kalerkantho

রবিবার । ৪ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সিইপিজেডে পানিসংকট

বৃষ্টি, কর্ণফুলীর পানি মেটাবে ঘাটতি

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বৃষ্টি, কর্ণফুলীর পানি মেটাবে ঘাটতি

চট্টগ্রাম ইপিজেডে দৈনিক সুপেয় পানির চাহিদা ৬০ লাখ গ্যালন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ওয়াসা থেকে পায় দুই লাখ গ্যালন। ১১২টি গভীর নলকূপ থেকে আসে ২০ থেকে ৩০ লাখ গ্যালন। তার পরও পানির ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এর স্থায়ী সমাধান পেতে কর্ণফুলীর পানি শোধনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আজ  বৃহস্পতিবার এই প্রকল্প চালু হলে দৈনিক ৩০ লাখ গ্যালন পানি আসবে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমের ঘাটতি মেটানো হবে।

চট্টগ্রাম ইপিজেড সূত্র জানায়, বর্তমানে পানির চাহিদার একটি বড় অংশ (প্রায় ৩০ থেকে ৩২ লাখ গ্যালন) আসে দুই কিলোমিটার দূরত্বের কর্ণফুলী ইপিজেডের ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট থেকে। এ ছাড়া বিভিন্ন কারখানায় অন্তত ১১২টি গভীর নলকূপ থেকে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ লাখ গ্যালন পানি তোলা হয়। এতে পানির চাহিদা মিটলেও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা হওয়ায় এই পানির লবণাক্ততা দূর করতে কারখানাগুলোকে বাড়তি টাকা খরচ করতে হয়। এই সংকট সমাধানে ‘কর্ণফুলী আরো ওয়াটার লিমিটেড’ নামের ট্রিটমেন্ট প্লান্ট পরীক্ষামূলক পানি উৎপাদন শুরু করেছে। ঢাকাভিত্তিক সিগমা গ্রুপের এই প্রতিষ্ঠান থেকে আপাতত দিনে কর্ণফুলী নদীর ৩০ লাখ গ্যালন পানি পরিশোধন করে ইপিজেডের কারখানাগুলোতে সরবরাহ করা হবে। আজ বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করবে প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য কর্ণফুলী নদীর পারে পতেঙ্গার সাইলো জেটিসংলগ্ন স্থানে পাম্প স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে পানি এনে ইপিজেডের ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পরিশোধন করে সরবরাহ করা হবে। লবণাক্ততা কম পেতে মূলত ভাটার সময় কর্ণফুলী নদীর উপরিভাগের পানি ট্রিটমেন্ট প্লান্টে সরবরাহ করা হবে বলে সিগমা গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) প্রকৌশলী মো. তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন। এ ছাড়া চাহিদার বাকিটুকু কর্ণফুলী ইপিজেডে ২০০৮ সালে স্থাপিত ট্রিটমেন্ট প্লান্ট থেকে আগের মতোই সরবরাহ করা হবে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মশিউদ্দিন বিন মেজবাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই ইপিজেডে সুপেয় পানি একটি বড় সমস্যা। অথচ ইপিজেডের কর্মব্যস্ততা যত বেড়েছে, উৎপাদন কাজে পানির চাহিদাও তত বেড়েছে। এই পানি চাহিদার খুব সামান্য চট্টগ্রাম ওয়াসা থেকে পাওয়া যায়। দেরিতে হলেও ইপিজেডের অভ্যন্তরেই নিজস্ব পানি ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। তবে আমরা একই সঙ্গে বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক পানি ধরে রেখে ব্যবহারের পদক্ষেপও নিচ্ছি। ’

গ্রাউন্ড রিচার্জ ওয়েলস

বছরের জানুয়ারি থেকে মে-জুন মাস পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টি না থাকায় এই সময়টায় কর্ণফুলীর পানিতে লবণ বেশি থাকে। এ কথা চিন্তা করে ‘গ্রাউন্ড রিচার্জ ওয়েলস’ পদ্ধতিতে পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সিগমা গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টিউবওয়েল যেমন মাটির তলদেশ থেকে পানি ওপরে টেনে আনে, তেমনি গ্রাউন্ড রিচার্জের মাধ্যমে বৃষ্টির সময় অতিরিক্ত পানি পাম্পের মাধ্যমে মাটির ৬০০ থেকে ৮০০ ফুট তলদেশে ঢোকানো হবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির উচ্চতা বাড়বে। এভাবে ইচ্ছামতো পানি ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে ঢোকানো যাবে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানির লবণাক্ততা বেড়ে গেলে তখন এই পানি আবার পাম্পের মাধ্যমে ওপরে টেনে পরিশোধন করে কাজে লাগানো যাবে। ’ এ জন্য ইপিজেডের একাধিক পয়েন্টে পাম্প বসানো হবে বলে তিনি জানান।

