kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৯ নভেম্বর ২০২২ । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সঞ্চালনে স্বস্তি ২০২৫ সালের পর

তামজিদ হাসান তুরাগ ও সজীব আহমেদ   

৭ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সঞ্চালনে স্বস্তি ২০২৫ সালের পর

দেশে গত ১২ বছরে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের বড় অংশ গেছে উৎপাদনে। এতে চাহিদার চেয়ে উৎপাদনের সক্ষমতা বেশি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়েনি। ব্যবস্থাপনার জন্য যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে তা-ও নিতে অনেক দেরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এসব প্রকল্প থেকে সুফল পেতে লাগবে কমপক্ষে আরো তিন বছর। এসব প্রকল্প শেষ হতে সময় লাগবে ২০২৫ সাল পর্যন্ত।

বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় আধুনিক অবকাঠামো না হওয়ায় অতি পুরনো ও জরাজীর্ণ সঞ্চালন লাইনের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। সঞ্চালন লাইনের এই দুর্বলতার মধ্যেই সক্ষমতার বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পুরনো পদ্ধতিতে লোড ব্যবস্থাপনার কারণে জাতীয় গ্রিডে বারবার বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। ট্রান্সমিশন ও সরবরাহ লাইনে মানহীন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণেও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুেসবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অতীতের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা না নেওয়াও এবারের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞ ও বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বড় বিপর্যয়ের পর তদন্ত কমিটি হয়। কিছু সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সেই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হয় না। ফলে গ্রিডব্যবস্থার উন্নয়নও মানসম্মত হয় না। তাই সঞ্চালনব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল দিয়ে গড়ে তুলতে হবে বিদ্যুতের সঞ্চালনব্যবস্থা।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিজিসিবির কর্মকর্তারা বলছেন, সঞ্চালন টাওয়ার বসানোর জন্য অনেক মানুষের জমি অধিগ্রহণ করতে হয়। এটি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সঞ্চালন লাইন হবে ২৮ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে আছে প্রায় ১৩ হাজার ৮৮৯ কিলোমিটার। গত এক যুগে বেড়েছে পাঁচ হাজার ৮৮৯ কিলোমিটার।

সঞ্চালন লাইনে পিছিয়ে থাকার কথা স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ নিজেও। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমাদের সঞ্চালনব্যবস্থা অনেক পিছিয়ে আছে। বিতরণে আমরা যতটা এগিয়েছি, সঞ্চালনে সেই পরিমাণ এগোতে পারিনি। আরো আধুনিকভাবে আমাদের কাজ করতে হবে। ’ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের বিভ্রাট এড়াতে হলে অটোমেশনের কোনো বিকল্প নেই। যত দ্রুত অটোমেশনে যাব, তত দ্রুত সমস্যা কমে আসবে। আমরা বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলাম। করোনার কারণে দুই বছর আমাদের অনেক কাজ পিছিয়ে গেছে। ’

সঞ্চালনব্যবস্থায় গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই দুই বছর ধরে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। কেন্দ্রটি থেকে পূর্ণ সক্ষমতার বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে না পারলেও গত দুই বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ গুনতে হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ বলেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হলেও বাজেটে গুরুত্ব কমেনি। এই অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দের ৫৮ শতাংশ রাখা হয়েছে উৎপাদনে। আগের বছর এটি ছিল ৬১ শতাংশ। আগের চেয়ে সঞ্চালন ও বিতরণে বরাদ্দ কিছুটা বেড়েছে। এবার বরাদ্দের ২১ শতাংশ পেয়েছে সঞ্চালন খাত।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি ও গবেষণা শাখা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, “এখন বিদ্যুৎ খাতে যত ধরনের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সবগুলোর মূল ফোকাস হচ্ছে সঞ্চালনব্যবস্থাকে আরো আধুনিকায়ন করা। সঞ্চালন লাইন আধুনিকায়নের পাশাপাশি ‘গ্রিড রিলায়েবিলিটি স্টাডি’ করছি আমরা। ‘স্মার্ট গ্রিড স্টাডি’ও করছি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণে সঞ্চালনব্যবস্থায় যাতে কোনো ধরনের ত্রুটি না থাকে, সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ”

