকাল অবনী। বইমেলা তাঁর খুবই প্রিয় জায়গা। প্রতিবারের মতো এবারও বইমেলায় শাড়ি পরে এসেছে। কিন্তু সঙ্গে যার থাকার কথা সেই পলাশ একটু আগে ফোন করে জানাল, সে ফ্যাভিকলের আঠার মতো আটকে আছে আগারগাঁওয়ের জ্যামে। সেই আঠা কখন ছুটবে ঠিক নেই। খিঁচরে যাওয়া মেজাজ নিয়ে অবনী দাঁড়াল একটা স্টলের সামনে। একটা বই খুলে এক পৃষ্ঠা পড়ে দ্বিতীয় পৃষ্ঠা উল্টাতে যাওয়ার সময় ঘটল ঘটনাটা। একা একা বইমেলায় ঘুরতে হচ্ছে বলে এমনিই মন খারাপ। তার ওপর এই উটকো আওয়াজে প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে পাশে দাঁড়ানো বেঢপ লম্বা পাঞ্জাবি পরা লোকটার দিকে তাকাল।

—আপনি কি এই স্টলের বিক্রেতা?

—জি না। আসলে হয়েছে কী...

—আপনার আসলে কী হয়েছে, সেটা শুনে আমি কী করব?

—তা ঠিক।

—কোন বই ভালো, কোন বই খারাপ, সেটা কি আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছি?

—জি না।

—আমি যদি এই বইটা দুই পৃষ্ঠা পড়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিই বইটা নেব কি নেব না, আপনার কি কোনো সমস্যা আছে?

—না, মানে আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না, প্লিজ।

—আপনাকে তো চিনিই না, এখানে বোঝাবুঝির কী আছে? ভুল বোঝা তো অনেক পরের কথা।

—প্লিজ, আপনি আগে আমার কথাটা শুনুন। বইটা হাতে নিয়েই একটু সাইডে আসুন বুঝিয়ে বলছি।

—আশ্চর্য তো, কোথাকার কোন উটকো লোক আপনি, আমাকে বলছেন সাইডে আসতে?

—আপা প্লিজ বোঝার চেষ্টা করেন, আমার কথাটা একটু শোনেন। প্লিজ, স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে সিনক্রিয়েট না করি।

—আচ্ছা, আসলাম সাইডে। এবার বলেন, আপনার কথা শুনতে হবে কেন? সমস্যাটা কী?

—আমার কেন সমস্যা থাকবে? আমার কোনো সমস্যা নেই।

—তাই? একা কোনো মেয়ে দেখলেই আগ বাড়িয়ে কথা বলতে চাওয়া কোনো সমস্যা না?

—আপনি আমাকে যা ভাবছেন, আমি তা না।

—ওরে বাবা, এর মধ্যেই আমি আপনাকে নিয়ে কী ভাবছি, সেটা বুঝে ফেলেছেন? বুক রিডার থেকে মাইন্ড রিডার হয়ে গেছেন নাকি? গুড, ভেরি গুড। তা, এই লাইনে কত দিন ধরে?

—বিশ্বাস করুন আপু, আপনি আমাকে সেই তখন থেকেই ভুল বুঝে যাচ্ছেন।

—আচ্ছা, তাই? তা আপনি আমার পেছন পেছন ফলো করে কখন থেকে বোঝার চেষ্টা করছেন?

—তার মানে?

—তার মানেও বোঝেন না? আচ্ছা, তা-ও বুঝিয়ে দিচ্ছি। আপনি যখন দেখলেন, আমি একা একা বইয়ের স্টলে ঘুরছি, তখনই তো টার্গেট করেছেন, তাই না?

—বিশ্বাস করুন, আমি এই স্টল ছেড়ে কোথাও যাইনি। এখানেই ছিলাম।

—তাই? কেন? এ স্টলের কারো সঙ্গে খাতির আছে, তাই না?

—জি।

—ওরা আপনাকে শেল্টার দেয়, তাই না?

—জি না, মানে জি না।

—খবরদার, আপনি একেবারে নড়বেন না। নড়লেই কিন্তু চিত্কার দিয়ে লোক ডাকব। এ দেখি পুরা একটা গ্যাং। বইমেলায় স্টল নিয়ে এসব হচ্ছে? আমি পুলিশ ডাকছি। আজ সবার খবর করে ছাড়ব।

—আপু, প্লিজ আমার মানসম্মান ডোবাবেন না।

—ওরে বাবা, আবার মানসম্মানের ভয়ও আছে? আলগা ভাব নিয়ে পরিচয় জমানোর সময় এসব কথা মনে থাকে না?

—প্রমিজ করলাম, আর জীবনেও অপরিচিত কোনো মহিলার সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে যাব না।

—কী, আমি মহিলা?

—তাহলে আপনি কী? না মানে, আপনি কী বললে খুশি হন?

—চুপ, একেবারে চুপ। আমি আগে ওকে ফোন করছি। একেবারে নড়বেন না বললাম।

অবনী পলাশের সঙ্গে কথা শেষ করে ঘুরে দেখে সেই পাঞ্জাবিওয়ালা আর নেই। স্টলের সামনে এসে হাতের বইটা দেখিয়ে স্টলের দুই বিক্রেতাকে বলল, একটু আগে আমার সঙ্গে যে ছোটলোকটা কথা বলছিল, সে কই?

দুজন, দুজনের দিক হাঁ করে তাকিয়ে আছে দেখে অবনী আবার বলল, চালাকির চেষ্টা করবেন না। সেই লোকটা বলেছে আপনারা খুব ভালো করেই চেনেন তাঁকে। বলুন, সেই লম্বা পাঞ্জাবিওয়ালা কই? না হলে কিন্তু পুলিশ ডাকব।

এবার একজন মুখ খুলল, ও আপনি মিঠু ভাইয়ের কথা বলছেন? আপনার হাতের বইটা তো উনিই লিখেছেন। বইয়ের ব্যাক কাভারে দেখুন, ওনার ছবিসহ বায়োডাটা আছে।

হাতের বইটা উল্টাতে উল্টাতে শেষ পৃষ্ঠায় আসে অবনী। ছবিটা দেখে জিবায় কামড় দিয়ে এদিক-ওদিক তাকায়। তারপর মুচকি হেসে বলে, দেখুন তো, দাম কত আসে বইটার?

অবনী বইটা নিয়ে চলে যেতে যেতে একবারও স্টলের পাশের নারকেলগাছটার দিকে তাকায় না। তাকালে দেখতে পেত ওটার পেছন থেকে উঁকি দিয়ে তাকে দেখছে এক লম্বা পাঞ্জাবিওয়ালা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা