kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০২২ । ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

তিন ইউএনওর বিরুদ্ধে অভিযোগ

৮ দিনেও শেষ হয়নি ২৪ ঘণ্টার তদন্ত

দেলওয়ার হোসেন   

৩ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



৮ দিনেও শেষ হয়নি ২৪ ঘণ্টার তদন্ত

তিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত ৮ দিনেও শেষ হয়নি। কমিটি গঠনের সময় বলা হয়েছিল, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

নতুন করে অভিযোগের তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরো এক ইউএনও এবং দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের নাম। তাঁদের একজনকে বদলিও করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আলাদা কোনো তদন্ত কমিটি করা হয়নি।

অভিযুক্ত একজন এসি ল্যান্ড হলেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার এসি ল্যান্ড অতিম দত্ত। দুই কর্মচারীকে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁকে ভূঞাপুর থেকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। অভিযোগ ওঠা ইউএনও হলেন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার ফারজানা প্রিয়াংকা। সেখানকার এসি ল্যান্ড ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ করেন এক ভুক্তভোগী। অভিযোগ করায় ইউএনও তাঁকে লাঞ্ছিত করেছেন বলে দাবি করেন ওই ভুক্তভোগী।

এ অবস্থায় মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদের কর্মকর্তাদের অপেশাদার আচরণে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিএএসএ)। কর্মকর্তাদের কথায়, কাজে ও আচরণে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়—সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সরকারি সূত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মাঠ পর্যায়ের কোনো কোনো কর্মকর্তা অপেশাদারসুলভ, অসহিষ্ণু ও অসৌজন্যমূলক আচরণ প্রদর্শন করছেন।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে যা ঘটেছে তা একেবারেই কাম্য নয়। এসব ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত। না হলে জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হবে এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ার গত বুধবার সংগঠনের ফেসবুক পেজে কর্মকর্তাদের আচরণে উদ্বেগ জানিয়ে একটি পোস্ট দেন। তবে কিছুক্ষণ পর তা মুছে ফেলা হয়। একই পোস্ট পরে কর্মকর্তাদের ফেসবুক গ্রুপে দেওয়া হয়। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াও এ ধরনের ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে বৈরী আচরণ করছে এবং সরকারকে বিব্রত করার অপচেষ্টা করছে। ’

পোস্টে বলা হয়, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথন, টেলিফোনে কথোপকথন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষদের সঙ্গে কথা বলা, মোবাইল কোর্ট বা বিক্ষুব্ধ জনতাকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ বর্তমান অনলাইনের যুগে ছবি বা ভিডিও করা সহজ হওয়ায় সেগুলোর অপব্যবহারের মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পোস্টে বলেন, ‘অন্যায় ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে আইন রাষ্ট্রের সব নাগরিকের জন্য সমান। কাজেই সবাইকে নিজ কর্মস্থলে কথায়, কাজে এবং আচরণে দায়িত্বশীলতার পরিচয় প্রদানের জন্য আহ্বান করছি। ’

তিনি লিখেছেন, প্রশাসন ক্যাডার দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় প্রথম কাতারের সৈনিক। অন্যদিকে প্রশাসনিক কার্যক্রম মূলত জটিল ও অপ্রীতিকর। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, ভেজালবিরোধী অভিযান, পাবলিক পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন, সরকারি সম্পত্তির অবৈধ দখল মুক্তকরণ, জটিল তদন্ত কার্যক্রম, চোরাচালান দমন ইত্যাদি কার্যক্রম পালন করতে হয়, যাতে কোনো না কোনোভাবে কায়েমি স্বার্থবাদী দুষ্টচক্রের সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশাসন ক্যাডারের চাকরির ধরনই এরূপ। এসব ক্ষেত্রে মৌখিক কথা এবং আচরণের মাধ্যমে নয়, বরং কলমের মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই উত্তম।

এই ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে কবির বিন আনোয়ার গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সভাপতি। তাই অভিভাবক হিসেবে তাঁদের সতর্ক করে আমাদের নিজস্ব গ্রুপে পোস্টটি দিয়েছি। ’ তিনি আরো বলেন, ‘সন্তান ভুল করলে তাদের শাসন করতে হয়। অভিভাবক হিসেবে সেটাই করেছি। বিভিন্ন প্রশিক্ষণেও এ বিষয়গুলো তাঁদের বলা হয়। তবে মোট কর্মকর্তার তুলনায় এমন ভুল করা লোকের সংখ্যা খুবই কম। ’

