kalerkantho

সোমবার । ২৮ নভেম্বর ২০২২ । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

৮ বছরেও সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি

সজীব আহমেদ   

৬ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৮ বছরেও সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছিল ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর। সেই ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি কারিগরি ত্রুটি, দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কারিগরি সব ব্যবস্থার উন্নয়নসহ ২০ দফা সুপারিশ করেছিল। কিন্তু আট বছরেও সেসব সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। ওই সুপারিশগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে গত মঙ্গলবারের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতো বলে মত দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের বিদ্যুতের সঞ্চালনব্যবস্থার আধুনিকায়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সঞ্চালন লাইন আধুনিকায়নের পাশাপাশি ‘গ্রিড রিলায়েবিলিটি স্টাডি’ ও ‘স্মার্ট গ্রিড স্টাডি’ এবং বিদ্যুৎ খাতের সাইবার নিরাপত্তা নিয়েও কাজ করা হচ্ছে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হয় পূর্বাঞ্চলের গ্রিডের মাধ্যমে। আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে সঞ্চালন করা হয় পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের মাধ্যমে। দুটি গ্রিডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোড থাকে পূর্বাঞ্চলে। কারণ এই গ্রিডে শিল্প-কারখনা ও ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড বেশি হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ।

যদিও কোনো গ্রিড অঞ্চল ঝুঁকিতে নেই বলে দাবি বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পাওয়ার গ্রিড কম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) কর্মকর্তাদের। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঞ্চালনব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হওয়ায় এখনো পুরনো পদ্ধতিতে লোড ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। এ কারণেই জাতীয় গ্রিডে ঘন ঘন বিপর্যয় হচ্ছে। তাঁদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো করে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি সঞ্চালনব্যবস্থার আধুনিকায়নকে। পুরনো পদ্ধতিতে লোড ব্যবস্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ করছে জাতীয় গ্রিড লাইনকে। পাশাপাশি আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থা না হওয়ায় গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ উদঘাটন করাও সম্ভব হচ্ছে না।

২০১৪ সালের বিপর্যয়ের পর তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক এবং গত মঙ্গলবারের বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান মো. ইয়াকুব ইলাহী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রিড বিপর্যয় ঠেকাতে অনেক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ঝুঁকিপূর্ণ সঞ্চালন লাইন পরিবর্তন করে নতুন লাইন করা হয়েছিল, দুর্বল সঞ্চালন লাইনগুলোকে শক্তিশালী করা হয়েছিল, সাবস্টেশনেও বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তখন থেকেই সঞ্চালন ও সাবস্টেশনগুলো আধুনিকায়নের গুরুত্ব দেয় সরকার। ধাপে ধাপে এগুলোর আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হচ্ছে। ’

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার দুপুর ২টা ৫ মিনিটে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের শুরু। সাড়ে তিন ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৫টায় প্রাথমিকভাবে রাজধানীর কিছু এলাকায় সরবরাহ শুরু করে বিতরণ কম্পানিগুলো। পরে রাত ১০টার দিকে রাজধানীর ৮০ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়। তবে রাজধানীর বাইরে তখনো ৫০ শতাংশ এলাকা বিদ্যুত্হীন ছিল। তারপর রাতের মধ্যেই রাজধানীতে শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও রাজধানীর বাইরে তা সম্ভব হয়নি।

তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান শুরু

জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গতকাল বুধবার সকাল থেকেই তদন্ত শুরু করেছেন পিজিসিবির তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান ইয়াকুব ইলাহী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলাম নরসিংদীর ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। কিন্তু আজ (গতকাল) সকালে ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে আসার পর বুঝতে পারি, বিপর্যয়টি এখান থেকে হয়নি। তবে আমাদের যেসব জায়গাকে সন্দেহভাজন মনে হচ্ছে সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছি। ’

বারবার কেন বিপর্যয়

২০১৪ সালে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর ২০১৭ সালের মে মাসেও গ্রিড বিপর্যয়ে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমের ৩২টি জেলা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুত্হীন ছিল। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা দেড় ঘণ্টা বিদ্যুত্হীন ছিল।

বারবার গ্রিড বিপর্যয়ের বিষয়ে বিদ্যুৎসচিব হাবিবুর রহমান বলেন, সঞ্চালন লাইনে মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো সমস্যা হয় এবং সেটা হতে পারেও। শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এটা ঠেকানোর জন্য আধুনিকায়ন করতে হবে। তখন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। যান্ত্রিক ত্রুটি কমে যাবে।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, বিভিন্ন কারণে গ্রিড বিপর্যয় হতে পারে। যখন কোনো গ্রিড বিপর্যয় ঘটে, সঙ্গে সঙ্গেই কারণ বলা যায় না। সব ‘ফ্যাক্টর’ বিশ্লেষণ করে একটা কাছাকাছি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।

কী কারণে বিপর্যয়

কী কারণে কোথায় গ্রিড লাইনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল, গতকাল পর্যন্ত পিজিসিবি, পিডিবি ও বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল কেউ এই বিষয় নিয়ে তথ্য দিতে পারেননি।

বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি ও গবেষণা শাখা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিপর্যয়টি কী কারণে, কোথায় হয়েছে, এই বিষয়ে সঠিকভাবে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে তদন্ত কমিটি মাঠে কাজ করছে। আমাদের পুরনো অভিজ্ঞতা আছে, তাই বলছি, বিষয়টি চিহ্নিত করতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। আমরা এখনো স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা চালু করতে পারিনি বিধায় কোথায় সমস্যা হয়েছে তা এখনো চিহ্নিত করতে পারিনি। ’

বিপর্যয় রোধে আধুনিকায়ন ও স্মার্ট গ্রিড

গ্রিড পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা এখনো চালু না হওয়ায় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস কিংবা কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ বিষয়ে মোহাম্মদ হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা চালু করার যে কাজ চলছে সেটি সম্পন্ন হলে তখন কোথাও লাইন ট্রিপ করলে কোথায় হলো, কিভাবে হলো, তা আমরা বলতে পারব। কোথাও কোনো অসুবিধা হলে কেন্দ্রীয়ভাবে সতর্ক বার্তা পাওয়া যাবে। ’

মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, “আমরা দেশের শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিয়েছি, তাই এখন আমাদের যত ধরনের প্রকল্প রয়েছে সেসব প্রকল্পে মূল ফোকাস হচ্ছে সঞ্চালনব্যবস্থাকে কিভাবে আরো আধুনিকায়ন বা উন্নত করা যায়। সঞ্চালন লাইন আধুনিকায়নের পাশাপাশি ‘গ্রিড রিলায়েবিলিটি স্টাডি’ আমরা করছি। ‘স্মার্ট গ্রিড স্টাডি’ আমরা করছি। বিদ্যুৎ খাতের সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করছি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণে সঞ্চালনব্যবস্থায় যাতে কোনো ধরনের ত্রুটি না থাকে, সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ”

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সঞ্চালন লাইনগুলোর আধুনিকায়ন করা খুবই জরুরি। কারণ সঞ্চালন অবকাঠামো অনেক পুরনো। ফলে পুরনো পদ্ধতিতে লোড ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। আধুনিক গ্রিড না থাকায় বিপর্যয়ের উৎস খুঁজতেও দেরি হচ্ছে। ’

 

 



সাতদিনের সেরা