kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুপথে চলা শপথ

বিনয় দত্ত

১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুপথে চলা শপথ

কয়েক দিন ধরে আবুল খালেদ খুব গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছে শপথটা এইবার নিয়েই ফেলবেন। সমস্যা হয়েছে অন্য জায়গায়। শপথ নেওয়া নিয়ে খালেদ সাহেবের মধ্যে নানা ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শপথে কী বলবেন, কিভাবে বলবেন, কী পড়বেন, চশমা পরবেন কি পরবেন না, কোন রঙের পাঞ্জাবি পরবেন ইত্যাদি প্রশ্ন দানা বাঁধতে বাঁধতে পাহাড় সমান হয়ে গিয়েছে। এই পাহাড় সমান প্রশ্নগুলোকে সরিয়ে খালেদ সাহেব এবার মনস্থির করলেন, শপথ নেবেনই। শপথ নিলেই নতুন দায়িত্ব। আর নতুন দায়িত্ব মানেই নতুন কাজের চাপ। এসব কিছু ভেবে ভেবে খালেদ সাহেবের অস্থিরতা বাড়ছিল।

বাথরুমে বসে খালেদ সাহেব ভাবছেন—এই শপথ নিলে কী হবে, কী করবেন, কোন কাজটা আগে শুরু করবেন ইত্যাদি। ভাবনাগুলো যখন খালেদ সাহেবকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছিল, সেই সময় বাথরুমের দরজায় টোকা পড়ল। কিছুটা বিরক্তি, কিছুটা চাপা ক্ষোভ নিয়ে তিনি বাথরুম থেকেই ‘হুম’ শব্দ করলেন। এই ‘হুম’ শব্দ থেকে কেউ কিছু বুঝতে পেরেছে কি না তা বোঝা না গেলেও খালেদ সাহেব নিজেও যে কিছু বুঝতে পারেননি তা স্পষ্ট।

বাথরুমের দরজার বাইরে কুলসুমের মৃদু গলার শব্দ শোনা গেল। কুলসুম কিছুটা ভীত গলায় বলল, ‘কালকে বলেছিলে আজকে ছেলেকে নিয়ে স্কুলে যাবে, ছেলে তো রেডি হয়ে বসে আছে।’

কথাটা শেষ করার আগেই খালেদ সাহেব পরিষ্কার বিরক্তিধরা গলায় বললেন, ‘আমি পারব না। তুমি নিয়ে যাও।’

এ কথার পরে কুলসুম কিছু বলবে কি না ভাবছে। ভাবনা চলার সঙ্গে সঙ্গে ছেলের দিকে একবার তাকাল। খালেদ সাহেবের কথা শুনে ছেলেও অভিমান করেছে। ছেলেকে শান্ত করার জন্য কুলসুম গালে আলতো করে হাত রাখল।

কুলসুম আরেকবার দরজায় হাত রাখবে কি রাখবে না, এটা ভাবতে ভাবতে ছেলে সোজা রুম থেকে বেরিয়ে গেল। কুলসুম নিজের সাহস সঞ্চয় করে আরেকবার বাথরুমের দরজায় টোকা দিয়ে বলল, ছেলে তো রাগ করেছে।

কথা শেষ করতেই খালেদ সাহেব তীব্র গর্জনে ফেটে পড়লেন। কুলসুমের উদ্দেশে কঠোর বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘আরে বললাম তো, তুমি নিয়ে যাও। না গেলে থাক। স্কুলে যাওয়ারই দরকার নাই আজকে।’

এই কথা শুনে কুলসুমের মনে পড়ল, আজকে ছেলের ম্যাথ ক্লাস টেস্ট। আজকে না গেলে ভয়ানক বিপত্তি ঘটে যাবে। যেভাবেই হোক, আজকে ছেলেকে নিয়ে ক্লাসে যেতেই হবে।

খালেদ সাহেবের দ্বিতীয় ঘরের স্ত্রী কুলসুম। বয়সের দূরত্বও বেশি। সুন্দরী দেখে খালেদ সাহেব নিজে পছন্দ করে কুলসুমকে বিয়ে করেছেন; কিন্তু কুলসুম কখনো খালেদ সাহবের ওপর কিছু বলতে পারেনি। বিয়ের আগেই অনেক কিছু বলেছিল; কিন্তু বিয়ের পর সেই কথা কখন যে উড়ে গেছে, তা খালেদ সাহেবের নিজেরই মনে নেই।

কুলসুম যথারীতি এইবারও কিছু বলল না। শুধু নিজের মনে কিছু একটা ভাবল। বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে ছেলেকে নিয়ে বের হতে রওনা দিল।

বাথরুমে বসে খালেদ সাহেব তখনো ভাবছেন, শপথ নিলে কী করবেন, কিভাবে করবেন, কেন করবেন—এই অঙ্কগুলো সমাধানের আগেই তাঁর মুঠোফোনটা বেজে উঠল। অসমাপ্ত অঙ্ক রেখেই খালেদ সাহেব ফোনে স্যার স্যার করে বাথরুম থেকে বেরিয়ে পড়লেন।

দ্রুত পোশাক পরে পাঁচ মিনিটের মধ্যে গাড়িতে চড়ে রওনা দিলেন আবুল খালেদ। আজ তাঁর শপথ নেওয়ার দিন। এই দিন তিনি জাতিকে মুক্ত করবেন নিজের বাক্যবাণে। নিজের অঙ্গীকারনামা নিজেই ঠিক করবেন। ঠিক করবেন নিজের কী করণীয়, কী করণীয় নয়। এই মহান দিনে তিনি শুভ্র পোশাক পরে নিজের মোচটাকে আঁচড়ে অল্প সময়ের মধ্যে অফিসে পৌঁছলেন।

আবুল খালেদ মহোদয় নিজের ঠিক করা শপথবাক্য পাঠ করলেন। সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে নিজের শপথবাক্য পাঠ করে তিনি পুরো অডিটরিয়াম উত্তপ্ত করে তুললেন। তাঁর প্রতিটি কথার পরপরই হাততালিতে ফেটে পড়ছে সবাই। উচ্ছ্বসিত সদস্যদের মনে আশা জাগিয়ে আবুল খালেদ মঞ্চ থেকে নেমে আসলেন। হাস্যোজ্জ্বল মুখে সবাইকে স্বস্তি জাগালেন। সব সদস্য আবুল খালেদকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানালেন।

শপথবাক্য পাঠ করে আবুল খালেদ নতুন সভাপতির দায়িত্ব নিলেন। আর বাকি সদস্যরা আবুল খালেদের ওপর আস্থা রাখলেন। সেই আস্থা পূরণ হবে কি না কেউই জানে না।

মেসেজ : যে লোক নিজের ঘরে কখনো কথা রাখেনি, সেই লোক কিভাবে জাতিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখবে?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা