kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

পঞ্চগড়ে করতোয়ায় নৌকাডুবি

কান্নার জল গড়ায় করতোয়ায়

► মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৮ এখনো ৪ জন নিখোঁজ দাবি প্রশাসনের
► মৃতদের মধ্যে নারী ৩০, শিশু ২১ ও পুরুষ ১৭ জন
► দিনাজপুরে নদীতে ভেসে এলো আরো ৪ মরদেহ

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কান্নার জল গড়ায় করতোয়ায়

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন জগদীশ চন্দ্র রায়। তাঁকে হারিয়ে মা ননীবালা, স্ত্রী ফুলমতি এবং দুই শিশুসন্তান কৌশিক ও রাধিকা যেন দিশাহারা। গতকাল পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া বটতলী এলাকায়। ছবি : লুৎফর রহমান

২৫। ৫০। ৬৮। প্রতিদিন নিখোঁজ কমছে, আর লাশ বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

এখনো বাকি আছে চারজন। একে একে শেষ হচ্ছে অপেক্ষার প্রহর। মরদেহ দেখে কেঁদে ওঠে স্বজন। কান্নার জল গড়ায় স্বজনের ডুবে যাওয়া করতোয়ায়।

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় নৌকাডুবির ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার তৃতীয় দিনের উদ্ধার অভিযানে পাওয়া যায় আরো ১৮ মরদেহ। দিন শেষে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৮-তে। এর আগে সোমবার ২৫ জন এবং রবিবার ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকক্ষের হিসাবে মারা যাওয়া ৬৮ জনের মধ্যে নারী ৩০ জন, শিশু ২১ এবং পুরুষ ১৭ জন। এর মধ্যে দেবীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ১৮ জন, বোদা উপজেলার ৪৪, আটোয়ারীর দুই, ঠাকুরগাঁও সদরের তিন এবং পঞ্চগড় সদরের একজন।

গতকাল যাদের মরদেহ উদ্ধার হয় তারা হলো শৈলবালা (৫১), সনেকা রানী (৫৫), হরিকিশোর (৪৫), শিন্টু বর্মণ (৩২), মহেন চন্দ্র (৩০), ভূমিকা রায় পূজা (১৫), আঁখি রানী, (১৫), সুমি রানী (৩৮), পলাশ চন্দ্র (১৫), ধৃতি রানী (১০), সজিব রায় (১০), পুতুল রানী (১৫), কবিতা রানী (৯), রত্না  রানী (৪০) মলিন্দ্র নাথ বর্মণ (৫৬), মণিভূষণ বর্মণ (৪৬), মুনিকা রানী (৩৬) এবং দোলা রানী (৫)।

তবে এখনো অপেক্ষায় আছে কিছু স্বজন। তাদের সঙ্গে করতোয়ার তীরে উত্সুক জনতাও ভিড় করে আছে। জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, এখন আর মাত্র চারজন নিখোঁজ রয়েছে। তারা হলো বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের খালপাড়া এলাকার হিমালয়, একই উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া এলাকার সুরেন, পঞ্চগড় সদর উপজেলার কামাতকাজলদিঘী ইউনিয়নের জয়া রানী এবং দেবীগঞ্জ উপজেলার ছত্রশিকারপুর হাতিডুবা এলাকার ভূপেন।

নৌকাডুবিতে মারা যাওয়া ৬৮ জনের মধ্যে ৬৭ জনই সনাতন ধর্মাবলম্বী। কেবল মাঝি হাশেম আলীই ছিলেন মুসলিম।

স্বজন হারানো গোবিন্দ্র চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘দেবী মায়ের কী ইচ্ছা জানি না। তাঁর ভাসানের আগেই আমাদের ৬৭ জন ভক্তের ভাসান হয়ে গেল। এবার দুর্গাপূজা কিভাবে করব আমরা ভেবে পাচ্ছি না। আমাদের মাথা শর্ট সার্কিট হয়ে গেছে। বিধাতার লীলা বোঝা বড় মুশকিল। তবে নির্মম হলেও নিয়তি মেনে নিতে হয়। ’

নিখোঁজ হিমালয়ের বাবা বীরেন চন্দ্র রায় বলেন, ‘দুই মাস আগে আমার ছেলের বিয়ে হয়েছে। সে তার বৌ বর্ণাসহ আমাদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মহালয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিল। কিন্তু নৌকাডুবিতে হিমালয়ের মামি সিমলা, মাসি সফলতা ও মামাতো বোন আঁখির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু এখনো আমার ছেলে হিমালয়ের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা তিন দিন ধরে অপেক্ষা করছি। এই শোক আর কষ্ট আর সইতে পারছি না। ’

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দীপঙ্কর রায় বলেন, ‘একজন মানুষও নিখোঁজ থাকলে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমরা প্রত্যেক নিখোঁজ মানুষকে উদ্ধার করে অন্তত তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে তুলে দিতে চেষ্টা করে যাচ্ছি; যেন তারা তার শেষকৃত্য করতে পারে। ’

অতিরিক্ত যাত্রী ও নৌকার ইঞ্জিনে ত্রুটি : অতিরিক্ত যাত্রীর পাশাপাশি নৌকার ইঞ্জিনে ত্রুটি এই দুর্ঘটনার কারণ বলেছেন বেঁচে যাওয়া যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, করতোয়ার দুই পারের লাখো মানুষ ব্যবহার করে এই ঘাট। রবিবার মহালয়া থাকায় বোদেশ্বরী মন্দিরে যাওয়ার জন্য ঘাটে আট থেকে ১০ হাজার মানুষের সমাগম হয়েছিল। তাদের পারাপারের জন্য বড় নৌকা ছিল মাত্র দুটি। দুর্ঘটনাকবলিত নৌকাটিতে ৫০ থেকে ৬০ জন ধারণক্ষমতা থাকলেও তাতে চড়েছিল তিন গুণ মানুষ। নারী ও শিশুরাই ছিল বেশি।

ওই নৌকায় থাকা মানিক চন্দ্র রায় নামের এক যাত্রী বলেন, ‘নৌকাটির ইঞ্জিন বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। ওঠার পর আমার মন আবার নেমে যেতে চাইছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা হতে চলেছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকা ডুবে যায়। ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে যাই। ’

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কমিটির প্রধান দীপঙ্কর রায় বলেন, ‘আমরা নৌকা ডোবার ভিডিও সংগ্রহ করেছি। প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে ফেরা মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করেছি। এখন তথ্যগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে কিছুই বলতে চাচ্ছি না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ব্রিফ করবেন। ’

আরো চার মরদেহ ভেসে এলো দিনাজপুরে

এদিকে দিনাজপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পঞ্চগড়ের বোদায় করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ থাকা চার নারীর মরদেহ দিনাজপুরের বীরগঞ্জ ও সদর উপজেলার আত্রাই নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে গত দুই দিনে পঞ্চগড় থেকে ভেসে আসা ১১ জনের মরদেহ দিনাজপুরের নদী থেকে উদ্ধার করা হলো।

তিস্তায় উদ্ধার মরদেহ নিয়ে সন্দেহ

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়নের পাঁচপীর-চিলমারী তিস্তা ব্রিজ এলাকা থেকে গতকাল দুপুরে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের (৩৫) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশকে খবর দিলে তারা মরদেহটি হেফাজতে নেয়।

স্থানীয়দের ধারণা, পঞ্চগড়ের বোদার নৌকাডুবির ঘটনায় মারা যাওয়া কোনো ব্যক্তির হতে পারে এই মরদেহ।

সুন্দরগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সেরাজুল হক মরদেহ উদ্ধারের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।



সাতদিনের সেরা