kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০২২ । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বাণিজ্য ও চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, কিন্তু বাণিজ্য ক্যাডার মুমূর্ষু

দেলওয়ার হোসেন   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাণিজ্য ও চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, কিন্তু বাণিজ্য ক্যাডার মুমূর্ষু

দেশ এবং দেশের বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্যে যখন প্রতিযোগিতা ও চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, তখন সরকারের বাণিজ্যসংক্রান্ত বিশেষায়িত ক্যাডার ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। সরকারের বাণিজ্য ক্যাডারের সদস্য এখন মাত্র ২১ জন। ১৯৯৪ সালে এই ক্যাডারে পদ ছিল ১১৬টি। বাণিজ্য ক্যাডারের কাজ চলে গেছে প্রশাসন ক্যাডারের হাতে।

বিজ্ঞাপন

পাশের দেশ ভারত ও পাকিস্তান গত কয়েক বছরে বাণিজ্য উইংয়ের পরিধি বাড়িয়েছে। দেশে-বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে তাঁদের কাজেও লাগাচ্ছে। বাণিজ্য প্রসার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), চীন, ভিয়েতনামও বাণিজ্য বা ট্রেড সার্ভিসের কর্মকর্তাদের দক্ষ করে তুলছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক কূটনীতির কথা জোরেশোরে বলে আসছে। কিন্তু বিদেশে দূতাবাসগুলোতে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ লোকজন পাঠানোর কোনো সুযোগ তৈরি করছে না।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, পাঁচ দশকের ব্যবধানে দেশের রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৯ গুণ। আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৪ গুণ। নতুন পণ্য বাজারে আনতে না পারা ও বৈচিত্র্যকরণ করতে না পারার কারণে রপ্তানি কয়েকটি পণ্যে সীমাবদ্ধ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য হলো, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৭৫ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে রপ্তানি ছিল তিন লাখ ৮৭ হাজার ৭৬৭ কোটি, আমদানি ছিল ছয় লাখ ৮৭ হাজার ৭৫২ হাজার কোটি টাকা।

কিন্তু দেশের আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের প্রধান নিয়ন্ত্রক পদটিতেও এখন বাণিজ্য ক্যাডারে কেউ নেই। প্রশাসন ক্যাডারের একজন অতিরিক্ত সচিব এই দায়িত্ব পালন করছেন। উন্নয়নশীল দেশ হলে কম সুদে ঋণ পাওয়া এবং রপ্তানিতে পাওয়া বর্তমান সুবিধাগুলো আর থাকবে না বাংলাদেশের। তখন বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদন, দর-কষাকষি, সমঝোতার জন্য বিশেষায়িত কর্মকর্তার প্রয়োজনীয়তা আরো বাড়বে।

আমদানি-রপ্তানি দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, আমদানি-রপ্তানি, ট্যারিফ, প্রণোদনানীতি এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সংস্থা, বাণিজ্য চুক্তি—এসবের জন্য পেশাদার ও দক্ষ জনবল তৈরির কোনো নীতিমালাও করা হচ্ছে না।

ফলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারব্যবস্থাও তদারকি করতে পারছে না সরকার।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, পৃথিবীতে বাণিজ্য কূটনীতি একটা বড় বিষয়। ওয়ার্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (ডাব্লিউটিও) এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর কাজ করার জন্য বাণিজ্য সম্পর্কিত জনবল প্রস্তুত করা জরুরি। দূতাবাসগুলোর কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পদে বাণিজ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এ জন্য তাঁদের প্রস্তুত করতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, বাণিজ্য বিষয়ে নির্দিষ্ট জনবল না থাকায় যেসব কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাঁরা অন্য দায়িত্বে চলে গেলে এই প্রশিক্ষণও আর কাজে লাগে না। সিপিডির পক্ষ থেকে প্রায় দেড় শ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাণিজ্যিক কাজের প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে বদলি হয়ে গেছেন। তাই বিশেষ কাজের জন্য বিশেষায়িত লোক দরকার। না হলে সরকারের অর্থের অপচয় হয়। দেশেরও স্বার্থের ক্ষতি হয়।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব তপন কান্তি ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, বাণিজ্য ক্যাডারের জনবল অনেক কম। তাঁদের দিয়ে আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তরই চলে না। ফলে দূতাবাসের বাণিজ্যিক উইংয়ে তাঁদের পদায়ন করা যাচ্ছে না। আবার বাণিজ্য ক্যাডার বিলুপ্তির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ক্যাডার থাকবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে।

দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংগতি রেখে দক্ষ কর্মকর্তা তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে তপন কান্তি ঘোষ বলেন, এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। বাণিজ্য বিষয়ে যাঁদের অভিজ্ঞতা আছে তাঁদেরকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।

