kalerkantho

রবিবার । ৪ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

দক্ষিণে বাস ব্যবসায় নতুন মেরুকরণ

সজিব ঘোষ   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দক্ষিণে বাস ব্যবসায় নতুন মেরুকরণ

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পরিবহন ব্যবসায় নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। দক্ষিণের ২১ জেলায় বাস মালিকদের আলাদা কমিটি আছে। তাঁরা সরাসরি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সদস্য। এখন এই ২১ জেলা নিয়ে একটি আঞ্চলিক সমিতি করতে যাচ্ছেন স্থানীয় নেতারা।

বিজ্ঞাপন

এতে দেশের এক-তৃতীয়াংশ জেলার প্রতিনিধিত্ব এই কমিটির হাতে চলে আসবে।

পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের বাস যোগাযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি বাড়ছে এই খাতে বিনিয়োগও। সাধারণত নতুন কেউ বাস নামাতে গেলে জেলা মালিক সমিতির সদস্য হতে হয়। সারা দেশেই এর জন্য সমিতিকে এককালীন বিপুল টাকা দিতে হয়। এরপর আছে প্রতিদিন বাস চালানোর জন্য নির্দিষ্ট হারে চাঁদা পরিশোধ। এই অঞ্চলে বাসের সংখ্যা বাড়তে থাকায় তাই নড়েচড়ে বসছেন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সমিতি ও এর বাইরের নেতারা।

সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের পাঁচটি জেলা ঘুরে স্থানীয় বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে এসব এলাকায় রুট পারমিট নেই, এমন বাসের চলাচলও বেড়েছে। মূলত সমিতি ও রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব বাস চলছে।

আঞ্চলিক কমিটি গঠনের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গোপালগঞ্জ জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. জামিল সারোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই অঞ্চলে বাসের ব্যবসা পরিচালনার জন্য আমরা নিজেরা আলাদা একটি কমিটি করছি। এতে ২১ জেলার বাস মালিকরাই অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। ’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এই আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি হতে পারেন বর্তমানে খুলনা বিভাগীয় বাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল গফফার বিশ্বাস। আর এই কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন বরিশাল, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরের বাস মালিক নেতারা। তাঁদের বেশির ভাগ আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জাতীয় ও স্থানীয় বড় নেতা।

আব্দুল গফফার বিশ্বাস খুলনায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় বিশ্বাস পরিবারের সদস্য। তিনি জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য। তাঁর ভাতিজা সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বুলু বিশ্বাস আওয়ামী লীগের খুলনা মহানগর কমিটির সদস্য। গফফার বিশ্বাসের ভাই আনিসুর রহমান বিশ্বাসও খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য। আগে তিনি বিএনপির কমিটিতে ছিলেন।

আঞ্চলিক এই কমিটি হলে জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির প্রভাব কমতে পারে বলেও মনে করছেন এই অঞ্চলের নেতারা। এতে জাতীয় পর্যায়ে বিভাজন তৈরি হবে কি না—জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভাগীয় কমিটি থাকতে পারে, সেগুলো আমরা অনুমোদন দিই। তবে ২১ জেলা নিয়ে আঞ্চলিক কমিটি করা হলে তারা ঢাকায় আসতে পারবে না। জেলার ভেতরেই তাদের ব্যবসা করতে হবে। ’

মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব থাকবেই। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সেই রাজনৈতিক সুবিধাগুলোও নেবেন, সেটা স্বাভাবিক। তবে জাতীয় সংগঠনকে উপেক্ষা করে কিছু করা যাবে না। এই সংগঠনে দক্ষিণাঞ্চলের বড় নেতারাও রয়েছেন। এখন মনে হচ্ছে, কোনো একটা সমস্যা তো আছে। সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে।

সরেজমিনে বরিশাল, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর শহর ঘুরে বাসের ব্যবসায় আঞ্চলিক আধিপত্যের বিষয়টি স্পষ্ট লক্ষ করা গেছে। জানা গেছে, ঢাকার বড় বাস কম্পানিগুলো দক্ষিণাঞ্চলে বাসের ব্যবসায় সরাসরি যুক্ত হতে পারছে না। তারা চাঁদা দিয়ে স্থানীয় বাস মালিক সমিতির কাছ থেকে জেলার ওপর দিয়ে যাওয়ার অনুমতি নেয়। কিন্তু জেলায় কাউন্টার বসিয়ে কোনো টিকিট বিক্রি করতে পারে না।

ঢাকার বিলাসবহুল বাসের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ। কারণ তাঁরা নতুন এই গন্তব্যে নির্বিঘ্নে ঢুকতে চান। স্থানীয় মালিক সমিতির খবরদারি মেনে তাঁরা এখন ব্যবসা করছেন।

