kalerkantho

সোমবার । ২৮ নভেম্বর ২০২২ । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বিশেষ সাক্ষাৎকার

নদীগুলো যেন এতিম অভিভাবক নেই

দেশের নদীগুলো দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। প্রতিনিয়ত কমছে নদীপথ। নদীমাতৃক এই দেশের নদীগুলো এখন কেমন আছে? বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে দেশের নদ-নদীর নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজিব ঘোষ

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নদীগুলো যেন এতিম অভিভাবক নেই

কালের কণ্ঠ : বর্তমানে দেশের নদীগুলোর অবস্থা কেমন?

আইনুন নিশাত : নদীগুলোর অবস্থা এতিমের মতো। নদীর দেখভাল করার জন্য কিছু নিয়ম প্রয়োজন। এদের দেখার কেউ নেই। কোনো অভিভাবক নেই।

বিজ্ঞাপন

একটি নদী শীতকালে এক রকম থাকে, বর্ষাকালে আরেক রকম। শীতকালে পানি কমে গেলে নদীগুলো ক্রমান্বয়ে দখল হয়ে যাচ্ছে। দখল হয়ে গেলে নদী আর নিজের অবস্থানে থাকে না। সঙ্গে দূষণ আছে। অপরিকল্পিতভাবে নদীতে ড্রেজিং হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠান নদীর উন্নয়নে কাজ করার কথা, তারা নদীকে আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

কালের কণ্ঠ : এখনো আমরা নদীর সঠিক সংখ্যা জানি না। এমনকি নদীর সংজ্ঞা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আইনুন নিশাত : এটা ঠিক। আমরা নদীর সংখ্যা ও সংজ্ঞা কোনোটাই সঠিকভাবে জানি না। কেউ একজন কোনো একসময় বলেছিলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এখনো আমরা সে কথাই বলে যাচ্ছি। কিন্তু আমার ধারণা, আরো ২০-৩০টি নদী বেশি হবে। দেশের নদীর সঠিক সংখ্যাও কারো কাছে নেই। এর কারণ নদীর সংজ্ঞা পরিষ্কার নয়। চোখে দেখে নদী ঠিক করা যাবে না। দিনাজপুরে যেটি নদী, বরিশালে সেটি হয়ে যায় খাল। বরিশালের খাল দিনাজপুরের জন্য অনেক বড় নদী। প্রবহমান পানির ধারাকেই নদী বলা হয়। সিলেটের ছড়াও নদী। অতি ছোট, ছোট, মাঝারি, বড় ও অতি বড়—এভাবে দেশের নদীগুলোকে ভাগ করা যেতে পারে।

কালের কণ্ঠ : দেশে এখন বড় বড় সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। নদীর ওপর এর প্রভাব কী?

আইনুন নিশাত : যমুনা সেতু নির্মাণের পর যমুনা নদীতে এক ফোঁটাও পানি কমেনি। নদীর পানি আগে যেমন ছিল তেমনই আছে। কিন্তু আগে আমরা নদীর মাঝখানে চর দেখতে পেতাম। এখন সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে পুরো পানির প্রবাহটা দেখা যায়। একই কথা পদ্মা সেতু, লালন শাহ সেতুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেতু আর কালভার্টের পার্থক্যটা বুঝতে হবে। নদীর ক্ষতি হচ্ছে কালভার্টের কারণে। যে সেতুর নিচ দিয়ে নৌযান চলাচল করতে পারে না, সেটাই কালভার্ট। এখন ৫০০ ফুট প্রস্থ নদীতে ৩০০ ফুটের কালভার্ট বানিয়ে নদীগুলোকে ২০০ ফুট আগেই মেরে ফেলা হচ্ছে। এর জন্য এলজিইডি (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর) আর স্থানীয় জনপ্রতিনিধীরা দায়ী।

কালের কণ্ঠ : ১৯৭৫ সালে দেশে মোট যাত্রীর ১৬ শতাংশ নৌপথে যাতায়াত করত আর সড়কে ৫৪ শতাংশ। ২০০৫ সালে নৌপথে কমে হয়েছে ৮ শতাংশ আর সড়কে বেড়ে হয়েছে ৮৮ শতাংশ। কী বলবেন?

আইনুন নিশাত : নিঃসন্দেহে আমাদের নদীপথ অবহেলিত। আঞ্চলিক ও ব্যাবসায়িক রাজনীতিও এর জন্য দায়ী। আবার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আছে। সড়ক হলে ঋণ পাওয়া যায়। প্রকল্প বাড়ানো যায়। বড় বড় প্রকল্প তৈরি করা যায়। বাস-ট্রাকের ব্যবসা করা যায়। জ্বালানি তেল বিক্রি করা যায়। এগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িত।    

কালের কণ্ঠ : আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ১০ হাজার কিলোমিটার নদীপথ তৈরি করা হবে। সরকার সেই লক্ষ্যে আগাচ্ছে বলে মনে করেন?

আইনুন নিশাত : কেউ সরকারকে বুদ্ধি দিয়েছে, ড্রেজিং করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আসলে বিষয়টা তা নয়। ড্রেজিং অনেক সময় নদীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়। তবে আমি বলব, সরকারের সদিচ্ছা আছে। কিন্তু সঠিকভাবে, পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাব রয়েছে।  

কালের কণ্ঠ : নদীর দূষণ-দখল কেন ঠেকানো যাচ্ছে না?

আইনুন নিশাত : কারণ খুব সোজা, যারা দখলে জড়িত, তারা খুবই শক্তিশালী। ক্ষমতাধর মানুষরাই নদীর দখল-দূষণের সঙ্গে বেশি জড়িত।

কালের কণ্ঠ : নদী বাঁচাতে করণীয় কী?

আইনুন নিশাত : নদীগুলো বাঁচাতে হলে সঠিক পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো এখনো পরিকল্পনার মাধ্যমে ভালো রাখার সুযোগ আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।



সাতদিনের সেরা