kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ছোট্ট ভুল

সত্যজিত্ বিশ্বাস

১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ছোট্ট ভুল

গিন্নি এসে মোকলেছ সাহেবের হাতে এক কাপ চা তুলে দিয়ে জানিয়ে গেল, ‘আজ তো শিউলির দেবরের গায়েহলুদ, আবার তোমার বসের ছেলের বউভাত। তাহলে কী হবে?’

মোকলেছ সাহেবকে অবশ্য এ নিয়ে চিন্তিত হতে দেখা গেল না। বড় বড় চুমুকে চায়ের ফিলিংস নিতে নিতে বললেন, ‘এটা কোনো সমস্যা হলো? তুমি যাবে তোমার বোনের দেবরের গায়েহলুদে। আর আমি যাব বসের ছেলের বউভাতে।’

কথা শুনে গিন্নি মুচকি হাসছে। তা দেখে মোকলেছ সাহেব বিরক্ত হলেন, ‘কী ব্যাপার, হাসছ কেন? আমার বন্ধুরা আমাকে মাথামোটা মোকলেছ বলে দেখে তুমিও তা-ই ভাবো? খাবই না তোমার চা।’

মোকলেছ সাহেব খেয়াল করে দেখেছেন, তার জীবনটাই এমন। ছোটবেলায় যেখানেই গিয়েছেন, বাবা না হয় মায়ের কোলে বসে। বড় দুই ভাইয়ের জন্য কোনো না কোনোভাবে সিট ম্যানেজ হয়ে গেলেও তাঁকে এর-ওর কোলে চড়েই যেতে হয়েছে। ঈদ ছাড়া কখনো নতুন জামা পরেছেন বলে মনে হয় না। বড় দুই ভাইয়ের জামা, প্যান্ট পৈতৃক সূত্রে তাঁর শরীরে চেপেছে। ভাবটা এমন, বড়টা কিংবা মেজোটার জন্য কিনলেই তো ও পরতে পারবে। ওর জন্য নতুন কেনার দরকার কী? ছোটবেলায় বাসার যেকোনো অপমানজনক কাজের দায়িত্ব, যেমন ময়লা ডাস্টবিনে ফেলা, দোকান থেকে চিনি, দুধ কিংবা মসলা কিনে আনা, এমনকি কোনো আত্মীয় এলে তাঁর ব্যাগ টেনে গেট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াও চেন অর্ডারে তার ওপর চেপেছে। হয়তো কোনো কাজের দায়িত্ব বাবা দিয়েছেন বড় ভাইকে, বড় ভাই মেজো ভাইকে, আর মেজো ভাই তাঁকে। প্রতিবাদ জানাতে গেলেই শুনেছে বিখ্যাত মনীষীর প্রখ্যাত বাণী—‘বড়দের কথা শুনতে হয়।’

স্কুল-কলেজের বন্ধুরাও কী করে জানি এটা টের পেয়ে কোনো খেলার টুর্নামেন্ট হলে পোস্টার লাগানোর দায়িত্বে অথবা খেলার মধ্যাহ্ন বিরতির সময় পানি টানার দায়িত্বে আর কোনো বিকল্প খুঁজত না। এটুকু হলেও হতো, এসব কাজে যে মোকলেছ পূর্ণ দায়িত্ব পেত, তা না। হেলপারের দায়িত্ব। সেটা আবার সবার সামনে ফলাও করে বলা হতো, ‘এই কই যাচ্ছিস? মাথা মোটা মোকলেছকে নিয়ে যা।’    

জীবনের অর্ধেক সময়ে এসে ভেবেছিলেন, এবার বিয়ে করার পর বুঝি বউ তাঁকে মূল্যায়ন করবে। কিসের কী? এই যে একটু আগে ঘটে যাওয়া সামান্য একটা ঘটনার কথাই ধরা যাক। গিন্নির এই মুচকি হাসির মানে কী? ওর কী ধারণা, এই বউভাতের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে কোনো ঘটনা না ঘটিয়ে সুস্থ, সুন্দরমতো আসতে পারব না?

বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন এসব ভাবছিলেন, ঠিক তখন আরেক কাপ চা হাতে পাশে দাঁড়াল গিন্নি। কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি না হয় গায়েহলুদে না যাই।’

আবার মাথায় আগুন ধরে গেল মোকলেছ সাহেবের।

—আমার বসের ছেলের বউভাত অনুষ্ঠানে আমি যাব। তুমি যাবে গায়েহলুদে—এটাই ফাইনাল।

—কিন্তু তুমি তো কখনো একা যাওনি কোনো অনুষ্ঠানে।

—আগে কখনো একসঙ্গে দুটি অনুষ্ঠান পড়েনি, তাই যাইনি। 

—পারবে?

—এটা কী বললে? পারব মানে কী? আমি কী বিয়ে করতে যাচ্ছি?

