kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

পঞ্চগড়ে নৌকাডুবি ২৫ জনের মৃত্যু

শোকে ভেসে গেল উৎসবের রং

► মৃতদের ১২ জন নারী, ৮ জন শিশু ও ৫ জন পুরুষ যাত্রী
► নৌকাটিতে ৭০-৮০ জন যাত্রী ছিল। উদ্ধার ২০ জন হাসপাতালে
► যাত্রীরা নদীর ওপারে মন্দিরে যাচ্ছিল। মৃতদের ২৪ জনই হিন্দু

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শোকে ভেসে গেল উৎসবের রং

করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির পর উদ্ধার করা লাশের মধ্যে স্বজনদের খুঁজছেন অনেকে। গতকাল বিকেলে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাট এলাকায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

শারদীয় দুর্গোৎসবের মহালয়ার দিন। করতোয়া নদীর ওপারে মন্দির। পূজা-অর্চনার জন্য পরিবার-পরিজন নিয়ে নৌকায় করে সেখানেই যাচ্ছিল এপারের সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ ৭০ থেকে ৮০ জন।

নদীর মাঝে গিয়ে স্রোতে দুলতে শুরু করে নৌকা।

বিজ্ঞাপন

ওপারে যেতে না পেরে ফিরে আসার চেষ্টা করেন মাঝি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই উল্টে যায় নৌকাটি। ডুবে মারা যায় ২৫ জন। এর মধ্যে আটজনই শিশু। বাকিদের মধ্যে ১২ জন নারী এবং পাঁচজন পুরুষ। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় লোকজন ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বর্ণনায় এ তথ্য জানা গেছে।  

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাট এলাকায় গতকাল রবিবার দুপুর দেড়টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর অনেকে সাঁতরে তীরে ওঠে। তবে অনেকে নিখোঁজ রয়েছে বলে দাবি স্বজনদের।

স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা যায়, মহালয়া উপলক্ষে বোদা উপজেলার মাড়েয়া বাজার এলাকার আউলিয়া ঘাট থেকে ৭০ থেকে ৮০ জনের মতো মানুষ নিয়ে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি বড়শশী ইউনিয়নের বোদেশ্বরী মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। ডুবে যাওয়ার পর নৌকার যাত্রীদের অনেকেই সাঁতরে তীরে ওঠে। তবে যাত্রীদের বেশির ভাগ নারী ও শিশু হওয়ায় তারা ডুবে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন খবর পেয়ে উদ্ধারকাজে যোগ দেয়।

মারা যাওয়া ব্যক্তিরা হলো শ্যামলী রানী (১৪), লক্ষ্মী রানী (২৫), অমল চন্দ্র (৩৫), শোভা রানী (২৭), দীপঙ্কর (৬), পিয়ন্ত (৩), রূপালি ওরফে খুকি রানী (৩৫), প্রমীলা রানী (৫৫), ধনবালা (৬০), সুনিতা রানী (৬০), ফাল্গুনী (৪৫), প্রমীলা দেবী (৭০), জ্যোতিষ চন্দ্র (৫৫), তারা রানী (২৫), সনেকা রানী (৬০), সফলতা রানী (৪০), হাশেম আলী (৭০), বিলাশ চন্দ্র (৪৫), শ্যামলী রানী (৩৫), উশশী (৮), তনুশ্রী (৫), শ্রেয়শী (১), প্রিয়ন্তি (৮), বিষ্ণু (৩) ও ব্রজেন্দ্রনাথ (৪৫)। তারা সবাই বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। হাশেম আলী ছাড়া বাকিরা সবাই সনাতন ধর্মাবলম্বী বলে জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা লাবু ইসলাম বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনেই নৌকা ডুবে যায়। নৌকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষ যাচ্ছিল। নৌকাটি মাঝনদীতে যাওয়ার পর দুলতে থাকে। এক পর্যায়ে সরাসরি উল্টে যায়। সবাই নৌকার নিচে চাপা পড়ে। কেউ কেউ সাঁতরে উঠে আসে। শিশু ও নারীরা ডুবে যায়। ’

পাঁচপীর এলাকার রঞ্জিত কুমার রায় বলেন, ‘আমার মা সুমিত্রা রানী বাবাসহ বোদেশ্বরী পীঠ মন্দিরে মহালয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে নৌকা ডুবে আমার মা মারা যান। বাবা সাঁতরে পারে উঠেছেন। ’

ঘটনাস্থলে অপেক্ষারত মিজানুর রহমান নামের একজন বলেন, ‘আমাদের দুজন স্বজনকে এখনো পাওয়া যায়নি। জানি না তারা বেঁচে আছে, না মারা গেছে। উদ্ধারের আশায় বসে আছি। ’

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, বোদা, পঞ্চগড় ও আটোয়ারী উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট নৌকা নিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালায়। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২০ জনকে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

পূজা উপলক্ষে ঘাট এলাকায় দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্য মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমরা সকাল থেকেই আউলিয়া ঘাটে দায়িত্ব পালন করছিলাম। নৌকার মাঝিদের অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে পারাপারের জন্য আমরা নিষেধ করছিলাম। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। মানুষও কথা শুনছিল না। নৌকা পারে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে নৌকায় উঠছিল। তাই এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। ’

ফায়ার সার্ভিসের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক জসীম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের ছয়টি ইউনিটের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন। এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। আমাদের অভিযান চলবে। ’

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোলেমান আলী বলেন, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের প্রতি পরিবারকে সৎকারের জন্য ২০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আহতদের পাঁচ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হবে।

দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী নৌকাটিতে ছিল। ছোট নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী তোলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমাদের উদ্ধারকাজ পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী চলেছে। তবে কেউ নিখোঁজ থাকলে তাদের স্বজনদের যোগাযোগের জন্য মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে একটি কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। ’

 



সাতদিনের সেরা