বিদ্যুৎ বিভাগের উন্নয়ন কর্মসূচি ও সংশোধিত উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট প্রকল্প রয়েছে ৭৭টি। এর মধ্যে সঞ্চালন লাইন ব্যবস্থাপনার প্রকল্প রয়েছে ২১টি। এর মধ্যে চলমান প্রকল্প রয়েছে ১৬টি। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২৪-২৫ সালের দিক। প্রকল্পের তারিখ অনুযায়ী সমাপ্ত প্রকল্প রয়েছে পাঁচটি। এসব প্রকল্পের তিনজন প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে।

বিতরণ ব্যবস্থাপনার প্রকল্প রয়েছে মোট ৩১টি। এর মধ্যে চলমান প্রকল্প ১৩টি। আর তারিখ অনুযায়ী সমাপ্ত প্রকল্প রয়েছে ১৮টি। তবে সমাপ্ত প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকদের পাঁচজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে দুটি প্রকল্পের কাজ এখন তলানিতে। সে হিসাবে এখনো চলমান প্রকল্প রয়েছে ১৫টি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় কখনো বড় ধরনের বিনিয়োগ হয় না। আমাদের গ্রিড লাইনগুলো আধুনিকায়ন করা জরুরি। বিপর্যয় এড়ানোর জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। ’

সঞ্চালন লাইনের যত প্রকল্প

ন্যাশনাল পাওয়ার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, ৪০০/২৩০/১৩২ কেভি গ্রিড নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিড নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্প, আমিনবাজার-মাওয়া-মোংলা ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন প্রকল্প, ঢাকা চট্টগ্রাম মেইন পাওয়ার গ্রিড স্ট্রেংদেনিং প্রকল্প (সংশোধিত), গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহে দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প, পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক স্ট্রেংদেনিং প্রজেক্ট আন্ডার পিজিসিবি, পটুয়াখালী থেকে গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণ, মাতারবাড়ী মদনাঘাট ৪০০ কেভি সঞ্চালন প্রকল্প, বাংলাদেশ পাওয়ার সিস্টেম রিহ্যাবিলিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প, পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিড নেটওয়ার্কের পরিবর্ধন এবং ক্ষমতাবর্ধন প্রকল্প, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চীয় ট্রান্সমিশন প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সঞ্চালন সম্প্রসারণ লাইন প্রকল্প, আশুগঞ্জ ১০০ কেভি পুরনো এআইএস উপকেন্দ্রকে ১৩২ কেভি নতুন জিআইএস উপকেন্দ্র দ্বারা প্রতিস্থাপন করা, বড়পুকুরিয়া বগুড়া কালিয়াকৈর ৪০০ কেভি লাইন প্রকল্প, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্প, ঢাকা এবং পশ্চিম অঞ্চলের গ্রিড সঞ্চালন প্রকল্প, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাপনা সমন্বিত সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্প, বিদ্যমান গ্রিড উপকেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইনের ক্ষমতাবর্ধন, মুদনাঘাট-ভুলতা ৭৬৫ কেভি সঞ্চালন লাইন প্রকল্প।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রকল্পের সংখ্যা কমলেও বাড়ছে ব্যয়

বিগত পাঁচ অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিভাগের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দের পরিমাণ কমেনি। বরং তা প্রকল্পের সংখ্যার তুলনায় বেড়েছে অনেকটা। চলতি অর্থবছরেও (২০২২-২৩) মোট প্রকল্প রয়েছে ৬২টি। এর বিপরীতে বরাদ্দ আছে ২৭ হাজার ৪৫৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ১০৪টি। বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ৩২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

 



সাতদিনের সেরা