kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৯ নভেম্বর ২০২২ । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

বিশ্বব্যাপী আশঙ্কা, আগামী বছর হবে মহাসংকটের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিশ্বব্যাপী আশঙ্কা, আগামী বছর হবে মহাসংকটের

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। ছবি : পিএমও

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী বছর হবে দুর্যোগময় ও মহাসংকটের, এমন আশঙ্কা বিশ্বজুড়েই। তিনি এই দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক—আওয়ামী লীগ এটাই চায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিরোধী দল শক্তিশালী হলে অনেক কিছুই হতো।

বিজ্ঞাপন

গতকাল বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এই আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সাম্প্রতিক যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিষয়ে তথ্য তুলে ধরেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রধানমন্ত্রী দেশের রাজনীতি, আওয়ামী লীগের কাউন্সিল, র‌্যাবের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাসহ নানা প্রসঙ্গ সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন।

এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব নেতৃত্ব, যাঁদের সঙ্গেই দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, তাঁরা সবাই আশঙ্কা করে বলছেন, ২০২৩ সালে বিশ্বের জন্য একটি অত্যন্ত দুর্যোগময় সময় এগিয়ে আসছে। এমনকি বিশ্বে দুর্ভিক্ষও দেখা দিতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা জানেন আমাদের দেশ এমনিতেই দুর্যোগপ্রবণ। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে মানুষের সৃষ্ট দুর্যোগ। এসব দুর্যোগ আমাদের মোকাবেলা করতে হয়। এসব মোকাবেলা করেও তিন মেয়াদে আমরা দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছি। ’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি সবাইকে আহ্বান জানিয়েছি, যার যে জমি আছে সবাই যেন সেখানে কিছু না কিছু উৎপাদন করে। বিশ্বব্যাপী একটি আশঙ্কা আছে, আগামী বছর একটি মহাসংকটের বছর হবে, তাই আমাদের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। বিদ্যুৎ, পানি, খাদ্য ব্যবহারে যেন সবাই সচেতন হই। ’

দেশের অর্থনীতির জন্য সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যেকোনো ক্ষেত্রে দেশের ঝুঁকি নেই, এটুকু আমি কথা দিতে পারি। খাদ্য নিরাপত্তায় আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। বাজেটের বাইরেও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য টাকা আলাদা করে রাখলাম। যা যা করণীয় আমরা করছি। ’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাঁচ মাসের খাদ্য কেনার মতো রিজার্ভ আমাদের আছে। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ কখনো ঋণখেলাপি হয়নি। আর যখন আমরা ঋণ পরিশোধ করি তখন রিজার্ভ কিছুটা কমে যায়। এর পরও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা যেন থাকে তার জন্য যা যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার আমরা তা নিচ্ছি। ’

বিদায় নেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত

রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের একটি কাউন্সিলরও যদি বলে আমাকে চায় না, আমি কোনো দিনও থাকব না। যেদিন আমার অবর্তমানে আমাকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট করেছিল তখন থেকেই এই সত্যটা মেনে যাচ্ছি। এটা ঠিক দীর্ঘদিন হয়ে যাচ্ছে। আমি চাই, নতুন নেতৃত্ব আসুক। নেতৃত্ব কাউন্সিলররা নির্বাচিত করেন। তাঁদের সিদ্ধান্তটাই চূড়ান্ত। আর আমার তো আসলে সময় হয়ে গেছে। ’

বিরোধী দল শক্তিশালী হলে অনেক কিছুই হতো

এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশ আমাদের। সেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। অধিকারের আন্দোলন-সংগ্রাম, হুমকি-ধমকি অনেক কিছুই পাওয়া যাচ্ছে। সেটা তো বিরোধী দলের কাজ। তা না করলে কিসের বিরোধী দল। বিরোধী দল যদি শক্তিশালী হতো তাহলে তো অনেক কিছুই হতো। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের কিছু কিছু পত্রিকা আছে, সব সময় নেতিবাচক চিন্তা। এ রকম মানুষও আছে। তবে সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। জনগণের যেন কষ্ট না হয় আমি সেদিকে দৃষ্টি দিই। এক বিলিয়ন রিজার্ভ, ৪৪ মিলিয়ন খাদ্য ঘাটতি নিয়ে ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করেছিলাম। তবে আমরা যখনই আসি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই। অর্থনীতি এখন যথেষ্ট শক্তিশালী—এটা আমি নিশ্চিত করতে পারি। ’

বাংলাদেশের সন্ত্রাস দমনের ফলে কি যুক্তরাষ্ট্র নাখোশ?