—খেপে যাচ্ছ কেন, বুঝলাম না। তোমাকে নিয়ে ভয় হয় বলেই তো বলি।

—আজ সেটা প্রমাণ করে ছাড়ব। আমি একাই যাব।

অনেক দামাদামি করে বড় একটা রাইচ কুকার র্যাপিংপেপারে মুড়ে মোকলেছ সাহেব রওনা দিলেন কমিউনিটি সেন্টারের উদ্দেশে। ঢাকা শহরে এই একটা সমস্যা। কমিউনিটি সেন্টারের অভাব নেই। রিকশাওয়ালাকে ঠিকানা বলতেই বলে, কোন কমিউনিটি সেন্টার? হেইখানে তো তিনটা কমিউনিটি সেন্টার আছে।

মোকলেছ সাহেব এখন আর আগের মোকলেছ নেই। মুচকি হেসে পকেট থেকে ইনভাইটেশন কার্ড বের করে ভালোভাবে আরেকবার দেখে কমিউনিটি সেন্টারের নাম বললেন। 

তিনতলা কমিউনিটি সেন্টার দেখে মোকলেছ সাহেব হাঁ হয়ে গেলেন। দিন দিন কতই না উন্নতি হচ্ছে। নিচেই অফিস কলিগ কয়েকজনের সঙ্গেই দেখা হয়ে গেল। সবার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভেতরে রওনা দিলেন মোকলেছ সাহেব। দোতলায় উঠতেই সামনে রিসিপশন। ওখানে গিফট জমা দিয়েই চলে এলেন না। এখন আর এতটা বোকা নন তিনি। ধীরে-সুস্থে নিজের নাম লিখিয়ে নিয়ে মুচকি হেসে ভেতরে ঢুকলেন। হায় রে মানুষ, অথচ সবাই ভাবেন, তিনি নাকি মাথামোটা?   

ভেতরে ঢুকেই মাথা নষ্ট অবস্থা। শুধু মানুষ আর মানুষ। এমন অবস্থায় সাধারণত যা হয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবারে শর্ট পড়ে যায়। মোকলেছ সাহেব বুদ্ধি করে একটা খালি চেয়ার পেয়েই আর দেরি না করে খেতে বসে পড়লেন। খেতে খেতে ভাবলেন, আজ বাসায় ফিরে গিন্নিকে বলা যাবে, মনে আছে একবার তোমাকে নিয়ে এক বিয়েতে গিয়ে খাবার না খেয়েই ফিরে এসেছিলাম? আজ একা গিয়েও সে ভুলটা হয়নি।

তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া শেষ করে স্টেজের সামনে গিয়ে দেখলেন, বউ বসা। তার পাশে বসে আমন্ত্রিত অতিথিরা ছবি তুলেই যাচ্ছেন। এবারও দুর্দান্ত বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে সবার সামনে গিয়ে, ‘ভালো আছ মা, জামাই বাবাজি কই?’ বলে চট করে পাশে বসে একটা  সেলফিও তুলে ফেললেন। 

তারপর খুঁজতে বের হলেন জামাইকে। জামাইয়ের সঙ্গে আর বসের সঙ্গে একটা সেলফি তুললেই মিশন কমপ্লিট। হাঁটতে হাঁটতে পুরো ফ্লোর খুঁজেও কাউকে নজরে পড়ল না দেখে একটু বিরক্তই লাগল। এ কেমন কথা? রিসিপশনে বাবা, ছেলে কেউ থাকবে না? তা ছাড়া অফিস কলিগ কাউকেই কি চোখে পড়বে না?

নিচে নেমে কমিউনিটি সেন্টারের সামনেই দেখা মিলল দুজন কলিগ—রাকিব সাহেব আর মোক্তার সাহেবের সঙ্গে। মোকলেছ সাহেবকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, চলে যাচ্ছেন যে? আমরা সব অফিস স্টাফ মিলে ছবি তুলব না? মোকলেছ সাহেব মুখ ভার করে বললেন, সব পাবেন কই? কেউই তো আসেনি।

‘আসবে না, কেন? আমরা তো এইমাত্রই খাবার খেয়ে নিচে নামলাম পান খেতে। সবাই তো তিনতলায়ই।’

মোক্তার সাহেবের কথা শুনে মোকলেছ সাহেব হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকলেন তাঁর মুখের দিকে। তারপর নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবার জিজ্ঞেস করলেন, কয়তলায়?  

রাকিব সাহেব সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললেন, কেন? এখানে দুটি বউভাতের অনুষ্ঠান হচ্ছে, খেয়াল করেননি? একটা দোতলায়, আরেকটা তিনতলায়। ঢোকার গেটে কাগজে তো বড় বড় করে লেখাও আছে। দেখেননি?

মোকলেছ সাহেব আর একটা কথাও না বলে সোজা হাঁটা দিলেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা