kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মজিদ ভাইয়ের বিয়ে

রুহুল আমিন ভুইয়া

২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মজিদ ভাইয়ের বিয়ে

মজিদ ভাইয়ের মনে বড় দুঃখ। সেই দুঃখে সারাক্ষণ মুখটা কালো করে রাখলেও, বাইরে থেকে সেটি  বোঝার উপায় নেই। কারণ মজিদ ভাইয়ের গায়ের রং কুচকুচে কালো। তাঁর দুঃখ হলো, ‘গায়ের রং ঠিক আছে; কিন্তু আমি বিদেশে জন্মালে কি কোনো সমস্যা ছিল? কে না জানে, বিদেশে কালোদের কত খাতির! সাদা চামড়ার অপরূপ ক্লাসিক মেয়েরা তাদের পাশে চিমশা চেহারার কালো ছেলেদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।’ শনির আখড়ার বদলে তিনি যদি প্যারিসের কোনো আখড়ায় জন্মাতেন, তাহলে তাঁর ভাগ্য অন্য রকম হতো। মজিদ ভাই অবশ্য এই ব্যারিয়ার ভাঙার চেষ্টা করেছেন। বিদেশের মাটিতে তাঁর দর্পিত কৃষ্ণকায় পাখানা রাখার অদম্য ইচ্ছায় দেশের মাটি বেচে দিয়েছেন। মানে শনির আখড়ার তিন কাঠা জমি বেচে পয়সা দিয়েছেন আদম ব্যাপারীকে। পরিণতিতে সেই আদম ব্যাপারী লাখপতি হয়ে গেছে, মজিদ ভাই হয়েছেন ভিটাছাড়া।

এভাবে বেশ কিছুদিন ঝিম মেরে থাকার পর একদিন জেগে উঠলেন তিনি। ভাবলেন, চেহারাটা নতুন উদ্যোগে খোলতাই করা যাক। রং ফরসাকারী ক্রিম গালে মাখলেন। দেখে বন্ধুরা বলেছে, ‘মুখের মধ্যে এ রকম পাতলা চুনকাম করেছিস কেন রে?’

মুখটা ঝকঝকে দেখানোর জন্য বিদেশি সুগন্ধভরা ক্রিম মেখেছেন। বন্ধুরা দেখে বলেছে, ‘কী রে, মুখটাকে তো একেবারে পলিশ করা লেদারের জুতো বানিয়ে এনেছিস!’

বন্ধুরাই যদি এ রকম কথা বলে, তাহলে শহরের সুন্দরী মেয়েরা কী বলবে? মজিদ ভাইয়ের দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি আর দশটা মানুষের থেকে আলাদা। সবাই তাদের বুকের মধ্যে হার্টের পাশাপাশি ফুসফুস, কলজে-মলজে অনেক কিছু নিয়ে জন্মায়, কিন্তু তাঁর বুকটাজুড়ে শুধুই একটা রেকর্ড মাপের হার্ট। যে হার্টের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, অন্দরে-বন্দরে তন্বী তরুণীদের জন্য বন্যার পানির মতো এক হাঁটু ভালোবাসা থইথই করছে। কিন্তু হায়, সেই হাঁটুপানিতে কোনো লাস্যময়ী জলকেলি বা নিদেনপক্ষে একটু ঝাঁপাঝাঁপিও করতে এলো না!

মজিদ ভাইয়ের আম্মা দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিয়ের চেষ্টা করে আসছেন, কিন্তু আজন্ম প্রেমিক মজিদ ভাইয়ের মতে, সম্বন্ধ করে বিয়ে করা মানে ম্যাচ ফিক্সিং করে জয় পাওয়ার মতো ব্যাপার। আর নানা ধরনের পক্ষ-বিপক্ষ মতের সামনে দাঁড়িয়ে প্রেম করে বিয়ে করা মানে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে আনা। কিন্তু দীর্ঘদিন নানা জায়গায় চেষ্টা করেও মজিদ ভাই যখন মেয়েদের মসকরা-অবহেলায় পর্যুদস্ত, তখন সব চিন্তা বাদ দিয়ে তিনি ম্যাচ ফিক্সিং তত্ত্বের দিকেই এগোলেন। পদ্মা নদীর মতো লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাকে বললেন, ‘ঠিক আছে, পাত্রী দেখো...আমাকে কিছু দেখানোর নেই। তোমাদের পছন্দই আমার পছন্দ!’