তদন্ত কমিটি হয়েছে, প্রতিবেদন আসেনি

বান্দরবানের আলীকদম, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ও বগুড়া সদর উপজেলার উপজেলা ইউএনওর বিরুদ্ধে পৃথক তদন্ত কমিটি করা হয়। সংশ্লিষ্ট জেলার এডিসিদের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর ২৫ সেপ্টেম্বর এই তিন কমিটি গঠনের কথা গণমাধ্যমকে জানান। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রতিবেদন জমা দেবেন বলেও জানান তিনি।

গতকাল এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত সচিব মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো কোনো ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন আসেনি। তবে বগুড়ার ইউএনওর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আলীকদমের ইউএনওকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। আর কুড়িগ্রামের ইউএনও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় জড়িত নন বলে জেনেছি। ’

গত ২৩ সেপ্টেম্বর আলীকদম উপজেলায় একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণের আগে দর্শকের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রফি আছড়ে ভেঙে ফেলেন ইউএনও মেহরুবা ইসলাম। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর ইউএনও দীপক কুমার দেব শর্মাকে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হয়। বগুড়া সদরে আলমগীর হোসেন নামের এক তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ ইউএনও সমর কুমার পালের বিরুদ্ধে।

জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, দ্রুত তদন্ত করে অভিযুক্ত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তা না হলে জনগণের মধ্যে ভুল বার্তা যাবে।

ঘটেই চলছে এমন ঘটনা

কক্সবাজারের এক সাংবাদিককে গালমন্দ করেন টেকনাফ উপজেলার ইউএনও মোহাম্মদ কায়সার। গত জুলাই মাসে তাঁর সেই অডিও ফাঁস হয় এবং স্থানীয় প্রশাসন বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে।

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে আদালতের দুই কর্মচারীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে ইউএনও মো. রেজাউল করিম ও তাঁর অফিসের নাজির উকিল মিয়ার বিরুদ্ধে। ফরিদপুর আদালত থেকে লিখিতভাবে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে ঘটনাটি জানানো হয়। ইউএনও নিঃশর্ত ক্ষমা চান।

গত বছরের মে মাসে নারায়ণগঞ্জে ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে সরকারি ত্রাণ সহযোগিতা চেয়েছিলেন এক ব্যক্তি। উপজেলা প্রশাসন ফরিদ আহমেদ নামের ওই ব্যক্তি অবস্থাসম্পন্ন দাবি করে তাঁকে শাস্তি দেয়। ১০০ জনকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার শাস্তি পান তিনি। পরে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি সত্যিই সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। তিনি অসচ্ছল ছিলেন।

গত বছরের ৪ জানুয়ারি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলপনা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ ওঠে। গত বছরের ১৭ মে ফুলগাছ খাওয়ার অভিযোগে একটি ছাগলকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেন বগুড়ার আদমদীঘির ইউএনও সীমা শারমিন।

একই বছরের ৮ জুলাই মানিকগঞ্জের সিংগাইরের ইউএনও রুনা লায়লাকে ‘স্যার’ না বলে আপা বলায় তাঁর নির্দেশে এক ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ ওঠে। আগস্টে লালমনিরহাটের আদিতমারীর ইউএনও মুনসুর উদ্দিনের বিরুদ্ধে স্থানীয় দুজনকে হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগ আসে।

৪ অক্টোবর কুমিল্লার বুড়িচংয়ে জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত কাজে ইউএনওর অফিসে যান প্রবীণ ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন। এক পর্যায়ে ইউএনও সাবিনা ইয়াসমিনকে ‘আপা’ বলায় ইউএনও উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘স্যার ডাকতে না পারলে মা ডাকবেন। ’ জামাল উদ্দিন বিষয়টি ফেসবুকে শেয়ার করলে তা ভাইরাল হয়।

আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় জামালপুরের এক ডিসিকে শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছিল। এ ছাড়া মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাংবাদিককে সাজা দেওয়া ও ‘নির্যাতনের’ ঘটনায় কুড়িগ্রামের তৎকালীন ডিসি সুলতানা পারভীনসহ তৎকালীন জেলা প্রশাসনের কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অবশ্য পরে ডিসিকে অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

 

 

 



সাতদিনের সেরা