kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৯ নভেম্বর ২০২২ । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বিশেষ লেখা

আত্মজৈবনিক সাহসী রচনা তাঁর শক্তি

মাসুদুজ্জামান

৭ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আত্মজৈবনিক সাহসী রচনা তাঁর শক্তি

এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন ফরাসি নারী লেখক আনি এরনো। এরনোর জীবনটা উপন্যাসের মতো, কিন্তু তিনি উপন্যাস রচনা করেননি। পুরস্কারটি তিনি পেলেন আত্মজৈবনিক রচনার জন্য। এই পুরস্কারের মধ্য দিয়ে নোবেল পুরস্কার কমিটি আবারও এমন একজনকে পুরস্কার দিল, যিনি ফ্রান্সের বাইরে সেভাবে পরিচিত নন।

বিজ্ঞাপন

ভাষা বা শৈলীর দিক থেকেও যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, তা-ও নয়। নোবেল পুরস্কার কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি পুরস্কার পেয়েছেন ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণার সূত্রে শিকড়সন্ধানী আত্মজৈবনিক সাহসী লেখালেখির জন্য। উপস্থিত একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছিলেন পুরস্কারের ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের এত প্রাধান্য কেন, কেন ইউরোপের বাইরের লেখকদের সেভাবে বিবেচনায় আনা হয় না? জবাবে পুরস্কার কমিটির ভাষ্য, সবাইকে সন্তুষ্ট করা যাবে না। গত বছর আফ্রিকার একজনকে (গুরনাহ) পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, এ বছর একজন নারীকে। কিন্তু এশীয় লেখকদের সম্পর্কে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেননি পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান অ্যান্ডার্স অলসন। সালমান রুশদি পুরস্কারটি পেতে পারেন—এ রকম সম্ভাবনার মধ্যেই প্রশ্নটি করা হয় বলে ধরে নিতে পারি। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেও দেখা যাবে, পুরস্কারপ্রাপ্তিতে এশিয়া-আফ্রিকার লেখকরা অনেক পিছিয়ে আছেন।

১৯৪০ সালে ফ্রান্সের নরমান্ডিতে এক শ্রমজীবী পরিবারে এরনোর জন্ম। মা-বাবার ছিল একটা ক্যাফে আর মুদির দোকান। জীবনের শুরুতে চেয়েছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে। পরে রুয়েঁ বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন লেখালেখিতে। তাঁর রচনার প্রায় সবই আত্মজৈবনিক আখ্যানমূলক।

লৈঙ্গিক পার্থক্য, নারীর দুঃসহ অবস্থা, ভাষা ও শ্রেণিবিভক্তি তাঁর লেখার মূল বিষয়বস্তু।  

এরনোর প্রথম প্রকাশিত বই ‘ক্লিন্ড আউট’ (১৯৭৪)। অবৈধ গর্ভপাত ও শ্রমজীবী থেকে মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার আত্মজৈবনিক গল্প। তবে তিনি সাহিত্যের ক্ষেত্রে সুনাম ও পুরস্কার দুই-ই অর্জন করেন ১৯৮৩ সালে বাবার জীবন নিয়ে লেখা ‘আ ম্যানস্ প্লেস’ গ্রন্থের সূত্রে। ২০১৭ সালে আত্মস্মৃতি ‘দ্য ইয়ার্স’ ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে প্রকাশ পেলে ফ্রান্সের বাইরে তিনি পরিচিতি অর্জন করেন। এটি ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কারের শর্ট লিস্টে ছিল। এই বইটি ফ্রান্সেও বেস্টসেলার হয়। স্মৃতি, স্বপ্ন ও বাস্তব ঘটনার মিশেলে বইটি রচিত।

এরনোর বইগুলোর বিষয়-আশয়ই মূলত এ রকম। ব্যক্তিজীবনের ইতিবৃত্ত। ‘গেটিং লস্ট’ (২০১৮) নামের যে বইটি তিনি লিখেছেন সেটি ব্যক্তিগত প্রেম ও সম্পর্কের কাহিনি। ঘটনার সূত্রপাত ১৯৮৮ সালে। ওই বছর তিনি সোভিয়েত রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। শেষ দিন লেনিনগ্রাদে তাঁর পরিচয় হয় এক বিবাহিত তরুণ রুশ কূটনীতিকের সঙ্গে, যিনি প্যারিসে রুশ দূতাবাসে কাজ করছিলেন। সেই তরুণের সঙ্গে তাঁর তুমুল প্রেমই ওই বইটি লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। এরনোর লেখার বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি কখনো নিজের যৌন সম্পর্কের কথা বলতে দ্বিধা করেননি। এ নিয়ে তাঁর কোনো রাখঢাক নেই। এ জন্যই বলা হয়, তিনি এমন একজন লেখক, যিনি আপস করেন না, কোনো সংস্কার নেই তাঁর। জীবনের সব কিছুই তিনি স্পষ্টভাবে দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেন। সু্ইডিশ কমিটিও এর স্বীকৃতি দিয়েছে এই বলে যে তিনি লেখাকে মুক্তির মাধ্যম বলে মনে করেন। এটাই তাঁর অবদান। আলঝেইমারে আক্রান্ত মায়ের গল্প স্থান করে নিয়েছে তাঁর ‘আই রিমেইন ডার্কনেস’ বইটিতে। এতে মায়ের জীবনের হতাশা, আতঙ্ক ও বিপর্যয়কে তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সাধারণ অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল সহজ ঘটনার সরাসরি বর্ণনা দেন তিনি। তাঁর লেখা বুঝতে সমস্যা হয় না পাঠকের। তাঁর ‘দি হ্যাপেনিং’ বইয়ের চলচ্চিত্রায়ণ হয়েছে, পরিচালক অড্রে দিয়ান। চলচ্চিত্রটি ২০২১ সালে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার জিতে নেয়। এরনোর রচনা, বলা যায় পশ্চিমা ধনতান্ত্রিক সমাজের রুগ্ণ, অবক্ষয়িত সমাজের নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

গত বছর পশ্চিমের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বলা হচ্ছিল যে তিনি নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন। এ বছরও এ রকম একটি প্রচারণা ছিল। সমালোচকদের মতে, তাঁর নিজস্ব জীবনবীক্ষণ আছে। তাঁর বই পড়ার মাধ্যমে নতুন পাঠক তৈরি হবে। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, তাঁকে কি রাজনৈতিক কারণে পুরস্কার দেওয়া হলো? জবাবে সুইডিশ একাডেমির প্রতিনিধি এলেন মাতসেন বলেন, ‘আমরা সাহিত্যে মনোনিবেশ করি, আর দেখি সাহিত্যগুণ কতটা আছে। এখানে কিভাবে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়, সেটা বলি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একদল সদস্য, সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক, পূর্বতন নোবেল লরিয়েট আর সুইডিশ জাতীয় সাহিত্য সংগঠনের সদস্যরা বিভিন্ন লেখকের নাম প্রস্তাব করেন। পরে একটি ছোট কমিটি পাঁচজনের নাম চূড়ান্ত করে আর সুইডিশ একাডেমি তাঁদের ভেতর থেকে একজনকে পুরস্কার দেয়। কিন্তু কে কার নাম প্রস্তাব করলেন ৫০ বছরের আগে সেটা প্রকাশ করা হবে না। এ বছরের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানটি হবে আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে।



সাতদিনের সেরা