তবে এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনার পর্যবেক্ষণ পুরোপুরি ঠিক না। দক্ষিণাঞ্চলে বাসের ব্যবসা করতে কারো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমি নিজেও খুলনায় বাস চালাচ্ছি। অনেক জেলাতেই ঢাকার বাস কম্পানিগুলো ঢুকছে। ’ তিনি বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলে আঞ্চলিক কমিটি হলেও ঢাকায় কেন্দ্রে ক্ষমতা কমবে না। তারা আমাদের কেন্দ্রের অধীনেই থাকবে। ’

স্থানীয় পরিস্থিতি : শরীয়তপুর জেলা বাস মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা-শরীয়তপুর রুটে চার কম্পানির ১২০টির মতো বাস নিয়মিত চলাচল করছে। তবে এসব বাসের কোনোটিরই রুট পারমিট নেই। শরীয়তপুর আন্ত জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. ফারুখ আহম্মেদ চৌধুরী বলেন, ‘শরীয়তপুর থেকে ঢাকা রুটে একটি বাসেরও রুট পারমিট নেই। আমরা রুট পারমিট ছাড়াই বাস চালাচ্ছি। রুট পারমিটের দরকারও নেই। ’

মাদারীপুর থেকে বিভিন্ন জেলায় মোট ১৪০টি বাস চলাচল করে বলে জানিয়েছেন জেলা সড়ক পরিবহন বাস মালিক সমিতির সভাপতি তুসু খন্দকার। মাদারীপুরে তাঁর কার্যালয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, সার্বিক পরিবহনের বাস চলে ৭০টি, সোনালী পরিবহনের বাস চলে ৪০টি আর চন্দ্রা পরিবহনের বাস চলে ৩০টি। এর মধ্যে সোনালী পরিবহনের মালিক তিনি। সার্বিক পরিবহনের মালিক সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী ও পরিবহন নেতা শাজাহান খানের ছোট ভাই হাফিজুর রহমান খান। তবে বাসের ব্যবসা শাজাহান খানই নিয়ন্ত্রণ করেন।

তুসু খন্দকার বলেন, বাসের ব্যবসায় যুক্ত হতে হলে সমিতির সদস্য পদ নিতে হয়। এর জন্য এক লাখ টাকা দিতে হয়। বাসপ্রতি দৈনিক চাঁদা ২০ টাকা। বাসের চাহিদা তৈরি হলে নতুন মালিকরা বাস নিয়ে আসতে পারবেন না। তবে এই তিন পরিবহনের মধ্য থেকেই বাসের সংখ্যা বাড়ানো হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জেলার বাস মালিক সমিতির নেতারা স্বীকার করেছেন, মালিক সমিতির সদস্য হতে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা লাগে। রুটভেদে দৈনিক চাঁদা ৭০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। বাসের সংখ্যা বাড়লে চাঁদার অঙ্ক আরো বেড়ে যায়।

দক্ষিণাঞ্চলের বাস মালিক সমিতির বেশ কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, বাসের ব্যবসায় দক্ষিণাঞ্চলের কেন্দ্র হতে যাচ্ছে বরিশাল। মাদারীপুর, খুলনা, বরিশাল ও গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা বাস মালিক সমিতিকে ছায়া দিয়ে রাখেন। তাঁরাই দক্ষিণাঞ্চলের নতুন বাস ব্যবসা ও মালিক সমিতিকে নিয়ন্ত্রণ করবেন।

একসময় বাস মালিক সমিতির বরিশালের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন মো. আফতাব হোসেন। পরিবহন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ছিলেন বরিশাল বাস মালিক সমিতির সভাপতি। দক্ষিণাঞ্চলের বাসের ব্যবসার মেরুকরণ বিষয়ে তাঁর বরিশালের বাসায় কথা হয় এই প্রতিবেদকের। আফতাব হোসেন বলেন, পরিবহন ব্যবসায় চাঁদাবাজি নতুন কিছু না। তবে কী পরিমাণ চাঁদা নেওয়া হচ্ছে, তা দেখার বিষয়। চাঁদার পরিমাণ সহনশীল হলে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের তা দিতে আপত্তি থাকে না। পরিবহনের যে নেতারা চাঁদা তুলছেন, তাঁদের পেছনে থাকছে রাজনৈতিক শক্তি। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাই এই চাঁদার বড় অংশ নিয়ে যান। আবার রাজনৈতিক নেতাদের মদদ ছাড়া চাঁদাবাজি করাও সম্ভব হয় না।

পদ্মা পেরিয়ে ভাঙ্গার পর সড়কে ভোগান্তি

পদ্মা পার হলে যাত্রী তুলতে পারে না ঢাকার বাস

 



সাতদিনের সেরা