বাণিজ্য ক্যাডারের পদে প্রশাসন ক্যাডার

১৯৮০ সালের ১ সেপ্টেম্বর ১০০টি পদ নিয়ে বাণিজ্য ক্যাডার পুনর্গঠন করা হয়। এর মধ্যে ৩৩টি পদ ছিল বিভিন্ন দূতাবাসে। ১৩টি প্রেষণযোগ্য পদ ছিল ইপিবি ও টিসিবির অধীন। পরবর্তী সময়ে ডিপার্টমেন্ট অব প্রাইসেস অ্যান্ড মার্কেট ইন্টেলিজেন্স, ডিপার্টমেন্ট অব সাপ্লাই অ্যান্ড ইন্সপেকশন, ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বস্ত্র সেল বাণিজ্য ক্যাডারের আওতাভুক্ত করে ১১৬টি পদ তৈরি করা হয়।

কিন্তু সপ্তম বিসিএসের ১৪ বছর পর ২২তম বিসিএসে বাণিজ্য ক্যাডারে মাত্র চারজন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। ২৮তম বিসিএসে চারজন, ২৯ ও ৩০তম বিসিএসে দুজন করে এবং ৩৬তম বিসিএসে পাঁচজন নিয়োগ দেওয়া হয়। চারজন নন-ক্যাডার থেকে পদোন্নতি পেয়েছেন।

এখন ৪৪তম বিসিএস চলছে। কিন্তু বাণিজ্য ক্যাডারে আর কোনো নিয়োগ হয়নি। ফলে প্রশাসন ক্যাডার দিয়েই চলছে এই বিশেষায়িত কাজ।

দূতাবাসে নেই বাণিজ্য ক্যাডার

বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাসের বাণিজ্যিক উইংয়ে ইকোনমিক মিনিস্টার, কমার্শিয়াল কাউন্সেলর, প্রথম সচিবের (বাণিজ্যিক) ২১টি পদ থাকলেও বাণিজ্য ক্যাডারের কোনো কর্মকর্তা নেই। যাঁরা কর্মরত আছেন তাঁদের বেশির ভাগই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করেননি।

রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, বিদেশের বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ, দেশীয় বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গে সংযোগ সাধন, আমদানি-রপ্তানির জটিলতা নিরসনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয় এসব কর্মকর্তাকে।

ডাব্লিউটিএ সেলেও প্রশাসন ক্যাডার

ডাব্লিউটিএ সেলের কাজ টেকনিক্যাল প্রকৃতির হওয়ায় এ পদগুলো বিসিএস বাণিজ্য ক্যাডারভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয় কয়েক বছর আগে। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত আগস্ট মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ সেলকে অনুবিভাগে রূপান্তর করে প্রশাসন ক্যাডারের জন্য ১০টি পদ সৃষ্টি করেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, যৌথ মূলধনী কম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে বেশির ভাগ কর্মকর্তা বাণিজ্য ক্যাডারের থাকার নিয়ম থাকলেও আছেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। টেকনিক্যাল এসব পদে অল্পদিনের জন্য এসে আবার তাঁরা বদলি হয়ে যাচ্ছেন অন্য পদে।     

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও বাণিজ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, সামনে আরো অনেক চ্যালেঞ্জ আসবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে। বাণিজ্যিক কূটনীতির জন্য অবশ্যই একদল জলবল তৈরি করা প্রয়োজন। বাণিজ্যিক কূটনীতির জন্য বাণিজ্যিক টার্ম বুঝতে হয়। এলসি, ব্যাংকিং কার্যক্রম ও চুক্তিসংক্রান্ত অনেক টেকনিক্যাল বিষয় আছে। দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পদেও পেশাদার, দক্ষ জনবল নিয়োগের নীতিমালা করতে হবে।

প্রশাসনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার কাজও ঝুলে আছে তিন বছর

বর্তমানে বিসিএস বাণিজ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগও সীমিত। নানা বৈষম্যে জর্জরিত হয়ে ২০১৯ সালে তাঁরা প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত হওয়ার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সে বিষয়েও কোনো অগ্রগতি হয়নি।

আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান নিয়ন্ত্রক নন্দন কুমার বণিক বলেন, বাণিজ্য ক্যাডারকে শক্তিশালী করার জন্য বিদ্যমান আইন, নীতিমালা, বিধি, পরিপত্র ও আদেশ সংশোধন করে সময়োপযোগী করা প্রয়োজন। কারণ, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হলে বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ আরো বাড়বে। ফলে এখনই দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি।

বিসিএস ট্রেড ক্যাডার অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বাণিজ্য ক্যাডারের পদগুলোতে এখন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। একটি ক্যাডারকে এভাবে রাখার কোনো মানে হয় না।

 



সাতদিনের সেরা