গ্রাউন্ড রিচার্জ ওয়েলস পদ্ধতির বিষয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-চুয়েটের সাবেক উপাচার্য এবং চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসটিসি) বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে এ ধরনের প্রযুক্তি বেশি বেশি ব্যবহার হওয়া দরকার। বৃষ্টির এক ফোঁটা পানিও নালা-নর্দমায় ফেলে নষ্ট হতে দেওয়া উচিত নয়। পাম্পের মাধ্যমে মাটির তলদেশে পানি জমা রাখার প্রযুক্তি বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। এটা পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না বরং মাটির নিচে পানির স্তর ঠিক রাখতে সহায়তা করে বলে পরিবেশবান্ধব। ’

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ

অপর্যাপ্ত পানির চাহিদা মেটাতে ২০১৬ সালে প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপ তাদের ইউনিভার্সাল জিন্স, প্যাসিফিক জিন্স ও এনএইচটি ফ্যাশনস কারখানায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে জিন্স-২০০০, প্যাসিফিক ক্যাজুয়ালস এবং গত বছর প্যাসিফিক ওয়ার্কওয়্যার লিমিটেডে একই উদ্যোগ নেয়। ২০২২ পর্যন্ত গত ছয় বছরে এক লাখ ২০ হাজার ১৪২ কিউবিক মিটার বা ১২ কোটি এক লাখ ৪২ হাজার লিটার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেছে তারা।

প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (হেড অব সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘পানির সংকটে বরাবরই আমাদের ডিপ টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে আমরা প্রাকৃতিক উৎস থেকেও পানি সংরক্ষণ শুরু করি। আমাদের নতুন যতগুলো কারখানা চালু হচ্ছে মুরু থেকেই সেগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এই পানি দিয়ে আমাদের ২ শতাংশের বেশি চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এতে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে কারখানা সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা যাচ্ছে। ’

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম ইপিজেডের কানাডিয়ান বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মাইডাস সেফটি বাংলাদেশ লিমিটেড। এ বছরই প্রতিষ্ঠানের দুটি ইউনিটে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া উদ্যোগের ফলে গত দুই মাসে প্রায় ৩৬৪ কিউবিক মিটার বা তিন লাখ ৬৪ হাজার লিটার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা গেছে। মাইডাস সেফটি বাংলাদেশ লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মইনুল হোসাইন বলেন, ‘দুটি ইউনিটের ৭০ হাজার গ্যালনের রিজার্ভারটি পরিপূর্ণ করা গেলে অন্তত চার মাস আমাদের বাইরে থেকে পানি কিনতে হবে না। এতে পানির যে খরচ বাঁচবে তাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যয় উঠে আসতে পাঁচ বছরও লাগবে না। ’

পানি সংরক্ষণে পুকুর খনন

চট্টগ্রাম ইপিজেড কর্তৃপক্ষ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে ইপিজেডের আবাসিক এলাকায় ‘কর্ণফুলী আরো ওয়াটার লিমিটেড’ কর্তৃপক্ষকে ২.৩ একর জায়গা বরাদ্দ দিচ্ছে পুকুর খননের জন্য। চট্টগ্রাম ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মশিউদ্দিন বিন মেজবাহ জানান, এই পুকুরের সঙ্গে নালা এবং পাইপের মাধ্যমে পুরো ইপিজেডের সংযোগ থাকবে। বৃষ্টির পানি এসে এই পুকুরে সংরক্ষিত থাকবে। এ ছাড়া বর্তমানে সিইটিপির ময়লা পানির কারণে দূষিত ইপিজেডের খালগুলো সংস্কার করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হবে। সিইটিপির জন্য বিকল্প নালার ব্যবস্থা করা হবে।



সাতদিনের সেরা