kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

৫০ মরদেহ উদ্ধার, এখনো নিখোঁজ ৪০

পঞ্চগড় ও দিনাজপুর প্রতিনিধি   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




৫০ মরদেহ উদ্ধার, এখনো নিখোঁজ ৪০

স্তব্ধ স্বজনহারা : করতোয়ায় নৌকাডুবিতে স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোকে যেন পাথর হয়ে গেছেন দিপালী। গতকাল পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের গড়দিঘী এলাকায়। ছবি : লুৎফর রহমান

করতোয়া থেকে আত্রাই ও ঢেপা। তিন নদীতেই একের পর এক ভেসে উঠছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মরদেহ। খোঁজ পেয়ে আহাজারি করতে করতে ছুটে যাচ্ছে স্বজনরা। কোনোটি নিজের স্বজনের সঙ্গে মিলছে, কোনোটি মিলছে না।

বিজ্ঞাপন

তবে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। দুর্ঘটনার দিন ২৫ জনের মৃত্যু দ্বিতীয় দিনে গিয়ে ঠেকেছে ৫০-এ।   

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে নৌকাডুবিতে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃত্যুর এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দীপঙ্কর রায়। নিখোঁজ রয়েছেন এখনো ৪০ জনের মতো। গতকাল রাত ৮টায় দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযান শেষ করা হয়। আজ আবার তল্লাশি চলবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে ডুবে যাওয়া নৌকাটিতে কতজন যাত্রী ছিল, তার সঠিক তথ্যও পাওয়া যায়নি। স্বজনদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, এখনো অনেক যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দীপঙ্কর রায় জানান, এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ৫০টি মৃতদেহের মধ্যে ১৩ জন শিশু, ২৫ জন নারী ও ১২ জন পুরুষ। তাদের মধ্যে বোদা উপজেলার ২৯ জন, বীরগঞ্জের ১৮ জন, আটোয়ারীর একজন, পঞ্চগড় সদরের একজন এবং ঠাকুরগাঁও সদরের একজন রয়েছে।

গতকাল যে ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে তারা হলো ঝর্ণা রানী (৪৫), দিপ বাবু (১০), সুচিত্রা (২২), কবিতা রানী (৫০), রেজ্যে বালা (৫০), দিপশিখা রানী (১০), সুব্রত (২),  জগদীশ (৩৫), যতি ম্রিন্ময় রায় (১৫), গেন্দা রানী, কনিকা রানী, সুমিত্রা রানী, আদরী (৫০), পুষ্পা রানী (৫০), প্রতিমা রানী (৫০), সূর্যনাথ বর্মণ (১২), হরিকেশর বর্মণ (৪৫), নিখিল চন্দ্র বর্মণ (৬০), সুশীল চন্দ্র রায় (৬৫), যুথি রানী (০১), রাজমোহন অধিকারী (৬৫), রূপালী রানী রায় (৩৮), প্রদীপ রায় (৩০) পারুল রানী (৩২) ও প্রতিমা রানী রায় (৩৯)।

গতকাল সকালে করতোয়ার আউলিয়ার ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান পেতে স্বজনরা ভোর থেকেই ওই ঘাট ও এর আশপাশে জড়ো হয়। একটি লাশ উদ্ধার হলেই নিজের স্বজনদের পরিচয় শনাক্তে সবাই ছুটে যায়। পরিচিত না হলে আবারও লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে।

নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে করতোয়া নদীতীরে অপেক্ষা করা মাড়েয়া বটতলি এলাকার উজ্জল কুমার রায় বলছিলেন, ‘মোর বাবা, মা আর পিসি নিখোঁজ ছিল। আইজ মা ও পিসির লাশ পাইছু। কিন্তুক এলাও বাবাক খুঁজে পাউনি। হামার আরো মেলা আত্মীয়-স্বজন এলাও নিখোঁজ। ’

পঞ্চগড় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী উপপরিচালক শেখ মো. মাহাবুবুল আলম বলেন, ‘সকাল থেকে পঞ্চগড় এবং আশপাশের জেলার আটটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট উদ্ধারকাজ করছে। এর বাইরে রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং রাজশাহী থেকে তিনটি ডুবুরিদলে মোট ৯ জন ডুবুরি উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। ’

নিখোঁজ সাতজনের মরদেহ ভেসে এলো দিনাজপুরে

দিনাজপুরের বীরগঞ্জের আত্রাই এবং খানসামার ঢেপা নদী থেকে গতকাল সাতটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে দুটি শিশু, পাঁচজন নারী।

পুলিশ জানায়, এগুলো পঞ্চগড়ের বোদায় করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজদের মরদেহ। মরদেহগুলো নদীর স্রোতে ভেসে এসেছে।

বীরগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত সকোর জানান, তাঁরা বীরগঞ্জ আত্রাই নদের কাশিমনগর বাদলা ঘাট থেকে একটি শিশু এবং এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করেছেন।

শিশুটির নাম সুব্রত রায়। তার বয়স আড়াই বছর। শিশুটি পঞ্চগড় উপজেলার বোদা উপজেলার মাড়েয়া গ্রামের প্রফুল্ল রায়ের ছেলে।

নারীর নাম আদুরী রায়। তিনি বোদা উপজেলার কাউয়াখাল গ্রামের হেম কুমার রায়ের স্ত্রী। মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

খানসামা থানার ওসি চিত্ত রঞ্জন রায় জানান, তাঁর এলাকা খানসামায় আত্রাই নদের বাসুলী চেয়ারম্যানপাড়া, জয়ন্তীয়া ঘাট, ঘাটপার ও জিয়া সেতুর কাছ থেকে পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হয়।

মৃত ওই ব্যক্তিরা হলেন পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার শক্তিপদ রায়ের স্ত্রী ঝর্ণা বালা রায়, বোদা উপজেলার সহিন রায়ের স্ত্রী সুমিত্রা রাণী, বিমল চন্দ্র রায়ের ছেলে সূর্য রায়, দেবীগঞ্জ উপজেলার ভূপেন রায়ের স্ত্রী রূপালী রায় এবং ঠাকুরগাঁও সদরের অনন্ত রায়ের স্ত্রী পুষ্পা রানী। মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বোদা উপজেলার করতোয়া নদী থেকে খানসামার আত্রাই নদের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। আর বীরগঞ্জের ঢেপা নদীর স্লুইচ গেটের দূরত্ব ৬৫ কিলোমিটার।

হতাহতদের জন্য বোদেশ্বরী

মন্দিরে প্রার্থনা

যে মন্দিরে যাওয়ার জন্য নৌকায় চেপে যেতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে সনাতন ধর্মের অর্ধশত মানুষ, তাদের জন্য সেই মন্দিরে ত্রিসন্ধ্যা বিশেষ প্রার্থনা করেছে পূজারিরা। মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি নীতিশ বকসী বলেন, ‘দুর্গা পূজার ছয় দিন আগে মহালয়ার মাধ্যমে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এই সময়ে এই মন্দিরে অনেক ভক্তের আগমন ঘটে। একটি সেতু না থাকায় আজ এতগুলো মানুষের প্রাণ গেল। আমরা নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় মায়ের কাছে ত্রিসন্ধ্যা প্রার্থনা করে যাচ্ছি। আগামীকাল (আজ) ভক্তদের নিয়ে বড় আকারের প্রার্থনা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। ’

গত রবিবার দুপুরে বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাটের কাছে শতাধিক যাত্রী নিয়ে করতোয়ায় ডুবে যায় নৌকাটি। শারোদীয় দুর্গোত্সবের মহালয়া উপলক্ষে নদীর এপার থেকে সনাতন ধর্মের লোকজন দেবীগঞ্জ উপজেলার বোদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন। মাঝনদীতে গিয়ে নৌকা ডুবু ডুবু অবস্থা দেখে মাঝি আবার ফিরে আসার চেষ্টা করেন। এর মধ্যেই উল্টে যায় নৌকাটি। এতে কেউ কেউ সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অনেকে ডুবে যায়।  

ঘটনা তদন্তে রবিবার রাতেই পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দ্বীপংকর রায়কে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।



সাতদিনের সেরা