পরাজিত সম্রাটের মতো হাঁটতে হাঁটতে মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। ছাদে এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হে রাতের আকাশ, তুমি কালো তবু কতই না রূপবান। তোমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কত অষ্টাদশীর নির্ঘুম রাত কেটে যায়, অথচ...’

এ রকম যখন ভাবছেন, ঠিক তখনই মাথায় টুপ করে একফোঁটা পানি পড়ল! মজিদ ভাইয়ের দুঃখে আজ আকাশের চোখেও পানি! ভাবতেই তাঁর চোখে পানি চলে এলো। ঠিক তখনই হুড়মুড়িয়ে প্রায় আধা বালতি পানি গায়ে এসে পড়ল! মজিদ ভাই লাফিয়ে উঠে দেখেন, পাশের আন্ডার কনস্ট্রাকশন বাড়ির ছাদ থেকে দুজন মজুর অনুসন্ধিত্সু দৃষ্টিতে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।

বয়স্ক একজন মজুর বলল, এত রাইতে কোন শালা রে? নিশ্চয়ই চোর?

কোনো শব্দ না করে মজিদ ভাই নিচে নেমে এলেন। এর কদিন বাদেই তাঁর বিয়ে হয়ে গেল। পাত্রী তিনি দেখেননি, দেখতেও চাননি! বাসর রাতে সবাই তাঁকে হিন্দি সিনেমার কায়দায় ধাক্কা দিয়ে অন্ধকার ঘরে ঢুকিয়ে দিল! বউ নির্ঘাত বিছানায় বসে আছে, মজিদ ভাই কিছুটা কৌতূহল, কিছুটা টেনশন নিয়ে এগিয়ে গেলেন! কিন্তু বিছানায় যে কেউ নেই! মজিদ ভাই চোখ বড় বড় করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দেখে রিনরিনে গলায় এক নারীকণ্ঠ বলে উঠল, ‘উহ ন্যাকা! অন্ধকারে বউ খুঁজে পায় না! আমি তোমার থেকে বেশি কালো না, বুঝেছ?’

মজিদ ভাই হাঁ করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘সোনিয়া!’

বউ মিটমিট করে হেসে বলল, ‘চিনতে পেরেছ তাহলে?’

চিনতে না পারার কোনোই কারণ নেই। মজিদ ভাইয়ের ফুফাতো ভাইয়ের বড় শালার চাচাতো শালির ননদ। তাঁর মতোই ঘোরতর কৃষ্ণকায়। প্রথম দেখার পর থেকেই আঠার মতো মজিদ ভাইয়ের পেছনে লেগে ছিল। সারা জীবন ফরাসি মেয়েদের স্বপ্ন দেখে এসেছেন, তাই জীবনের একমাত্র প্রত্যাখ্যানটি তিনি সোনিয়াকেই করতে বাধ্য হয়েছিলেন!

সোনিয়া আপা চাপা গলায় বললেন, ‘খুব ফরসা মেয়ে খুঁজে বেড়ালে এত দিন, তাই না? পেলে না তো, আমি অভিশাপ দিয়েছিলাম কি না!’

মজিদ ভাই চমকে উঠে বললেন, ‘অভিশাপ!’

‘হ্যাঁ, এ কারণেই পাওনি! অভিশাপ না থাকলে পেয়ে যেতে, গায়ের রংটা কালো তো কী? তুমি মানুষটা তো অনেক সুন্দর! যথেষ্ট লম্বা, গলার ভয়েস ভারি মিষ্টি।’

মজিদ ভাই নড়েচড়ে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখটা আপনা থেকেই কেমন যেন হাসি হাসি হয়ে উঠল। মনের ভেতর একটা ফুরফুরে ভাব। কী যেন একটা রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে চলেছে ভেতরে। মনে মনে ভাবলেন, জাতের মেয়ে কালোই ভালো। আই লাবিউ, সোনিয়া।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা