kalerkantho

সোমবার । ২৮ নভেম্বর ২০২২ । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সরেজমিন দক্ষিণখান-১

সড়কজুড়ে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ

তৌফিক হাসান   

৬ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সড়কজুড়ে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ

রাজধানীর দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ, গাওয়াইর, আমতলা রসুলবাগ ও আশকোনা এলাকায় কাজের ধীর গতির কারণে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এলাকার মানুষ। গতকাল তোলা। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

রাজধানীর দক্ষিণখানে প্রায় পাঁচ লাখ লোকের বসবাস। ঢাকা উত্তর সিটির অঞ্চল ৭-এর আওতায় এই এলাকার সড়কগুলো বছরের অন্তত আট মাস (এপ্রিল থেকে নভেম্বর) জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকে। জলাবদ্ধতার কারণে বেশির ভাগ সড়ক ভেঙে অসংখ্য গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও বা উঠে গেছে স্লাব।

বিজ্ঞাপন

আবার রাস্তাজুড়ে ডিভাইডারের রড বেরিয়ে পথচারীদের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে চলা এ সমস্যার কারণে ওই এলাকায় বসবাস করা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এলাকার অধিবাসীরা বিষয়টি বারবার স্থানীয় কাউন্সিলর এবং উত্তর সিটির মেয়রের দৃষ্টিতে আনলেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। আশ্বাসেই কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর।     

সরেজমিনে ওই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে জমে যায় হাঁটুপানি। সেই পানি অবলীলায় প্রবেশ করে সড়কের পাশের দোকানগুলোয়। ফলে বাধ্য হয়ে দোকান মালিকরা তাঁদের দোকানের ভিটা পাঁচ-ছয় ফুট উঁচু করে নিয়েছেন।

দক্ষিণখানে দীর্ঘদিন বসবাস করছেন সাইদুল ইসলাম। আশকোনা মেডিক্যাল রোডে রয়েছে তাঁর একটি খাবারের হোটেল। জলাবদ্ধতার কারণে ভোক্তারা আসতে পারেন না বলে ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারছেন না তিনি। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই এই এলাকায় চলাফেরা মুশকিল হয়ে পড়ে। বেশি বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। পুরো দোকান ভরে যায় পানিতে। দোকানের চেয়ার-টেবিল নষ্ট হয়ে যায়। এই দশা থেকে রক্ষা পেতে বাধ্য হয়ে গত মাসে আমি দোকান উঁচু করেছি। মেয়র-কাউন্সিলর সবাই আসেন। সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে যান। কিন্তু পরে কেউ আর কিছু করেন না। আমরা দোকানিরা মিলে চাঁদা তুলে পানি নামানোর চেষ্টা করি। এভাবে আর পারছি না। ’

একই ধরনের কষ্টের কথা জানালেন আশকোনা মেডিক্যাল রোডের আরেক দোকানি সাইফুল ইসলাম। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এখানকার জলাবদ্ধতা আমাদের নিত্য সঙ্গী হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির দিনেও যা, বৃষ্টি না হলেও তা। তবে বৃষ্টি হলে এখানকার সড়ক দিয়ে চলাফেরা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এক লাখ টাকা খরচ করে দোকান দিয়েছি। পুরা টাকাটাই জলে গেছে। কারণ সড়কে জলাবদ্ধতার কারণে ক্রেতারা আসতে পারেন না। স্থানীয় কাউন্সিলর অনেকবার এ পরিস্থিতি দেখে গেছেন। তবে সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। ’

ঢাকা উত্তর সিটির ১৮টি নতুন ওয়ার্ডের মধ্যে চারটি (৪৭, ৪৮, ৪৯ ও ৫০) নিয়ে দক্ষিণখান থানা। প্রায় চার বছর আগে এই ওয়ার্ডগুলো উত্তর সিটির আওতায় আসে। দীর্ঘ এই সময়েও ওয়ার্ডগুলোর জলাবদ্ধতা দূর করতে পারেনি উত্তর সিটি কর্তৃপক্ষ।

দক্ষিণখানবাসীর অভিযোগ, যখন তাদের এই এলাকা ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় ছিল তখনো তারা জলাবদ্ধতার এত সমস্যায় ছিল না। সিটি করপোরেশনের আওতায় আসার পর ভেবেছিল নগর জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা পাবে। হয়েছে উল্টোটা। জলাবদ্ধতার সমস্যা তাদের জীবনকে করে তুলেছে অসহনীয়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দক্ষিণখানের আশকোনা, সর্দারপাড়া, গণকবরস্থান, মোল্লাবাড়ী, চালাবন, গাওয়াইর, মোল্লারটেক, রসুলবাগ, দক্ষিণখান বাজার, নর্দাপাড়া, কাওলা ও কসাইবাড়ী এলাকার সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতা বেশি। এলাকার সড়কগুলো মাত্র ৮-১০ ফিট চওড়া। অল্প কিছু ১২ ফুট। ফলে দুটি গাড়ি পারাপারে সমস্যা হয়। আর এসব সড়কে বড় গাড়ি প্রবেশ করলে সৃষ্টি হয় যানজট।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই জলাবদ্ধতার বড় কারণ ভঙ্গুর ড্রেনেজব্যবস্থা। বেশির ভাগ ড্রেনে নির্মাণাধীন ভবনের ইট-বালু পড়ে জমাট বেঁধেছে। ফলে পানির স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি ওই এলাকার বিল-ঝিলগুলো দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন। কিন্তু রাখা হয়নি পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা। এ কারণে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

সপ্তাহখানেক আগে রসুলবাগ এলাকার সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হন মোল্লারটেকের বাসিন্দা সুমন আহমেদ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে ডাক্তার দেখিয়ে রসুলবাগ দিয়ে বাইক চালিয়ে বাসার দিকে আসছিলাম। হঠাৎ আমার বাইকের সামনের চাকা গর্তে পড়ে যায়। পা সরাতে গেলে রড ঢুকে পড়ে পায়ে। এখানকার সব সড়ক ভাঙা। তার মধ্যে হাঁটুপানি। বোঝার উপায় নেই কোথায় কী আছে। আন্দাজের ওপর চলছিলাম। এ কারণে দুর্ঘটনায় পড়তে হয়েছে। ’

উত্তর সিটির ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আলী আকবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সড়কগুলো সংস্কারে আমাদের তো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। সিটি করপোরেশনে গেলে শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়। বলা হয়, খুব দ্রুত বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু এখনো দেওয়া হয়নি। যে কারণে এ পর্যন্ত কোনো কাজে হাত দিতে পারিনি। ’

বরাদ্দ না পেলেও কিছু কাজ হচ্ছে বলে জানান ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনিছুর রহমান নাঈম। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমাদের ওয়ার্ডের যে বেহাল দশা, গত দুই বছরে কোনো ধরনের বরাদ্দ না পেলেও নিজেদের টাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছু সংস্কারকাজ করছি। ’

বিষয়টি স্বীকার করে উত্তর সিটির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা জুলকার নায়ন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওয়ার্ডগুলোর উন্নয়নে আমরা বাজেট করেছি। সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। কোন কোন সড়কে সমস্যা, কোথায় কোথায় ড্রেন করতে হবে, সব কিছু চিহ্নিত করা হয়েছে। পানি সরানোর ব্যবস্থাও হাতে নেওয়া হয়েছে। এই কাজগুলো করতে তো অর্থের প্রয়োজন। অর্থের সংস্থান হলেই বরাদ্দ দেওয়া হবে। তখন পুরোদমে কাজ শুরু করা হবে। আপাতত তাত্ক্ষণিক কিছু কাজ করা হচ্ছে। স্থায়ী সমাধানের কাজও শুরু করা হবে। ’

উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কমকর্তা সেলিম রেজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক কাউন্সিলরকে বছরে একটা বরাদ্দ দিচ্ছি। তাঁরা ওই বরাদ্দের টাকা দিয়ে কিছু কিছু কাজও করছেন। ওই এলাকা নিয়ে একটি মেগাপ্রজেক্ট তৈরি করা হচ্ছে। এ কারণে কিছু সময় লাগছে। ’



সাতদিনের সেরা