র‌্যাবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘নিষেধাজ্ঞা তারা কতটুকু তুলবে জানি না, তবে যাদের দিয়ে এ দেশের সন্ত্রাস দমন হয়েছে, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার অর্থ কী? সন্ত্রাসীদের মদদ দেওয়া? এটাই প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। তাহলে কি তারা সন্ত্রাস দমনে নাখোশ? (আফগানিস্তানে) তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধ করে সেই তালেবানকেই ক্ষমতা দিয়ে চলে এলো যুক্তরাষ্ট্র। তাহলে তাদের ব্যর্থতার কথা বলে না কেন?’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন সময় নানা রকম ঘটনা ঘটায়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশেরই কিছু লোক স্থানীয়ভাবে সেখানে থাকে। তারা সেখানের সিনেটরদের কাছে বানোয়াট ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকে। এসব তথ্য দিয়ে একটা পরিবেশ সৃষ্টি করে। যারা এসব করে তারা কিন্তু এক একটি অপকর্ম করেই দেশছাড়া। র‌্যাবের ওপর তারা যখন নিষেধাজ্ঞা দিল, আমার প্রশ্ন হচ্ছে, র‌্যাব সৃষ্টি করেছে কে? এটি তো যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শে হয়েছে। তারাই তো র‌্যাব সৃষ্টি করতে পরামর্শ দিয়েছে। র‌্যাবের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, হেলিকপ্টার, আইটি সিস্টেম—সবই যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া। যখন নিষেধাজ্ঞা দেয়, অভিযোগ জানায়, তখন তো বলা লাগে যেমন ট্রেনিং দিয়েছে, তেমনই কাজ করছে। এখানে আমাদের করার কী আছে? ট্রেনিং যদি ভালো হতো তাহলে তো একটু কথা ছিল! দ্বিতীয় কথা, আমাদের দেশের আইন-শৃঙ্খলা সংস্থা র‌্যাব, পুলিশ যেই হোক, তারা যদি কোনো অপরাধ করে তার কিন্তু বিচার হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ইচ্ছামতো গুলি করে মারলেও বিচার হয় না। ’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গুম খুন নিয়ে কথা বলে। গুমের হিসাব নিয়ে দেখা গেল সবচেয়ে বেশি গুম জিয়াউর রহমানের আমলে। তার পর থেকেই তো চলছে। আমরা যখন তালিকা চাইলাম ৭৬ জনের নাম পাওয়া গেল। এর মধ্যে এমনও আছে, আরেকজনকে শায়েস্তা করতে মাকে লুকিয়ে রেখেছে। কেউ বোনকে লুকিয়ে রেখেছে। ...তালিকায় এমনও নাম আছে, ভারতে পলাতক। এটা কেমন করে হয়? এমনও হয়েছে যে তালিকায় নাম আছে; কিন্তু লুকিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রে। সেই বিষয়গুলো আমরা তাদের সামনে তুলে ধরেছি। ’

আমরা চাই, সব দল নির্বাচনে আসুক

নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে চায়ের আমন্ত্রণ জানাবেন কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনার সময়ে আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ একটু কমই দেখা যাচ্ছে। করোনা হচ্ছে। সাংবাদিকদের ঢুকতে দিত না। তার পরও আমি আমার অফিসে একটু জোর করেই... কত দিন আর দূরে থাকা যায়। সেই জন্য। তবে করোনার কারণে এবার একটু চিন্তা করতে হবে। অনেকে আসতেও পারবে না। নির্বাচন হলে রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত কে আসবে কে আসবে না। সেখানে আমরা তো আর চাপিয়ে দিতে পারি না। রাজনীতি করতে হলে দলগুলো নিজে সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা চাই, সব দল অংশগ্রহণ করুক। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ দেশে নির্বাচনের যতটুকু উন্নতি, যতটুকু সংস্কার, এটা কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং মহাজোট করে সবাইকে নিয়েই করে দিয়েছি। এরপর যদি কেউ না আসে সেখানে আমাদের কী করণীয়। হারার ভয়ে আসব না। আর একেবারে সবাইকে লোকমা তুলে খাইয়ে দিতে হবে। জিতিয়ে দিতে হবে তবে আসব, এটা তো আর হয় না। মিলিটারি ডিকটেটররা ওভাবেই করেছে। যাদের ওটাই অভ্যাস তারা তো জনগণের কাছে যেতে ভয় পায়। জনগণের সামনে ভোট চাইতে ভয় পায়, এটাই বাস্তবতা। ’

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘ডিসেম্বর মাসে আমরা দলের সম্মেলন করব। দল সিদ্ধান্ত নেবে। আর পরবর্তী বছরই নির্বাচন। নির্বাচনের প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি। আর দলের প্রতিটি বিষয়ে গঠনতন্ত্র মেনে আমরা সিদ্ধান্ত নিই। প্রতিবার আমরা কী কী অঙ্গীকার করেছিলাম, কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছি তার হিসাব করি। আগামী দিনে আমরা কী করব, সেটাও সেভাবে তৈরি করি। ’

 

 



সাতদিনের সেরা